মহুয়া মল্লিক
কমলালেবুর ভ্যানটা দেখেই নভশ্রী ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলল৷ কলকাতা থেকে মা এসেছে৷ ক’টা দিন এই নির্বান্ধব পুরীতে দারুণ হইহই করে কাটছে৷ কান্টিনের একঘেয়ে খাবারের থেকে ক’টা দিন বিরতি৷ মায়ের ফেরার সময় হয়ে এল৷ ক’দিন আগেই কথায় কথায় বলেছিল, ‘‘এখানে নাকি কিলো দরে কমলা লেবু পাওয়া যায়?’’ নভশ্রী কথাটা শুনেছিল, উত্তর দেয়নি কারণ অফিসের বাইরে আর কোনও খবর সে রাখে না৷ আজ তাই ভ্যানটা দেখেই নেমে গেল৷ খুব সস্তা, ড্রাইভার এসে দরদাম করতে আরও কম দামে পাঁচ কিলো লেবু কিনে ফেলল৷ দাম মিটিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দেবার আগেই সেই লোকটাকে আবার দেখল৷ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার৷ দীর্ঘদেহী, ফর্সা টকটকে রঙ রোদে পুড়ে একটু তামাটে৷ ঠান্ডার কারণে মাথা, মুখ মাফলারে ঢাকা থাকলেও ঐ চোখের দৃষ্টি নভশ্রী চিনতে পারল৷
প্রথম লোকটাকে দেখে জনবহুল মেইন রোডে, একটা কল আসায় নভশ্রী একটু সরে গিয়েছিল৷ তারপর যখন ফিরছিল, মুখোমুখি লোকটাও সটান তার চোখে চোখ রেখে এগিয়ে আসছিল৷ এভাবে কেন আসছিল লোকটা? নভশ্রী ভারী অবাক হয়েছিল৷ ঠিক সেই সময় মা দুটো সফটি নিয়ে হাজির হয়েছিল৷ লোকটা চোখের পলকে উবে গিয়েছিল৷ নভশ্রীও আর লোকটাকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি৷
কিন্তু আজও মুখোমুখি এগিয়ে আসতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেল৷ খুব দ্রুত কান ঘেঁষে বেরিয়ে যাবার সময় লোকটা বলে গেল, ‘‘আপ কি হর সওয়াল কী জবাব ম্যায় দে সাকতা হু, কাল সাম পাঁচ বাজে মেহেরবানী করকে পাহাড়ি মন্দিরকে তরফ আ যাইয়ে৷’’ নভশ্রী ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই লোকটা একটা চলমান বাইকে উঠে বাঁকের মুখে অদৃশ্য হয়ে গেছে৷ মেডিক্যাল কলেজকে ডাইনে রেখে তারা যখন বরিয়াতুর রাস্তায় উঠছে এক ঝলক বাইকটা দেখল তারপর আর দেখতে পেল না৷ এই ঠান্ডায়ও ঘেমে উঠেছিল নভশ্রী৷ কী হচ্ছে এসব! লোকটা এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন? এমনকি বলতে চায় তাকে?
এই ক’টা মাস সে এখানে এসে ভালোই ছিল৷ ইংলিশে অনার্স করে দুম করে সে হিউম্যান রিসোর্সে এম. বি. এ. করে এই চাকরিটা ক্যাম্পাসিং-এর মাধ্যমে পেয়েও গিয়েছিল৷ সরকারি চাকুরে বাবা-মায়ের এতে প্রবল আপত্তি ছিল৷ ওঁরা চেয়েছিলেন মেয়েও সরকারি স্কুল বা কলেজে চাকরি করুক৷ আর পাঁচটা বাঙালি বাবা-মায়ের মতোই একমাত্র মেয়ের জন্য ঝুঁকি নিতে চাননি তাঁরা৷ কিন্তু নভশ্রী যখন হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার লেভেলের এই চাকরিটা পেয়ে গেল, বাবা- মায়ের কোনও আপত্তি আর ধোপে টেকেনি৷
বরিয়াতু ছাড়িয়ে ওর গাড়ি তখন হিলভিউইয়ের গেটে হর্ন দিচ্ছে৷ ঝলমলে আবাসনের ভিতরে ঢুকতেই চাপা টেনশনটা ওকে ছেড়ে গেল৷ দরজায় যখন বেল দিচ্ছে এক অন্য নভশ্রী যেন, সারাদিনের অফিসের গম্ভীর, ইস্পাত কঠিন মেয়েটা খোলস ছেড়ে যেন এক উচ্ছল জলপ্রপাত৷ যেন এক আদুরে কিশোরী কন্যা৷ ঘরে পা দিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরল৷ পিছনে ড্রাইভারের হাতে পলিথিনের বড় বড় দুটো ব্যাগ ভর্তি কমলালেবু৷
আজ সারাদিন নভশ্রীর বড্ড ধকল গেছে৷ পরপর দুটো ইউনিট ভিজিট করা৷ ওয়ার্কারদের সঙ্গে কথা বলা, তারপর ইউনিট টুয়ের প্রোডাকশন ম্যানেজারের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলে, এমপ্লয়িদের জন্য একটা স্পেশাল ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে নিজের অফিসে ফিরতে ফিরতে সূর্য ডুবে গিয়েছিল৷
প্রোডাকশন ম্যানেজার অর্কদীপও বাঙালি এবং মাস দুয়েক জয়েন করেছে৷ ওর কাগজপত্র নিয়ে কাজ করার সময় চোখে পড়েছে কোলকাতায় ওদের পাশের আবাসনেই থাকে৷ যদিও আগে কখনো দেখা হয়েছে কিনা মনে করতে পারেনি৷ মেটালরজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি এই স্বল্প সময়েই নিজের দক্ষতা প্রমাণ দিয়েছে৷ নভশ্রীর থেকে সামান্য বড় তবে বেশ অন্তর্মুখী স্বভাবের ছেলেটি, নভশ্রী লক্ষ্য করেছে সে কথা বলতে গেলেই কেমন নার্ভাস হয়ে যায়৷ কথাটা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা খেলে যায়৷ মৈত্রেয়ী চায়ের কাপ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছেন৷ মেয়েকে সোফায় শুয়ে মোবাইল নিয়ে খুটখাট করতে দেখে হা হা করে উঠলেন, ‘‘এই স্ন্যাক্সটা খাসনি কেন? উফ এই মেয়েকে নিয়ে যে আমি কি করি! কোন সকালে সেই চিকেন স্ট্যু আর স্যালাড ছাড়া কিছু পেটে পড়েনি সারাদিন৷ নিজেই তো বললি খিদে পেয়েছে৷’’
মায়ের চিৎকারে উঠে বসে নভশ্রী৷ সেন্টার টেবিল থেকে ধোঁয়া ওঠা চিঁড়ের পোলাও-এর প্লেটটা সঙ্গে সঙ্গে টেনে নেয়৷ মায়ের হাতের এই জলখাবারটা তার ভীষণ পছন্দের৷ তবুও ক্যালরি কনসাস মেয়ে অনুযোগের সুরে বলল, এই ক’দিনে এত খাওয়াচ্ছ, ওয়েট বেড়ে গিয়ে কুমড়োপটাশ না হয়ে যাই!
মৈত্রেয়ী মেয়ের পাশে বসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ভাবলেন এত তাড়াতাড়ি মেয়েটা চাকরিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে জয়েন না করলেই পারত৷ এখনও এত ছেলেমানুষ! মেয়েটাকে ছেড়ে একা একা থাকতে তাদের বড্ড চিন্তা হয়৷
রাত্রে ঘুমের মধ্যেও লোকটা তাকে তাড়া করে বেড়ালো৷ কী বলতে চায় লোকটা? ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়? কীসের প্রশ্ন? ওর তো কোনও প্রশ্ন নেই৷ ও উচচাকাঙ্ক্ষী আজকের তরুণী৷ ছকে বাঁধা জীবনে আটকে থাকতে চায়নি বলেই এই জব বেছে নেওয়া৷ মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে এই রকম ভারত কোম্পানির এইচ আর ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার হয়ে দুটি আলাদা আলাদা ইউনিটের দায়িত্ব নিয়ে রাঁচি শহরে আসা৷ কোম্পানির প্রোভাইড করা ঝাঁ চকচকে পনেরোশো স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট, পার্কস, মোটা পে প্যাকেট-জীবন তাকে এই বয়সেই দু’হাত ভরে দিয়েছে৷
ইউনিট ওয়ানে বিস্কুট ফ্যাক্টরি আর ইউনিট টু-এ অটো অ্যানসিলারি প্ল্যান্ট—এখানে মেটাল গিয়ার মেইনলি উৎপাদন হলেও গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশও তৈরি হয়৷ পাঞ্জাবি মালিক সুখবিন্দরের এই রকম আরও আঠারোখানা ফ্যাক্টরি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে৷ তাদের এইসব ইউনিটের প্রোডাকশান প্রায় তেরো-চোদ্দটি রাজ্যে সাপ্লাই হয়৷ শুরুতেই এমন একটা জায়গায় চাকরি পাওয়া সত্যি ভাগ্যের৷
তবে আপাত দৃষ্টিতে সব ঠিকঠাক চললেও কোথাও যেন একটু ছন্দপতন ইদানীং টের পাচ্ছে সে৷ ইউনিট টু নিয়ে তেমন প্রবলেম নেই, ওই মাঝে মাঝে অটোমেটিক মেশিনারিজগুলো একটু গণ্ডগোল করে ফেলে, অনেক পুরনো হয়ে গেলে যা হয় আর কী! তবে প্রোডাকশান ম্যানেজার আর সুপারভাইজার দক্ষতার সঙ্গে সেসব হ্যান্ডেল করে, নভশ্রীকে খুব একটা মাথা ঘামাতে হয় না৷ ওই মাঝে মাঝে ওয়ার্কারদের স্কিল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে একটু ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা ছাড়া৷ কিন্তু আপাত নিরীহ বিস্কুট ফ্যাক্টরিটা নিয়ে নভশ্রী একটু চাপে আছে৷ মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের জট৷ ওয়ার্কারদের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলেও কিছু সুরাহা হচ্ছে না৷ এদিকে ম্যানেজার লেভেলের লোকজনরাও নভশ্রী এটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাক এটা চাইছেন না৷ আসলে কেউই মালিকের রোষানলে জ্বলতে চায় না৷ লাম সাম একটা কমপেনসেশন দিয়ে দিলেই যদি ব্যাপারটা মিটে যায় তাহলে নভশ্রীর এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজনটাই কিসের?
কথাটা মনে আসতেই সন্ধেবেলায় লোকটার বলা কথাগুলো মস্তিষ্কের মধ্যে অনুরণিত হলো, ‘‘আপকি হর সওয়াল কী জবাব...৷’’ পাশ ফিরে শুতে শুতে নভশ্রী ঠিক করেই ফেলল, কাল অফিস ফেরত একবার পাহাড়ি মন্দির ঢুঁ মেরেই আসবে৷
মৈত্রয়ী দেখছেন মেয়ে তার থরথর করে কাঁপছে৷ এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় ঘেমে নেয়ে গেছে প্রায়৷ পাশের ঘর থেকে মেয়ের চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে ছুটে এসেছেন তিনি৷ মা’কে দেখে একটু ধাতস্থ হল নভশ্রী৷ মুঠিতে ধরা মোবাইল ফোন ধীরে ধীরে বালিশের আড়ালে নামিয়ে রাখল৷ মৈত্রেয়ী ততক্ষণে টিউবটা জ্বালিয়ে দিয়েছে৷ জোরালো আলো লাফিয়ে নামতেই নভশ্রী অনেকটা সামলে নিয়েছে, মায়ের সামনে তাকে স্টেডি থাকতে হবে, না হলে এই চাকরির মায়া ছেড়ে তাকে কলকাতা ফিরতে হবে৷ সে বরাবরই অন্যরকম কাজ করতে চেয়েছিল, যদিও যত দিন যাচ্ছে বুঝতে পারছে কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে৷ এখন নার্ভ শক্ত রেখে না এগোতে পারতে তাকে হেরে যেতে হবে৷ নভশ্রী সরকার হারার জন্ম জন্মায়নি৷
মৈত্রেয়ী মেয়েকে এতক্ষণ জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন, এবার প্রশ্ন করলেন, ‘‘মিতিন কি হয়েছে মা, এমন চিৎকার করে উঠলি কেন? ভয় পেয়েছিস? নভশ্রী মা’কে আশ্বস্ত করে বলল, ‘‘ও কিছু না একটা ভয়ের স্বপ্ন দেখেছিলাম৷’’ ভোর হয়ে আসছিল, মা’কে চা করতে বলে সে টয়লেটে ঢুকে গেল৷
মৈত্রেয়ী দু’কাপ চা বানিয়ে মেয়ের রুমে এসে দেখে সে এত ভোরেই জিন্স টপ আর লেদার জ্যাকেটে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছে৷
‘‘কী রে তুই কোথাও বেরবি নাকি?’’ চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে মৈত্রেয়ী ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন৷ মেয়ের ব্যাপারস্যাপার তার সুবিধের ঠেকছে না৷
রিস্টওয়াচটার ব্যান্ড আটকাতে আটকাতে চট জলদি নভশ্রী ম্যানেজ দেবার চেষ্টা করল, ‘‘এই দেখো কাল তোমায় বলতেই ভুলে গেছি, আজ সকালেই একটা ইম্পরট্যান্ট ডেলিভারি আছে, আমি না গেলে মালটা আটকে যাবে৷’’
‘‘তা বলে কাকভোরে! একটা যুবতী মেয়ে, মালিকের ঘরে কি মেয়ে নেই? এইসব কাজ তো পুরুষদের দিতে পারে৷’’
মা তার কাজের ব্যাপারটা বোঝে না বলে কোনরকমে ম্যানেজ করল৷
চায়ে চুমুক দিতে দিতে নভশ্রী হেসে ফেলে, ‘‘উফ মা চাকরির সময় কি এইসব ছেলে মেয়ে দেখে চাকরি দিয়েছিল? তুমি এত ভেব না তো৷ অফিসের গাড়িতে যাব৷ আর তাছাড়া রোজ তো আর এমন কাজ করতে হয় না৷’’
মা’কে ম্যানেজ করে গাড়িতে উঠতেই চিন্তাটা আবার ঘিরে ধরল৷ কী হচ্ছে এসব! আবার একই ঘটনার রিপিটেশন৷ তার জয়েন করার পর এই নিয়ে চারজন৷ আর অদ্ভুত ব্যাপার প্রত্যেকবার নাইট শিফট সেরে বাড়ির ফেরার পথে ঘটনাটা ঘটছে৷ তাদের ফ্যাক্টরির মধ্যে হলে একটা দায়িত্ব থেকে যায়৷ কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার প্রত্যেকেই ডিউটি সেরে ডিপারচার দিয়ে বাড়ির ফেরার পথে আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হচ্ছে৷ মালিক পক্ষের দায় না থাকলেও প্রতিবারই সহূদয়তার সঙ্গে মোটা টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে সুখবিন্দর সিং মানবিকতার নজীর গড়লেও এলাকাবাসীর মধ্যে কানাঘুষো লেগেই আছে৷ আর সেসব কথার ছিটেফোঁটা নভশ্রীর কানেও পৌঁছে যায়৷ মানবিকতার খাতিরেই নভশ্রী নড়েচড়ে বসে৷ লাস্ট দু’বার ওয়ার্কার মারা যাবার পর সে নিজের উদ্যোগে সে রাত্রির ডিউটি লিস্ট চেক করে, ধরে ধরে বাকি এমপ্লয়িদের সঙ্গে কথা বলছিল৷ মৃতদের বাড়িতেও গিয়েছিল৷ সবার সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করছিল, কোনও অবাঞ্ছিত বা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল কিনা৷ কিন্তু বেশিদূর সে এগোতে পারেনি৷
উপরওয়ালার নজরে পড়তেই তাকে প্রছন্নভাবে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল৷ সেও আর মাথা ঘামায়নি৷ দেড় মাস সব চুপচাপ৷ আবার আজ শেষ রাত্রে৷ এবারে ঝড়ু মুরমু৷ আপাত নিরীহ লোকটিকে নভশ্রী চিনত৷ কর্মঠ এবং কম কথা বলত৷ মুখে সব সময় একটা হাসি লেগে থাকত৷ লোকটির মুখটা মনে পড়তেই ওর বুক চিরে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এল৷
হর্নের আওয়াজ চোখ খুলতেই নভশ্রী দেখতে পেল, ওর গাড়ি ইউনিট ওয়ানের গেট দিয়ে ঢুকছে৷ মালিকের নির্দেশে, দুটি ইউনিটের ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররা ইতিমধ্যে জমা হয়েছেন৷ নভশ্রীর জন্যই সবাই ওয়েট করছিলেন৷ মিটিং-এ বারবার এই দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে আলোচনা করা হল৷ সবাই দুঃখ প্রকাশ করলেন৷ ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আলোচনা করে একটা লাম সাম অ্যামাউন্ট ডিক্লেয়ার করা হল এবং ফ্যামিলি মেম্বারের মধ্যে থেকে উপযুক্ত কারুকে একটা চাকরি দেওয়া হবে৷ ঠিক হল এই খবরটা নিয়ে আজই কোম্পানির তরফ থেকে কয়েকজন মৃতের বাড়িতে যাবেন৷ হুবহু আগের বারের ঘটনার ব্লু প্রিন্ট৷ এভাবেই দরাজ হাত খুলে তাড়াতাড়ি কোম্পানি সব মিটিয়ে নিয়েছিলেন৷ কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি৷ নভশ্রী ভাবছিল এর জন্য এই মিটিং এর খুব দরকার ছিল কি?
বেয়ারা এসে খবর দিল, পুলিশ একবার সবার সঙ্গে কথা বলতে চায়৷ সুখবিন্দর পারমিশান দিলেন, ওনাদের এখানে নিয়ে আসার জন্য আর সঙ্গে এও বললেন আরেক রাউন্ড করে কফির ব্যবস্থা করতে৷ নভশ্রী হঠাৎ দেখল, সুখবিন্দর কেমন ঠান্ডা চোখে ওকে দেখছে৷ বাকির এটা কেউ লক্ষ্য না করলেও নভশ্রী দেখল, ইউনিট টু-এর প্রোডাকশান ম্যানেজার অর্কদীপ ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে৷ ছেলেটির সঙ্গে চোখাচোখি হতে এত টেনশানেও নভশ্রীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্লিষ্ট হাসি খেলে যায়৷ অর্কদীপ সেটা দেখেই দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়৷
সারাদিন কোথাও কোনও শোকের চিহ্ন নেই৷ যন্ত্রের মতো দুটো ফ্যাক্টরিতে কাজ হচ্ছে৷ নভশ্রী আর ফ্ল্যাটে ফেরেনি৷ গেস্টরুমে রেস্ট নিয়ে অফিসে চলে এসেছে৷ অফিসে বসে কাজ করতে করতেই ভাবল, একবার ইউনিট টু থেকে ঘুরে আসবে৷
অর্কদীপের সঙ্গে আলোচনা করে ট্রেনিং-এর ডেটটা ঠিক করবে৷ আর জানিয়ে আসবে জামশেদপুর আর কলকাতা থেকে বিখ্যাত দুই ব্যক্তিকে এবার রিসোর্স পার্সন হিসেবে আনা হচ্ছে৷ এটুকু কথা সে ফোনেই সেরে নিতে পারত কিন্তু আরেকটা কাজও আছে৷
গত পরশু ছোটখাটো এক ব্রেকডাউনের কমপ্লেন পেয়েছিল৷ কাল কাজের চাপে ব্যাপারটা ভুলেই গেছিল৷ আজ একবার সুপারভাইজার আর প্রোডাকশান ম্যানেজার দু’জনের সঙ্গেই এ নিয়ে কথা বলাটা জরুরি৷ নভশ্রী ড্রাইভারকে গাড়ি বার করতে বলল৷ দুটো ইউনিটের মধ্যে দূরত্ব এমন কিছু না, হেঁটেও যাওয়া যায়৷ কিন্তু নভশ্রী সব সময় অফিস ডেকরাম মেনে চলে৷
হুট করে অর্কদীপের কিউবিক্যলে ঢুকতেই চোখে পড়ল, টেবিলের উপর স্টিলের থালা ও গ্লাস সাজানো, আর পাশেই একটা অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান যেমনটা গয়লাদের কাছে দেখা যায়৷ এই জিনিসটা এখানে দেখে নভশ্রী একটু অবাক হল৷ আগেও সে দেখেছে ফার্নেসের দরজার উপরে এইরকম নানা আকৃতির ক্যান বসানো থাকতে৷ জিজ্ঞাসু চোখে অর্কদীপের দিকে তাকাইে আসল ব্যাপারটা ক্লিয়ার হল৷ ছেলেটা লজ্জা লজ্জা মুখ করে হাসছিল, ‘‘মিস সরকার, রোজ রোজ আমার ঐ ক্যান্টিনের ছেলে রোটি, লাউকি চাউল সহ্য হয় না৷ তাই এখানে দুটো ফুটিয়ে নিই৷ নভশ্রী চোখ কপালে ওঠে৷ তার মানে? সুপারভাইজার ভদ্রলোক এসে ব্যাপারটা ক্লিয়ার করলেন৷ হিট ট্রিটমেন্ট শুরু হলে, ফার্নেসের টেম্পারেচার ৬০০-৭০০ সেন্ট্রিগ্রেড হয়ে যায়, আর বাইরে প্রায় ১০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড৷ বন্ধ চেম্বারের দরজার উপরে চাল, ডাল, আলু, ডিম বসিয়ে দিলে দিব্যি ভাত হয়ে যায়৷ অনেকেই এভাবে....৷ ভদ্রলোকের কথা শেষ হবার আগেই নভশ্রী ছেলেমানুষের মতো হেসে ওঠে৷ অর্কদীপ দেখে গাম্ভীর্যের মুখোশ খুলে মেয়েটি বৃষ্টি ধোয়া গোলাপের মতো হেসে উঠেছে৷
নভশ্রী খুব দ্রুত নিজের মধ্যে ফিরে এল৷ ‘‘আচ্ছা, একটা ব্রেকডাউন হয়েছে শুনলাম৷’’
অর্কদীপ উত্তর দিল, ‘‘আসলে টাইমিং সেট করা থাকলেও মাঝে মাঝে সেটা গোলমাল হচ্ছে৷ সেদিন হিট ট্রিটমেন্ট চলাকালীন টাইম ওভার হবার পরও মেশিন বন্ধ হল না দেখেই আমরা এলার্ট হয়েছিলাম৷ ক্ষয়-ক্ষতি তাই এড়ানো গিয়েছিল৷ আর এমনিতেই আমাদের চার্জবক্স উন্নতমানের হান্ড্রেড পারসেন্ট নাইক্রোম দিয়ে তৈরি, তাই ভেতরের মেটেরিয়ালস ঠিক ছিল৷’’
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে অর্কদীপ একটু থামলো৷ দেখল নভশ্রী কেমন ঘোর লাগা চোখে মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখছে৷ অর্কদীপ চোখ নামিয়ে নিল৷ সুপারভাইজার ভদ্রলোক এতক্ষণ চুপ করেছিলেন, এবার বললেন, ‘‘ম্যাডাম ডোন্ট ওয়ারি৷ আমরা এখন ম্যানুয়ালি অপারেট করছি, বড় ধরনের প্রবলেম হবে না৷’’
নভশ্রী এখন টানটান, ঋজু৷ পেশাদারি কণ্ঠে বলে উঠল, ‘‘অল রাইট দুবেজী, তবু আমি দেখেছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা ঠিক করা যায়৷’’ আর দাঁড়ায় না সে৷ এখন লাঞ্চ টাইম৷ এমনিতেই অর্কদীপের অনেকটা সময় নষ্ট করেছে৷ আর নিজেরও বেশ খিদে পেয়ে গেছে৷ ক্যান্টিনের ডাল রোটি অমলেটই তার ভরসা৷ দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে সে বেরিয়ে এল৷
লাঞ্চের পর একরাশ পেপারওয়ার্কে ডুবে গিয়েছিল৷ কাজের পাহাড় যেন! মাথা তোলার আর সময় পায়নি৷ পাশের চার্চের ঘড়িতে ঢংঢং করে পাঁচটা বাজতেই তার ঘোর ভাঙল৷ ইসস একদম ভুলেই গিয়েছিল৷ পাহাড়ি মন্দির তাকে যেতেই হবে৷ ফ্যাক্টরিকে ঘিরে ক্রমশ একটা রহস্য যেন দানা বেঁধে উঠছে৷ এর শেষ দেখতে হবেই তাকে৷ কেন জানি মনে হচ্ছে ঐ মানুষটা তার জটগুলো খুলে দিতে পারে৷
মেইন রোডে উঠে কেনাকাটার বাহনায় অফিসের গাড়িটা ছেড়ে দিল৷ একটা অটো নিল৷ মন্দিরের নীচের রাস্তায় ভাড়া মিটিয়ে অটো থেকে নামতেই সেই লোকটাকে দেখতে পেল৷ সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে আছে৷ নভশ্রী এগিয়ে যেতেই উঠে দাঁড়াল, ‘‘সেলাম মেমসাহেব, আনে কে লিয়ে বহুৎ সুক্রিয়া৷’’ নভশ্রীও মাথা ঝুঁকিয়ে প্রতি নমস্কার ফিরিয়ে দিল৷ আর কে জানে কেন তার মনে হল, এই লোকটিকে বিশ্বাস করা যায়৷’’
মা এই সময়টা থাকলে ভালো হত৷ কিন্তু মৈত্রেয়ী বা ক’দিন অফিস কামাই করে মেয়ের কাছে থাকে! একটা অসহ্য চাপ বুকের মধ্যে প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছে৷ কিছু একটা করতেই হবে৷ ইউনিট ওয়ানে একটা মিটিং আছে আজ৷ রুটিন মিটিং৷ কোম্পানির প্রোডাকশান, এমপ্লয়িদের এফিসেয়েন্সি ইত্যাদি সংক্রান্ত৷ নভশ্রী সুযোগের প্রতীক্ষাতেই ছিল৷ ওয়ার্কারদের রহস্য মৃত্যুর কথা উঠতেই, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘‘ড্রাগ৷’’
বিস্কুটের প্যাকেটের আড়ালে ড্রাগ পাচার হয়৷ এতদিনে সে জেনে গেছে সুখবিন্দরের এত রমরমার কারণ৷ কিছু ডকুমেন্টস তার হাতেও এসেছে৷ গোপনে গোপনে সে তৈরি হচ্ছিল একটা প্রবল সংঘাতের জন্য৷ কিন্তু আজ নিজেকে সংযত করতে না পেরে মুখ ফসকে কথাটা বলেই সে বুঝে গেল ভীষণ একটা ভুল করে বসেছে৷ এইসব মিটিংগুলোতে সুখবিন্দর থাকেন না কিন্তু প্রতিটা খবর তার কাছে ঠিক পৌঁছে যায়৷ বাকিরা ব্যাপারটা নিয়ে মাথা না ঘামালেও, চোপড়া সাহেবের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠল৷ গর্জে উঠলেন তিনি, ‘‘কী বলতে চাইছে নভশ্রী?’’
নভশ্রী দেখল, চুপ করে থাকলে সন্দেহ বাড়বে৷ কোনোরকমে সে বোঝাতে চেষ্টা করল এইসব দেহাতি জনজাতিরা নানা প্রকারের গাছের লতা পাতা শিকড় ব্যবহার করে নেশা করতে৷ কাজের প্রেশার কমাতে, তেমনটাই কিছু হবে৷ চোপড়া কিছুটা আশ্বস্ত হলেন তবে সম্পূর্ণ হলেন কিনা নভশ্রী বুঝতে পারল না৷ সে বুঝতে পারল খুব সাবধান হয়ে যেতে হবে তাকে৷
কয়েক মাস দিব্যি কেটে গেল৷ গ্রীষ্মের সময় ক’দিন ছুটি নিয়ে কলকাতা ঘুরে এল৷
সেই লোকটার সঙ্গে আবার একবার দেখা হয়ে গেল৷ এই ক’টা মাস নভশ্রী ওকে দেখেনি৷ লোকটা ভিড়ের মধ্যে মিশে থেকে ওর কানের কাছে বলে গেল, ‘‘বারো তারিখ রাত দো বাজে আপ কো সবুদ চাহিয়ে তো ফ্যাক্টরি ওয়ান পে চলে যানা৷’’ শিউরে ওঠে নভশ্রী৷ বড্ড ভয় ভয় করে৷ যেন সে এক মস্ত অপরাধী৷ নিষিদ্ধ কিছু শুনে ফেলেছে৷ চোপড়া, সুখবিন্দরা জানতে পারলে তাকে শাসাবে৷ আতঙ্কে হিম হয়ে যায় সে৷ হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়িতে ফিরে আসে৷ মার্কেটিং মুলতুবি রেখে বাড়ির ফেরার হুকুম দেয় ড্রাইভারকে৷ ড্রাইভার ম্যাডামের মর্জি বুঝে উঠতে পারে না৷ গাড়ি ছুটিয়ে দেয় শহরের জনবহুল পথে৷
বাড়ি ফিরে নভশ্রী এক কাপ কফি নিয়ে বসে৷ নার্ভ চাঙ্গা হয় অচিরেই৷ ক্যালেন্ডার উল্টে দেখে বারো তারিখ আসতে আর মাত্র চারদিন৷ না ভয়ে পিছিয়ে এলে চলবে না৷ লোকটা তাকে কথা দিয়েছিল, আগাম খবর পেলেই সে যেভাবে হোক নভশ্রীর কাছে পৌঁছে দেবে৷ সে বুঝেছে, এই বেটি সাচচা ইনসান আছে, লোকের দুখ দর্দে এর মন কাঁদে৷ এ সহজে চোপড়া, বিনীত, রাজেশজীর মতো রূপেয়াতে বিক্রি হয়ে যাবে না৷
নভশ্রী বুঝতে পারে, বারো তারিখ একটা বড়সড়ো ড্রাগ ডিল হবে৷ হাতেনাতে ধরার মোক্ষম সময় উপস্থিত৷ এই সুযোগ তাকে কাজে লাগাতেই হবে৷
বারো তারিখ ঠিক রাত একটায় একটা প্রাইভেট কারে নভশ্রী বেরিয়ে যায়৷ ফ্যাক্টরির কাছাকাছি গিয়ে কারটা ছেড়ে দেয়৷ চেনা ড্রাইভার৷ তাই প্রশ্ন করে নি৷ সে দেখে ম্যাডাম ইউনিট ওয়ানের গেটের দিকে না গিয়ে পিছনের দিকে যাচ্ছে৷ ড্রাইভার আর দাঁড়ায়নি৷ এটুকুই শেষ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সে বারবার থানায় বলেছে৷ কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার সেই রাত্রে নভশ্রী সরকার রাঁচি শহর থেকে কর্পূরের মতো উবে গেল৷ জীবিত মৃত কোথাও তাকে পাওয়া গেল না৷
পুলিশ প্রশাসন জঙ্গল, নদী, পাহাড় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ছাব্বিশ বছরের মেয়েটাকে কোথাও খুঁজে পেল না৷ ধীরে ধীরে সব ঘটনার মতো এই ঘটনাও লোকে ভুলে গেল৷ এক অর্কদীপের বুকের মধ্যে নিঃশব্দে রক্তক্ষরণ হয়৷ সে হাজারবার অন্য জায়গায় জয়েন করবে মনস্থির করেও পিছিয়ে আসে৷ এক অমোঘ মায়ায় এখানেই আটকে যায়৷
নিজের কিউবিক্যলে বসে অর্কদীপ শুনতে পাচ্ছিল বাইরের একটা গোলমাল হচ্ছে৷ একসঙ্গে অনেক মানুষ উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে৷ ব্যাপারটা কী বোঝার জন্য অর্কদীপ বাইরে যাবে ভেবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই দুবেজী এসে দাঁড়ালেন সামনে৷
‘‘কী ব্যাপার দুবেজী, এত আওয়াজ কীসের? হিট ট্রিটমেন্ট শুরু হয়েছে?’’
দুবেজী আমতা আমতা করতে থাকেন৷ অর্কদীপ এবার বিরক্ত হয়৷ ‘‘কী ব্যাপার বলুন তো, চুপ করে আছেন কেন? আপনার তো জানা উচিত পাটনার ফ্যাক্টরিতে নতুন মেশিন বসছে বলে ওদের প্রোডাকশান বন্ধ আছে, আমাদের ডাবল কাজ করতে হচ্ছে৷ এই মাসে আমরা অসম্ভব চাপে আছি৷’’
দুবেজী জানায় একটা প্রবলেম হয়েছে৷ ওয়ার্কাররা চার্জবক্স লোড ঠিক সময় মতই করেছে৷ কিন্তু ফার্নেসে ঢোকাবার আগে হঠাৎ টের পেল, বক্সটা হাল্কা, ভেতরে মাল না থাকলে যা হয়৷ নিজের চোখেই দেখলাম ভিতরটা একদম শূন্য৷
অর্কদীপ দেখে দুবেজীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম৷ তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বক্স লোড করান৷ এমন ভুল হবার তো কথা নয়!
দুবেজী পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মোছেন৷ তারপর ধীরে ধীরে বলেন, ওয়ার্কারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে৷ কেউ আর কাজ করতে চাইছে না৷ আপনি একবার চলুন স্যার৷
অর্কদীপ উঠে দাঁড়ায়৷ এই সমস্ত ব্যাপারকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না৷ সে নিজে দাঁড়িয়ে গিয়ারগুলো আবার লোড করালো, চার্জ বক্স ফুল লোডেড৷ ফার্নেসের কাছাকাছি নিয়ে আসা হতেই জনা কয় ওয়ার্কার চিৎকার করে উঠল, ‘‘ফির খালি লাগ রাহা হ্যায় বক্স৷’’ ওরা বক্স ফেলে দৌড়ে পালাতে পারলে বাঁচে৷ সত্যি অবাক কাণ্ড বক্স তো একদম খালি! এ কেমন করে সম্ভব? নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তো....৷ হঠাৎ এক ঝলক দমকা বাতাস ভেসে এল, অর্কদীপ একটা আশ্চর্য সুন্দর গন্ধ পেল৷ ঠিক নভশ্রীর পারফিউমের গন্ধটার মতো হুবহু যেন! এবার সে আমূল কেঁপে গেল৷
আপাতত প্রোডাকশন বন্ধ৷ খবর পেয়ে সুখবিন্দরের মাথায় হাত৷ তিনি রাত্রেই পাটনা থেকে ছুটে আসছেন৷ হুমকি দিয়েছেন একটা দিন নষ্ট হওয়া মানে বিপুল ক্ষতি৷ কালকেই পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে হবে৷
ঠিক রাত্রি দেড়টায় ইউনিট ওয়ানের গেট খুলে গেল৷ সুখবিন্দরের কালো বি. এম. ডব্লিউ. মসৃণ গতিতে ভিতরে ঢুকে এল৷ অর্কদীপ আর দুবেজীর চোখে উদ্বেগ৷ এখুনি চোপড়া, রাজেশ, বিনীতের সঙ্গে সুখবিন্দর এখানে পৌঁছে যাবেন৷ সমস্ত ব্যাপারটার জন্য তাদের ব্যর্থতাকেই দায়ী করবেন৷ ওরা নিঃশব্দে সেই সময়টার অপেক্ষা করতে থাকে৷
একটু পরেই কয়েক জোড়া বুটের শব্দে ওরা মেশিন রুমের বাইরে বেরিয়ে আসে৷ ঐ বুঝি সবাই এসে গেল! কিন্তু ওদের মধ্যে সুখবিন্দরকে দেখা গেল না৷ চোপড়া প্রশ্ন করলেন, ‘‘সুখবিন্দর জী কাঁহা হ্যায়?’’
ওদের কথার মাঝেই মেশিন রুম থেকে ঝলসানো মাংসের একটা তীব্র গন্ধ ভেসে আসে৷ অর্কদীপ আর দুবেজী সেদিকে দৌড় লাগায়৷ বাকিরাও ওদের পিছনে এসে দাঁড়ায়৷ একী! ফার্নেস কখন কীভাবে যেন চালু হয়ে গেছে৷ গনগন করে রাগে ফুঁসছে যেন চুল্লি৷ সুইচটা অফ করেই চেম্বারের দরজাটা খুলে ফেলল দুবেজী৷ সারাদিন যে বক্সটা তারা ভিতরে ঢোকাতে পারেনি সেটা এখন গনগন করছে৷ তীব্র হল্কা উপস্থিত সব্বাইকে যেন পুড়িয়ে দিতে চাইল৷ সবাই একটু তফাতে সরে গেল৷ একটু পরেই লোকজন জড়ো করে চার্জবক্সটা বাইরে বার করা হল৷ ডালা খোলার পর দেখা গেল, সুখবিন্দরের ঝলসানো দেহটা৷ আর কিছুক্ষণ থাকলে পুরোটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত৷ উপস্থিত সকলেই দেখতে পেল, সুখবিন্দরের দগ্ধ ডান হাতের মুঠিতে ধরা লম্বা একটা চুলের গোছা, সেটি কিন্তু এই অবস্থাতেও অবিকৃত৷ অর্কদীপ চিনতে পারল, এই বিশেষ পার্পল কালারে নভশ্রী কেশ রঞ্জিত করত৷
বাকিদের চোখে আতঙ্ক৷ একে অপরকে টপকে পিছু হঠার পালা শুরু হয়েছে বাকি তিনজন লোকের মধ্যে৷ অর্কদীপ আর দুবেজী নিথর দাঁড়িয়ে থাকে৷ ওরা জানে এরা বেশিদূর পালাতে পারবে না৷ এই জ্বলন্ত ফার্নেসই এদের নিয়তি৷ আজ নয়তো কাল নভশ্রী এদের টেনে আনবেই এখানে৷
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া ভেসে এল৷ দুজনেই সেই পরিচিত পারফিউমের গন্ধটা পেল৷ আর ঠিক তখন চার্চের ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত দুটো বাজল৷ অর্কদীপের মনে পড়ে গেল, আজ সেই অভিশপ্ত দিনের এক বছর পূর্ণ হল৷ এক বছর আগে এই দিনেই নভশ্রী কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল৷
কেউ না জানুক অর্কদীপ টের পেয়েছে, সে আসলে উবে যায়নি দাউ দাউ রোষানলে ঝলসে গিয়েছিল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন