জাম্বোর নামডাক

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov55

কালীপদ সেন হলেন গিয়ে তারানাথ মেমোরিয়াল স্কুলের ইংরিজির মাস্টারমশাই। মেলা ইংরিজি জানেন বলে পাঁচটা গাঁয়ে তাঁকে সবাই মান্যগণ্য করে। তা সাহস করে এক সন্ধেবেলায় তাঁর কাছে হাজির হয়ে জাম্বো হাতজোড় করে বলে, প্রাতঃপেন্নাম হই কালীবাবু। অধমের আপনার শ্রীচরণে একটু নিবেদন ছিল।

গ্রীষ্মকাল, কালীমাস্টার দাওয়ায় মোড়া পেতে বসে হাতপাখায় হাওয়া খাচ্ছেন। বললেন, বলে ফেল বাপু।

আজ্ঞে, জাম্বো কথাটার মানে কী একটু বলবেন?

কালীপদবাবু ভ্রু কুঁচকে বলেন, সে কি হে! নিজের নামের মানে নিজেই জানো না! অথচ নামটা দিব্যি বয়ে বেড়াচ্ছ!

আজ্ঞে, আমার মা বাপের তো মোটে বিদ্যে নেই, তারা নাম রেখেই খালাস। কিন্তু নামটার একটা দায় তো আছে, ঠিক কিনা বলুন!

তা বটে, আমি যতদূর জানি, জাম্বো হল বড়সড় জিনিস। এই যেমন জাম্বো হাওয়াই জাহাজ, জাম্বো আইসক্রিম, জাম্বো সাইজের কলা।

তার মানে তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে আমি একজন বড়সড় লোক?

তাই দাঁড়ায় বটে।

কালীমাস্টারকে একটা পেন্নাম ঠুকে জাম্বো খুশি মনে বাড়ি ফিরে এল। যাক এতদিনে নামটার একটা হেস্তনেস্ত হয়ে গেল।

সকালে ঘাটের পৈঠায় পা ঘষছিল খগেন মান্না। আর জাম্বো পুকুরঘাটের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁতন করছিল। নামের বৃত্তান্ত শুনে খগেন বলে, আহা, নাম জম্পেশ হলেই কী হয় রে? নামে মাঞ্জা না দিলে জেল্লা কি ফোটে?

জাম্বো একটু ফাঁপড়ে পড়ে বলে, ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা হয় জানি। নামের মাঞ্জা ব্যাপারটা কী একটু খোলসা করে বলো তো!

গিরিধারী পল্যেকে চিনিস তো? তারা মা অপেরার মায়ের কান্না পালায় কানা বৈরাগীর পার্ট করে যেমন কাণ্ডটা করল। এখন দশটা গাঁয়ে-শহরে-গঞ্জে লোকের মুখে শুধু গিরিধারীর নাম। তারপর ধর ভোলা মণ্ডল। হাল বলদ নিয়ে ক্ষেতের কাজে নাকাল হচ্ছিল। কেউ চিনত তাকে? সন্ধেবেলা ঢোল বাজিয়ে একটু গানবাজনা করত। একদিন সেই ঢোলের চাঁটি শুনে এক ভদ্রলোক গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন। আর ভোলাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন কলকাতায়। এখন ঢোলকদার হিসেবে সারা দেশে ভোলা মণ্ডলের নাম। এবার বুঝলি নামে মাঞ্জা দেওয়া কাকে বলে!

শুনে জাম্বো একটু ভাবনায় পড়ে গেল। তাই তো! কথাটা তো ভাববার মতোই কথা। শুধু জাম্বো হয়ে থাকলে তো পেখমছাড়া ময়ূর। তার আর দামটা কী?

গাঁয়ের মাতব্বর নবীন দাসের একটা সম্পত্তির মামলায় গতবার সাক্ষী দিয়েছিল জাম্বো। সেই থেকে নবীনের সঙ্গে তার একটু খাতির। তা নবীন সব শুনে টুনে বলল, বুঝেছি, তোর শুধু নাম হলেই চলছে না, সঙ্গে একটা ডাকও চাই। মানে তুই নামডাকওলা একজন হতে চাস তো!

হলে মন্দ হত না দাদা।

তা সে আর বেশি কথা কি? সজনেহাটি গাঁ তো বেশিদূর নয়। মেরেকেটে মাইল তিনেক হবে। সেখানকার মা শীতলা ক্লাব সামনের রোববার কদলী ভক্ষণ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেছে। পাঁচ টাকা এন্টি^্র ফি। যা গিয়ে নাম লিখিয়ে আয়। যদি জিততে পারিস তাহলে বেশ নামডাক হবে খন। পাঁচটা টাকার তো মামলা, আর তুই বেশ তাগড়াইও আছিস। দুগ্গা বলে লেগে যা।

জাম্বো ব্যাপার শুনে মোটেই খুশি হল না। গাঁয়ের নিমাই সাধু গতবারই কদলী ভক্ষণ জিতে একটা রুপোর মেডেল পেয়েছিল। কিন্তু নিমাইকে তো পোঁছেও না কেউ। সাইকেল সারাইয়ের দোকানে সে এখন লিক সারায়। মেডেলটা বেচতে নিয়ে গিয়েছিল, স্যাঁকরা বলেছে, ও মোটে রুপোই নয়, হোয়াইট মেটাল।

গাঁয়ের জ্ঞানী মানুষ হলেন পতিতপাবন ঘোষ। শোনা যায় বেদ-বেদান্ত গুলে খেয়েছেন। তিথিনক্ষত্র, খনার বচন, শুভঙ্করী সব ঠোঁটস্থ। লোকে বেশ মানে গোনে। তা তিনিও সকালবেলা বসে পঞ্জিকা দেখছিলেন, এমন সময় জাম্বো গিয়ে পেন্নাম ঠুকে সামনেই বসে পড়ল। সমস্যাটা শুনে বললেন, ডান হাতটা একটু চ্যাটালো করে পাত তো। কর রেখাটা একটু দেখি।

তা দেখলেন। মন দিয়েই দেখলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, নাম না হওয়ার তো কারণ দেখছি না।

জাম্বো উজ্জ্বল হয়ে বলে, তাহলে হবে বলছেন পণ্ডিতমশাই?

হবে বলিনি। বলেছি না হওয়ার তো কারণ দেখছি না। লেগে থাকলে

হতে পারে।

তাহলে একটু উপায় বাতলে দিন।

ওরে, নাম করার উপায়ের অভাব কী? লোকে খুন-খারাপি, চুরি-ডাকাতি করেও নাম কিনে ফেলছে। তুই ভালো করে ভেবে দ্যাখ তোর কোন দিকে ঝোঁক। যেদিকে হাতযশ আছে বুঝবি তাইতেই লেগে যাবি। পট করে নাম হয়ে যাবে।

কথাটা তেমন ভরসার কথা নয়। তবু জাম্বো মিনমিন করে বলে, ভাবনা চিন্তাটাই যে আমার আসতে চায় না পণ্ডিতমশাই। মাথাটা বড্ড নিরেট।

রোজ ব্রাহ্মী শাক খা। মাথায় ভাবনাচিন্তার এমন ভাসাভাসি হবে যে, ভেবে কূল পাবি না।

ব্রাহ্মী শাকও সোনা হেন মুখ করে খেতে লেগে পড়ল জাম্বো। কিন্তু তেমন সুবিধে কিছু হল বলে টের পেল না।

নরহরি গুঁই মেলা তুকতাক জানে, মড়ার খুলিতে করে রোজ চা খায়, মাটিতে দাগ কেটে অব্যর্থ বাণ মারতে পারে, মারণ উচাটন জানে, বশীকরণ তার কাছে জলভাত। জাম্বোর সমস্যার কথা নরহরিও খুব মন দিয়ে শুনল। তারপর মুখ খোলার আগে পঞ্চাশ টাকা চেয়ে বসল। বলে, ওরে, দক্ষিণা না দিলে যে আমার মুখ থেকে লাগসই কথা বেরোতেই চায় না।

জাম্বো হাতেপায়ে ধরে কুড়ি টাকায় রফা করল। নরহরি বলল, তোর সবই তো ভালো দেখছি, তবে রাহু ব্যাটা বক্রী হয়ে বসে আছে। সেটাকে ঢিট করতে হলে তো একটা যজ্ঞ না করলেই নয়। খরচাপাতি আছে কিন্তু।

তা জাম্বো ফের হাতেপায়ে ধরে কম খরচেই যজ্ঞ করাল। কিন্তু বাঁকা রাহু সটান হল কিনা তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।

তবে সে যে একটা নামডাকওলা লোক হতে চায় সেটা গাঁয়ে বেশ চাউর হয়ে গেল। সবাই ডেকে ডেকে জিগ্যেস করে, হ্যাঁ রে জাম্বো, তুই নাকি নামকরা লোক হতে চাস?

জাম্বো কাঁচুমাচু হয়ে বলে, তা ইচ্ছে তো যায় মশাই, কিন্তু তেমন সুবিধে হয়ে উঠছে না।

নানা লোক নানা পরামর্শ দেয়। তার কিছু কিছু করেও দেখেছে জাম্বো, কিন্তু তাতে তার নাম তেমন ফাটছে বলে মনে হচ্ছে না তো!

মনটা বড্ড খিঁচড়ে আছে জাম্বোর। তা সেদিন বিষয়কর্মে নসীবপুরে যেতে হয়েছিল জাম্বোর। ফকির শা-র পাইকারি দোকান থেকে মাল কিনতে হবে। ফকির শা-র দোকানে বেজায় ভিড় থাকে। তা সে ভিড়ের পিছন দিকটায় দাঁড়াতেই সামনের লোকটা বলে উঠল, আরে, তুমি সেই কুসুমপুরের নামডাকওলা জাম্বো না? তা কি খবর হে, নামডাক হল?

জাম্বো লোকটাকে চেনে না। তেতো মুখে বলল, কই আর হল মশাই!

আর একটা লোকও সামনে থেকে বলে উঠল, হ্যাঁ, আমারও কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছিল বটে! তাই তো, এ হল গে কুসুমপুরের নামডাকের জাম্বো। তা পিছনে কেন ভাই, সামনে এসো, জায়গা করে দিচ্ছি।

কপালটা ভালোই বলতে হবে। অত বড় কারবারী ফকির শা অবধি চিনতে পারল তাকে। দূর থেকেই বলল, ওরে, ওই দ্যাখ নামডাকওলা জাম্বো এসেছে, তোরা ওকে মালপত্র দিয়ে ছেড়ে দে তাড়াতাড়ি।

জাম্বো তাজ্জব।

এখানেই ব্যাপারটার ইতি হল না। মিঠিপুরের হাটে গেছে সেদিন পাটের গুছি কিনতে, সে ঢুকতেই হাটে একটা ঢেউ উঠে গেল। 'ওরে, ওই দ্যাখ নামডাকওলা জাম্বো এসেছে।' ব্যাপারীরা অবধি ভারি খাতির করে মালপত্র গস্ত করে দিল।

এখন যেখানেই যায় জাম্বো, লোকজন তাকায়, তাকে নিয়ে বলাবলি করে। হাসাহাসিও করে বটে। তা করুক, তবু নামটা তো ফেটেছে!

তার বাপ কালোহরি একদিন বলেই ফেলল, ওরে জাম্বো, বাপ আমার! নামডাকের জন্য হেঁদিয়ে মরছিলি, এখন দ্যাখ তোর কেমন নামডাক হয়েছে।

Cov56
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%