নতুন গ্রহ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov22

এতদ্বারা নভশ্চরদিগকে জানানো যাইতেছে যে, সম্প্রতি সতেরো নম্বর নভো মহাসড়কে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল হইতে মাত্র চারি লক্ষ মাইল দূরে একটি পুঞ্জীভূত কঠিন বস্তু আসিয়া পড়িয়াছে। ইহা কয়েকটি গ্রহাণুর একীভূত রূপ হইতে পারে। মহাকাশে চংক্রমণশীল আমাদের দূরবীক্ষণে ইহাকে গোলাকার বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। ব্যাস আনুমানিক পাঁচশত মাইল। নভশ্চরগণ, ইহার কিছু মাধ্যাকর্ষণও রহিয়াছে। সুতরাং আপনারা সতেরো নম্বর নভোসড়কে গতায়াতের সময় এই বস্তুটিকে লক্ষ রাখিবেন। আমরা এই বস্তুটি সম্পর্কে আগ্রহী, কৌতূহলী। অধিক নিকটে যাইবেন না, বিপদ ঘটিতে পারে।

যাদববাবু মহাকাশের একটি কূট অঞ্চল থেকে পৃথিবীতে ফিরছিলেন। তাঁর মন অত্যন্ত খারাপ। এই একান্ন বছর বয়সে তাঁর মনে হচ্ছে আর বেঁচে থাকার কোনও মানে নেই। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা কেউই তাঁকে কোনও গুরুত্ব দেয় না। কাজেকর্মেও তিনি তেমন কৃতবিদ্য নন বলে কারও কাছে পাত্তা পান না। তিনি আজ অবধি কোনও পুরস্কার পাননি, প্রমোশনও জোটেনি। তিনি টের পাচ্ছেন, দিন-দিন তিনি আরও ভোঁতা এবং নির্বোধ হয়ে যাচ্ছেন। মহাকাশের যে অঞ্চলে তাঁকে প্রায়ই পাঠানো হয় সেটি একটি অন্ধকার বিটকেল অঞ্চল। একটি নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে নির্গত গামা রশ্মির পরিমাণ করাই তাঁর কাজ। সেই কাজটি যে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় তা তিনি ভালোই বোঝেন। কারণ গামা রশ্মি সম্পর্কিত তাঁর রিপোর্ট বেশিরভাগ সময় কম্পিউটারে ফিড করাও হয় না। অফিসে তাঁকে নিয়ে আড়ালে-আবডালে ঠাট্টা-মশকরাও হয় বলে তিনি জানেন।

তাঁর মহাকাশযানটিও সেকেলে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কিছুই প্রায় নেই। আজকাল যে আলোর চেয়েও পঞ্চাশগুণ গতিসম্পন্ন যান বেরিয়েছে তা তাঁকে দেওয়া হয়নি।

তিনি একবার তাঁর বস টম সাহেবকে বলেছিলেন, 'স্যার, আমাকে একটা ওরকম গাড়ি দিলে অনেকটা সময় বাঁচে।'

টম সাহেব ভ্রূ কুঁচকে বললেন, 'ও গাড়ি দিয়ে তোমার আবার কিসের কাজ? ওসব জিনিস তুমি হ্যান্ডেলই করতে পারবে না।'

'আজ্ঞে আমার নক্ষত্রপুঞ্জটা বেশ দূর।'

'তা হোক না দূর, তোমার তো সময়ের অভাব নেই।'

'একা একা অন্ধকারে দিনের পর দিন কাটানো বড় একঘেয়ে।'

'সব কাজই একঘেয়ে। ও কাজ করতে না চাও তো অফিসে বসে কেরানির কাজ করতে পারো।'

যাদববাবু জানেন, সেটা আরও খারাপ দেখাবে, লজ্জার ব্যাপার হবে। তাই তিনি পালিয়ে এলেন।

এই যে তিনি মহাকাশে মাসের পর মাস থেকে তারপর একদিন বাড়ি ফিরে আসেন তাতে যে বাড়ির লোক—অর্থাৎ স্ত্রী ও সন্তানেরা খুব যে উল্লসিত হয় তা নয়। বরং তাঁকে দেখে স্ত্রী এমন মুখভঙ্গি করেন তাতে বোঝা যায় যে বলতে চাইছেন, ওই এলেন! বড্ড অপমান লাগে যাদববাবুর। তিনি নিরীহ মানুষ বলে সবই সয়ে নেন। তিনি জানেন তাঁর ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। তাঁকে কেউ পছন্দও করে না।

আজ তাঁর মন বড়ই বিমর্ষ। আকাশের কূট অঞ্চলে দিনের পর দিন নির্বাসন ভোগ করা, নিঃসঙ্গতা তাঁকে কাহিল করে ফেলেছে।

এবার যে তিনি তিন মাস ওই অঞ্চলে ছিলেন তার বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন চিন্তা করে। নিজের জীবনের ব্যর্থতার কথাই ভেবেছেন। এই তিন মাস পৃথিবী থেকে কেউ তাঁর কোনও খোঁজ নেয়নি। বাঁচলেন না মরলেন, শরীর ভালো আছে কিনা, কোনওরকম অসুবিধে হচ্ছে কিনা তাও কেউ জানতে চায়নি। ঘোর অন্ধকার এবং ঘোর একাকীত্বের মধ্যে বসে তিনি ভেবেছেন, দেহযুক্ত এবং বস্তুযুক্ত জীবনই নানা দুঃখের আকর।

তিন মাস পর কাজের শেষে তিনি নিরানন্দভাবে পৃথিবীতে ফেরার পথে ঘোষণাটি শুনলেন। সতেরো নম্বর নভোসড়কে একটি বস্তুপিণ্ড এসে পড়েছে। তেমন গা করলেন না। তিনিও সতেরো নম্বর সড়কপথেই ফিরছেন। ভাবলেন যদি ধাক্কা খেয়ে মরেন তাহলে ভালোই হয়।

বেশ দূর থেকেই তিনি বস্তুটিকে দেখতে পেলেন। সৌরবলয়ের মধ্যেই ভেসে আছে গোলাকার ছোট্ট গ্রহাণুটি। একপাশে সূর্যের আলো পড়ে আধখানা দেখাচ্ছে। যাদববাবু যানের গতি কমিয়ে দিলেন এবং ধীরে ধীরে গ্রহাণুটির দিকে এগিয়ে গেলেন। গ্রহাণুটির চারপাশে চক্কর দিয়ে তাঁর বেশ পছন্দই হলো জায়গাটা। ছোটখাটো পাহাড় আছে, ছোট ছোট উপত্যকাও দেখা যাচ্ছে। স্ক্যান করে তাঁর মনে হল গ্রহাণুটিতে একসময়ে জল আর উদ্ভিদও ছিল। খুবই অবাক হলেন তিনি। এইটুকু একরত্তি একটা গ্রহে এসব হওয়ার তো কথা নয়!

তবে যাই হোক, মরার পক্ষে এই গ্রহটি ভারি ভালো। নভশ্চরদের মরতে বেশি সময় লাগে না। মহাকাশযান থেকে বেরিয়ে গায়ের আকাশচারীর পোশাকটি খুলে ফেললেই মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যু।

মনটা স্থির করে ফেললেন যাদববাবু। এই ব্যর্থ জীবন আর রাখবেন না। মহাকাশযানটি ধীরে ধীরে নামিয়ে আনলেন। তারপর বহির্গমনের সুড়ঙ্গপথটি বেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলেন। দরজাটি খুলে একটি লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন মাটিতে। চারদিকে চেয়ে একটু দেখে নিলেন। যা দেখলেন তাতে খুবই বিস্মিত হলেন তিনি। আপাত ঊষর বলে মনে হলেও, পাথরের খাঁজে খাঁজে সবজে এবং কালচে কিছু উদ্ভিদ যেন চোখে পড়ল তাঁর। আর চোখের ভুল কিনা কে জানে, একটা পাথরের চাঙারের নীচে তিনি একটু জলও দেখতে পেলেন কি?

মরার কথা ভুলে ব্যাপারটা ভালো করে দেখার জন্যই যাদববাবু তাড়াতাড়ি তাঁর মহাকাশের পোশাক খুলে ফেললেন। মাথার ঢাকনাটিও খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে দেখলেন, বাস্তবিকই, পাথরের খাঁজে জল জমে আছে। এক কোষ জল তুলে মুখে দিয়ে দেখলেন ভারি সুস্বাদু জল। গাছগুলোতে হাত দিয়ে দেখলেন সেগুলো বাস্তবিকই উদ্ভিদ এবং হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল, মহাকাশচারীর পোশাক খুলে ফেলার পরও তিনি মরেননি এবং শ্বাসক্রিয়াও বন্ধ হয়নি অক্সিজেনের অভাবে।

হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল, 'যাদব ঘোষাল নাকি হে?'

যাদববাবু চমকে উঠে পিছন ফিরে যাঁকে দেখলেন তিনি বহুকাল আগে মহাকাশে হারিয়ে যাওয়া বৈজ্ঞানিক হারাধন হালদার। হারাধনকে দেখে তাঁর ভিরমি খাওয়ার যোগাড়।

'আ-আপনি?'

'ভূত নই হে, সশরীরে হারাধন হালদারই বটে। তা তুমি কোত্থেকে এসে উদয় হলে?'

মাথাটা ঘুরছিল যাদববাবুর। মাথা চেপে ধরে বললেন, 'আপনি এখানে বেঁচে আছেন কি করে? এখানে কি আবহমণ্ডল আছে? জল? খাবার?'

'তা না হলে বাঁচব কি করে হে? এখানে সব আছে। আবহমণ্ডল না থাকলে মহাকাশের পোশাক খুলে ফেলার পরও তুমি বেঁচে আছ কি করে?'

'তাও তো বটে! বলে যাদববাবু মাথা চুলকোলেন।'

হারাধন হালদার হেসে বললেন, 'আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে মহাকাশে ক্ষেপ মারতে মারতে একদিন জীবনের ওপর ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। তখনই সৌরমণ্ডলের এই অজানা গ্রহটির সন্ধান পাই। ছোট বলে কারও নজরে পড়েনি কখনও। বিজ্ঞান-টিজ্ঞান ছেড়ে একটু আরামে বেঁচে থাকার জন্য এখানেই থানা গাড়ি। এখানে আমিই রাজা।'

আমতা-আমতা করে যাদববাবু বললেন, 'তা এখানে কি লোকজনও আছে নাকি?'

'তা থাকবে না কেন? দেড়-দুই ফুট লম্বা মানুষজন আছে। সংখ্যায় মেরেকেটে হাজার পাঁচেক। গরু-ছাগলের মতো জীবজন্তুও আছে। সবই ছোট মাপের।'

দেখতে দেখতে পাথরের নানা খানাখণ্ড থেকে পিল পিল করে ছোট ছোট পুতুলের মতো মানুষ বেরিয়ে এসে তাঁদের ঘিরে দাঁড়াল।

হারাধন বললেন, 'এরা লোকও ভালো। এখানে ফলমূল, শস্য সবই হয়। খুব শান্তির জায়গা।'

বলতে-বলতে হঠাৎ অন্ধকার হয়ে আসছিল। যাদববাবু বললেন, 'সন্ধে হয়ে এল নাকি?'

'হ্যাঁ। ছোট্ট গ্রহ, দু'ঘণ্টা রাত, দু'ঘণ্টা দিন। কিন্তু রাতের বেলা তেমন অন্ধকার হয় না বেশ আলো থাকে।'

'এখানে কি সমুদ্র-টমুদ্র আছে?'

'না রে ভাই। ওসব তো নেইই, এমনকী নদীনালা-পুকুরও নেই। এক ধরনের স্পঞ্জ পাথরের মধ্যে জল হয়। নরম পাথর, নিংড়োলে জল বেরোয়। মাটি খুঁড়লেও জল পাওয়া যায়। এখানে শীত-গ্রীষ্ম নেই, চির বসন্তের দেশ। খুব ভালো আছি হে ভায়া, দিব্যি আছি। বয়স প্রায় নব্বই হতে চলল, এখনও জরা-ব্যাধি বলে কিছু টের পাই না। এখানে সর্দি লাগে না কারো, অন্য অসুখ তো ক্যা কথা।'

'তা হারাধনদা, আমাকেও যদি এই গ্রহে একটু ঠাঁই দেন বড় ভালো হয় তবে।'

'পাগল নাকি? দিব্যি একা একা আছি, এখানে কাউকে ভাগ বসাতে দেব না।'

যাদববাবু বললেন, 'কিন্তু কতদিন একা থাকবেন দাদা, পৃথিবীর মানুষ যে এ গ্রহের সন্ধান পেয়ে গেছে! একটু আগেই ঘোষণা করা হয়েছে তারা এই গ্রহ সম্পর্কে আগ্রহী।'

হারাধনের মুখ শুকোলো, 'বলো কি?'

'আজ্ঞে সত্যি কথাই বলছি। তারা এল বলে!'

হারাধন একটু চুকচুক শব্দ করে বললেন, 'দুঃখের কথা। তবে সব জিনিসেরই ভালো-মন্দ দুটো দিক আছে। বহুকাল পায়েস খাইনি, ঢেঁকি শাক খাইনি, কড়াইশুঁটির কচুরি খাইনি। আমার গিন্নি চমৎকার মুড়িঘণ্ট রাঁধত— সেটারও স্বাদ ভুলতে বসেছি। তাছাড়া সমুদ্রের ধার বা নদীর কিনারা বা গাছতলা এসবও তো এখানে নেই। মনটা মাঝে মাঝে হু হু করে। আসল কথা কি জানো? পালিয়ে থাকা যায় বটে, কিন্তু পালিয়ে বাঁচা যায় না।'

'তাহলে কী করবেন?'

ফিরেই যাই চলো। এই গ্রহটাকে যাতে ওরা নষ্ট না করে তার ব্যবস্থাও করতে হবে। তুমি আর আমি মিলে ওদের বোঝাতে পারব। আর মাঝে মাঝে এসে হাঁফ ছেড়ে যাব।

হারাধন হালদারকে নিয়ে যাদব ঘোষাল পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তুমুল হৈ-হৈ হল যাদববাবুকে নিয়ে। নতুন গ্রহের খোঁজ এনেছেন এবং হারাধন হালদারকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন বলে তাঁর গুরুত্ব খুবই বেড়ে গেল। বাইরের জগতে গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় বাড়িতেও তাঁর কদর হল খুব। টম সাহেব তাঁকে নতুন মহাকাশযান তো দিলেনই, নবাবিষ্কৃত গ্রহটিতে গিয়ে ছুটি কাটিয়ে আসার ঢালাও অনুমতিও দিয়ে দিলেন।

Cov23
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%