শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

গাড়িটা আজ সকাল থেকেই গন্ডগোল করছিল। মাঝে মাসে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায় মাঝে মাঝে ইঞ্জিনে ধাক্কা লেগে গাড়ি কেঁপে ওঠে। অধ্যাপক সারদাচরণ মুস্তফি তাঁর ড্রাইভার পাঁচুগোপালকে বললেন ওহে পাঁচু, গাড়িটার আজ হল কী? আমার যে জরুরি মিটিং।
পাঁচুগোপাল পুরোনো ড্রাইভার, এ গাড়ির নাড়ি নক্ষত্র তার জানা, বলল, চিন্তা করবেন না বাবু, তেলে ময়লা এলে এরকম হয়। আপনাকে পৌঁছে দিয়ে গাড়িটা কোনও কারখানায় গিয়ে সারিয়ে নেব।
সারদাচরণ অঙ্কের খুব বড় পণ্ডিত। অঙ্কশাস্ত্রে তাঁর ব্যুৎপত্তি কিংবদন্তীর মতো। দেশে-বিদেশে সুনাম। আজ কলকাতার একটি নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশ থেকে কয়েকজন অঙ্কবিদ আসছেন। মিটিং তাঁদের সঙ্গে তারপর তিনি যাবেন বনগাঁয়ের কাছে এক গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে, সেখানে তাঁর পরিবারের লোকজন আজ সকালেই চলে গেছে। আগামীকাল শনিবার সেখানে পিকনিক হবে। সুতরাং সারদাচরণের ভ্রু কুঁচকে গেল। গাড়ি যদি বিগড়োয় তবে এতখানি রাস্তা, পেরোবেন কী করে?
যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে সময় মতোই তাঁকে পৌঁছে দিয়ে পাঁচুগোপাল গাড়ি নিয়ে সারাতে গেল।
মিটিং-এ অঙ্কশাস্ত্রের আলেচনায় ডুবে গিয়ে সারদাচরণের আর গাড়ির কথা মনেই রইল না।
মিটিং-এর পর লানচ এবং গল্পগুজবের পর সারদাচরণ যখন তাঁর গাড়িতেবনগাঁ রওনা হলেন তখন শীতের বেলা ফুরিয়ে এসেছে। বনগাঁ অনেকটা রাস্তা।
কলকাতা শহর ছাড়িয়ে যশোর রোড ধরতে না ধরতেই সন্ধে হয়ে গেল। গাড়িতে বেশি স্পিডও তোলা যাচ্ছে না। আগের মতো না হলেও একটু খুটখাট করছে গাড়িটা। সারদাচরণ চিন্তায় পড়লেন। বনগাঁর কাছে এক নিকর্ষি গ্রামে তিনি বিশাল বাগানবাড়ি করছেন, সেখানে সুইমিং পুল, ব্যাডমিন্টন কোর্ট সব আছে। তাঁর চার ছেলে, দুই মেয়ে, তাঁর স্ত্রী, চার বউমা, দুই জামাই এবং বারো জন নাতি নাতনী তার জন্য অপেক্ষা করছে। খাওয়া-দাওয়ার বিরাট আয়োজন হয়েছে। মেজো জামাই ভালো ম্যাজিক দেখায় সে ম্যাজিক দেখাবে। নাতি নাতনীরা আজ শাপমোচন গীতি নাট্য করবে। কালকেও অনেক মজা টজা হবে। এই পারিবারিক আনন্দোৎসব খুবই ভালো লাগে তাঁর। তাই তাড়াতাড়ি পৌঁছোনোর জন্য একটা ব্যস্ততা ছিলই।
গাড়িটা অবশ্য অনেক পুরোনো অস্টিন, গাড়িটার বয়স হয়েছে। মায়াবশে সারদাচরণ এটাকে ছাড়তে পারেন না। তাঁর পরিবারের লোকেরা এ গাড়িতে চড়েই না। তাদের জন্য সুমো আর আর্মাডা গাড়ি আছে, একটা মারুতিও।
বনগাঁ অবধি গাড়ি পৌঁছতে রাত নটা বেজে গেল। সারদাচরণ বললেন আরও পাঁচমাইল পথ।
ভাববেন না বাবু, পৌঁছে যাবো।
বনগাঁ থেকে খামারের রাস্তাটা বিশেষ ভালো নয়। বড্ড ভাঙাচোরা আর খুবই নির্জন। চুরি-ডাকাতির বদনাম আছে। তবে তাঁর খামার বাড়িতে বিস্তর লোক চাকর বাকর দারোয়ান এবং সিকিউরিটি গার্ডের অভাব নেই। কিন্তু এ রাস্তাটা মানে মানে পার হওয়া দরকার।
বিপদের ভয় যেখানে বিপদও সেখানেই, নির্জন , জনহীন জংলা একটা জায়গায় দুবার ঘটাং শব্দ করে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল।
কী হল হে পাঁচু?
পাঁচু 'দেখছি' বলে টর্চবাতি নিয়ে নেমে বনেট খুলে খুটখাট করতে লাগল।
সারদাচরণ নেমে একটু আড়মোড়া ভাঙলেন, হঠাৎ তাকে চমকে দিয়ে তিনটে লোক সামনে এসে দাঁড়াল। সারদাচরণ চমকে গেলেও ভয় পেলেন না। এদের চেহারা ডাকাতের মতো নয়, বরং নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের মতোই। পরনে ধুতি, গায়ে উড়ুনির মতো কিছু একটা। এই শীতের পক্ষে পোশাক খুবই যৎসামান্য। সামনের জন করজোড়ে বলল, আপনি কি বিখ্যাত অঙ্কবিশারদ শ্রীসারদাচরণ মুস্তফি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মহাশয়, আমরা বিপন্ন। আপনি আমাদের সাহায্য করিবেন কি?
বিস্মিত সারদাচরণ বললেন, আপনারা কারা?
আমরা এ স্থানের অধিবাসী নই। আগন্তুক মাত্র।
কোথা থেকে আসছেন?
সহস্র সহস্র আলোকবর্ষ দূর হইতে মহাশয়।
সারদাচরণ হাঁ হয়ে রইলেন। পাগল নাকি লোকটা?
মহাশয়, আমাদিগকে অবিশ্বাস করিবেন না। আমাদের সুবিশাল নক্ষত্রটির নাম পৌলমী, তাহাকে ঘিরিয়া সহস্রাধিক গ্রহ পাক খাইতেছে। তাদের মধ্যে প্রায় এক সহস্র গ্রহে মনুষ্য বসবাস করে। জীবজগৎ ও উদ্ভিদও আছে। তবে দুই তিন শত গ্রহে প্রাণের চিহ্ন নাই।
পাগলই বটে। সারদাচরণ বললেন, তা এলেন কী করে? মহাকাশ পাড়ি দেওয়ার অনেক ঝক্কি, সময়ও অনেক লাগে, যা কিনা এক আয়ুস্কালে সম্ভব নয়।
মহাশয় সব কথা বুঝিবেন না, তবে আপনি পণ্ডিত মানুষ, সম্ভবত জানেন মহাকাশ পাড়ি দিতে হইলে পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করিতে হয়।
জানি, কিন্তু সেটা বাস্তবে অসম্ভব।
লোকটা অমায়িক হেসে বলে, মহাশয়, ওসকল কথা আপাতত থাকুক। আপনি ঈষৎ ক্লেশ স্বীকার করিয়া একটু আসিবেন কি? অদূরেরই আমাদের যান রহিয়াছে।
ভয়ের চেয়ে কৌতূহল সর্বদাই প্রবল। সারদাচরণ পাগলের কাণ্ড দেখতে রাজি হয়ে তাদের পিছু পিছু একটা মাঠের ভিতর দিয়ে খানিক হাঁটতেই অবাক হয়ে দেখল, অন্ধকার মাঠের মধ্যে সত্যিই একটা বড় গোলাকার জিনিস রয়েছে।
বিস্ময়ের পর বিস্ময়, লোকগুলোর সঙ্গে ভিতরে ঢুকে দেখলেন, বিশাল অচেনা সব যন্ত্রপাতিতে অভ্যন্তরটা ঠাসা। বিচিত্র শব্দও হচ্ছে। তাঁর মুখ দিয়ে বাক্য সরল না। হ্যাঁ করে দেখতে লাগলেন। স্বপ্ন দেখছেন কিনা তাও বুঝতে পারছেন না।
নাদুস নুদুস লোকটা তাঁকে একটা চেয়ারের মতোই আরামদায়ক আসনে বসিয়ে সামনে টেবিলের মতোই একটা জিনিসের ওপর একটা খাতা খুলে দিয়ে বলল, মহাশয়, এই অঙ্কটি দয়া করিয়া কষিয়া দিবেন কি?
সারদাচরণ বললেন, আপনারা সাধু বাংলায় কথা বলছেন কেন?
মহাশয়, ইহাই আমাদের ভাষা, আমাদের গ্রহে ওই ভাষার নাম সুধাক্ষর।
আপনারা বাঙালি?
না মহাশয়, আমরা সুধং জাতির লোক। এখানে আসিয়া কিন্তু বিপদে পড়িয়াছি। এই অঙ্কটি না মিলিলে আমরা আমাদের মহাকাশযান সঠিক নিশানায় উৎক্ষেপন করিতে পারিব না।
কেন, অঙ্কটি কি কঠিন?
সম্ভবত নহে। কিন্তু ইহা আপনাদের গ্রহের অঙ্ক। আমাদের গ্রহে এইরূপ অঙ্ক অচল। কিন্তু এই গ্রহ হইতে উৎক্ষিপ্ত হইতে হইতে এই স্থানের অঙ্কেরই সাহায্য লইতে হইবে। বুঝিয়াছেন?
বুঝেছি।
সারদাচরণ অঙ্কটি দেখলেন। বেশ কঠিন একটা ক্যালকুলেশন। গতিবেগ, আবহ, মাধ্যাকর্ষণ ইত্যাদি সংক্রান্ত। কঠিন হলেও অসাধ্য নয়। সারদাচরণ কলমের মতো জিনিসটি হাতে নিয়ে খাতার মতো জিনিসটির ওপর অঙ্কটি কষতে লাগলেন। অঙ্কে ডুবে যাওয়ায় তাঁর আর কিছু খেয়াল রইল না।
শেষ করে তিনি বললেন, এই নিন, হয়ে গেছে। আমি এ সময়ে এখানে না এলে কী করতেন?
লোকটি বিগলিত হয়ে বলল, মহাশয়, সবই হিসাব সাপেক্ষ, ভবিতব্যও বটে। আপনাকে আসিতেই হইত। কোনও ঘটনাই আকস্মিক ঘটে না। ঘটাইতে হয়।
হেঁয়ালি নাকি?
আপাতত তাহাই মনে করুন। চলুন, আপনার গাড়ি আমাদের যন্ত্রবিদরা মেরামত করিয়া দিয়াছে। উহা আর কখনও গণ্ডগোল করিবে না।
সারদাচরণ এসে দেখলেন, সত্যিই গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে। পাঁচু বলল, বাবু, এরা সব ওস্তাদ মিস্ত্রি। পাঁচ মিনিটে সারিয়ে দিল।
সারদাচরণ একটা অদ্ভুত গোঁ-গোঁ শব্দ শুনে পিছু ফিরে দেখলেন, গোলাকার জিনিসটা হঠাৎ নক্ষত্রবেগে অন্ধকার আকাশে উঠে চোখের পলকে মিলিয়ে গেল।
পাঁচু অবাক হয়ে বলল কী বাবু ওটা?
আমিও জানি না, গাড়ি ঠিক আছে তো!
আজ্ঞে হাঁ বাবু, ইঞ্জিনের কোনও শব্দই হচ্ছে না। মাখনের মতো চলছে।
খামারবাড়িতে পা দিতেই বড় নাতনী ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বলল, এত দেরি হল যে! কী করছিলে দাদু?
সারদাচরণ গম্ভীর মুখে বলল, একটা খুব শক্ত অঙ্ক করছিলাম।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন