মহুয়া মল্লিক
মামার বাড়িতে এলে মিঠি আর দিঠির সাহেবি আদবকায়দাগুলো বেমালুম উবে যায়৷ আজকেও তাই হল৷ সন্ধে থেকে যথারীতি পাওয়ার কাট৷ ইনভার্টারের অবস্থাও তথৈবচ৷ ঠিক হল সবাই মিলে উঠোনে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে খেতে বসবে৷ রিমিমাসি ওদের দিকে একবার তাকিয়ে টুকাই দাদাকে বলেছিল, ‘‘ফাইবারের চেয়ার টেবিলটা পেতে দে, মিঠি দিঠির মাটিতে বসে খেতে কষ্ট হবে৷’’ ওরা দুই বোন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠেছিল, ‘‘না, না আমাদের একটুও অসুবিধা হবে না, সবাই মিলে ডিনার করার মজাই আলাদা৷’’ তারপরেই ওদের মায়ের সহবত জ্ঞান, বিদেশে দীর্ঘদিন থেকেও মেয়েদের সঠিক শিক্ষাদান এসব নিয়ে রীতিমতো সেমিনার শুরু হয়ে গিয়েছিল৷ ওদের ডাক্তার মা বিভা এসব শুনে মুচকি মুচকি হাসছিল৷
মিঠি আর দিঠি তখন রিমিমাসির সঙ্গে প্ল্যান করছিল, রাত্রে একসঙ্গে শুয়ে ভূতের গল্প শুনবে৷ এ বাড়ির আনাচে-কানাচে নাকি অনেক অতৃপ্ত আত্মার কাহিনী লেপটে আছে৷ এই সেদিনও সোনাদিদা দেখেছে, একটা মেয়ে দরজা দিয়ে ঢুকছে৷ সোনাদিদা তখন সবে মাত্র শাঁখ বাজিয়ে তুলসী মঞ্চে প্রদীপখানি রেখে মাথা ঠেকাচ্ছে৷ ও মা! মাথা তুলেই দেখে মেয়েটি উধাও৷ সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই মেয়েকে পাওয়া গেল না৷ সবাই তখন সোনাদিকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করছে, ‘‘মেয়েটা কেমন দেখতে বলতো?’’ সোনাদিদা ফ্যালফ্যাল করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে পড়ে হাঁটতে শুরু করল৷ এসে থামল ‘‘ছবিঘর’’-এর সামনে৷ মিঠি আর দিঠি একসঙ্গে বলে উঠল ‘‘ছবিঘর?’’
রিমি ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে ইশারা করল, একদম চুপ৷ শেষ যখন এ বাড়িতে ওরা এসেছিল, তখন মিঠির বয়স ছিল সাত আর দিঠির নয় বছর৷ ধুলোখেলা, ধানের পালুইয়ে গড়াগড়ি খাওয়া, লুকিয়ে কুল পেড়ে খাওয়া এসব দস্যিপনাতেই সময় কেটে গিয়েছিল৷ এবারে পাঁচ বছর পরে এল, একটু বড় হয়েছে, এ বাড়ির সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছে৷ ট্যাবে সারাদিন ছবি তুলে রাখছে বাড়ির নানা অংশের অ্যাঙ্গেল থেকে৷ ‘‘ছবিঘর’’ শুনে তাদের কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক৷
রিমি একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘‘ছবিঘর’’ মানে এ বাড়ির পূর্বপুরুষদের ছবি রাখা আছে, শুধু যে ফ্যামিলি মেম্বারদের ছবি তাই নয়, ফ্যামিলির ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব, নিকট আত্মীয়দের ছবিও আছে৷ আগে ঘরটা খোলাই থাকত৷ এখন মাসে একবার খোলা হয়, নিতাই কাকু পরিষ্কার করে৷
দিঠি, রিমিকে তাড়া লাগায়, তারপর কী হল সেটা বলো৷ রিমি বলে, ‘‘সোনাদিদা, নিতাই কাকুকে বলল দরজাটা খোল৷’’ দরজা খুলতেই ভ্যাপসা একটা গন্ধ ভেসে এল৷ তাড়াতাড়ি ঘরের অন্যান্য জানলা দরজা খুলে লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হল৷ সোনাদিদা একটা ঘোরের মধ্যে ছিল, এলোমেলো পায়ে একটা ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর ছবির মেয়েটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘‘এই মেয়েটাকে আমি ঢুকতে দেখেছিলাম৷’’ ছবির দিকে তাকিয়ে বাড়িশুদ্ধু লোক স্তম্ভিত হয়ে গেছে, এসব কী বলছে! রিমি এরপর দিঠি আর মিঠির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘এই মেয়েটা এ বাড়ির কেউ ছিল না, পরে ওর গল্প তোদের বলব, তবে সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানিস? ওই মেয়েটা.....’’ রিমি কথা অসম্পূর্ণ রাখে৷ বড়রা তাড়া লাগাচ্ছে, শতরঞ্জি ভাঁজ করে বসার জায়গা হয়ে গেছে, কলাপাতাও দেওয়া হয়ে গেছে৷ দিঠি মিঠির আবদারেই আজ কলাপাতায় খাওয়া৷ ওরা তিনজনেই হাত ধুয়ে খেতে বসে পড়ল৷ মাও ওদের পাশেই এসে বসল৷ ‘‘তোরা তো রাত্রে ভাত খাস না, অসুবিধা হবে না তো? রুটিও আছে কিন্তু, ডাল রুটি আর স্যালাড খেতে পারিস৷ তোদের ব্রেডস্টিক আর স্যুপের বিকল্প হতে পারে৷’’ মায়ের কথায় দু বোনই ফিক করে হেসে ফেলল৷ দিঠি মায়ের হাত ছুঁয়ে বলল, ‘‘আমাদের কিছু অসুবিধা হবে না, আর তাছাড়া কলাপাতায় রুটি মানায় নাকি!’’ ততক্ষণে পাতে ধোঁয়া ওঠা সাদা জুঁইফুলের মতো ভাত দেওয়া হয়ে গেছে৷ সেদিকে তাকিয়ে ওদের মা’ও মনে মনে শৈশবের দামাল দিনগুলোতে ফিরে গেল৷
মায়ের পাশে শুয়ে দুই বোনের ঘুম আসে না৷ দুজনেই ছটফট করতে থাকে৷ রিমিমাসির সঙ্গে শোওয়ার পারমিশান মেলেনি৷ একে নতুন জায়গা তাই খাওয়াদাওয়ার একটু অনিয়ম হচ্ছে, রাতবিরেতে অসুবিধা হলে রিমি তো পারবে না সামলাতে৷ সম্পর্কে ওদের মাসি হলেও তারই আর বয়স কত! সবে কলেজে ঢুকেছে৷ মায়ের চোখ লেগে গেছে টের পেয়ে মিঠি জিজ্ঞেস করল, ‘‘ছবিঘর’’টা কোথায় বলত?’’ ‘‘তা কী করে জানব! এ বাড়িতে প্রচুর ঘর তালা বন্ধ পড়ে আছে,’’ দিঠি জবাব দেয়৷
রিমিমাসি ঠিক কী বলতে চেয়েছিল, সে আর শোনা হল না৷ এত রাত্রে আর জানার উপায়ও নেই৷ কাল বরং জেনে নেবে৷ ওরা দুই বোন ঘুমোবার চেষ্টা করল৷
সকালে ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে৷ রিমিমাসিকে কোথাও দেখতে পেল না৷ একটু পরেই অবশ্য জানতে পারল, সে কলেজ চলে গেছে৷ ফিরতে ফিরতে সন্ধে৷ দিঠি মিঠি একটু বিষণ্ণ হল, সেই সন্ধে অবধি অপেক্ষা করতে হবে! সোনাদিদাকে জিজ্ঞেস করবে নাকি? নাহ ঠিক হবে না, রিমিমাসি ব্যাপারটা কারুকে জানাতে বারণ করেছে৷ ওরা নিতাইকাকার সন্ধানে ছিল, একটু পরে তার দেখা মিলল৷ তাদের দেখেই ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে এগিয়ে এল, ‘‘দিদিরা একদম মেমসাহেব হয়ে গেছ যে!’’ নিতাইকাকা বাড়ি শুদ্ধু সবার কাকা৷ সরল মানুষ, বয়সের ভারে নুব্জ৷ খুব একটা পরিশ্রমের কাজ আর পারে না, তবু এ বাড়ির মায়া যেমন কাটাতে পারেনি, এ বাড়ির লোকও তাকে বাতিলের দলে ফেলতে পারেনি৷ একটু পরেই দেখা গেল কোদাল দিয়ে বাগানের মাটি আলগা করছে৷ বাগানে আর কেউ নেই৷ এই অংশটা বাড়ির পিছনের দিক হওয়ায় কেউ চট করে যায় না৷ দুই বোন দেখল এই সুযোগ৷ নিতাইকাকার কাছে এসে দাঁড়িয়ে দিঠি মুঠো খুলে বাড়িয়ে দিল৷ বিদেশি টফি দেখে আহ্লাদে গলে পড়ল কাকা৷ প্রথমেই একটার মোড়ক খুলে টপ করে মুখে ফেলে বাকিগুলো যত্ন করে ফতুয়ার পকেটে ভরে নিল৷
মিঠি ভণিতা না করে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেল, ‘‘ছবিঘরটা কোথায় গো কাকা? আমাদের দেখাবে?’’ নিতাইকাকার চোখে একটা আতঙ্ক দেখতে পেল ওরা৷ তবে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে নিতাইকাকা উত্তর দিল, ‘‘সে তো বারমহলে, বৈঠকখানা ঘরের ঠিক পাশে৷ তবে বাপু ও ঘর খুলে দেখাতে পারব না, এই বলে দিলুম৷’’ নিতাইকাকা মাটি কোপাতে থাকে৷ মিঠি এবার অন্য প্রসঙ্গে গেল, ‘‘কিছুদিন আগে সোনাদিদা, ছবির একটা মেয়েকে এ বাড়িতে ঢুকতে দেখেছিলে?’’
নিতাইকাকা বুঝতে পারল, দুই বোন তৈরি হয়েই এসেছে৷ তাই এবার আড়াল করার চেষ্টা করল না, ‘‘হ্যাঁ তাই তো বলল৷ তবে কিনা জোয়ান ছেলেটা জলে ডুবে মারা যাবার পর সোনামায়ের মাথাটা ঠিক নেই৷ কী দেখতে কী দেখেছে!’’
‘‘তবে রিমি দিদিমণি আমায় একটা কথা বলেছে, ছবির মেয়েটা নামি তোমাদের এক বোনের মতো দেখতে৷ তোমাদের আসার কথা চলছিল, প্রায় তো তোমাদের ছবি কম্পিউটারে দেখে, আমার মনে হয় সেই দেখেই সোনা মায়ের একটা...কী যেন বলে না, সেরকম কিছু হয়েছিল৷’’
ওরা বুঝতে পারে, নিতাইকাকা আসলে হ্যালুসিনিয়েশন নিয়ে বলতে চাইছে৷ তবে দুই বোনই চমকে গেল, ওদের কার মতো দেখতে ছবির মেয়েটা? এ কথা রিমিমাসি ছাড়া আরও কেউ বলেছে? খুব কৌতূহল হচ্ছে দুই বোনেরই ‘‘ছবিঘর’’ এ যেতে, ছবির মেয়েটাকে এখুনি দেখতে৷ সেটা যে সম্ভব নয় সেটা বুঝতে পেরেই দুজন বাগান থেকে বেরিয়ে এসে বারমহলের বৈঠকখানা ঘরের আশেপাশে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করল৷ যদিও কোনটা ‘‘ছবিঘর’’ সেটা বুঝতে পারল না৷ সারি সারি তালা বন্ধ ঘরের মধ্যেই একটা ঘরে রহস্য দানা বেঁধে আছে, সেটুকু বুঝতে পারছে দুজনেই৷
‘‘মেয়েটা না একদম দিঠির মতো দেখতে৷ নাক, চোখ, চিবুক হুবহু তোর মতো৷’’
—-এটা তুমি ছাড়া আর কেউ বলেছে?
—-কে বলবে? আমার মতো দেখার চোখ সবার আছে নাকি?
—-রিমিমাসি, আমাদের দেখাতে পারো ছবির মেয়েটাকে? প্লিজ মাসি, খুব কৌতূহল হচ্ছে৷
—-এত সহজ না, দেখছি চেষ্টা করে৷ বড়জেঠু বা সোনাজেঠুকে যদি ম্যানেজ করতে পারি৷ জানিস ঐ ছবির মেয়েটার একটা স্টোরি আছে৷
—-কী সেই গল্প? দুই বোন রিমির গা ঘেঁষে শোয়৷ আজ রিমির সঙ্গে ওদের শোয়ার পারমিশান মিলেছে৷ রিমির কথন ভঙ্গিমা ভারী চমৎকার৷ সে টিভির অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করতে চায়, পড়াশোনা শেষ করে একটা প্রফেশন্যাল কোর্স করে নিতে চায়৷ কিন্তু এ বাড়ির কেউ সেটা চায় না৷ সবাই চায় সে অধ্যাপিকা হোক৷ রিমি গল্পে ফেরে৷
‘‘ছবির মেয়েটির নাম ডরোথি, দেরাদুনে ওদের বসবাস ছিল৷ ওর দাদুর সঙ্গে এ বাড়ির কোনও এক পূর্বপুরুষের হূদ্যতা ছিল৷ দেরাদুনে গেলেই ঐ অ্যাংলোইন্ডিয়ান পরিবারটি আতিথেয়তা গ্রহণ করত৷ ওঁরাও কয়েকবার এই জমিদার বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছেন৷ তবে ডরোথি যেবার এলো সেই ওঁদের শেষ আসা৷ তারপর দুই বাড়ির মধ্যে যোগাযোগটাই ভেঙে যায়৷ আসলে এ বাড়িতেই ডরোথি মারা যায়৷ আর জানিস তো মারাও যায় অদ্ভুতভাবে৷ রাত্রে ছাদের দরজার চাবি খুলে, গেলই বা কী করে! আর সুইসাইডই বা করল কেন? চাবি তো ওর পাওয়ারই কথা না৷’’ দুই বোন এই কথা শুনে একে অপরের দিকে তাকায়৷
রিমি আবার বলতে শুরু করে, ডরোথির বাড়ির কেউ অবশ্য আত্মহত্যা বলে মানতেই চায়নি৷ ফুটফুটে এক হাসিখুশি কিশোরী মেয়ে, সে কেন জীবনের প্রতি আগ্রহ হারাবে? কথাটায় তো যুক্তি আছে৷ নাইটগার্ডের একটা কথা ইন্ধনের কাজ করেছিল, সে নাকি ডরোথির ঝাঁপ দেবার মুহূর্তে দেখেছিল৷ ডরোথির পিছনে একটা ছায়া দেখা গিয়েছিল৷ এর থেকেই ডরোথির বাড়ির লোকজনের বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে৷ কোনও যুক্তি তাঁরা মানতে চাননি৷ থানা পুলিশ করেছিলেন৷ যদিও প্রমাণ অভাবে সেই কেস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷
দুই বোনের বুক চিরে দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে হতভাগী মেয়েটির কথা ভেবে৷ রিমির কথাতেও বিষাদের সুর টের পাওয়া যায়৷ রিমি এরপর বলে, ‘‘একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি, ডরোথির মারা যাবার ডেট আর তোদের সোনাদিম্মার মেয়েটিকে দেখার ডেট কিন্তু এক৷ ছবির মধ্যেই ডরোথির জন্ম মৃত্যু লেখা ছিল আমি সেটা দেখে নিয়েছিলাম সেদিনই৷’’ দিঠি জিজ্ঞেস করে ডেটটা কবে গো রিমিমাসি?
‘‘একুশে সেপ্টেম্বর৷’’
ডেটটা শুনেই মিঠি লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে বড় আলোটা জ্বেলে দেয়৷ দিঠির দিকে প্রাণহীন চোখে তাকায়৷ দিঠিও আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে, কোনোক্রমে মিঠি বলে ওঠে, ঐ দিন তো দিঠির বার্থডে! তারপরেই দুই বোনের মধ্যে চোখে চোখে কথা হয়ে যায়৷ রিমির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় টের পায়, দুই বোনেই তাকে কিছু একটা লুকোচ্ছে৷ রিমির মনে হয় সে একটা অচেনা দুনিয়াতে ঢুকে পড়েছে, এবার একটা ঠান্ডা ভয়ের স্রোত তাকেও জড়িয়ে ধরে৷
একুশে সেপ্টেম্বর তখনও শেষ হয়নি৷ দিঠির বার্থডে পার্টি শেষ হয়ে গিয়েছিল আটটার মধ্যেই৷ সবাই বাড়ি ফিরে গিয়েছিল৷ পরের দিন রবিবার থাকায় ওদের আবদারে মানালি আর কুহুকে মানসআঙ্কেল আর অরিন্দমআঙ্কেল রেখে গিয়েছিলেন৷ মানালি আর কুহুর সঙ্গে ওদের দু বোনের ভালো বন্ধুত্ব৷ তিন পরিবারের মধ্যে হূদতা দেখার মতো৷ আমেরিকায় এই সময় বেশ ঠান্ডার আমেজ৷ গাছে গাছে রঙের বাহার, ফল সিজন চলছে৷ সন্ধে থেকেই একটু গ্যাপে গ্যাপে দাঁড়িয়ে থাকা ভিলা বাড়িগুলো নিঝুম হয়ে যায়৷ সে-রাত্রেও তাই হয়েছিল৷ বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ শুধু চারটি মেয়ে শুয়ে শুয়ে অপার্থিব জগতের গল্প করছিল৷ কথা প্রসঙ্গেই ‘‘ব্লাডিমেরী’’র কথা ওঠে৷ কুহু বলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনবার জোরে জোরে ব্লাডিমেরীর নাম নিলে সে ঐ ডাক উপেক্ষা করতে পারে না, আসেই৷ আর তারপর শুরু হয় ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানা৷ মানালি আর মিঠি এসব শুনে হিহি করে হাসছিল৷ দূর তা আবার হয় নাকি! ভূতের গল্প ভালো লাগে শুনতে, গা ছমছম ভয় পেতেও ভালো লাগে৷ কিন্তু তা বলে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে মানতে ওরা দুজন নারাজ৷ দিঠি কিছু কথা বলছিল না৷ একদৃষ্টিতে ঘরের মধ্যে রাখা বেলজিয়াম গ্লাসের আয়নার দিকে তাকিয়েছিল৷ তারপর সবার অলক্ষ্যে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই আয়নার সামনে৷ চাপা অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে ব্লাডিমেরীর নাম নিতেই বাকিরা ওর দিকে তাকিয়েছিল৷ কুহু দৌড়ে গিয়েছিল ওকে থামাতে৷ ‘‘কী করছিস! সর্বনাশ ডাকছিস কেন? চলে আয় প্লিজ৷’’ দিঠি শোনেনি, কেটে কেটে আরো দুবার উচচারণ করেছিল ‘‘ব্লাডিমেরী৷’’ ওরা উপলব্ধি করেছিল ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল হঠাৎই৷ আর সেইসময় কাচ ভাঙার আওয়াজে চারটে মেয়ে চমকে উঠেছিল৷ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল৷ দিঠি মিঠির বাবা মা ঘুম চোখে ততক্ষণে আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন বারান্দায় ঝোলানো পাখিদের জল খাবার কাচের পাত্রটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে৷ অথচ ঝড় বৃষ্টি কিছুই নেই৷ ওরা চারজন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে এসে শুয়ে পড়েছিল৷ সে রাত্রে আর কিছুই ঘটেনি৷ কুহু বলেছিল অনেক কিছুই এরপর ঘটবে৷ আর ব্লাডিমেরীকে জাগালে সে অবধারিত কারুকে নিয়ে ফিরে যায়৷ দিনের আলোয় এই কথাগুলো খুব হাস্যকর লেগেছিল৷ ব্রেকফাস্ট করে ওরা যে যার ঘরে ফিরে গিয়েছিল৷ কুহু স্কুলে বার কয়েক জিজ্ঞেস করেছিল, ‘‘কিছু টের পেয়েছে কিনা?’’ মিঠি আর দিঠি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল ঘটনাটা৷
যদিও এখন বুঝতে পারছে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাটা নয়৷ সে এসেছে, এবং এই বাড়িতেই কোথাও মিশে আছে৷ ঘুম ভেঙে জেগেছে যেন বহু বছর পর৷ একই কথা দুই বোনে ভাবতে ভাবতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল৷
একটা অস্বস্তিতে মাঝ রাত্রে ঘুম ভেঙে গেল মিঠির৷ ঘরে জমাট অন্ধকার, নাইট বাল্বটা জ্বলছে না, তার মানে আবার পাওয়ার কাট৷ বিছানাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে৷ অথচ আজ রাত্রে মা, দিঠি আর ও ঠাসাঠাসি করে শুয়েছিল ছোট খাটটায়৷ শীতকাল বলে তেমন অসুবিধা হচ্ছে না ওদের৷ কিন্তু হাত দিয়ে বুঝতে পারল, দিঠির জায়গাটা ফাঁকা৷ চোখ অন্ধকারে সয়ে যেতেই মিঠি উঠে পড়ল৷ পা টিপে টিপে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল৷ দোতলায় ওরা থাকে৷ তিনতলার ঘরগুলো বন্ধই থাকে৷ তবু অমোঘ আকর্ষণে তিনতলার সিঁড়ির দিকে মিঠি হাঁটতে শুরু করল৷
চাঁদের আলো আজ বড় ম্রিয়মাণ৷ সে আলোয় পরিবেশটা কেমন থমথম করছে৷ মিঠির ভয় করছে, মাকে ডেকে নিলে ভালো হত৷ কিন্তু ওর বিচারবুদ্ধি বলে, হাতে সময় খুব কম৷ দেরি করলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে ওদের৷ মিঠি অবাক হয়ে দেখে ছাদের দরজা খোলা৷ দরজা গলে মরা চাঁদের আলো সিঁড়িতে এসে পড়েছে৷ দিঠি তবে.....মিঠি আর দেরি করে না দৌড়ে ছাদে চলে আসে৷ যা ভেবেছ ঠিক তাই৷ দিঠি প্যারাপিটের উপর হেঁটে বেড়াচ্ছে টলমল পায়ে, দু’হাত দুপাশে ছড়ানো৷ একটু এদিক-ওদিক হলেই ওর শরীরটা নীচে আছড়ে পড়বে ডরোথির মতো৷ মিঠি দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটে যায় দিঠির কাছে৷ ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারে৷ টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে ছাদের মধ্যে পড়ে যায় দিঠি৷ আর তারপরেই ঘোর থেকে জেগে ওঠে, নিজেকে এভাবে দেখে চিৎকার করে ওঠে৷ রাত্রির নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যায়৷ বাড়ির সবাই দিঠির চিৎকার অনুসরণ করে ছুটে আসে ছাদে৷ চাঁদের আলোয় দেখা যায়, দিঠির মুখে, হাতে, পায়ে আঁচড়ের দাগ৷ দিঠি মা’কে জড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে৷ মিঠি ঠিক করে নেয়, এই বাড়িতে আর নয়, বাকি ছুটিটা তারা কলকাতায় দাদু ঠাম্মির সঙ্গে কাটাবে৷ শুধু সকাল হবার অপেক্ষা৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন