আকাশ গঙ্গা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov20

লোকের সঙ্গে ভাব ভালোবাসা করতে নরহরি খুবই ভালোবাসে। ভাব জমানোর নানা ফিকিরও জানা আছে তার। শনিবার ডাউন বর্ধমান-কলকাতা লোকালে উঠে দেখল কামরাটা বড়ই ফাঁকা। জনমনিষ্যি নেই। এধার-ওধার খুঁজে সে দেখল জানালার কাছে একজন মাত্র বসে বসে ঝিমোচ্ছে। নরহরি গিয়ে তার পাশটিতেই বসল। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বিনয়ের সঙ্গে দেখল মুখখানা খুব চেনা-চেনা ঠেকছে যে! লোকটা নিমীলিত চোখে তাকে একবার দেখে নিয়ে বলল, 'চেনা লোককে তো চেনা-চেনা দেখবারই কথা!'

নরহরি কস্মিনকালেও এই মুশকো চেহারার ফ্যালা ভুঁড়ো গোঁফওয়ালা লোকটাকে দেখেনি। তবু খুশি হয়ে বলল, 'তা যা বলেছেন। কতকাল পরে দেখা!'

কিছু বলতে হয় বলেই বলা। কথা না কইলে নরহরির বড় হাঁসফাঁস লাগে। তবে ভাব জমাতে হলে ভুল ভাল, সত্যি-মিথ্যে যা হোক কিছু বললেই হল।

লোকটা ঝিমোতে ঝিমোতে বলল, 'হ্যাঁ, এক বছর তিনমাস সতেরো দিন পর।'

নরহরি এ-কথায় একটু হাঁ হল। ও বাবা! এ যে একেবারে দিনক্ষণ অবধি বলছে!

তবু নরহরি বেশ অমায়কিভাবেই বলল, 'হ্যাঁ, তা হবে। তা বাড়ির সবাই ভালো তো!'

লোকটা ফের নিমীলিত চোখে একবার নরহরিকে দেখে নিয়ে বলল, 'বাড়ি? বাড়ির কথা আর বলবেন না মশাই। তাদের হাল কী হয়েছে তা ভগবানই জানেন।'

'বাড়ির খবর পাচ্ছেন না বুঝি! তা গিয়ে ঘুরে আসুন না একবার। বাড়ি দূর তো আর নয়।'

'দূর! না, দূর আর এমন কি! আসলে ফুরসৎ পাচ্ছি কোথায় বলুন।'

'তা অবশ্যি ঠিক। আপনি তো কাজের লোক, তা সেই পুরোনো চাকরিই করছেন এখনও?'

'তাছাড়া আর কী? চাকরিটা তেমন খারাপ ছিল না মশাই। তবে এই বুড়ো মা-বাবা, বউ-বাচ্চাদের ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে থাকাটাই বড্ড খারাপ লাগে।'

একটা স্টেশনে ট্রেন থামতেই একটা চাওলা ছোকরা উঠল।

নরহরি বলল, 'একটু চা ইচ্ছে করবেন নাকি? ভাদ্র মাসের শেষে এবার একটু ঠান্ডাই পড়ে গেছে।'

'তা নিন একটু চা।'

চা খেতে খেতে নরহরি বলল, 'তা কতকাল বাড়ি যাওয়া হয়নি আপনার?'

'তা বেশ অনেকদিনই হয়ে গেল। দু-আড়াইশো বছর হবে।'

চা খেয়ে লোকটির ঝিমুনি কেটেছে। হাঃ হাঃ করে হেসে বলল, 'দু'আড়াই বছর হলে তো কথাই ছিল না মশাই। সে তো নস্যি। আমি কি তাই বললুম আপনাকে?'

'তাহলে?'

'দু'আড়াইশো বছরের কথাই বলছি। এতদিনে মা-বাবা আরও একটু বুড়ো হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। ছোট মেয়েটা তখন হামা দিয়ে বেড়াত, এখন নিশ্চয়ই হেঁটে চলে বেড়ায়। রাঙী গাইটার বিয়োনোর কথা ছিল, তা তার বাছুরটাও বোধহয় এতদিনে বড় হয়ে গেছে। গোয়ালঘরের পিছনে কলমের গাছটা ছোট ছিল, এখন নিশ্চয়ই ফল দিতে শুরু করেছে।'

লোকটা পাগলই হবে। তবে ভয়ঙ্কর পাগলকেই যা ভয়। অল্পস্বল্প পাগলকে নরহরি সামাল দিতে পারবে। তাই সে ভারি বিনয়ের সঙ্গে বলল, 'হ্যাঁ, অনেকদিনের পাল্লা তো, ওরকম হতেই পারে। তা আপনার গ্রামটি কি বাঁকড়ো না মেদিনীপুরে?'

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, 'কোনওটাই নয়, আমার জেলা হল হরেকেষ্টপুর, থানা শিকরগাছা, গাঁয়ের নাম কালীতলা।'

'হরেকেষ্টপুর! এরকম জেলার নাম তো শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।'

'খুব বড় জেলা মশাই। আড়ে দীঘে এতই বড় যে আপনাদের এগারোটা বর্ধমান জেলা তাতে অনায়াসে ঢুকে যাবে।'

নরহরি অবাক হয়ে বলে, 'ওরে বাবা! তা কোন লাইনে যেতে হয় বলুন তো! একবার না হয় ঘুরেই আসা যাবে।'

'কাজটা শক্ত হবে। পরাণ মাঝির খেয়া ছয়মাসে একবার করে এখানে ক্ষেপ মারে। তা সে খেয়ায় সবসময়ে জায়গা পাওয়া যায় না। মোটে বারোশো লোক বসবার জায়গা আছে।'

চোখ কপালে তুলে নরহরি বলল, 'খেয়া নৌকোয় বারোশো লোক! সেটা কি নৌকো, না জাহাজ?'

'আদর করে খেয়া বলে বটে সবাই। তবে সেখানা বেশ বড়সড় ব্যাপারই বটে।'

'তা মশাই, খেয়া নৌকো তো আমাদের দামোদরেও ক্ষেপ মারে। দিনে অগুনতিবার এপার-ওপার করছে। কিন্তু আপনাদের পরাণ মাঝি ছ'মাসে একবার ক্ষেপ মারে কেন?'

'পাল্লাটাও তো দেখতে হবে। তা ধরুন এ মুড়ো ও মুড়ো ধরলে লক্ষ কোটি মাইলের তফাৎ।'

'এ যে দুনিয়াজোড়া কথা মশাই।'

'যে আজ্ঞে। দুনিয়াজোড়া কথাই তো।'

'নদীটার নাম কি বলুন তো।'

'আমরা তো বলি আকাশ গঙ্গা।'

'আকাশ গঙ্গা! না দাদা, এরকম নদীর নাম শুনিনি।'

'না শুনলেও দেখেছেন তো বটেই।'

'দেখেছি নাকি?'

'না দেখার কী আছে বলুন। চোখের সামনেই বুক চিতিয়ে পড়ে আছে। জলটল নেই অবশ্য, শুধু খাত।'

'বলেন কি, জলছাড়া নদী! তা তাতে আবার খেয়া! না দাদা, আমার মাথায় সেঁধোচ্ছে না।'

লোকটা ভারি হাঃ হাঃ করে হাসল। বলল, 'আকাশ গঙ্গা কি যে সে নদী! তার দেমাকই আলাদা।'

'নদীটা কি আমাদের বর্ধমানের লাইনেই পড়বে মশাই?'

'তা পড়বে না কেন? আকাশ গঙ্গার ঘাট সর্বত্র। ওপর পানে তাকালেই তো আকাশ গঙ্গা মশাই। একেবারে ভগবানের রাজ্যে। ও নদীর কোনও কূলকিনারা নেই। কোথাও শুরু হয় না, কোথাও শেষ হয় না।'

'আপনি বোধহয় ঠাট্টা করছেন।'

'আমি ঠাট্টা করার কে? ঠাট্টা যদি বলেন তো সেটা ভগবানেরই ঠাট্টা। অত বড় আকাশখানা আমাদের মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়ার কোনও মানে হয় বলুন! আমরা ছোটখাটো মানুষ সব, আকাশখানার বহর দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ারই তো কথা।'

নরহরি এবার খুব সন্তর্পণে বলল, 'আপনার আকাশ গঙ্গা কি তাহলে আকাশের নদী মশাই?'

'তাই বটে।'

'সেটাকেই কি আকাশকুসুম বলে?'

'তাও বলতে পারেন। সন্ধেরাতের দিকে পুবমুখো দাঁড়িয়ে বাঁ হাতে কোনাকুনি যে লালচে তারাটাকে দেখতে পাবেন, ওরই কাছেপিঠে আমার গাঁ। ভারি ভালো গ্রাম মশাই। হপ্তায় তিন দিন হাট বসে। শিবরাত্তি, চড়ক, রথ, আরও সব পালে-পার্বণে বিরাট মেলা বসে। জাগ্রত রক্ষাকালীর থান আছে। লাগোয়া দ্বাদশ শিবের মন্দির। রথযাত্রায় দুশো ফুট উঁচু রথ বেরোয়।'

নরহরির বাক্য শেষ হয়ে গেল। এ পাগলের সঙ্গে কথা কওয়ার মানেই হয় না। সে পিছনে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ফেলল। মাথাটা ঘুরছে।

'মশাই কি ঘুমোলেন?'

'আজ্ঞে একটু ঝিমুনি আসছে বটে।'

'তাহলে ঘুমোন। আমি পরের স্টেশন মশাগ্রামেই নেমে যাব।'

'তা বেশ।'

'শুধু নামবার আগে একটা কথা।'

'কী বলুন তো।'

'এক বছর তিন মাস তেরো দিন আগে এই ট্রেনেই এমনি রাতের বেলা আপনি আমার ঘুম ভাঙিয়ে খেজুড়ে আলাপ জুড়েছিলেন, মনে আছে?'

নরহরি শশব্যস্তে বলল, 'তাই নাকি?'

'যে আজ্ঞে। তাই তক্কে তক্কে ছিলাম আজ সুযোগ পেয়ে একটু পাল্টি দিয়ে গেলাম আর কি। ভবিষ্যতে আর বোধহয় আপনি আমার ঘুম ভাঙনোর চেষ্টা করবেন না।'

নরহরি ভারি খুশি হয়ে হাত কচলে বলল, 'আজ্ঞে না। কস্মিনকালেও না।'

Cov21
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%