শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

চকবেড়ের গোহাটা থেকে একটা দুধেল গাই কিনে বাড়ি ফিরছিল নগেন। তা বাড়িও তো হেথা নয়। সে হিমির জলা পেরিয়ে, নয়া গোবিন্দপুর ছাড়িয়ে মনসাতলা। তারপর ক্রোশ খানেক গেলে জামতলার শ্মশানঘাট। সেখানে ছোট নদী ডুমডুমি পেরিয়ে আরও দুপোয়া রাস্তা। বাড়ি ফিরতে মাঝরাত। তা কি আর করা! বরাতে যা আছে হবে।
বরাতটা তার কোনোদিনই ভালো নয়। আজ গরু কিনে মনটা ভারী ভালো হয়ে গিয়েছিল কিনা। বেশ সস্তাতেই পেয়ে গিয়েছিল গরুটা, তাই মনের আনন্দে কিছু বাজারহাটও করে ফেলল। গগন ময়রার দোকানে বসে পো টাক বোঁদে আর দই আর আধ কেজি মুড়ি সাঁটাল। সেখানে আবার জুটে গেল শীতলকুচির জীবন মণ্ডল। বন্ধুমানুষ। পাঁচটা কথা উঠে পড়ল। কথায় কথায় বেলা গেল গড়িয়ে। যখন রওনা দিল তখন সুয্যিঠাকুর পাটে বসে গেছেন।
তবে আজ মনে ফুর্তিই আছে। কারণ গরুটা বড় জব্বর কেনা গেছে। তেমন বয়স নয়, তেল চুকচুকে চেহারা, তার ওপর স্বভাবটাও বড্ড ঠান্ডা। এমন গরু হকে নকে পাওয়া শক্ত। একা একা এতটা পথ ফিরতে হবে বটে, তবে মনে ফুর্তি থাকায় তেমন দুশ্চিন্তা হচ্ছে না। আর একাই বা ভাবছে কেন নিজেকে! সঙ্গে স্বয়ং মা ভগবতীই তো রয়েছেন। গরু তো আর হ্যাতান্যাতা জীব নয়। জীবন মণ্ডলও বলছিল বটে, এ বড় সুলক্ষণ গরু। খুব দাঁও মেরেছো বটে হে।
নিজের কপালটা নিয়েই যত দুশ্চিন্তা নগেনের। কপালটা তার কোনোদিনই ভালো নয়। কাজকর্ম বড্ড ফস্কে যায় তার হাত থেকে। গেলবার হরেন কীর্তনীয়ার সরেস জমিটা বায়নার দিনই হাতছাড়া হয়ে গেল, পঁচিশ হাজার টাকা বেশি হেঁকে দখল নিল নিমাই নস্কর। এইরকমই সব হয় তার বরাতে।
ফেরার সময়ে তিনজন জুটেছিল সঙ্গে। শীতলপুরে তায়েব মিয়া খসে গেল, পীরগঞ্জে বিদেয় হল নটবর, হলার হাটে পরেশ গাঁইয়ের শ্বশুরবাড়ি। তাই সেও সরে পড়ল। নগেন তারপর নির্যস একা। না, ঠিক একা নয় বটে, সঙ্গে মা ভগবতী রয়েছেন অবশ্য।
বলতে নেই, এই গো-জননীটি বড্ড ভালো হয়েছে। চোখ দু'খানা যেন মায়ায় ভরা। এ গরুর চোখ যেন কথা কয়। বাড়ির সবাই হাঁ করে বসে আছে, সে ফিরলেই গরুকে বরণ-টরণ করা হবে। সে বেশ জম্পেশ ব্যাপার। ছোটরাও আজ কেউ ঘুমের চৌকাঠ ডিঙোবে না। আগের গরুটার নাম সে আদর করে রেখেছিল মালতী। তা মালতীরও বয়স হল, আজকাল দুধ দেয় না, রিটায়ার নিয়ে বসে-বসে জাবর কাটে। অনেকে চামড়ার লোভে বুড়ো গরু কিনতে আসে। নগেন রাজি হয়নি। মালতী কি ফ্যালনা নাকি? মা মাসির মতোই একজন। এখন এই নতুন গরুরও নাম রাখা হবে। সেই নাম নিয়েও বিস্তর বাক বিতন্ডা চলছে বাড়িতে। নগেন অবিশ্যি নাম একটা ভেবেই রেখেছে, এখন সেই নাম অন্যদের পছন্দ হলে হয়। নামটা হল দুগ্গা।
সবে বোশেখ গেল, এখন দুপুরটা বেগুনপোড়া গরম। সন্ধের পরও তেমন ঠান্ডা হচ্ছে না। তবে একটু বাতাস ছেড়েছে বলে অস্বস্তি কিছু কম। সামনেই বাঁ ধারে হিমির জলা। বড় বড় ঘাসের জঙ্গলের নীচে চোরা জলের বিশাল এলাকা। না জেনে ঢুকে পড়লে খুব বিপদ। কোমর অবধি কাদায় গেঁথে যাবে। দুগ্গাকে একটু জল খাওয়ানোর ইচ্ছে ছিল, মুখের কাছে জল থাকলেও খাওয়ানোর উপায় নেই। হিমির জলায় তলিয়ে গেলে উদ্ধারের আশা ত্যাগ করতে হবে।
হঠাৎ হাতের দড়িতে একটা হ্যাচকা টান পড়ল। ঠান্ডা স্বভাবের গরুটার হল কি?
গরুটার বোধহয় বেজায় তেষ্টা পেয়েছে। জলের গন্ধ পেয়ে ভারি হন্যে হয়ে পড়ে জব্বর টান টানছে। এত জোর গরুটার তা এতক্ষণ বোঝাই যায়নি তো! নগেন টান সামলাতেই পারল না। তার দুগ্গা তাকে হিড়হিড় করে টেনে জলার দিকে নিয়ে চলল। শত চেষ্টাতেও সামাল দিতে পারল না নগেন। বড় বড় ঘাসজঙ্গলের ভিতরে ঢুকে জলার এঁটেল কাদায় হুড়ুম করে নেমে পড়ল গরুটা। সঙ্গে নগেন। চেঁচিয়ে লাভ নেই, কেউ শুনতে পাবে না। তবু নগেন চেঁচাল। কিন্তু বৃথা। প্রথমে হাঁটু অবধি, তারপর কোমর পর্যন্ত কাদায় গেঁথে গেল সে আর তার সাধের গাই।
দুগ্গার অবশ্য ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রথমে চোঁ চোঁ করে বেশ খানিকটা জল খেল, তারপর মহানন্দে জলার ঘাস মস মস করে খেতে লাগল। নগেন তাকে টানাটানি করল বটে, কিন্তু জলে কাদায় সে নিজেই এমন বেকায়দায় পড়েছে যে, সুবিধে করতে পারল না। বেশি হুড়যুদ্ধু করলে কাদায় আরও তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
তাই নগেন প্রাণপণে ঠাকুর দেবতাদের ডাকতে লাগল। উদ্ধারের কোনও আশা দেখতে পেল না সে। অন্ধকার, মশা ভনভন করছে, পায়ে জোঁক লেগেছে, দুর্দশার একশেষ। গরুটা যে এত বেয়াদব, তা কে বুঝতে পেরেছিল! এমন অবাধ্য গরু নিয়ে তার যে বড় বিপদ হল! বোকার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরা ছাড়া আর কোনও উপায় আছে বলে মনে হচ্ছে না তার।
কতক্ষণ কাটল কে জানে! তবে এত বিপদের মধ্যেও তার একটু চটকামতো লেগে গিয়েছিল। হঠাৎ সম্বিত ফিরল দড়ির টানেই। গরু ঠাকরুণের খিদে তেষ্টা মিটেছে বোধহয়, তাই এবার গা তুলতে চাইছেন। কিন্তু চাইলেই তো হবে না।
এ পর্যন্ত এই জলায় গেঁথে গিয়ে গরু, ছাগল, মানুষ বড় কম মরেনি। তাই দুগ্গার টানাটানিতে যে কোনও কাজ হবে না সেটাই বিশ্বাস ছিল তার। কিন্তু দুনিয়ায় কত আজগুবিই যে ঘটে! দুগ্গা গরু না হাতি তাও ঠাহর পেল না সে। হঠাৎ হড়হড় করে টেনে এক ঝটকায় জলকাদা ভেঙে ডাঙায় উঠে পড়ল দুগ্গা, সঙ্গে ফাউ হিসেবে নগেনও। প্রত্যয় হতে চাইছিল না নগেনের। এই জলা থেকে যে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব এটা কেউ বিশ্বাস করে না। গরুর পিছু পিছু ফের হাঁটা ধরে নগেন হাঁ হয়ে ভাবতে লাগল। কিন্তু ভেবে লাভ হল না।
নয়া গোবিন্দপুর জায়গা ভালো। এখানে একটু জিরেন নেওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। চকবেড়েতে যা খেয়েছিল, তা এতক্ষণে হজম হয়ে বেশ খিদে হচ্ছে। কিন্তু তার মেজাজী গরু দুগ্গার মতিগতি মোটেই সুবিধের ঠেকছে না তার। লোকনাথের মিঠাইয়ের দোকানে বসে খানকতক জিবেগজা আর মতিচুর সাঁটিয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে ফের হাঁটা ধরার ইচ্ছে ছিল তার।
কিন্তু তার এই গোঁয়ার গরুর কারবারই আলাদা। তাকে মোটে দাঁড়াতেই দিল না, লোকনাথের দোকানের কাছাকাছি হতেই যেন রোখ চাপল তার। এমন পড়ি কি মরি করে ছুট লাগাল যে, নগেন প্রায় ছেঁচড়ে যাওয়ার জোগাড়। কোনওরকমে টাল সামলে গরুর দড়িটা শক্ত করে ধরে নিজেকে বাঁচাল বটে সে, কিন্তু বেয়াক্কেলে গরুটার মতিগতি ভালো বুঝছিল না নগেন।
ওরে বাপু, তোকে তো আর বাঘে তাড়া করেনি যে অমন গুল্লির
মতো ছুটছিস! নয়া গোবিন্দপুরের রথতলার বট গাছটার কাছাকাছি
এসে মা দুগ্গা একটু হাঁপ ছাড়লেন। বটতলায় বাঁধানো চাতালে কয়েকজন বসে ছিল। তাদের মধ্যে কেনারাম। সে হেঁকে বলল, কে হে, নগেন নাকি?
নগেনই বটি হে।
কোথা থেকে আগমন হচ্ছে?
সেই চকবেড়ের গোহাটা থেকে।
বলি গরু কিনলে নাকি?
তা কিনলুম।
সঙ্গে তো তাহলে টাকা পয়সা আছে?
সামান্য।
লোকনাথের দোকানের সামনে দিয়ে এলে নাকি?
তা এলুম। কেন বলো তো?
আর বোলো না! এই একটু আগে কয়েকটা গুন্ডা বন্দুক-পিস্তল নিয়ে লোকনাথের দোকানে চড়াও হয়েছে। তারা লোকনাথের দোকান লুট করার পরেও সেখানে ঘাপটি মেরে বসে আছে। না জেনে যেই কেউ দোকানে ঢুকছে, অমনি তাকে মেরে ধরে সব কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের বড় বিপদ যাচ্ছে ভাই। ভয়ে আমরা ওদিকে ঘেঁষতেই পারছি না। তা তুমি জোর বেঁচে গেছ হে!
বৃত্তান্ত শুনে নগেন হাঁ হয়ে গেল। এ কি কাণ্ড রে বাবা! আর একটু হলে তারও তো খবর হয়ে যেত ! গরুটা তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে না এলে ট্যাকের বিশ হাজার টাকা হাওয়া হয়ে যাওয়ার কথা এতক্ষণে।
রাত হয়ে যাচ্ছে, আর দেরি করা ঠিক হবে না। সুতরাং নগেন আর দাঁড়াল না। বলল, ভাই কেনারাম, তাহলে আমি রওনা হয়ে পড়ি। তোমরা বরং পুলিশে খবর দাও।
সে কি আর দিতে বাকি রেখেছি নাকি? তবে গাঁয়ের পুলিশ তো! তার ওপর থানা দশ মাইল দূর। বুঝতেই পারছ অবস্থা।
নগেন তেমন বীর নয়, তার সাহায্যও কেউ চায়নি। সুতরাং তার এই ঝঞ্ঝাটে জড়ানোর দরকার নেই। আর জড়িয়েই বা সে করবে কি? ডাকাত তাড়ানোর এলেম তো তার থাকার কথা নয়। গরুর দড়ি ধরে একটা টান দিয়ে সে আদুরে গলায় বলল, চল রে মা দুগ্গা, আমরা বাড়ি যাই।
কিন্তু তার ত্যাদড় গরুর মর্জি বুঝে ওঠাই মুস্কিল। কী হল কে জানে, গরু ঠাকরুণ চার পা ছড়িয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, নড়ার নামটিও নেই। নগেন তাড়া দিয়ে বলল, ওরে চল, চল, রাত হয়ে যাচ্ছে যে!
কিন্তু কে শোনে কার কথা! গরু মোটে পাত্তাই দিল না তাকে। ছোট ছোট শিংওলা মাথা ঘন ঘন নাড়া দিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। গরু নিয়ে ভারি বিপদেই পড়া গেল তো!
ঠিক এই সময়ে হঠাৎ শোনা গেল 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে চেঁচাতে চেঁচাতে জনা চারেক লোক এদিকপানেই ধেয়ে আসছে। তাদের পিছনে জনা পাঁচেক বন্দুকধারী মুশকো চেহারার লোক। কেনারাম আর তার স্যাঙাৎরা লাফিয়ে উঠে 'ওরে বাপ রে!' বলে দৌড় লাগাল। হতভম্ব নগেনও ছুট লাগানোর চেষ্টা করল বটে, কিন্তু তার বজ্জাত গরু নড়লে তো!
নগেন অবাক হয়ে দেখল, লোকনাথ আর তার দোকানের তিনজন কর্মচারি প্রাণভয়ে ছুটছে, পিছনে তাড়া করে আসছে ডাকাতরা। অবস্থাগতিক দেখে সে বুঝতে পারল আজ লোকনাথের রক্ষে নেই। খুনে ডাকাতরা তাদের নাগাল ধরে ফেলল বলে! নগেন টুক করে তার গরুর আড়ালে বসে পড়ে গা-ঢাকা দিল। আগে প্রাণটা তো বাঁচুক!
কিন্তু কার ভরসায় গা-ঢাকা দেওয়া! তার নেমকহারাম গরু কোথায় তাকে আড়াল করবে, তা না, বরং সে হঠাৎ তার ছোট ছোট শিং নাড়া দিতে দিতে নগেনকে উদোম ফেলে রেখে হরিণের মতো ধেয়ে গিয়ে ডাকাতগুলোর ওপর চড়াও হল। ওরে বাপু, তুই কি বাঘ না সিংহি যে, গুন্ডাগুলোর সঙ্গে লড়াই দিবি! নগেনের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে হল। তার বিশ হাজার টাকায় সদ্য কেনা গরুটা আজই বেঘোরে মরবে।
কিন্তু দুনিয়ায় কত কিই যে হয়! চোখে দেখলেও প্রত্যয় হতে চায় না। যেমন সে হাঁ করে দেখল, তার ছোটখাটো নিরীহ গরুটি এক-একটি গুঁতোয় একেকজন ডাকাতকে মাটিতে ধরাশায়ী করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তার ওপর চাঁট মেরেও জখম করে ছাড়ছে। এ কী কাণ্ড রে বাবা! লড়াই বেশিক্ষণ চললও না। কয়েক পলকেই যেন শেষ হয়ে গেল। ডাকাতরা কুমড়োর মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে, আর 'বাবা রে, মা রে' বলে চেঁচাচ্ছে, এই দৃশ্য দেখে লোকজন ফিরে আসতে লাগল।
ডাকাতদের দুরবস্থা দেখে সবাই বুরবক। এমন কাণ্ড তারা জন্মেও দেখেনি বা শোনেওনি। একটা নিরীহ চেহারার গরু যে পাঁচ-পাঁচটা আলিশান চেহারার ডাকাতকে এমন হেনস্থা করতে পারে তা কে বিশ্বাস করবে!
কেনারাম কাঁদো কাঁদো হয়ে জিগ্যেস করল, ভাই নগেন, এ গরু কোথা থেকে কিনলে? এ যে সাক্ষাৎ কল্কি অবতার!
নগেনও বুঝতে পারছে ব্যাপারটা বড় এলেবেলে জিনিস নয়। সে আমতা আমতা করে বলল, তাই তো দেখছি!
গাঁয়ের এক মুরুব্বি পাঁচকড়ি হাইত বলে বসল, ওহে বাপু, গরু এ গাঁয়েই রেখে যাও। এ বাবদ এক লাখ টাকা নগদ দিচ্ছি।
নগেন প্রমাদ গুনল। হাত জোড় করে বলল, ওটি পারব না মশাই, মাপ করবেন। এ আমার পয়া গরু।
গাঁয়ের মহাজন হরিহর গুণ হেঁকে বলল, আহা, তোমাকে বাপু না হয় দু-লাখই দেব। এ গরু আমার চাইই।
নগেন পালাতে পারলে বাঁচে। বলল, পয়সায় কি আর সব কিছু কেনা যায় মশাই? আমার রাত হয়ে যাচ্ছে।
লোকে অবশ্য সহজে ছাড়ল না। দরও বাড়তে লাগল। শেষে পাঁচ লাখ পর্যন্ত ঠেলে উঠে গেল গরুর দাম। নগেন অবশ্য তাতেও টলল না। তবে বাড়ির মুখো রওনা হতে আরও একটু দেরি হয়ে গেল, এই যা।
মনসাতলা অবধি দিব্যি ভালোয় ভালোয় চলে এল নগেন। গরুটার কথাই ভাবতে ভাবতে হাঁটছিল সে। গা'টা একটু ছমছমও করছে বটে। গরু যা এলেম দেখাল তাতে ব্যোমকে যাওয়ারই কথা কিনা। এ গরুর দর পয়লা রাতেই পাঁচ লাখে উঠেছে, দিনে দিনে আরও কত উঠবে কে জানে! তবে দর যাই উঠুক, এ গরু সে প্রাণ থাকতে বেচবে না। তাদের বংশে গরু বেচার রেওয়াজ নেইও। কিন্তু বুকটা দুরুদুরুও করে! হে ভগবান, দর বেশি উঠে গেলে আবার আমার লোভ বেড়ে উঠবে না তো? তখন যদি গরু বেচে দিই?
বড্ড একটানা হাঁটা হয়েছে বলে একটু জিরোতে ইচ্ছে হচ্ছিল। বটগাছের তলায় এক সাধু ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছে দেখে নগেন ভয়ে ভয়ে দুগ্গাকে জিজ্ঞেস করল, ও মা দুগ্গা, এখানে একটু জিরিয়ে নিবি?
দুগ্গা তেমন আপত্তি প্রকাশ করল না দেখে নগেন বটের ঝুরিতে গরুর দড়িটা বেঁধে এগিয়ে গিয়ে সাধুবাবাকে একটা পেন্নাম ঠুকে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। সাধুবাবার চেহারা তেমন পেল্লায় নয়, বরং বেশ রোগা ভোগা মানুষ। তবে জটাজুট আছে, লম্বা আর পাকা দাড়ি গোঁফ আছে, পরনে নেংটি। বয়স সত্তর ছাড়িয়েছে। চোখ দুখানা ভারি সুন্দর। তাকালে ভয় করে না।
সাধুবাবা তার দিকে মিটিমিটি একটু চেয়ে দেখল। তারপর বলল, কিছু বলবে নাকি বাপু?
নগেন করজোড়ে বলল, আজ্ঞে এই একটু বিশ্রাম নিচ্ছি বাবা।
তা বিশ্রাম নেবে বৈকি। গরু নিয়ে তোমার যা ধকল গেল।
নগেন ভারি অবাক হয়ে বলে, বাবা, সে বৃত্তান্ত আপনি জানলেন কি করে?
ও জানা আর শক্ত কি! এই যে তুমি আমার কাছে আজ রাতে এসে হাজির হলে সেও তো এমনি নয়, ওসব ঠিক করাই থাকে। না এসে তোমার উপায় ছিল না।
নগেন গোল্লা গোল্লা চোখ করে চেয়ে থেকে বলল, বটে বাবা! আপনি বোধহয় অন্তর্যামীই হবেন!
সাধু বলেন, তা অন্তর্যামী বললেও বলতে পারো। গরু কিনতে গিয়েছিলে বুঝি?
যে আজ্ঞে।
ও গরু কিন্তু সুবিধের নয়। এই বলে রাখলুম তোমাকে। ও গরু যে ঘরে যাবে সেই ঘর ছারখার করে ছাড়বে।
নগেনের একগাল মাছি। বলে কি রে বাবা! এমন উপকারী গরু কি খারাপ হতে পারে! এতক্ষণ যে খেল দেখাল তাতে তো অলক্ষুণে বলে মনে হয় না! কিন্তু সাধুবাবাও হ্যাতান্যাতা সাধু নন! সাক্ষাৎ অন্তর্যামী। বড্ড দোটানায় পড়ে গিয়ে সে বলল, তাহলে কী করতে হবে বাবা!
সাধুবাবা ভাবিত হয়ে বললেন, এক কাজ করো। গরুটা আমার কাছেই রেখে যাও। শোধন করে দেখি, ওর গ্রহদোষ কাটাতে পারি কিনা। সাত দিন বাদে এসো। আর ওই সঙ্গে হাজার দুই টাকা রেখে যাও। মনে হয় গরু শোধরানো যাবে।
নগেন খানিক ভাবল। তারপর ঠিক করল, সাধুবাবাকে অমান্য
করাটা ঠিক হবে না। ট্যাক থেকে দু হাজার টাকা বের করে সাধুবাবার পায়ের কাছে রেখে বলল, একটু দেখবেন বাবা, গরুটার মতি গতি যেন ফেরে।
ফিরবে হে, ফিরবে। নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও।
একটা পেন্নাম ঠুকে উঠে পড়ল নগেন।
তারপর জোর হাঁটা লাগাল। ডুমডুমি নদী তেমন বড় নদী নয়। হেঁটেই পেরোনো যায়। এ সময়ে কোমরসমান জল থাকে। নদীর কাছাকাছি যখন এসে পড়েছে, তখন পিছনে হঠাৎ দৌড়পায়ের আওয়াজ পেল সে। মানুষের পা নয়, গরুর চারপেয়ে আওয়াজ।
ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখল, তার দুগ্গা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে। কাছে এসে তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হুমমম করে আদুরে শব্দ করতে লাগল।
অবোলা জীব নিয়ে এই অসুবিধে, কী হয়েছে তা কইতে পারে না। কিন্তু ব্যাপারটা দেখতেও তো হবে। তাই দুগ্গাকে নিয়ে ফের ফিরে যেতে হল বটতলায়। গিয়ে যা দেখল, তাতে সে হাঁ। সাধুবাবা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর অভিসম্পাত দিচ্ছে, তোর পা খোঁড়া হবে, চোখ কানা হবে, তুই মরা বাছুর বিয়োবি, তুই ন্যাজেগোবরে হয়ে ঘুরে বেড়াবি।
নগেনকে দেখে সাধু উঠে বসল। তারপর ট্যাক থেকে দু'হাজার টাকা বের করে তার হাতে দিয়ে বলল, তোমার গরু যে এমন ত্যাদড় তা আগে বলতে হয়। এখন বিদেয় হও তো বাপু।
নগেন ব্যাপারটা যে পষ্ট বুঝতে পারল, তা নয়। শুধু এটুকু বুঝল যে, দুগ্গার দুগ্গা নাম রাখাটা বড্ড লাগসই হয়েছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন