শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পাঁচুবাবুর মনটা মোটেই ভালো নেই। গতকালই জ্যোতিষী অয়খান্ত তাঁর কুষ্টি বিচার করে বলে দিয়েছে যে, রাহুর দশা চলছে, সময়টা খারাপই যাবে। পাঁচুবাবু যদিও জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করেন না, তবু গ্রহ বৈগুন্য ঠেকানোর জন্য দু-হাতে মোট আটখানা আটরকমের দামি পাথরের আংটি, দু-হাতে চারটে মাদুলি, গলায় ধুকধুকি পরে থাকেন। লোকে জিগ্যেস করলে অবশ্য বলেন, না হে বাপু, এসব বুজরুকিতে আমার মোটেই বিশ্বাস নেই। তবে কিনা আমার গিন্নির চাপাচাপিতেই এসব পরতে হয়েছে।
হরিবিষুপুর গঞ্জ জায়গা। আগে গাঁ-মতো ছিল, এখন দিব্যি রমরম করছে। আগে হপ্তায় দুবার হাট বসত, এখন রোজ দোবেলা পাকা বাজারে বিকিকিনি হয়। মাইলটাক দূর দিয়ে নতুন রেল লাইন হল, স্টেশনের নামও হরিবিষুপুর, গঞ্জের গা ঘেঁষে পাকা রাস্তা হয়েছে, তা দিয়ে গাঁকগাঁক করে আপ-ডাউন বাস যায়। শোনা যাচ্ছে, শিগগির অটো-ভ্যানও চালু হয়ে যাবে। কিন্তু হরিবিষুপুরের এই উন্নতিই একরকমের কাল হয়েছে পাঁচুববাবুর পক্ষে। কারণ আগে এখানে একটা মাত্র ওষুধের দোকান ছিল, আর সেটা পাঁচুবাবুর। একেবারে একচ্ছত্র ব্যাবসা। পাঁচুবাবুর মনোরমা মেডিক্যাল স্টোর্স ছাড়া মানুষের গতি ছিল না। কিন্তু যাঁহাতক হরিবিষুপুরের উন্নতি হতে লেগেছে অমনি ঝপাঝপ আরও তিনখানা ঝকঝকে দোকান দাঁত বের করে খুলে গেল। তার মধ্যে আবার সদানন্দ সেনের বিশাল গোবর্ধন ফার্মাসি। যেমন কেতাদুরস্ত দোকান, তেমনই নানা ধরনের ওষুধের স্টক। ঝপ করে মনোরমা মেডিক্যালের বিক্রি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে গেছে। দু-চারজন পুরোনো খদ্দের অভ্যাসবশে এখনও হানা দেয় বটে, কিন্তু ঠিকমতো ওষুধ না পেলে দুর ছাই করে চলে যায়। পাঁচুবাবুর অবস্থা তাই মোটেই সুবিধের নয়।
দোকানের আয়-ব্যয় নেই, তাই দুজন কর্মচারী হরিপদ আর ষষ্ঠীচরণ চাকরি ছেড়ে একজন গোবর্ধন ফার্মাসি আর অন্যজন কেয়ার অ্যান্ড কিওর-এ গিয়ে ঢুকে পড়েছে। পাঁচুবাবু তাই একাই সন্ধেবেলা মনোরমা মেডিক্যালে বসে মাছি তাড়ান। চেনাজানা লোকেরা আগে উঁকিঝুঁকি দিয়ে যেত, আজকাল আর কারও টিকির নাগাল নেই।
পাঁচুবাবু সন্ধে সাতটা নাগাদ পঞ্চম হাইটা তুলে এক ভাঁড় চায়ের অর্ডার দেবেন কি না ভাবছিলেন, এমন সময় ছোটখাটো রোগা নিরীহদর্শন একটা লোক দোকানে ঢুকল।
পাঁচুবাবু খুশি হয়ে বললেন, আসুন, আসুন।
লোকটা মিটমিট করে চারদিকটা দেখল। একটু যেন নাকও সিঁটকালো। যেন ঠিক পছন্দ হল না। তারপর বলল, এটাই তো মনোরমা মেডিক্যাল, তাই না?
যে আজ্ঞে, বহু পুরোনো কারবার মশাই। হরিবিষুপুরকে তো এতকাল এই মনোরমা মেডিক্যালই বাঁচিয়ে রেখেছিল। এখন সব নতুন নতুন দোকান খুলেছে বটে, কিন্তু পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে।
এ সব কথায় লোকটা তেমন ভিজল বলে মনে হল না, ভ্রূ কুঁচকে ভারি অপছন্দের চোখে ওষুধের তাকগুলো দেখতে দেখতে আপনমনেই বলল, নাঃ, কর্তা বড্ড বেহিসেবি দর দিয়ে ফেলেছেন দেখছি? এ তো পাতে দেওয়ার মতো নয়।
পাঁচুবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, আহা, কী চাই বলুন না। আমার দোকানে সবরকম জিনিস থাকে। কলেরা, টাইফয়েড, হার্টের ব্যামো, হাঁপানি সব কিছুর ওষুধ পাবেন। নেপালডাক্তার গত দশ বছর ধরে এখানেই বসতেন। ইদানীং শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, তাই।
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, না মশাই, কর্তা না বুঝেসুঝে একটা বেহিসেবি কাণ্ডই করে ফেলেছেন দেখছি! স্টকের যা ছিরি তাতে তো হাজারদশেক টাকারও মাল নেই বলে মনে হচ্ছে?
বলেন কী মশাই! দশ হাজার কী, কম পক্ষে পঞ্চাশ হাজারের মাল তো আছেই। কিন্তু আপনি তো আর দোকানসুদ্ধু জিনিস কিনবেন না?
নিরীহদর্শন লোকটা এবার চোখ পাকিয়ে বলে, যদি কিনি, তাহলে?
পাঁচুবাবু হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, সব ওষুধ কিনবেন?
তাই তো ইচ্ছে। তবে শুধু ওষুধই নয়, সঙ্গে দোকানটাও।
অ্যাঁ।
আজ্ঞে হাঁ। কাগজপত্র সব তৈরি করেই এনেছি। অগ্রিম দেড় লাখ টাকা নগদে দিয়ে যাচ্ছি, বাকি টাকা রেজিস্ট্রির পর। কর্তার বড্ডই লোকসান হয়ে গেল দেখছি। তা কী আর করা। এই অখদ্দে দোকানঘরের জন্য কেন যে তিন লাখ টাকা কবুল করে বসলেন কে জানে।
পাঁচুবাবুর ব্যাপারটা বুঝে উঠতে একটু সময় লাগল। তারপর তেড়ে উঠে বললেন, মানে! ইয়ার্কি পেয়েছ? আমি দোকান বিক্রি করব বলে বসে আছি নাকি? বেরোও, বেরোও...
নিরীহদর্শন লোকটা ভারি মোলায়েম গলায় বলল, তিন লাখ টাকা যে দর উঠেছে সেটা তো আপনার কপালজোর মশাই। কর্তা নিতান্তই ভালোমানুষ বলে। নইলে এ তো লাখ টাকাতেও কেউ ছুঁয়ে দেখবে না।
পাঁচুবাবুর মুখ লাল হয়ে উঠল। কান গরম, রক্তচাপ বেড়ে গেল। টেবিলে ঘুঁষি মেরে বললেন, আশা তো কম নয়! দোকান কিনবে! দূর হয়ে যাও এক্ষুনি! নইলে পুলিশ ডাকব।
পাঁচুবাবুর বিক্রম দেখেও লোকটা এতটুকু বিচলিত হল না। শুধু পিছন ফিরে দরজার দিকে মুখ করে কাকে যেন ডাকল, কই রে? ইদিকে আয় বাবা। অমনি দরজায় যমদূতের মতো বিকট এবং বিশাল চেহারার একটা লোক উদয় হল। চেহারাখানা যেমন দৈত্যের মতো, চোখেও তেমনি খুনিয়া চাউনি।
পাঁচুবাবু লোকটাকে বিলক্ষণ চেনেন। মদনপুরের কেষ্ট বাউরি। কেষ্টর নামে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়। পাঁচুবাবুর মুখখানা এমন হাঁ হয়ে গেল যে দু-হাতে চেপেচুপেও বন্ধ করা যাচ্ছিল না। গলাও কেঁপে গেছে। কোনওরকমে কাতরকণ্ঠে বললেন, এসব কী হচ্ছে?
ছোটখাটো লোকটা ভারি কুটিল চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, না বুঝবার মতো কথা কী কয়েছি মশাই? একেবারে সোজা সরল বাংলায় বলা, গরুও বোঝে। আপনার ভালোর জন্যই আমাদের কর্তাবাবু ভজহরি ঘোষ দোকানখানা ন্যায্যর চেয়ে অনেক বেশি দামেই খরিদ করতে চাইছেন। তাঁর আবার দয়ার শরীর। মশা মাছিরও কষ্ট সহ্য করতে পারেন না। আর সেইজন্যই পুরোনো অখদ্দে, অচল দোকানঘরখানা তিন লাখে কিনতে চাইছেন। বাজার ঘুরে দেখে আসুন তো আর কেউ এ দর দেবে?
পাঁচুবাবু ডুকরে উঠে বললেন, বলো কী হে বাপু? পরেশ জানা যে সাত লাখ টাকা দর দিয়েছে, তবু আমি ঘাড় কাত করিনি। আর ভজহরি গুণ্ডা লাগিয়ে মাত্র তিন লাখে কিনতে চায়! এ কোন দিশি জুলুম বাপু?
লোকটা ভারি অবাক হয়ে বলে, জুলুম! জুলুম কোথায় মশাই? এ তো আপনার কপাল খুলে গেল বলতে হয়। ওষুধের ব্যবসা আপনার দ্বারা হবে না। তিন লাখ দিয়ে ভূষি মালের কারবার খুলুন, দু-দিনে লাল হয়ে যাবেন। ঠিক আছে, আজ আপনি বড্ড ভেঙে পড়েছেন দেখতে পাচ্ছি, তিন দিন বাদে আবার আসব। তৈরি থাকবেন।
লোকটা কেষ্ট বাউড়িকে নিয়ে বিদেয় হওয়ার পর পাঁচুবাবু অনেকক্ষণ বজ্রাহতের মতো বসে রইলেন। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। এ তাঁর বাপ-ঠাকুরদার আমলের দোকান। একসময়ে এই দোকানের আয়েই তাদের সংসার চলত। শুধু চলত কেন, এই দোকানের আয়েই তাদের জমি বাড়ি আর বাবুগিরি সবই হয়েছে। যতই খারাপ চলুক এই দোকান বিক্রি করে দেওয়ার কথা তিনি ভাবতেই পারেন না। কিন্তু গতিক সুবিধের নয়। ভজহরি ঘোষের পাঁচ-সাতটা ব্যাবসা। সোনা-রূপো থেকে মিঠাই-মণ্ডা অবধি। অতি দুর্দান্ত লোক। তাকে ভয় খায় না এমন লোক আশেপাশের দশটা গাঁয়েও নেই।
পাঁচুবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে তাঁর জামা ভিজে যাচ্ছে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। হাতে-পায়ে যেন সাড় নেই। বোধহয় কাঁদতে কাঁদতে হত ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েই পড়েছিলেন।
হঠাৎ দেখতে পেলেন, উলটো দিকে একটা বুড়োমতো লোক তাঁকে জুলজুল করে দেখছে। এই গরমেও লোকটার গায়ে একটা গলাবন্ধ কোট, গলায় মাফলার, মাথায় বাঁদুড়ে টুপি। পাঁচুবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, ভ্যাবলার মতো কেঁদে ভাসালেই হবে? কিছু করতে হবে না?
পাঁচুবাবু শশব্যস্তে বললেন, কীসের কথা বলছেন?
দুর আহাম্মক, এই যে ভজহরি তোর দোকান কিনতে চাইছে তার জন্য কিছু করবি না? নাকি ভয় খেয়ে বেচে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবি!
না বেচলে যে গুণ্ডা লাগাবে বলছে।
কেষ্ট বাউড়ির বাঁ-দিকের পাঁজরে এই অ্যাত্তবড় একটা ফোড়া হয়েছে। কার্বাংকল। ঠিক তাক করে যদি ওখানটায় একখানা ঘুঁষো বসাতে পারিস তাহলেই হয়ে গেল। কেষ্ট বাউরি চোখে সর্ষেফুল দেখতে দেখতে দাঁত ছরকুটে ভিরমি খেয়ে পড়ে যাবে। আর বেঁটে শয়তানটা তো নেংটি ইঁদুর, পালানোর পথ পাবে না।
পারব কি?
না পারলে চলবে কী করে। এর পর যখন ওরা আসবে, প্রথমেই কেষ্ট বাউড়িকে তাক করে ঘুঁষোটা মেরে দিয়ে দেখ না কী হয়।
কিন্তু মশাই, তার পরেও তো অন্য লোক দোকান হাতিয়ে নিতে আসবে।
তা আসবে। দোকানের যা ছিরি করে রেখেছিস। লোকে ভাববে কারবার লাটে তুলে বসে আছিস। একটু ঝা চকচকে না করলে কি খদ্দের ধরা যায়?
সে তো বড় কথা হয়ে গেল। দোকানের ভোল পালটাতে যে মালকড়িও চাই মশাই।
তা বটে। ওই যে মাঝখানের ভারী আলমারিখানা দেখছিস, ওটার পিছনে একখানা খোপ আছে। নাগাল পাওয়া সহজ নয়। আলমারির মাথায় উঠে পিছন দিকে সাবধানে নামতে হবে। খুব সামান্য ফাঁক। কোনওরকমে যদি নামতে পারিস তাহলে খোপের গায়ের তালাটা খুলতে পারলেই তোর কাজ হয়ে যাবে।
বটে! কী আছে খোপে?
খুঁজে দেখিস।
কিন্তু খোপের চাবি পাব কোথায়?
তোর চাবির থোকায় অনেক চাবির মধ্যে একটা পুরোনো চাবি পেয়ে যাবি। খাঁজগুলো ইংরিজি ই অক্ষরের মতো। সেইটেই।
আপনি কে?
কে বলে মনে হচ্ছে?
ঠিক বুঝতে পারছি না যে!
বুঝে কাজ কী তোর। যা বলছি শোন।
বুড়ো মানুষটা হঠাৎ উঠে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গায়েব হয়ে গেল।
প্রথমটায় পাঁচুবাবুর মনে হল স্বপ্নই দেখেছেন। পরে অনেক ভেবে মনে হল, তেমনটা নাও হতে পারে।
যাই হোক, তিনদিন বাদে যখন সত্যিই এক সন্ধেবেলা বেঁটে লোকটা আর কেষ্ট বাউড়ি এল সেদিনটার কথা ভুলতে পারবে না পাঁচুবাবু। উঠে গিয়ে সটান কেষ্ট বাউড়ির বাঁ-পাজরে একখানা মোক্ষম ঘুঁষি মেরে বসলেন। আর যাবে কোথায়, কেষ্ট তো অজ্ঞান হলই না, উলটে পাঁচবাবুকে সে কী উস্তম কুস্তম মার। সেই মার খেয়ে পাঁচুবাবুই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। তিনদিন হাসপাতালে পড়ে থাকতে হল। সেই ফিচেল বুড়োকে শাপশাপান্তর করতে করতে বাড়ি ফিরে একদিন কিন্তু সেই আলমারির পিছনেও নামলেন। যথারীতি সেখানে কোনও খোপের সন্ধানও পাওয়া গেল না।
তবে ঝুল আর মাকড়সার জালে আটকে থাকা একখানা বহু পুরোনো চিঠির খাম পেয়ে গেলেন। রাগে ফুঁসতে ফুসতে তিনি ফাজিল ও মিথ্যেবাদী বুড়োকে আরও বিস্তর শাপশাপান্ত করতে লাগলেন।
কিন্তু একটা ভারি আশ্চর্য কাণ্ড ঘটল। গাঁয়ের লোকেরা এসে তাঁর খুব প্রশংসা করতে লাগল। কেষ্ট বাউড়িকে যে তিনি অন্তত একটা ঘুঁষোও দিয়েছেন সেটাও নাকি কম কথা নয়। যারা প্রশংসা করে গেল তারা আবার কেউ কেউ আমাশা বা জ্বরের ওষুধও নিয়ে গেল নগদ দাম দিয়ে এবং রোজই বিক্রিবাটা হতে লাগল কিছু কিছু করে। আগের মতো ততটা খারাপ অবস্থা নয়। আরও আশ্চর্য কাণ্ড হল, একদিন বাবুমতো একটা লোক গাড়ি করে এসে একটা মলম কেনার সময় তাঁর টেবিলে পুরোনো খামটা দেখে ভারি অবাক হয়ে বললেন, এই খাম আপনি কোথায় পেলেন?
পাঁচুবাবু বললেন, আমার কাছেই ছিল। কেন বলুন তো?
ওই ডাকটিকিটের যে অনেক দাম। রেয়ার জিনিস। আমাকে দেবেন।
তা নিন না।
কত দিতে হবে?
দুর মশাই, পুরোনো ডাক টিকিটের জন্য পয়সা কীসের? এমনিই নিয়ে যান।
লোকটা অবাক হল, তবে খামটা নিয়েও গেল।
ক'দিন পরেই পাঁচুবাবু একটা চিঠি পেলেন। হাতিমতাই কোম্পানিতে দশ লক্ষ টাকার ওষুধ সাপ্লাইয়ের বরাত তাঁকে দেওয়া হয়েছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন