শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ভারু ভারী ভালো মানুষ, সাতপুরার হাটে সে সব্জী বিক্রি করে কোনও রকমে সংসার চালায়। তার জোত জমি বেশি নেই, মাত্র বিঘে তিনেক জমি। সে নিজেই লাঙল দেয়। জমিটুকুতে সব্জী ফলায়, তবে সে কেমিক্যাল সার বা পোকা মারার ওষুধ ব্যবহার করে না। সামান্য গোবর বা পচাই সার তার সম্বল। কেমিক্যাল সার দিলে সব্জীর স্বাদ ভালো হয় না। আর পোকা মারার ওষুধ দিলে যারা কিনবে তাদের অসুখ বিসুখ বা বিষক্রিয়া হওয়ার ভয় থাকে। ভারু ধর্মভীরু মানুষ, সে ওসব পন্থা নেয় না, ফলে তার মূলো বেগুন পালং কপি বা ধনেপাতা কোনওটাই তেমন ফসফস করে বেড়ে ওঠে না। পোকাও লাগে, ফলে তার সব্জীর চেহারা ভালো নয়। কেমন যেন খেঁয়ুরে মরকুটে, ফয়লাটে চেহারা, তা সেসবই নিজের পুরোনো ভ্যানগাড়িটায় চাপিয়ে সে সাতপুরার হাটে বেচতে আসে। বলতে নেই, তার খদ্দেরও তেমন হয় না। দু-চারটে গরিব খদ্দের কম পয়সায় কিছু কিনে নিয়ে যায় বটে, কিন্তু বেশির ভাগ সব্জীই পড়ে থাকে, অনেকেই বলে, ওহে ভারু, আদ্দিকালের ধারণা নিয়ে বসে থাকলে তো কিছু হবে না, ভালো সার, ভালো পোকার ওষুধ দিয়ে দেখ সব্জীর যেমন ফলন হবে, বাজারে পড়তে পারবে না, কিন্তু ভারু তাতে রাজি নয়।
গত তিন চার সপ্তাহ মোটেই বিক্রিবাটা ভালো হয়নি। গেল হপ্তায় তো সাকুল্যে বিক্রি হয়েছিল বাইশ টাকার সব্জী, এরকম ধারা চললে ভারুকে এরপর বউ বাচ্চা নিয়ে উপোস করতে হবে।
আজও ভারু সকাল সকালই এসে তার সব্জীর পসরা সাজিয়ে বসেছে। চারদিকে মেলা দোকানপাট, বিক্রিও হচ্ছে রমরম করে, শুধু তার কাছেই খদ্দেরের আনাগোনা নেই, তবে শীতের মিঠে রোদে বসে থাকতে ভারুর কিন্তু খারাপ লাগছে না। হাটের দৃশ্য দেখতেও ভারী ভালো।
একজন দাড়িওয়ালা মাঝবয়সী লোক দুটো বড় বড় থলি হাতে সব্জীর দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াচ্ছে আরও অনেকের মতো, লোকটা বেশ ঢ্যাঙা, চেহারাটা রোগা আর চোঁয়াড়ে মতো, মনে হয় রাগী লোক, পোশাকটাও একটু কেমন যেন আউল বাউলদের মতো জোব্বা পরা, দেখে মনে হয় গাঁইয়া লোক নয়।
ভারু দেখলে লোকটার কারও সব্জীই পছন্দ হচ্ছে না, মহেশতলার গণেশ অ্যাই বড় বড় দুধ সাদা ফুলকপি নিয়ে বসেছে, সঙ্গে এক হাত লম্বা রাঙা পুরুষ্টু মূলো, লসলসে পালং, সবুজ ফুটবলের মতো বাঁধা কপি। লোকটা সবই হাতে নিয়ে একটু দেখল তারপর মাথা নেড়ে রেখে দিল, অন্যরা থাবাথাবি করে কিনছে, কিন্তু লোকটার ভালো লাগল না।
পায়ে পায়ে লোকটা তার সামনে এসে দাঁড়াতেই সরু একটু জড়োসড়ো হয়ে গেল। গনেশের সব্জীই যখন পছন্দ হয়নি তখন তার তো কোনও আশাই নেই। লোকটা তার একখানা খেঁকুড়ে কপি তুলে ভ্রু কুঁচকে খুব ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, তারপর পকেট থেকে একখানা ছোট দেশলাই বাক্সর মতো যন্ত্র বের করে কপিটার গায়ে লাগিয়ে কী যেন পরীক্ষা করল, তারপর বেশ ভারিক্কী গলায় বলল, কত দাম হে?
ভারু দাম কখনও বেশি নেয় না। সে লোভী লোক নয়, সে বিনয়ের সঙ্গে বলল, আজ্ঞে তিন টাকা।
লোকটা তার মুলো পালং বাঁধা কপি লঙ্কা সবই একে একে দেখল, তারপর বলল, তোমার সব সব্জীই আমি কিনে নিচ্ছি, হিসেব করে দাম বলো।
অ্যাঁ! বলে ভারু হাঁ করে রইল, বলে কী লোকটা? মাথা খারাপ নয় তো! যাই হোক সে তাড়াতাড়ি হিসেব করে বলল, আজ্ঞে দেড়শো টাকা, সব নিচ্ছেন বলে পাইকারী করে দিচ্ছি।
লোকটা দরাদরি না করে দাম দিয়ে বলল, একটু কষ্ট করে আমার গাড়িতে তুলে দাও, আর পঞ্চাশ টাকা দিচ্ছি।
ভারু জিব কেটে বলে, ছিঃ ছিঃ মাল গাড়িতে তুলে দেব তাতে পয়সা কীসের? ও লাগবে না।
লোকটা গম্ভীর মুখে বলল, তা হয় না, পরিশ্রম করবে আর পারিশ্রমিক নেবে না কেন? এই নাও পঞ্চাশ টাকা।
ভারী লাজুক মুখে ভারু নিল, সব্জী সব বস্তায় ভরে হাটের গা ঘেঁষে দাঁড় করানো একটা ভ্যানগাড়ির মতো গাড়ির পাটাতনে তুলে দিল। দেখল, গাড়িটা আর পাঁচটা ভ্যানগাড়ির মতো নয়। নীচে চাকা দেখা যাচ্ছে না, পুরোটাই ঢাকা, তারপর একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল, বাবুটি গাড়ির সামনে একটা গদিওয়ালা সিটে উঠে বসে একটা হাতলে চাপ দিতেই ভুস করে একটা শব্দ হল আর গাড়িটা হঠাৎ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
হাঁ করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ভারু। ভুতুড়ে কাণ্ড নাকি রে বাবা! তবে ভারু চেঁচামেচি করল না, মেলা টাকা এসেছে হাতে। সে তাই হাট থেকে দরকারি জিনিসপত্র কিনে আজ বেলাবেলি বাড়ি ফিরে গেল।
পরের হাটবারে ভারু একটু বেশি জিনিসপত্র নিয়েই হাটে এল, একটু ভয়ে ভয়েই এল। বাবুটি ভূত না মানুষ তা সে বুঝতে পারছে না, তাই একটু ভয় ভাবনাও হচ্ছে।
দোকান সাজিয়ে বসবার কিছুক্ষণ পরেই সেই বাবুটি এসে হাজির, আবার সেই যন্ত্র দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা, দর জিগ্যেস করা।
ভারু এক ফাঁকে জিগ্যেস করল, বাবু যদি অভয় দেয় তো একটা কথা জিগ্যেস করব।
কী কথা?
আজ্ঞে আপনি আগের দিন ওরকম বাতাসে মিলিয়ে গেলেন কেমন করে? আমার খুব ভয় করেছে।
বাবুটি মৃদু হেসে বলল, ভয় নেই, আমার গাড়িটা বাতাসে মিলিয়ে যায় না, আসলে ওটা অন্য একটা সময়ে চলে যায়।
আজ্ঞে, কথাটা ঠিক মাথায় সেঁধোলো না।
না বুঝলেও ভয় পেও না, ভূতুড়ে ব্যাপার নয় হে।
আর একটা কথা বাবু, আপনি আমার অপুরুষ্টু সব্জী সব কিনে নেন, আর কেউ তো নেয় না।
তোমার সব্জীর ফলন তেমন ভালো নয় বটে, তবে সব্জীগুলোয় কোনও বিষাক্ত জিনিস নেই, আর স্বাদও ভালো।
সব্জীর দাম দাঁড়াল আড়াইশো টাকা। সেই সঙ্গে ফের পঞ্চাশ টাকা মজুরি।
না। কপালটা বোধ হয় ফিরছে ভারুর।
সপ্তাহে দুটো হাটবার, রবি আর বৃহস্পতিবার, ভারুর সব্জীর খেতের প্রায় সব সব্জীই মোট পাঁচটা হাটবারে বিক্রি হয়ে গেল।
পরের হাটবারে লোকটা যখন ফের এসে ভারুর সব সব্জী কিনে নিল তখন ভারু বলল, বাবু আমার বাগানে আর যা সব্জী আছে তাতে তার চারটে হাটবার চলবে, তারপর শেষ হয়ে যাবে।
লোকটা একটু হেসে বলল, ভেবো না, তোমাকে একটা গাছের চারা দিয়ে যাচ্ছি। এ গাছটা তোমার চেনা গাছ নয়, বাগানের এক কোণে পুঁতে দিও। দেখবে ফলন কম হবে না।
বলেন কী বাবু? এটা কি যাদু গাছ নাকি?
না হে। অনেক মাথা খাটিয়ে এটা আবিষ্কার করতে হয়েছে, এতে পোকামাকড়ও দূরে থাকবে, মাটিও উর্ব্বর হবে।
তা আপনি কোথায় থাকেন বাবু? কোন গাঁ?
কাছাকাছিই থাকি, তবে অন্য সময়ে। ও তুমি ঠিক বুঝবে না।
ভারু বুঝল না ঠিকই, তবে গাছটা জমির এক কোণে পুঁতে দেওয়ার তিন দিনের মধ্যে সে গাছের মহিমা বুঝতে লাগল। সে এক অলৌকিক কাণ্ড, প্রতি সকালে উঠেই সে দেখতে পায় তার তিন বিঘা জমি ফসলে একেবারে টই টম্বুর হয়ে আছে। সব্জীতে সব্জীতে ছয়লাপ। আর সব্জীর সেই খেঁকুড়ে চেহারাও নেই, ফুলকপির আকার বেড়েছে, বাঁধাকপি, বেগুন, মূলো, পালং সবই যেন একেবারে রসে ভরপুর।
পরের হাটবারে সে বাবুটিকে জিগ্যেস করল, তা বাবু, গাছটার যখন এতই মহিমা তাহলে আপনি আপনার বাগানে লাগান না কেন? তাহলে তো আর আপনাকে সব্জী কিনতে হয় না।
বাবুটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সে উপায় নেই হে। আমি দুশো বছর পরের পৃথিবীতে থাকি, তখন মাটি মরে গেছে। এই যারা এখন কেমিক্যাল সার দিয়ে চাষ বাস করে তাদের বোকামিতে মাটির উর্ব্বরাশক্তি শেষ হয়ে ফলন আর হয় না। ওই মাটিতে এখন আবার প্রাণ সঞ্চার করতে চাষবাস বন্ধ রেখে নানারকম চিকিৎসা করতে হচ্ছে।
বড় বড় চোখ করে শুনছিল ভারু, তাহলে সে তো ভালো কাজই করছে, মাটিতে কেমিক্যাল সার দেয়নি।
বাবু, ওই গাছের চারা অন্য কাদেরও দেন না কেন?
লোকটা ম্লান হেসে বলল, তুমি ভালো লোক বলেই কথাটা বললে, তবে কি জানো, ওদের কেমিক্যাল দেওয়া মাটিতে এ গাছ কোনও ক্রিয়া করতে পারে না। গাছ মরে যাবে। অন্তত পাঁচ সাত বছর মাটিকে বিশ্রাম দিয়ে তবে ওই গাছ লাগালে কাজ হবে। কিন্তু ততদিন ধৈর্য ধরবে এমন মানুষ কই?
ভারু বলল, তা বটে।
ভদ্রলোক তেমনি তার গাড়িতে উঠে গায়েব হয়ে গেলেন।
তবে ভারুর আর দুঃখ নেই, তার তিন বিঘা জমি থেকে এখন যা আয় হচ্ছে তাতে তার সব দুঃখ ঘুচে গেছে। সব্জী নিয়ে আর বাজার অবধি যেতে হয় না। দুশো বছর পরেকার ভদ্রলোক এখন তার বাড়ি থেকেই সব সব্জী নিয়ে যায়। দরও বাড়িয়ে দিয়েছে তিন গুণ।
দুঃখ শুধু একটাই, তার মতো আর সবাই তেমন সুখে নেই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন