শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সুবলবাবুর পুরোনো কোটটা বড়ই পুরোনো হয়েছে। আর চলে না। জোড়াতাপ্পি দিয়ে দু-তিন বছর চলল। কিন্তু এ বছর শীতের শুরুতে কোটটা বের করে দেখে তাঁর গিন্নি বললেন, ওগো, এটা এবার ঘর পোঁছার ন্যাতা বানাতে হবে, কোনও ভদ্রলোকের এটা আর গায়ে দেওয়া চলবে না।
সুবলবাবুর কোটটার ওপর ভারি মায়া। তাঁর ঠাকুর্দার আমলের জিনিস। দীর্ঘদিন পরেছেন। এখন আর সত্যিই চলে না। সুবলবাবুর অবস্থা ভালো নয়। কষ্টেসৃষ্টে চলে। একটা কোট কিনতে না হোক দেড় দুশো টাকা খরচ।
উনি বললেন, 'এই বছরটা কোনওক্রমে ওটা দিয়েই—'
গিন্নি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, 'না এটা ভিখিরিও আর গায়ে দিতে পারে না। এটা আমি ন্যাতা বানাবো।'
প্রস্তাবটা শুনে সুবলবাবুর চোখ ছলছল করতে লাগল। কোটটা বাতিল করতে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু ন্যাতা বানিয়ে দাদুর স্মৃতিকে অপমান করতে তাঁর বড় বুকে বাজবে। কিন্তু সুবলবাবুর গিন্নি অতিশয় রাগী ও একরোখা মহিলা। যা করবেন তা করেই ছাড়বেন।
সুবলবাবু মিথ্যে কথা বলেন না। কিন্তু আজ কোটটাকে বাঁচানোর জন্য অতিকষ্টে একটা মিথ্যে কথা বলেই ফেললেন। বললেন, 'ইয়ে, শুনেছি ধর্মতলায় একটা দোকান আছে, সেখানে পুরোনো জিনিস নিয়ে নতুন জিনিস দেয়। তাতে অনেক পয়সা বাঁচে। কোটটা নিয়ে গিয়ে দেখি এর বদলে কম পয়সায় একটা কোট পাওয়া যায় কিনা।'
গিন্নি এ প্রস্তাবে বেশ খুশি হয়েই রাজি হলেন।
এরকম কোনও দোকান যদিও সুবলবাবুর জানা নেই, তবু তিনি কোটটা ভালো করে কাগজে মুড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি ঠিক করলেন, ধারকর্জ করে একটা নতুন কোট আজ কিনেই ফেলবেন আর এই পুরোনো কোটটা আমতলায় তাঁর বোনের জিম্মায় রেখে আসবেন।
অফিসে গিয়ে সুবলবাবু টাকা ধার করার অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু সুবিধে হল না। মাসের শেষে কারও হাতেই তেমন টাকা নেই। মনটা খারাপ হয়ে গেল। শীতটাও এবার জাঁকিয়ে পড়বে বলে মনে হয়।
অফিস থেকে বেরোবার মুখে এক বিপত্তি। মেঘ করে বৃষ্টি পড়ছে। ছাতা আনেননি। সুতরাং ভেজা ছাড়া উপায় নেই। যা হওয়ার হবে, সুবলবাবু বৃষ্টি মাথায় করেই বেরিয়ে পড়লেন।
রাস্তাঘাট বৃষ্টির জন্য বেশ ফাঁকা হয়ে গেছে। শনিবার বলে দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুবলবাবু গুলিঘুঁজি দিয়ে আমতলায় বোনের বাসায় যাবেন বলে এগোতে লাগলেন।
বিপত্তির ওপর বিপত্তি, হঠাৎ ফটাস করে গেল লোডশেডিং হয়ে। সুবলবাবু অন্ধকারে একরকম আন্দাজেই হাঁটতে লাগলেন। একটু বাদেই বুঝতে পারলেন, তাঁর রাস্তা ভুল হয়ে গেছে। যে গলিটায় ঢুকে পড়েছেন সেটা যেন বড্ড সরু আর বড়ই নির্জন। হাতের তেলোটা অবধি ঠাহর করা যায় না এমন অন্ধকার।
সুবলবাবুর একটু ভয় ভয় করতে লাগল। যতদূর আন্দাজ করে বুঝলেন, এ গলিটা একটু বিটকেলে। দু'ধারে বাড়িঘর বা দোকানপাট কিছুই নেই। শুধুই দেয়াল। এ কোথায় এসে পড়লেন তিনি?
এগোবেন না পিছোবেন তা বুঝতে পারলেন না। বৃষ্টির জোরও যেন বাড়ছে। হিমশীতল বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে যেন ঠান্ডার ছ্যাঁকা দিচ্ছে। সর্দি নির্ঘাৎ হবে। নিউমোনিয়াও হতে পারে। এ সময়ে একটা দোকান-টোকান পেলে ঢুকে পড়তেন।
সুবলবাবু সামনের দিকে একরকম দৌড়োতে লাগলেন। গলিটাও বিচিত্র। কখনো বাঁ কখনো ডাইনে কেবলই এঁকেবেঁকে যাচ্ছে। উপায় নেই। তিনি এগোতে লাগলেন।
হঠাৎ ডান দিকে মোড় ফিরতেই ভারি খুশি হলেন সুবল সেন। সরু গলির মধ্যে একটা ছোট্ট দোকানঘরে আলো জ্বলছে। সুবলবাবু গিয়ে সোজা দোকানঘরটায় ঢুকে পড়লেন।
অবশ্য ঢুকে পড়া বলতে যা বোঝায় তেমন নয়। দোকানটা খুবই ছোট। চার ফুট বাই পাঁচ ফুট হবে বড় জোর। তার মধ্যে একজন বুড়ো মানুষ একটা সেলাই মেশিনের মতো জিনিস নিয়ে বসে আছেন। বুড়ো বলতে বুড়ো! মানুষ যে এত বুড়ো হয় তা তাঁর জানা ছিল না। ভারি রোগা বিশুষ্ক কঙ্কালসার চেহারা। গায়ে জোব্বা, মাথায় টুপি, চোখে ঠুলি পরা। দাঁত-টাত নেই, খুনখুনে বুড়ো।
সুবলবাবুকে দেখে মুখটা তুলে বৃদ্ধ বললেন, 'কী চাই?'
'আজ্ঞে এই একটু মাথা বাঁচাতে ঢুকে পড়েছি।'
'বগলে ওটা কী?'
'আজ্ঞে, একটা ছেঁড়া কোট।'
'ছেঁড়া কোট? কই দেখি?'
'আজ্ঞে, অনেক পুরোনো জিনিস। মায়া বলে ফেলে দিতে পারছি না। ঠাকুর্দার জিনিস কিনা। বোনের বাড়িতে রেখে দেব বলে নিয়ে বেরিয়েছি।'
বুড়ো মানুষটা বিরক্ত হয়ে বলে, 'বড্ড বেশি কথা বলো তোমরা। জিনিসটা দেখাও তো একটু।'
সুবলবাবু কোটটা বৃদ্ধের হাতে দিলেন। বুড়ো মানুষটি কোটটা খুলে একটু দেখে বললেন, 'তাই তো! বড়ই পুরোনো দেখছি। ছেঁড়া, দেখি কী করা যায়।'
'আপনি কি দর্জি?'
'তাও বলতে পারো।'
'কিন্তু এটা তো সেলাইয়ের মেশিন বলে মনে হচ্ছে না?'
'এটা সেলাইয়ের মেশিন কে বলল? তার চেয়ে ঢের ভালো জিনিস।'
এই বলে বুড়ো মানুষটি মেশিনের ঢাকনা খুলে কোটটা তার মধ্যে রেখে ঢাকনা দিয়ে একটা সুইচ টিপে দিল। মেশিনটার মধ্যে একটা অদ্ভুত বোঁ বোঁ শব্দ হতে লাগল। তিনি ভয় পেয়ে ভাবলেন, এই রে! যা-ও ছিল রয়ে বসে তাও গেল বদ্যি এসে। এ যা কাণ্ড হচ্ছে যন্ত্রের ভিতরে তাতে পুরোনো কোটটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার কথা।
সুবলবাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, 'ওটা ছিঁড়ে যাবে যে!'
বৃদ্ধ চোখ তুলে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, 'ছিঁড়বে কী হে! ছিঁড়ে একেবারে কুটি কুটি হয়ে রেণু রেণু হয়ে গেছে এতক্ষণে।'
'অ্যাঁ! সর্বনাশ! ঠাকুর্দার স্মৃতি যে শেষ হয়ে গেল।'
লোকটি ধমকের সুরে বললেন, 'গোড়া থেকে শুরু না করলে কি হয়? মেটেরিয়ালের এলিমেন্টে ফিরে যেতে হবে না?'
'আজ্ঞে সেটা কী?'
'রিকনস্ট্রাকশনের গোড়ার কথা। বিরক্ত করো না।
সুবলবাবু কাহিল মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ মেশিনের বোঁ বোঁ শব্দ থেমে গিয়ে একটা খচ খচ শব্দ শুরু হল।
'এটা কী হচ্ছে?'
'বুনোট।'
খচ খচ শব্দের পরে শুরু হল খটাখট শব্দ।
'আজ্ঞে এই শব্দটা?'
'মেমরি থেকে প্রোগ্রামিং হচ্ছে। তুমি বুঝবে না।'
সুবলবাবু মাথা নাড়লেন। নাঃ, পাগলের পাল্লায় পড়ে কোটটা গেল। দুঃখ করে লাভ নেই। বৃষ্টিটা থামলেই ফিরে যাবেন। কোটের মায়া ত্যাগ করাই ভালো।
কিন্তু বৃষ্টিটা জোরেই হচ্ছে। বেরোতে পারছেন না তিনি।
হঠাৎ মেশিনটা থেকে একটা চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দ হতে লাগল। বৃদ্ধটি সুইচ টিপে যন্ত্রটা বন্ধ করলেন। তারপর ঢাকনা খুলে কোটটা বের করে সুবলবাবুর হাতে দিয়ে বললেন, 'এবার দেখ, চলবে?'
সুবলবাবু যা দেখলেন তা স্বপ্ন না বাস্তব বুঝতে পারলেন না। তাঁর হাতে ঝকমক করছে আনকোরা নতুন সার্জের সেই কোটটাই। কী জেল্লা! কী রঙ! কী চেকনাই।
'এ কী?'
বৃদ্ধটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, 'এ আর এমন কী? সব বস্তুরই নবীকরণ হতে পারে। এই যে আমাকে দেখছ, কত বয়স বলো তো?'
'শতখানেক হবে বোধহয়, না?'
'হাঃ হাঃ, শতখানেক কিছুই নয়। পাক্কা পাঁচ হাজার বছর। তা এই আমারও নবীকরণ হয় মাঝে মাঝে। এই যন্ত্র দিয়েই।'
'উরেব্বাস! বলেন কি?'
'যা বললাম সত্যি কথা। এখন বাড়ি যাও, আমার কাজ আছে।'
বাইরে বৃষ্টিটাও ধরেছে। সুবলবাবু কোটটা কাগজে মুড়ে নিয়ে হতভম্বের মতো বললেন, 'কিছুই বুঝলাম না দাদু। আপনার ঠিকানাটা বলবেন। ফের দরকার হলে আসব।'
'পাগল নাকি? ঠিকানা দিলে রক্ষে আছে? যাও যাও। আর দেরি কোরো না।'
সুবলবাবু ভয় পেয়ে গলিতে নেমে পড়লেন। তারপর অন্ধের মতো হাঁটতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হল, 'আরে' লোকটা পয়সা নিল না যে!'
সুবলবাবু ফিরে এসে দোকানটা আর দেখতে পেলেন না।
যাই হোক, একটু রাত করে যখন বাড়ি ফিরলেন সুবলবাবু তাঁর গিন্নি কোট দেখে ভারি খুশি।
সুবলবাবুও খুশি। খুশি কেন, ডবল খুশি। কিন্তু মাথা থেকে ধন্ধ ভাবটা তাঁর কিছুতেই যাচ্ছে না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন