পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov47

পটলবাবু যে জঙ্গলের মধ্যে একা একটা বাড়িতে বসবাস করেন তার কারণ আছে। কারণ হল, পটলবাবুর তিরিক্ষি মেজাজ আর চণ্ড রাগ। তাঁর মেজাজের ভয়ে গিন্নি মানে মানে বিদায় নিয়ে বাপের বাড়িতে গিয়ে বসবাস করছেন। সঙ্গে দশ বছরের ছেলে আর ছয় বছরের মেয়েকেও নিয়ে গেছেন। প্রকৃতির মধ্যে বাস করবেন বলে পটলবাবু শহর থেকে দূরে একটু জঙ্গলঘেঁষা নির্জন জায়গায় বাড়ি বানিয়েছিলেন। কিন্তু এখান থেকে বাজার-হাট স্কুল-কলেজ লোকালয় সবই দূরে বলে তাঁর পরিবারের কেউ ব্যাপারটা পছন্দ করছিল না। কিন্তু পটলবাবু কারও মতামতের তোয়াক্কা করেন না, একাই থাকেন। সারাদিন বন্দুক নিয়ে শিকারের খোঁজে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান। শিকার অবশ্য কিছুই মেলে না। দু-চারটে হরিণ বা সম্বর দেখা যায়, আর পাখি। কিন্তু পটলবাবুর টিপ ভালো নয় বলে আজ অবধি একটিও পশু বা পাখি মারতে পারেননি। তবে শিকার করতে বেরোলে সময়টা কাটে ভালো।

সেদিন সন্ধের পর পটলবাবু ছাদে পায়চারি করতে গিয়ে হঠাৎ দেখলেন পুবদিকের আকাশে একটা তারা যেন বড্ড বেশি চকচক করছে। তারাদের তো জ্বলজ্বল করতে দেখা যায় না কখনও! তিনি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে দূরবীনটা এনে দেখলেন, তারাটা বেশ বড় একটা পিরিচের আকার নিয়েছে। নীলচে আলোটা আরও তীব্র হয়েছে। এবং তারাটা এদিকেই যেন ধেয়ে আসছে। পটলবাবুর শরীর কন্টাকিত হয়ে উঠল। এ কি সেই উফো নাকি রে বাবা। গত সপ্তাহেই আমেরিকা আর ব্রাজিলে কয়েকজন লোক উফো দেখেছে বলে খবরের কাগজে খবর ছিল!

পটলবাবু দূরবীন ধরে চেয়ে রইলেন। বুঝতে পারলেন, জিনিসটা তারা তো নয়ই, বরং উড়ন্ত চাকির মতোই কিছু। উজ্জ্বল আলোটা দপ করে খানিকটা কমে গেল এবং দেখা গেল আকাশে গোল আকৃতির একটা বাড়ির মতো জিনিস ভেসে আছে। বাড়িটা কয়েকতলা উঁচু, অনেক জানালার মতো চৌখুপী আছে। জানালাতে চৌকো চৌকো আলো দেখা যাচ্ছে। বাড়ির মাথায় একটা ঝুঁটির মতো কিছু রয়েছে।

উত্তেজিত পটলবাবু দুদ্দার করে নেমে বাইরে বেরিয়ে আঁদার-প্যাঁদার ভেঙে সেই উড়ন্ত চাকির দিকে ছুটতে লাগলেন। কিন্তু উত্তেজনার বশে খেয়াল করেননি যে, তিনি লুঙ্গি পরে আছেন এবং পায়ে হাওয়াই চটি। এই দুটি জিনিস যে দৌড়োনোর অনুকূল জিনিষ নয়, তা খেয়াল হল, লুঙ্গিতে পা জড়িয়ে একটা আছাড় খাওয়ার পর। অন্ধকারে একপাটি হাওয়াইও কোথায় ছিটকে গেল কে জানে। ছড়ে যাওয়া হাঁটু, মচকানো কব্জি আর মটকে যাওয়া গোড়ালি নিয়ে যখন কাতর মুখে উঠে দাঁড়ালেন তখন উড়ন্ত চাকি হাওয়া হয়ে গেছে। আকাশ পরিষ্কার। তবে তাঁর ধারণা হল উড়ন্ত চাকিটা ধারে কাছে কোথাও নেমেছে।

সকালে প্রায় প্রবল ব্যথা সত্ত্বেও পোশাক পরে বন্দুক বগলে নিয়ে পটলবাবু বেরিয়ে পড়লেন। হিসেবমতো যে জায়গায় উড়ন্ত চাকি নামবার কথা সেটা জঙ্গলের মধ্যে।

জঙ্গলের মধ্যে পটলবাবু প্রায়ই বিচরণ করে থাকেন। ফলে স্থানটি তাঁর বেশ চেনা। খুব একটা দুর্গম জঙ্গলও নয়। বেশ খানিকটা ভিতরে ঢুকে যাওয়ার পর একটা লতানে গাছের আড়াল সরিয়ে উঁকি দিতেই পটলবাবু হাঁ। সামনে একটু ফাঁকা জায়গায় একটা নৌকো রয়েছে। আর সেই নৌকোয় একদল বেজায় লম্বা লোক বসে হাতে ক্যালকুলেটরের মতো একটা যন্ত্রে যেন কিছু হিসেব-নিকেশ করছে। লোকটার পরনে একটা দেখার মতো জিনিস। জুডো খেলায় যেমন পোশাক পরতে হয় অনেকটা তেমনি।

লোকটা মুখ ফিরিয়ে তাঁর দিকে তাকাল। কী সুন্দর মুখখানা। যেন গ্রীক দেবতা।

পটলবাবু দু-পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, নমস্কার। তা এই জঙ্গলের মধ্যে একটা নৌকো কোথা থেকে এল বলুন তো। ধারে কাছে তো জলও নেই। ডুংরি নদী তো মাইলখানেক দূরে।

লোকটা গম্ভীর মুখে তাঁর দিকে চেয়ে হঠাৎ ইশারায় তাঁকে নৌকোয় উঠে পড়তে বলল।

পটলবাবু একটু দ্বিধায় পড়লেন। অচেনা অজানা মানুষ। ফট করে তার কাছে যাওয়াটা ঠিক হবে কি? তবে তাঁর দুর্জয় সাহস। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করে সটান গিয়ে নৌকোয় উঠে পড়লেন। আর উঠেই বুঝতে পারলেন এটা ঠিক দিশি ডিঙি নৌকো নয়। ভিতরে গদি আঁটা চমৎকার বসবার জায়গা রয়েছে এবং রয়েছে নানারকম কলকব্জা। সেগুলো পটলবাবু চেনেন না। তিনি বসতেই একটা স্বচ্ছ কাচের ঢাকনায় নিঃশব্দে নৌকাটা ঢেকে গেল। সামান্য একটু দোল খেয়ে নৌকোটা সটান আকাশে উঠে গেল। এতটাই ওপরে যে, কয়েক সেকেন্ড পরে প্রায় মেঘের রাজ্যে পৌঁছে গেলেন তাঁরা।

পটলবাবু চেঁচিয়ে উঠে বললেন, এসব কী হচ্ছে মশাই? আপনি নিশ্চয়ই অন্য গ্রহের লোক। কিন্তু আমার হাতে বন্দুক আছে। যদি নামিয়ে না দেন তাহলে কিন্তু...

লোকটা কোনও জবাব দিল না। কিন্তু পটলবাবুর পাশ থেকে একটা যান্ত্রিক লিভার হঠাৎ বেরিয়ে এসে তাঁর বন্দুকটা কেড়ে নিল।

পটলবাবু বুঝলেন, শক্ত পাল্লায় পড়েছেন। মুশকিল হল, এই ভিন্ন গ্রহের মানুষের মতলবটা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁকে এভাবে তুলে এনে এ কী করতে চায় সেটা ভেবে একটু ভয় হয়েছে তাঁর। লোকটা তাঁর ভাষা বুঝতে পারবে না। জেনেও পটলবাবু বলতে লাগলেন, শুনুন মশাই, শুনুন। আমরা খুব নিরীহ জীব। কারও কোনও ক্ষতি করি না। ভিন গ্রহ থেকে লোকজন এলে আমরা তাদের খুবই খাতির করি। কেন মশাই, আমাকে এভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি গেরস্ত মানুষ। আমার বউ বাচ্চা আছে। আমাকে যদি মেরে-টেরে ফেলেন তাহলে তারা যে খুব বিপদে পড়বে! আপনাদেরও সংসার-টংসার আছে, না কি! দোহাই আপনার, আমাকে নামিয়ে দিয়ে আসুন।

লম্বা লোকটা তার ক্যালকুলেটরের মতো যন্ত্রটা নিয়ে খুব মন দিয়ে কি সব হিসেব-নিকেশ করছিল যেন। এবার মুখ তুলে বলল, ইয়াও।

পটলবাবু কথাটার মানে বুঝলেন না। তবু বললেন, সে তো বটেই। তবে কিনা—

এবার লোকটা একটু হেসে পরিষ্কার বাংলা ভাষায় বলল, তোমার ভাষাটা বুঝতে, আমার দশ মিনিট সময় লেগেছে। আমার এই সেনসর যন্ত্রটি তোমার ভিতরকার সব খবর বিশ্লেষণ করে বলছে, তুমি অত্যন্ত বাজে লোক। একগুঁয়ে, রাগী, জেদী এবং নির্দয়। ঠিক কিনা!

পটলবাবু আর্তনাদ করে বলে উঠলেন, না না, অতটা নয়। তা মানুষের তো দোষ-গুণ সবই থাকে। একটু আধটু দোষ থাকলেও আমি খুব খারাপ লোক নই আজ্ঞে।

নৌকোটা এত ওপরে উঠে এসেছে যে, এখান থেকে গোটা পৃথিবীটাকেই দেখা যাচ্ছে একটা বিশাল গ্লোবের মতো। পটলবাবুর মাথাটা বাঁই করে ঘুরে গেল।

নৌকোটা একটা উচ্চতায় এসে থামল। লোকটা বলল, নামো।

পটলবাবু হাঁউ মাউ করে কেঁদে ফেলে বললেন, কোথায় নামব? পড়ে গেলে কি আর বাঁচব?

কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল, শূন্যে অদৃশ্যমানতা থেকে ধীরে ধীরে সেই বিশাল গোল ভাসমান বাড়িটা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। নৌকোটা ঘাটে ভেড়ার মতো সেই উড়ন্ত চাকির সঙ্গে লেগে রইল। সামনে একটা দরজার মতো ফাঁক। পটলবাবু খুব ভয়ে ভয়ে সেই দরজা দিয়ে লম্বা লোকটার পিছু পিছু ভিতরে ঢুকলেন। ওরে বাবা! চারদিকে বিটকেল এবং কিম্ভুত সব যন্ত্রপাতি। তারই ফাঁকে ফাঁকে খুব লম্বা চেহারার গম্ভীর মুখের লোকেরা মন দিয়ে নানা কাজ করে যাচ্ছে। তাকে যে পাকড়াও করে এনেছে সেই লোকটা তাকে টেনে নিয়ে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে মাথায় একটা হেলমেটের মতো জিনিস পরিয়ে দিয়ে বলল, মাঝে মাঝে আমরা পৃথিবীর কিছু বেয়ারা লোককে শায়েস্তা করে দিয়ে যাই। এবার তোমার পালা।

পটলবাবু আপত্তি করার আগেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলেন কে জানে। জ্ঞান ফেরার পর তিনি স্পষ্ট টের পেলেন, তিনি আর আগের মানুষটি নেই। মনটা বেশ হালকা ফুরফুরে। ভিতরে যেন রাগ- টাগগুলোও উধাও হয়েছে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, বউ বাচ্চাদের জন্য তাঁর মন কেমন করছে।

লোকটা ফের একটা দরজা খুলে দিয়ে পটলবাবুকে বলল, নামো।

পটলবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, নামব কি মশাই! পৃথিবী যে অনেক দূরে!

লোকটা হঠাৎ তাঁকে শূন্য ঠেলে ফেলে দিল। পটলবাবু চোখ বুজে ফেলেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি শূন্যে ভেসেও রইলেন না, আবার তীব্র গতিতে পতিত হলেন না। একটা অদৃশ্য দড়ি যেন তাকে ধরে ধীরে ধীরে পৃথিবীতে নামিয়ে দিতে লাগল। কয়েক মিনিট পর তিনি দিব্যি নিজের বাড়ির কাছেই নেমে পড়লেন। ওপরের দিকে বিস্মিত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তিনি বিড়বিড় করে বললেন, তোমরা লোক তেমন মন্দ নও হে।

পটলবাবু আর দেরি করলেন না। বউ আর ছেলে-মেয়ের কাছে যাবেন বলে তাড়াতাড়ি শ্বশুরবাড়ি রওনা হয়ে পড়লেন।

Cov48
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%