শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সিধু ছিল বিখ্যাত চোর।
এত সাফ হাত আর নিখুঁত চুরির মাথা সে-তল্লাটে আর কারও ছিল না। সিঁধ কাটা, গরাদ ভাঙা তো তুচ্ছ ব্যাপার, ভালোরকম মন্ত্র-টন্ত্রও জানা ছিল তার। মন্ত্রের জোরে গেরস্থকে ঘুম পাড়িয়ে হাসতে হাসতে চুরি করে আসত। জীবনে একবারও ধরা পড়েনি।
তা হল কি, সেদিন রাতে সিধু ভালোরকম রোজগার করেছে। পটলাপাড়ার নায়েব মশাইয়ের নতুন জামাই এসেছে। সোনার বোতাম, আংটি, চেন, মেয়ের গলার নেকলেস—জিনিস বড় কম নয়। তবে সিধু ছোটলোক নয়। চুরি করে বটে, কিন্তু গেরস্থকে পথে বসায় না। অর্থাৎ চেঁছেচুঁছে সব নিয়ে আসে না। রেখে ঢেকে নেয়। চুরির পরদিনই যাতে গেরস্থকে ভিক্ষেয় বেরতে না হয় সেদিকে তার নজর থাকে। তবু রোজগার বড় মন্দ হয়নি। মনটা খুশি খুশি ছিল তার।
শেষ রাতে একটু চাঁদ উঠেছে। সিধু মৃদুস্বরে একটু সুর ভাঁজতে ভাঁজতে মাঠ পেরিয়ে নিজের গাঁয়ে ঢুকল। তারপর পুকুরে হাত মুখ ধুয়ে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল।
চোরের কান খুব সজাগ। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও তার কাজ করে। সিধু হঠাৎ খুব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কী একটা জিনিস আঁচ করে নিল। তারপর বড় ঘরের পিছন দিকটায় আগাছার জঙ্গলে খুব নিঃশব্দে গিয়ে সেঁধোল।
তারপরই সিধুর চক্ষু স্থির। স্বপ্নেরও অগোচর দৃশ্যটা দেখে সে হাসবে না কাঁদবে তা ভেবে পেল না।
একটা চোর তার ঘরে সিঁধ কাটছে।
চোর হলেও সিধু শিল্পী মানুষ। প্রথমটায় অবাক ভাবটা কেটে যেতে তার ভীষণ রাগ হয়েছিল। কিন্তু রাগটা বেশিক্ষণ রইল না। শিল্পী মানুষ শিল্প দেখলেই সব ভুলে যায়। কিছুক্ষণ পিছনে দাঁড়িয়ে সে চোরটার কাজকর্ম দেখে খুশিই হল। সিঁধের হাত অতি পরিষ্কার।
সিঁধ কেটে চোরটা নিয়মমাফিক কেলে হাঁড়ি ঢুকিয়ে কেউ জেগে আছে কিনা পরীক্ষা করল। ঘুমপাড়ানি মন্ত্র পড়ল নির্ভুলভাবে। তারপর সেঁধোল।
পিছু পিছু সিধুও ঢুকে পড়ল।
চোরটার হাত যে ভালো তা সিন্দুকের তালা ভাঙার কায়দাতে বুঝে গেল সিধু। আলমারিটা খুলল একটু শব্দ না করে। বাসনপত্র যেন তার পোষমানা নাড়াচাড়াতেও শব্দ হল না। সিধু আর থাকতে পারল না। বলেই ফেলল, 'শাবাশ!'
চোরটা চমকে উঠে সিধুকে দেখে লজ্জায় জিভ কেটে মাথা হেঁট করে রইল।
সিধু তার পিঠ চাপড়ে বলল, 'লজ্জার কিছু নেই। হাত আছে তোমার। একটু তালিম নিলেই দিব্যি জমিয়ে ফেলবে।'
চোর সিঁধ কাঠি ফেলে সিধুর পায়ে পড়ে বলল, 'শেখাবেন আমাকে?'
সিধু মাথা নেড়ে বলে, 'শেখাব হে শেখাব। এ বিদ্যে তো আর নিজের ছেলেকে শেখানো যায় না। অথচ বিদ্যেটা নষ্টই বা করি কী করে? তোমার মতো লোক পেলে শেখাই।'
বাকি রাতটা আর সিধু ঘুমোল না। চোরটাকে নিয়ে দাওয়ায় বসে খুব মন দিয়ে চুরির কলাকৌশল শেখাতে লাগল। চোরটা ভক্তি গদগদ মুখে শিখতে লাগল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন