ফুল ফুটুক না ফুটুক

মহুয়া মল্লিক

আচ্ছা আমি কি কিছুই করতে পারি না? প্রতিদিন রাত্রের বাতাসে এই প্রশ্নটা নতুন করে আমায় গলা টিপে মারে। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়। দেওয়ালে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করি সুমনার কান্না, আর্ত চিৎকার বা ফুঁপিয়ে ওঠা। একটু আগেই ফ্ল্যাটের ক' ইঞ্চির দেওয়াল ভেদ করে পলাশের নেশাতুর গলার গালাগালি আর কাচের বাসন ভাঙার আওয়াজটা পেয়েই আমি সতর্ক হয়েছিলাম। অন্য রাত্রের মতোই সুমনার পাশবিক চিৎকার আর ওর এগারো বছরের মেয়েটার কান্না বাতাসের ঘনত্ব কিছুটা বাড়িয়ে দিল। রোজকার এই ব্যাপারে ফ্ল্যাটের বাকিরা অভ্যস্ত। তথাকথিত ভদ্রলোক সবাই, দিনের আলোয় পলাশের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করতে কেউ পিছিয়ে আসে না। কিন্তু এক আমিই মনে হয় পলাশ বসুকে প্রচণ্ড ঘৃণা করি। মনে হয় মাঝ রাত্রে কলিংবেল বাজিয়ে লোকটাকে পুলিশের দেবার হুমকি দিয়ে আসি। একা থাকি, বন্ধুবান্ধবরা বলে এসব ঝামেলায় না জড়াতে। তাদের সতর্কবাণী উপেক্ষা করার মতো সাহস আমার নেই, তাই আমিও তথাকথিত ভদ্রলোক থুড়ি ভদ্রমহিলা সেজে যাই।

অথচ আমার তো কিছু অন্তত করার কথা। আপনারা হয়তো ভাবছেন, পলাশ বসুর সঙ্গে আমার প্রতিবেশী হবার সুবাদে খুব খটাখটি সম্পর্ক। আরে না না, তিন বছর পাশাপাশি আছি কেউ কারুকে কখনো বিরক্ত করা তো দূরের কথা, একটা কথাও বলিনি। শুনেছিলাম ব্যাচেলার মানুষ, ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, অঢেল পয়সা। ফ্ল্যাটের অনেকেই নিজের বোন, ননদ, শালীর জন্য গোল্ডেন টার্গেট ভেবেছিলেন পলাশ বসুকে। সবার সব আশায় জল ঢেলে দিয়ে, মিস্টার বসু নাকি গোপন মদ্যপানের বৈঠকে কারুকে বলেছিলেন, ''মিস চ্যাটার্জী হলে ভেবে দেখতেন।'' ঠিক ধরেছেন আমিই সোহিনী চ্যাটার্জী। নাহ প্রস্তাবটা শুনেই আমি যে লাফিয়ে উঠব না সেকথা যিনি বলতে এসেছিলেন ভালোই জানতেন।

এদিকে সাড়াশব্দ না পেয়ে ওর তরফ থেকে আর তাগিদা আসেনি। একদিন শুনলাম পলাশ বসু বিয়ে করছেন, অফিস কলিগকে। মেয়েটি ডিভোর্সী এবং এক কন্যার জননী। শুনে আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটবাড়িটায় ধন্য ধন্য পড়ে গেল। আমার কিন্তু ব্যাপারটা ভালো লাগল না। এই যাঃ আমাকে পরশ্রীকাতর ভাবছেন বুঝি! আসলে আমি অনেককিছু আগে থেকেই টের পাই, যা আপনাদের কল্পনার অতীত। তাই জন্যই তো বললাম, আমার কিছু করার কথা।

পাশাপাশি কিচেন। এই সময়টা সুমনা রান্না করেন আমিও টুকটাক কাজ করতে করতে ওপাশের ফোড়নের গন্ধ বা চিকেন কষার গন্ধ টের পাই। হঠাৎ কচি গলার কথায় অতিমাত্রায় সজাগ হলাম। সুমনার মেয়ে, মায়ের কাছে কিছু একটা বলছিল। অনেক চেষ্টা করেও কিছুই শুনতে পেলাম না, তবে অতি মাত্রায় সংবেদনশীল, আমি টের পাই কোথাও যেন ধস নামছে।

একটু পরেই সুমনার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর টের পাই, ফোনে কারুকে বলছে, ''জানোয়ারটা আজকেও অফিসের কাজে আমাকে আটকে রেখে মেয়েকে স্কুল থেকে জোর করে তুলে এনে সারা দুপুর...উফ মাগো মেয়েটার কচি শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন আর যে দেখতে পারছি না। এবার যে কিছু একটা ভাবতেই হবে''। হাত ফসকে খন্তিটা পড়ে যেতেই সুমনা সাবধানী হয়ে গেল। আর কিছু শোনার দরকার ছিল না। অন্ধকার মেখে বসে রইলাম। নাহ এবার কিছু একটা করতেই হবে।

সুযোগ এসে গেল। পরের দিন লিফটে পলাশ বসুর সঙ্গে দেখা। অন্য সময় ওঁর লোলুপ দৃষ্টির সামনে শাড়ির আঁচলে নিজেকে মুড়ে দিই। আজ পিছলে যাওয়া শিফন শাড়ির আঁচলকে ইচ্ছে করেই অবাধ্য হতে দিলাম। ঠোঁটের কোণে সাজালাম একটুকরো আমন্ত্রণ। মুগ্ধ দৃষ্টি মাখিয়ে পলাশ বলে উঠলেন, ''মার্ভেলাস, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।'' তারপরেই বলে উঠলেন, ''আজ সন্ধেবেলায় কী করছেন মিস চ্যাটার্জী?''

ঠিক সন্ধে সাড়ে সাতটায় পাশের ফ্ল্যাটের কলিংবেলে আঙুল ছোঁয়ালাম। সুমনা আমাকে দেখে একটু অবাক হলেন। ''মিস্টার বসু তো নেই''। আমি আপনার কাছেই এসেছি, আপনার লিটল প্রিন্সেসের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছি''। সুমনা কেমন অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে থাকে। ওর মেয়ের হাতে আমি ততক্ষণে ক্যাডবেরি আর একটা বনসাই এর টব ধরিয়ে দিয়েছি। মেয়েটি পলকেই তার সোহিনী আন্টিকে আপন করে নিল।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল সুমনার ব্যালকনিতে রাখা সেই বনসাই ছোট ছোট লাল ফুলে ছেয়ে গেছে। লাল ফুলগুলো সেদিনের সন্ধ্যার রক্তকণাকে মনে করিয়ে দিল। ওদের ফ্ল্যাট থেকে মা মেয়ের খুনসুটি, হাসি ভেসে আসছে। বড্ড ভালো লাগল। অবশেষে আমি পেরেছি, পলাশ বসু কবেই কর্পূরের মতো উবে গেছেন। আয়েস করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে লাল ফুলে ঢাকা বনসাইটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম, ''পলাশ বসু দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখো, তোমার চেনা ফ্ল্যাটটা কেমন বদলে গেছে। ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%