শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

শহরে পরপর কতগুলো রহস্যময় চুরি হয়ে যাওয়ায় গোপীবাবু খুবই চিন্তিত। চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। তিনিই হলেন এই গোপালপুর গঞ্জের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। প্রচণ্ড প্রতাপশালী দারোগা গোপীনাথ মজুমদারের খুবই সুনাম। তার দাপটে গোপালপুরে চুরি-ডাকাতি একরকম বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে বেশ শান্তিই বিরাজ করছিল। কিন্তু কোত্থেকে একটা অতি ধুরন্ধর চোরের আগমন হওয়াতে গোপীনাথের সুনাম এখন গুডবাই জানিয়ে বিদায় নেওয়ার উপক্রম করেছে। একটা বিহিত না করলেই নয়। গত একমাসে বারোটা চুরি। ভাবা যায়? নন্দকিশোরবাবুর বাড়ি থেকে চোর এমন চেঁছেপুঁচে সব কিছু নিয়ে গেছে যে পরদিন নন্দকিশোরবাবুর গামছা ছাড়া পরার কিছু ছিল না। বাসব বাগের গিন্নির গয়নাগুলো লোপাট হওয়ার পর থেকে তাঁর একটু মাথার গোলমাল দেখা দিয়েছে। জানলায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কেবলই বলছেন, যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী। হাড়কেপ্পন হরেনবাবুর সব হারানোর শোকে নাকি তাঁর পাড়ার নেড়ি কুকুরগুলো অবধি দিনরাত ভৌ ভৌ করে হরেনবাবুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে কান্নাকাটি করছে। মহেশবাবু সেই যে সকালে উঠে মাথায় হাত দিয়ে দাওয়ায় বসে পড়েছিলেন, সেই থেকে আজও অমনিভাবেই বসে আছেন, মাথা থেকে হাতটা অবধি নামাননি। সারা গঞ্জে একটা ট্র্যাজিক অবস্থা।
গোপীনাথ সারা গঞ্জে চর মোতায়েন করেছেন। তাদেরই একজন খবর এনেছে আজ হাটবারে সেই রহস্যময় চোর কেনাকাটা করতে আসবে। তবে চতুর লোক ছাড়া তাকে চেনা এবং ধরা কঠিন।
গোপীবাবু তাই আজ সকালেই ছদ্মবেশে হাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। মুখে দাড়ি-গোঁফ, মাথায় পাগড়ি, গায়ে জোব্বা, গলায় ডুমো ডুমো পুঁথির মালা। চেনার কোনও উপায় নেই। বাড়ির পিছনের আমবাগানের রাস্তা ধরে গা-ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে তিনি সদর রাস্তায় উঠে হাটের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
কিন্তু কয়েক কদম এগোতে না এগোতেই একটা টেকো, গুঁফো বেঁটেমতো লোক ভারি গ্যালগ্যালে হেসে হাতজোড় করে মিঠে গলায় বলল, গোপীবাবু যে!
গোপীবাবু অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, আমি গোপীবাবু নই।
যে আজ্ঞে। তা আপনি হলেন গিয়ে গঞ্জের অভিভাবক, যা বলবেন তা মেনে নিতে হবে বৈকি। তবে হ্যাঁ, বলতেই হবে সাজটা বড় ভালো হয়েছে। গোপীবাবু বলে চেনার জো রাখেননি...
গোপীবাবু বিরক্ত হয়ে এগোতে লাগলেন। ছদ্মবেশে কোনও গণ্ডগোল হল নাকি? কিন্তু হওয়ার তো কথা নয়! বারদশেক আয়নায় নিজেকে ভালো করে নিরখ-পরখ করেছেন। তাঁর গিন্নি পর্যন্ত বলেছেন, তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি বটে, কিন্তু আজ ভোল একদম পালটে গেছে। তবু একটা লোক যে চিনতে পারল এটা চিন্তার কথা।
কদমতলার কাছে একটা সুরুঙ্গে চেহারার লোক গাছতলায় বসেছিল। হঠাৎ গোপীবাবুকে দেখে টপ করে উঠে এসে কানের কাছে মুখ এনে বলল, স্যার, কোমরের কাছে আপনার পিস্তলের বাঁটটা উঁচু হয়ে আছে।
বাজে কথা, আমার সঙ্গে পিস্তল নেই।
লোকটা অবাক হয়ে বলে, নেই? কী আশ্চর্য!
গোপীবাবু মৃদু হেসে বললেন, ওরে বাপু, ফকির দরবেশদের কাছে কি পিস্তল থাকে।
লোকটা মাথা চুলকোতে চুলকোতে নিজের জায়গায় ফিরে গেল বটে, কিন্তু যাওয়ার আগে চাপা গলায় বলে গেল, কিন্তু সঙ্গে রাখলে ভালো করতেন স্যার, বিপজ্জনক কাজে যাচ্ছেন!
গোপীবাবু অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। ছদ্মবেশটা কি কেউ কেউ ধরে ফেলছে? কিন্তু ধরবে কি করে?
তিনি পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটা মিষ্টি মশলার পান সাজতে বলে আয়নাটায় নিজেকে ভালো করে দেখলেন। না, কোনও খুঁত নেই। তিনি নিজেকে নিজেই চিনতে পারছেন না।
ঠিক এই সময়ে আয়নায় ঠিক তাঁর পিছনে একটা মুখ উঁকি দিল। ন্যাড়া মাথা, নাদুসনুদুস চেহারার একজন মানুষ। সেও আয়নায় গোপীবাবুকে বেশ ভালো করে দেখে নিয়ে বলল, না না, চেনা যাচ্ছে না। আপনার কোনও চিন্তা নেই গোপীবাবু।
গোপীবাবু ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে কড়া চোখে চেয়ে বললেন, আমি গোপীনাথবাবু-টাবু নই হে! কেটে পড়ো।
আহা, আমি কি বলেছি যে, আমি আপনাকে চিনেছি? কালীর দিব্যি কেটে বলছি মশাই, আমি আপনাকে আজ অবধি চিনতে পারলাম না।
পানের পয়সা দিয়ে গোপীবাবু ফের হাঁটতে লাগলেন, পানের খিলিটা মুখে পুরতেও খেয়াল হল না তাঁর। এসব হচ্ছে কী? একটার পর একটা লোক তাকে চিনে ফেলছে কি করে? তাজ্জব কাণ্ড!
রোগাভোগা বুড়োমতো একজন মানুষ হঠাৎ তাঁর পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল, চাকরিটি গেল তাহলে?
গোপীবাবু মুখে নির্বিকার ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করতে করতে উদাস গলায় বললেন, আল্লার চাকরি করি বাবা, সে চাকরি যাওয়ার নয়।
বুড়োটা খিটখিটে গলায় বলল, হুঃ, যত্তো সব অলক্ষুণে কথা। বলি লেগে থাকতে পারলে যে দু'হাতে লুটেপুটে খেতে পারতে! অমন সোনার চাকরিটা খোয়ালে বাপু, কাজটা কি ভালো হল? এখন তো দেখছি ছেলেপুলে নিয়ে তোমার পথে বসার কথা, ফকির সেজে ভিক্ষে করে বেড়াচ্ছ? দারোগাগিরিতে লেগে থাকতে পারলে যে আখের গুছিয়ে নেওয়া যেত হে!
গোপীনাথ অত্যন্ত রেগে যাচ্ছিলেন। তবু গলা যথাসম্ভব মোলায়েম করে বললেন, ওসব শোনাও আমার পাপ। গুনাহ হয়। ফকির দরবেশ কখনও চাকরি করে বলে শুনেছেন?
বুড়োটা মাথা নেড়ে বলল, নাঃ, চাকরির সঙ্গে মাথাটাও গেছে দেখছি! এ-রকম যে একটা কিছু হবে তা আগেই আঁচ করেছিলুম। বলি বাপু, চোর-ডাকাতদের পিছনে তোমার অত লাগবার দরকারটাই বা কী শুনি! ওই করতে গিয়েই বেশ বাড়াবাড়ি করে ফেললে, তখনই জানতুম বেশি কাজ দেখাতে গিয়ে ওপরওলাদের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়াবে। নাঃ, তোমাদের বুদ্ধিশুদ্ধি যে কবে পাকবে কে জানে।
বুড়োটা বিদেয় হল। কিন্তু গোপীবাবু ফাঁপরে পড়ে খুব ভাবতে লাগলেন। এ তো ভালো কথা নয়। ছদ্মবেশ ধরায় তাঁর বেশ নাম-ডাক আছে। বটতলায় দু'জন সেপাইয়ের সঙ্গে মুখোমুখি দেখাও হল এবং তারা তাঁকে চিনতে পারল না। তাহলে এরা চিনছে কি করে?
নদীর ধারে বিশাল হাটখোলায় গিজগিজ করছে ভিড়। চিন্তিত গোপীবাবু হাটে ঢুকে ইতিউতি চাইতে লাগলেন। এত বড় হাটে চোরটাকে খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার শামিল। তবে তাঁর পাকা দারোগার চোখ, বহু চোর-ডাকাত দেখে অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রচুর। তার চর বলেছিল, চোরটার চেহারা এমনই বৈশিষ্ট্যহীন যে চট করে আর পাঁচজনের সঙ্গে আলাদা করা যায় না। তবে তার নাকের ডগায় বেশ বড়সড় একটা আঁচিল আছে। কালচে আঁচিল, দূর থেকেও দেখা যায়।
ধীরে-সুস্থে চারদিকে নজর রেখে হাঁটছিলেন গোপীবাবু। তাঁর অনুসন্ধানী চোখ চারদিকে মানুষের ভিড়ে আঁতিপাঁতি করে ভয়ঙ্কর চোরটাকে খুঁজছে। হাটে বহু চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কিন্তু কেউই তাঁকে চিনতে পারছে না দেখে কতকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলেন তিনি। যাহোক, হাটে তিনি এখনও ধরা পড়েননি।
কানের কাছে মুখ এনে কে যেন ফিসফিস করে বলল, সামনে যে তেলেভাজার লাইন আছে ওইটে ধরে ডানদিকে ঠেলে এগিয়ে যান।
গোপীবাবু বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখেন উলোঝুলো পোশাক পরা একটা ফোকলা পাগল।
তুমি কে হে?
আজ্ঞে, আপনার ভালোর জন্যই বললাম। পছন্দ না হলে শুনবেন না।
তেলেভাজার লাইনে কী আছে?
যা খুঁজছেন পেয়ে যাবেন।
গোপীবাবুর গলায় দারোগার ধমক এসে যাচ্ছিল। সামলে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ওরে বাপু, ফকির-দরবেশরা আর কাকে খোঁজে? আল্লাহতালাকেই খোঁজে।
ও বাবাঃ! সে তো অনেক দূরের পাল্লা। আমি তাহলে আসি।
বলে লোকটা হাওয়া হয়ে গেল। গোপীবাবু একটু চিন্তা করে দেখলেন, লোকটার কথামতোই ডানদিকে যাওয়া ভালো।
তেলেভাজার লাইন মানে দু'ধারেই সারি দিয়ে তেলেভাজার দোকান। ফুলুরি, বেগুনী, চপ, পেঁয়াজি ভাজা হচ্ছে আর খদ্দেররা ভিড় করে দাঁড়িয়ে টপাটপ সাঁটাচ্ছে। লোভনীয় গন্ধে চারদিকটা একেবারে ম' ম' করছে। গোপীনাথের জিবও রসসিক্ত হয়ে উঠল। তবে কর্তব্য আগে, তারপর তেলেভাজা, তিনি লোভ সংবরণ করে দৃঢ় পায়ে এগোতে লাগলেন। লাইনের শেষ মাথায় একটা লোক গরম তেলে ডালের ঝালবড়া ভাজছিল। বেশ আহ্লাদী মোটাসোটা চেহারা, তার সামনে খদ্দেরের গাড়ি লেগে আছে। গোপীনাথ থমকে দাঁড়ালেন। লোকটার নাকের ডগায় কালো আঁচিলটা একেবারে জ্বলজ্বল।
লোকটা হঠাৎ চোখ তুলে গোপীনাথের দিকে চেয়ে ভারি খুশিয়াল গলায় বলে উঠল, এবার ঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন স্যার। নাকের ডগায় কালো আঁচিল খুঁজছেন তো! মেলাই পাবেন। আঁচিলের অভাব কি?
গোপীনাথ অবাক হয়ে চারদিকে চেয়ে দেখলেন, ঝালবড়ার খদ্দেরদের প্রত্যেকের নাকের ডগায় জ্বলজ্বল করছে কালো আঁচিল। যারা আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে তাদেরও নাকের ডগায় একইরকম কালো আঁচিল। আঁচিলওলা এত নাক গোপীনাথ আর কখনও দেখেননি। এখানে যেন আঁচিলের হাট বসে গেছে।
গোপীনাথের মাথা ঘুরছিল। এদের মধ্যে কোনটা আসল চোর, কাকে ধরবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। একটা ফচকে আঁচিলওলা লোক ঝালবড়া খেতে খেতে বিজ্ঞের মতো বলল, আহা, যে কাউকে ধরলেই তো হয়। আমরা তো আপনাকে সাহায্য করতেই আছি।
গোপীবাবু হতাশ হয়ে ফিরে এলেন।
শোনা যাচ্ছে গোপী দারোগা বদলির জন্য দরখাস্ত করেছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন