মহুয়া মল্লিক
ঘটনাটা প্রথম শুরু হয়েছিল ঝিলামকে পড়াতে বসে। হোমটাস্ক দিয়ে অহনা নিজের টুকটাক যোগা প্র্যাকটিস সেরে নিচ্ছিল। সাত বছরের ঝিলাম সেই সুযোগে মায়ের চোখ এড়িয়ে মোবাইল ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। অহনার চোখে পড়তেই চিল চিৎকার শুরু করে, ''আমি দেখতে পাচ্ছি, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোর পড়াশোনা হবে না, তুই, তুই...'' রাগে তোতলাতে থাকে, বাক্যটা শেষ করতে পারে না ঠিক করে। এই এক বদ অভ্যাস অহনার, রেগে গেলে তাল জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে। আর কে না জানে এই মুহূর্তে ভয়ানক তোতলাতে থাকে সে। মায়ের এই রূপটা ঝিলাম জানে। আর জানে বলেই মোবাইল ফোনটা এক পাশে সরিয়ে রেখে বই—খাতা টেনে নেওয়া উচিত ছিল তার। কিন্তু অহনার কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল যে ঝিলাম কেমন ঘাবড়ে গেল, কোনও ক্রমে বলে উঠল, ''সত্যি মা, তুমি দেখতে পাচ্ছ আমার পড়াশোনা হবে না? ওমা বলো না, সত্যি আমার পড়াশোনা হবে না? তাহলে কী হবে আমার?''
হ্যাঁ দেখতে পাচ্ছে তো অহনা। দু দুটো ঝিলামকে দেখতে পাচ্ছে। একটা শিশু ঝিলাম দামাল, অশান্ত ঢেউ—এর মতো। আরেকটা পরিণত বয়সের ঝিলাম ছিমছাম সালোয়ার কামিজ পরা। কী আশ্চর্য! একসঙ্গে দু দুটো ঝিলাম। নাহ ডাবল রিফ্লেকশন নয়। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সময়ের ঝিলাম। অহনার শরীরে বিচিত্র এক অনুভূতি, শরীরটা পালকের মতো হালকা। চোখে ঘোর লেগে যায়। ''মা, বলো না সত্যি আমার পড়াশোনা হবে না? তুমি দেখতে পাচ্ছ? প্লিজ মা, আমি খুব মন দিয়ে এবার থেকে পড়ব দেখো। আমার পড়াশোনা হবেই মা।''
ওড়নার প্রান্তে টান পড়তেই ঘোর থেকে জেগে ওঠে অহনা। ঝিলামের মাথা ভর্তি নরম চুলে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নেয়। ঐটুকু মেয়েকে এভাবে বললে ছোট থেকেই ভয় বাসা বাঁধবে। বুকের মধ্যে চেপে ধরে মেয়েকে শান্ত করল, ''তুমি তো খুব ভালো মেয়ে, একটু ফাঁকিবাজিটা সামলে নিলে খুব ভালো রেজাল্ট করবে তুমি।''
পলকেই ভুলে যায় ঝিলাম একটু আগের আতঙ্ক। ''ম্যাথসগুলো করে নিয়ে আমি কিন্তু একটু ড্রয়িং করব মা।''
অনুপম আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। ওর হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে, মেয়েকে তার পাপার জিম্মায় রেখে অহনা রান্নাঘরে ঢোকে। রান্নার মেয়েটা দিন কয়েক ছুটি নিয়েছে। ঝিলাম আজ লুচি খেতে চেয়েছে। ময়দা মাখতে মাখতে একটু আগের ঘটনাটা ভাবছিল সে। একসঙ্গে দু দুটো রূপে ঝিলামকে দেখল কেন? বড় ঝিলাম অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী, পরনে সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ, গলায় স্টেথো ঝোলানো। হাতের ফাইল আর ব্যাগ গাড়ির ব্যাক সিটে রেখে অত বড় একটা কার কী অবলীলায় ড্রাইভ করে বেরিয়ে গেল!
ফুলকো লুচি প্লেটে সাজিয়ে দিতে দিতে অহনা ভাবছিল প্রেশারটা একবার চেক করাতে হবে। এসব উদ্ভট কল্পনা মাথাতে ঠাঁই দেওয়া ঠিক নয়। দুই পরিবারেই এই প্রজন্মে একজনও ডাক্তার হয়নি এই আক্ষেপ শুনে শুনে অহনা আর অনুপমের কলেজ, ইউনিভার্সিটি লাইফ কেটে গেছে। হয়ত একটা চোরা রক্তক্ষরণ অবচেতন মনে হয়, সে টের পায় না। এ তারই প্রতিফলন। অনুপম আর ঝিলামকে লুচির প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে অহনা ঠিক করে নেয় এই সপ্তাহেই সে কলেজ ফেরত বাপির চেম্বার হয়ে আসবে।
''ম্যাম আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না।'' একদল ছাত্রছাত্রী রুখে দাঁড়িয়ে অহনার পথ রোধ করল। এমনিতেই অহনার যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। ক'দিন ধরে ঝিলামের জ্বর। অনুপম ট্যুরে। সারাদিনের কাজের মেয়েটিও সময় বুঝে ডুব দিয়েছে। মেয়েকে বাবা—মায়ের জিম্মায় দিয়ে তবে কলেজে আসা। অহনা বিরক্ত চোখে ইউনিয়নের ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকাল। একটারও পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলে মন হয় না। এভাবে আন্দোলন করে কার কী উপকার হবে জানা নেই, তবে এদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার সে বোঝাই যাচ্ছে। অহনা ওদের একপ্রকার ঠেলেই কলেজ চত্বরে পা রাখল। আর তখনই মেয়েটা এগিয়ে এল, অহনার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে শাসাতে শুরু করল। মেয়েটাকে থার্ড ইয়ারের পাসের ক্লাসে দেখেছেন মনে হচ্ছে। পড়াশোনায় চূড়ান্ত অমনোযোগী, সারাক্ষণ করিডোরে চোখ ঘুরতেই থাকে। বেয়াদপি দেখে অহনার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। ইচ্ছে করল একটা থাপ্পড় মারে। কিন্তু তার শরীরটা হঠাৎই হাল্কা হতে শুরু করল। চোখের সামনের দৃশ্যপট কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেল। শুধু মেয়েটার আঙুল তুলে নির্বাক ছবির মতো শাসানি আর তার মাঝেই অরেকটা ছবি, সবুজ ঘাস জমির উপর মেয়েটা লুটিয়ে পড়ে আছে। কপাল থেকে নামছে রক্তের ধারা। সবুজ ঘাসগুলো মুহূর্তে মেয়েটির রক্তে কালচে মেরুন হয়ে উঠছে। অহনার মাথাটা একটু টলে গেল। দেবারতি আর শুভ্রা সেই সময় ভেতরে আসছিল, ওকে এই অবস্থায় দেখে জাপটে ধরল।
দু দু'বার একই রকম ঘটনা। সেকি ভবিতব্য দেখতে পাচ্ছে? অহনা ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল। এমনিতে সে সুস্থ, শারীরিক অসুবিধা কিছুই টের পাচ্ছে না। শুধু এইসব মুহূর্তে শরীরটা অস্বাভাবিক হালকা হয়ে যাচ্ছে। সেটাও মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এর জন্য বাপির চেম্বারে ছুটে যাওয়ার মানেই হয় না। অনুপম বাড়িতেই ক'দিন আগেই প্রেশার চেক করে দিয়েছে। একদম নর্মাল তবে এইসব মেডিক্যাল কিটগুলোর উপর খুব একটা ভরসা নেই তার। বড় করে শ্বাস নিল অহনা।
শুভ্রা কাঁধে হাত রাখল। এখন কেমন লাগছে অহনাদি? ফীলিং বেটার?
—হ্যাঁরে আমি ঠিক আছি।
ওদের কথার মাঝেই ডিপার্টমেন্টের সর্ব কনিষ্ঠ লেকচারার অগ্নিভ ছুটে এল। ''এদিকে তো কেলেঙ্কারির এক শেষ। অহনাদিকে যে মেয়েটি শাসাচ্ছিল, সেই মেয়েটি মারাত্মকভাবে উন্ডেড। দু'দলের মারামারিতে মেয়েটা...''।
অহনা সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে। অস্থির অস্থির লাগে।
''এমা তুমি এমন করছ কেন?''
''আমাকে যেতে হবে রে। দেখলি না মেয়েটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সবুজ ঘাসগুলো কেমন কালচে হয়ে যাচ্ছে। প্লিজ যেতে দে ওর কাছে।'' শুভ্রার হাত ছাড়িয়ে উঠে পড়ে।
সবাই হতবাক। অগ্নিভ এগিয়ে আসে, ''অহনাদি, আমি তো একবারও বলিনি, মেয়েটি ঘাস জমিতে পড়ে আছে রক্তে মাখামাখি হয়ে। তুমি জানলে কী করে?''
অহনার মুখ পাংশু হয়ে যায় ভয়ে। ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা সবার চোখে চোখে কথা হয়ে যায় ওর অজান্তেই। ফেরার পথে অটোতে সোনালিদি ওর পিঠে হাত রাখেন, আলতো করে বলেন, ''ক'টা দিন সবাই মিলে কোথাও ঘুরে আয়। বড্ড স্ট্রেস যাচ্ছে তোর''। অহনা ঠোঁট চেপে ভেতরের কান্নাটা আটকায়। এরা সবাই তাকে কী ভাবছে!
ঘুমের মধ্যে ঘেমে ওঠে অহনা। ধড়ফড় করে উঠে বসে। ঘরে মায়াবী রাতবাতির নীলাভ আলো। এ.সি. মেশিনের মৃদু আওয়াজ ছাড়া নিস্তব্ধ ঘরখানি। ঝিলাম, অনুপমকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে। অনুপমের মুখটা সামান্য হাঁ করা। শিশুর মতো নিষ্পাপ লাগছে ওকে। ওদের দেখতে দেখতে বিছানা থেকে নামে অহনা। নিঃশব্দে দরজা খুলে ডাইনিং—এ আসে। ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা জলের বোতল বার করে ঢকঢক করে অনেকখানি জল খেয়ে ফেলে। একটু স্বস্তি বোধ করে যদিও পুরোপুরি আতঙ্কটা এখনো যায়নি। কী জঘন্য একটা স্বপ্ন দেখল। এই প্রথমবার নয়। এই নিয়ে চারবার। প্রতিবারই আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে। একবার অনুপম টের পেয়েছিল। ওকে ধ্বস্ত—বিধ্বস্ত দেখে তার নিজের আত্মবিশ্বাসও টাল খেয়ে গিয়েছিল। তীক্ষ্ন চোখে সঙ্গিনীকে জরিপ করতে করতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল, ''তুমি কী ভালো নেই অহনা? কী হয়েছে আমাকে বলবে?''
অহনা কিছু বলতে পারেনি। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠেছিল। অনুপমের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠেছিল।
ফ্যানটা ফুল স্পিডে চালিয়ে দিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিল। কী হচ্ছে এসব? ঝিলাম, কলেজের সেই ইউনিয়নের মেয়েটি বা টুকটাক দু—একটা ঘটনা অবধি ঠিক ছিল কিন্তু নিজেকে নিয়ে? ছিঃ।
একটি অপরিচিত পুরুষের বাহু বন্ধনে নিষ্পেষিত হচ্ছে সে। এই দর্শন কোন অমনিশার সন্ধান দিচ্ছে? প্রথমবার এক্সাম হলে ডিউটি দেবার সময়। খাতায় সাইন করার পর তেমন কাজ থাকে না। রাউন্ড দেওয়া বা এক্সট্রা পেজ দেওয়া ছাড়া। শুভ্রার একটু ফোন করার আছে বলে ও কিছুক্ষণের জন্য বাইরে গিয়েছিল। অহনা একাই সামলাচ্ছিল। মাত্র জনা চল্লিশেক মেয়ে। মেয়েরাও কমন পেয়েছে তাই মন দিয়ে লিখছিল। একা একা রাউন্ড দিতে দিতে নিস্তব্ধ হলঘরে এক সময় অহনা হাঁপিয়ে উঠেছিল। কিছুক্ষণ পিছনের জানলার কাছে দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে পুরো হলটা দেখা যাচ্ছিল। মেয়েরা মোটামুটি আয়ত্তে।
অহনা ধীরে ধীরে বাইরে তাকিয়েছিল। পাশেই একটা ছোট্ট পুকুর আর সারি সারি গাছ। একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে, একটা মিষ্টি বাতাস ভেসে আসছিল। আবেশে চোখ বন্ধ করে সেই বাতাস অহনা মুখে চোখে মাখছিল। হঠাৎ একটা গরম বাতাসের হল্কা ভেসে এল। চোখ খুলে তাকাতেই অহনা দেখতে পেল সবুজ একটি দক্ষিণি তাঁতে নিজের অসহায় মুখ। সে যেন তলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। আর তারপরই বলিষ্ঠ এক পুরুষের বুকে নিজেকে মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। পুরুষটি সবল বাহুর মধ্যে তার তনুলতার মতো দেহটা নিষ্পেষিত হচ্ছে। ডিপ কাট সবুজ ব্লাউজ। উন্মুক্ত পিঠে পুরুষটির আঙুল ছাপ ফেলে যাচ্ছে। অহনা ঘোরের মধ্যেই পুরুষটিকে চেনার চেষ্টা করল। চেনা অবয়ব নয়। অনুপম, তার কলিগ বা বন্ধুরা কেউ কী! নাকি অচেনা কেউ? শুধু রৌদ্রের মধ্যে পুরুষটির অনামিকার গাঢ় নীল পাথরটা ঝিকিয়ে উঠল।
''অহনাদি, এই অহনাদি কী হয়েছে তোমার? এত ঘামছ কেন?'' শুভ্রা ফিরে এসে ওকে ঝাঁকাতে থাকে। অহনা যেন ঘোর থেকে জেগে ওঠে। মেয়েগুলো লেখা থামিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে দেখতে থাকে। কঠোর চোখে শুভ্রা তাকাতেই সবাই আবার নিজের খাতায় মন দিল। একটা ফাঁকা বেঞ্চে অহনাকে ধরে ধরে বসিয়ে দিল সে। জলের বোতলটা এগিয়ে দিল। গায়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ''কেন যে এত অবহেলা করছ, ভালো করে একটা চেক আপ করাও না। দাঁড়াও আজকেই অনুপমদাকে ফোন করব।''
আঁতকে ওঠে অহনা। এত ব্যস্ত হোস না তো। প্রেশার চেক করিয়েছি। আমি একদম ঠিক আছি। একটু পরেই ঐশী এল। ও আজ রিলিভার। রুমে রুমে ঘুরে বেড়াচ্ছে যদি কারুর কিছু দরকার থাকে। ওকে দেখেই অহনার মুখে আলো জ্বলে উঠল। দুজনেই সমবয়সি, সমনস্ক। আড্ডা গল্প জমে ভালো। ঐশী এসেই মজার গলায় বলল, ডিউটি করে বোর হয়ে যাবার পর আজ সবার জন্য দারুণ রিফ্রেশমেন্ট আছে।
—কী আছে?
—আরে এখন বলব না। মজাটাই মাটি হয়ে যাবে।
একটু আড্ডা দিয়ে চলে গেল ঐশী। অহনা টের পেল মনের মেঘটা কখন যেন কেটে গেছে। তবে একটা কাঁটা বুকের মধ্যে অল্প বিস্তর খচখচ করেই যাচ্ছে।
খাতাটাতা জমা দিয়ে ওরা যখন স্টাফরুমে পৌঁছল, খুশির হাট বসে গেছে। আত্রেয়ীদি সবাইকে পুজোর গিফট দিচ্ছেন। প্রতিবছরই তিনি সব্বাইকে কুর্তি, শাড়ি, বাহারী ব্যাগ, ছেলেদের পাঞ্জাবি, শার্ট ইত্যাদি দিয়ে থাকেন। হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট হলেও অকৃত্রিম মানুষ। সবাইকে আত্মার শরীক ভাবেন। অহনাকে দেখেই একটা প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। ইশারায় বললেন, প্যাকেটটা খুলে দেখতে। পাকেটটা খুলে শাড়িটা বার করতেই অহনার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। গাঢ় সবুজ রঙের সোনালি ইঞ্চি পাড়ের দক্ষিণি তাঁত। একটু আগের দেখা হুবহু সেই শাড়ি। অহনার মনে হয় শাড়ি নয় একটা সবজেটে সাপ উদ্ধত ফণা দুলিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আত্রেয়ীদি, অহনার ফ্যাকাসে মুখ দেখে কী বুঝলেন কে জানে! পিঠে হাত রেখে বললেন, ''কীরে রঙটা পছন্দ হয়নি বুঝি? আসলে ভাবলাম তোকে এই রঙটা দারুণ মানাবে। তোর দেবতোষদাও বললেন, তোর জন্য এইটে নিতে।'' তারপরেই অন্যদের হাঁক দিলেন, অহনার মনে হয় রঙটা পছন্দ হয়নি। তোরা কেউ ওর সঙ্গে এক্সচেঞ্জ করবি?
অগ্নিভ এগিয়ে আসে, ''অহনাদি আমার ভাগে এই এক পিস পাঞ্জাবি জুটেছে, পাল্টাপাল্টি করতে পারো।''
''যাহ ফাজিল''। ছদ্ম রাগে অহনা পাজিটার কান মুলতে যায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে অকারণ প্রগলভ হয়ে ওঠে আত্রেয়ীদিকে খুশি করতে। শাড়িটা গায়ের উপর মেলে ধরে ঐশীকে ডাকে, ''এই কেমন মানাচ্ছে রে?''
ঐশী চোখ মটকে বলে বাড়ি গিয়ে তোর বরকে জিজ্ঞেস করিস। প্রতিবারতো বাবা সেরাটাই তোমার ঝুলিতে পড়ে। আত্রেয়ীদির চোখমুখ আলো আলো। ভারী ভালো মনের মানুষ। অহনাও খুশি। যাক ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে পেরেছে।
কপালে ঠাণ্ডা স্পর্শ পেতে ধীরে ধীরে চোখ খোলে অহনা। ''একী তোমার গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। এখানে শুয়ে না থেকে আমায় ডেকে তুলতে পারতে তো?''
অহনা ঘুম চোখে বোঝার চেষ্টা করে কে এই পুরুষ? দশ আঙুলের দিকে আঁতিপাঁতি করে কী খোঁজে যেন। আশ্বস্ত হয়। এ তার নিজস্ব পুরুষ। এর কাছে সমর্পণের মধ্যে কোনও আত্মগ্লানি নেই। অনুপম ততক্ষণে পাঁজাকোলা করে ওকে তুলে নিয়েছে। বিছানায় শুইয়ে, এ.সি. বন্ধ করে হালকা একটা চাদর গায়ে বিছিয়ে দিয়েছে। পরম নিশ্চিন্ততায় চোখ বন্ধ করল অহনা।
মোবাইল ফোনটা সেই থেকে বেজেই যাচ্ছে। অতি কষ্টে মাথা তুলে অহনা একবার নাম্বারটা দেখে মোবাইলটা আবার সাইড টেবিলে নামিয়ে রেখেছে। জ্বরটা আর নেই। তবে বড্ড দুর্বল। ঝিলাম এই ক'দিন স্কুল ফেরত ওর মামার বাড়িতে কাটাচ্ছে। সন্ধেবেলায় মা ওকে দিয়ে যায়। চা বানিয়ে খেতে খেতে দু'জনে টুকটাক গল্প করে। তার মধ্যেই রান্নার লোক, কাজের লোক চলে আসে। কোনও কোনও দিন অনুপমও। মা বাপি চেয়েছিল ক'টা দিন অহনাও বাড়িতে রেস্ট নিক। অহনাই চায়নি, ও একটু নিজের সঙ্গে নিজে কাটাতে চেয়েছিল।
ফোনটা আবার বাজছে। অহনা এবার ধরেই ফেলল, ''হ্যালো''।
—ম্যাডাম আমি রয় অপ্টিক্যালস থেকে বলছি, আপনি অহনা চক্রবর্তী তো?
হাই তুলতে তুলতে অহনার এক ঝলক মনে পড়ে গেল, ছিমছাম নতুন এই চশমা ঘরের কথা। অগ্নিভই খবর দিয়েছিল, ওখানে নতুন চশমা বানাতে দিতে পারো। সদ্য চোখে পাওয়ার এসেছে অহনার। ক'দিন রিডিং গ্লাস নিয়ে কাজ চালিয়ে তবে এই নতুন চশমাটা পেয়েছে।
—ম্যাম একটা ভুল হয়ে গেছে।
সজাগ হয় অহনা, মেয়েটি কী ভুলের কথা বলতে চাইছে?
—আসলে ম্যাম আপনাকে আমরা ভুল চশমা ডেলিভারি দিয়েছি। একজন স্যার আপনারটা ফেরত দিতে আসার পরই ভুলটা ধরা পড়ল। ওনার মিসেসের নতুন ফ্রেম থেকে গ্লাস খুলে গিয়েছিল। সেটা রিপ্লেসমেন্টের সময় ভুল করে আপনারটা...।
দুম করে অহনা বলে বসল রং নাম্বার। তারপর ফোন কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই আবার ফোন ঢুকল, ''প্লিজ ম্যাম ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড, এই স্যারের মিসেস কিছুদিন আগেই একটা এক্সিডেন্টে মারা গেছেন, মারা যাবার আগে এই মিসপ্লেসের কথাটা বলে যান। কিন্তু উনি ক্রিমেশন নিয়ে ব্যস্ত থাকায়..প্লিজ হেল্প আস ম্যাম। আমাদের গুড উইল নষ্ট হবে। ওঁর মৃত ওয়াইফের সেন্টিমেন্টের ব্যাপার। অহনা এবার ফোন কেটে সুইচ অফ করে দিল।
চোখটা ঝলসে যাচ্ছে অহনার। একটু আগেই আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। একটি পেশিবহুল পুরুষ শরীর ঢেকে দিয়েছে তার ফিনফিনে বেতসলতার মতো শরীরটা। বৃষ্টিভেজা পাখির মতো তিরতির করে কাঁপছে অহনা। তার গেঁহু রঙা মেদহীন টানটান পিঠে পুরুষটির দশ আঙুলের ছাপ, প্রবল ঢেউ—এ তলিয়ে যেতে যেতে উঠে বসে অহনা। ফোনটা আসার পরই কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। ঘোরের মধ্যেই উঠে বসল। আলমারি হাট করে হাতের কাছে যা পেল পরে ফেলল। কাঁধের ব্যাগের মধ্যে এক মুঠো টাকা ঠেসে দিল। হ্যাঁ আসল জিনিসটা নিতে ভোলেনি।
অটোওলা এই নিয়ে দু'বার জিজ্ঞেস করলো, বৌদি কোথায় নামবেন?
—যে কোনও গঙ্গার ঘাটে।
—ও আচ্ছা আপনি স্ট্যান্ডে নেমে একটা টোটো নিয়ে নেবেন, সামনেই ময়ূরপঙ্খী ঘাট। বসার জায়গাটায়গা আছে। অটোওলার বলার ভঙ্গিতে পাশের মেয়েটা মুখটিপে একটু হাসল। অহনা এসব গ্রাহ্যের মধ্যে আনল না।
ঘাট দেখেই সিঁড়ি ভেঙে নামতে শুরু করে দিল। গ্রীষ্মের দুপুর তেমন কেউ নেই। দু—চারজন ভবঘুরে ছাড়া। দ্রুত নামতে শুরু করল অহনা। ব্যাগ থেকে চশমাটা বার করে গঙ্গার জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। উফ কী শান্তি। রাহুমুক্তি হল। দুঃস্বপ্নরা আর আসবে না। এটা হাতে আসার পর থেকেই যত অশান্তির সূত্রপাত। আর কিছুদিন এরকম চললে সে নির্ঘাত মানসিক রোগী হয়ে যেত। এসব ভাবতে ভাবতেই দু'পা ওপরে উঠেই আবার দুড়দাড় করে নামতে শুরু করে। যেখানে চশমাটা ছুঁড়ে ফেলেছিল, জলটায় কেমন একটা তুফান উঠেছে। অথচ বাকি অংশের জল ঢেউহীন শান্ত। ঘোলা জলটার রং বদল শুরু হল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো জলের দিকে এক পা এক পা করে অহনা এগিয়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা সবল হাত তাকে জাপটে ধরল, ''আরে কী করতে যাচ্ছেন পাগল নাকি?''
ঘোর ভাঙে অহনার। জলের দিকে তাকিয়ে দেখে একটু আগে দেখা বিচিত্র বর্ণের রঙের খেলা মিলিয়ে গেছে। জলের রঙ এখন গাঢ় সবুজ। প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে তার নিজের। অবাক হয়ে সে নিজেকে দেখে আর জলের মেয়েটিকে। এবার খেয়াল হয় কেউ তাকে হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
''একই রয়ে গেছিস অহনা, সেই পাগলী পাগলী। অনুপম তোকে সামলায় কী করে?''
চমকে তাকায় অহনা। আরে এ তো কলেজ লাইফের ডায়াস কাঁপানো সৌরভ। অহনার জন্য ফিদা ছিল, অহনার বুকের গোপন কুঠুরিতেও সৌরভের জন্য একটা জায়গা বরাবর ছিল। কিন্তু খুব ছোট থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে কথা দেওয়া নেওয়া হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া অনুপম বিশ্বস্ত, অনুগত, ব্রাইট ফিউচার।
''কীরে ভেবলে গেলি যে?''
অহনার ভীষণ ভালো লাগছে। সৌরভের দিকে চোরা চোখে তাকাল।
—হু কটাক্ষ? সৌরভ হেসে উঠল।
চল আমার ফ্ল্যাট খুব দূরে নয়। অহনার কণ্ঠে নদীর নোনা বাতাসের মাদকতা। সৌরভ ওর দুর্বল শরীরটা জড়িয়ে ধরল আলতো করে যেন খুব দুর্লভ কিছু ধরেছে। একটু অসাবধান হলেই ভেঙে যাবে।
লিফট খারাপ হয়েছে আবার। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে উঠতে হাঁপাচ্ছিল অহনা। সৌরভ একসময় পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় ওকে। ওর গলা জড়িয়ে একটু একটু করে ওপরে উঠতে বড্ড ভালো লাগছিল অহনার। ওর থেকে চাবি নিয়ে সৌরভই দরজা খুলল। সৌরভের কাঁধে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অহনার চোখে পড়ল সৌরভের হাতের নীল পাথরের আংটিটা। অহনা সেটা দেখেও দেখল না। ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দু হাত টান টান করে ছড়িয়ে দিয়ে অরণ্য হয়ে গেল। সৌরভ সেই আদিম অরণ্যে ঝাঁপ দেবার আগে ভালো করে একবার অচেনা অহনাকে দেখার চেষ্টা করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন