শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নরেনবাবু পুজোর আয়োজন করে বসে আছেন, ওদিকে পুরুতের দেখা নেই।বারবার টেলিস্কোপে আকাশের সর্বত্র তল্লাস নেওয়া হচ্ছে, সব ভোঁ ভোঁ। আজ সরস্বতী পুজো, আন্তগ্রহ মহাকাশযান চালকও কম। ঘণ্টা দুই আগে খবর পাওয়া গেছে গদাই ভট্টাচার্যের পুষ্পকরথ চাঁদ হয়ে আসবে বলে পৃথিবী থেকে রওনা হয়েছে। চাঁদেও মস্ত পুজো। তাহলেও এতক্ষণ লাগবার কথা তো নয়। এদিকে নরেনবাবু বিশাল আয়োজন করে বসে আছেন। চার হাজার বর্গমাইল বসতি এলাকা থেকে অন্তত হাজার তিনেক মানুষ বৌ-বাচ্চা নিয়ে সাবওয়ে ধরে এখানে হাজির হয়েছে। বিশাল কমিউনিটি হলে জড়ো হয়ে সবাই অপেক্ষা করছে। প্রতিমা সাজ-সজ্জা সব শেষ। ফুল, বেলপাতা, ধূপ, ধুনো সবই রেডি। মহিলারা লালপেড়ে শাড়ি পরে শাখ নিয়ে তৈরি, বাচ্চারা হল্লাগোল্লা করে বেড়াচ্ছে। প্রকাণ্ড রান্নাঘরে বড় বড় সৌর-চুল্লিতে খিচুরি, লাবড়া, পাপর ভাজা, আলুর দম, বেগুনি, চাটনি, পায়েস সব রান্না হচ্ছে। অঞ্জলি দিয়ে সবাই খেতে বসবে। এখন গদাই ভট্টাচার্য এলেই হয়।
আশু ঘোষ মস্ত ইঞ্জিনিয়ার, নরেনবাবুর কাঁধে একটা থাবড়া দিয়ে বললেন কি হে তোমার পুরুত কোথায়? সকাল থেকে উপোস করে আছি। পেটে যে দাবানল জ্বলছে হে!
উদ্বিগ্ন নরেনবাবু বললেন, এসে যাবেন এখুনি।
চাঁদ থেকে মঙ্গলে আসতে কত সময় লাগে বাবা! এ তো একটুখানি পথ। টেলিফোন করছ না কেন?
একটু আগেই করেছি। চাঁদের পুজো হয়ে গেছে। ঠাকুরমশাই রওনা হলেন বলে।
আশুবাবুর আট বছরের ছেলে কনিষ্ক আরও গোটা কুড়ি বন্ধু-বান্ধবসহ দৌড়ে এসে বলল, বাবা, আমরা একটু বাইরে খেলি গে?
আশুবাবু একটু উদ্বিগ্ন হলেন মঙ্গলগ্রহে পৃথিবী থেকে আসা কোনও মানুষই খোলা জায়গায় থাকতে পারে না। কারণ, মঙ্গলে আবহমন্ডল বলতে কিছু নেই। অক্সিজেন ও বাতাসের অভাবে কয়েক মিনিটেই মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু এইসব বাচ্চা-কাচ্চারা মঙ্গলগ্রহেই জন্মেছে। আশ্চর্যের বিষয় এরা মঙ্গলে খোলা জায়গায় এক-দেড় ঘণ্টা মতন দিব্যি খেলা করে বেড়াতে পারে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে এইসব বাচ্চাদের ফুসফুসের ক্ষমতা অনেক বেশি। শরীরের ভেতরকার গঠনও অন্যরকম। আশুবাবু একটু দোনামনা করে বললেন যাও কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে এসো, অঞ্জলি দিতে হবে, মনে রেখো। বাচ্চারা দৌড়ে বেরিয়ে গেল। নরেনবাবুর সেল ফোন বেজে উঠল। নরেনবাবু বললেন, হ্যালো, চাঁদ থেকে অভিরাম বলছি।
অভিরামঃ আরে কি খবর? গদাই ভট্টাচার্য রওনা হয়েছে?
আজ্ঞে একটু মুশকিল হয়েছে দাদা।
কি মুশকিল?
ঠাকুরমশাই পায়েসটা একটু বেশি খেয়ে ফেলেছেন। বড্ড আইঢাই হচ্ছে।
বলো কী আমার পুজো কে করবে?
তার জন্য ভাবনা নেই আমরা নয়ন ভট্টাচার্যকে পাঠিয়ে দিয়েছি আর দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে।
নয়ন ভট্টাচার্য। সে আবার কে?
ভালো পুরুত দেখুন না পরীক্ষা করে।
দশ মিনিটের মধ্যেই নয়ন ভট্টাচার্যের মহাকাশযান এসে নামল। নয়ন ভট্টাচার্যের চেহারাখানা বেশ তাগড়াই। মস্ত শিখা, গায়ে নামাবলী, পরনে ধুতি, পায়ে খড়ম, মহাকাশচারীর পোষাক ছাড়াই নয়ন ভট্টাচার্য তার গাড়ি থেকে নেমে প্রায় বিশ গজ রাস্তা খট-খট করে হেঁটে এসে কমিউনিটি হলে ঢুকল। সবাই অবাক। পৃথিবী থেকে আসা মানুষ হলে এতক্ষণে মঙ্গলের খোলা জায়গায় অক্কা পাওয়ার কথা।
ভট্টাচার্য কারোর সঙ্গে বিশেষ কথা-টথা কইল না। গম্ভীর মুখে গিয়ে পুজোয় বসল এবং বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করে বেশ ভক্তিভরে পুজো সেরে সবাইকে অঞ্জলি দেওয়ালো তারপর চাল-কলার পুটুঁলি নিয়ে উঠে পড়ে বলল, আমার তাড়া আছে আমি যাচ্ছি। নরেনবাবু তাঁকে দক্ষিণা ধরিয়ে দিয়ে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে চাপা স্বরে বললেন আপনি আসলে কে?
নয়ন ভট্টাচার্য তাছাড়া কে?
উঁহু টিকিটা লক্ষ করেছি।
তাই নাকি? তাহলে চেপে যান।
যাচ্ছি কিন্তু সকলের চোখকে ফাঁকি দিলেও আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া সোজা নয় হে বাপু। তুমি হলে রোবট। গদাই ভট্টাচার্য এখন তোমাকে দিয়ে কাজ সারছেন।
নয়ন মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেল।
অবশ্য ব্যাপারটা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্চ হল না। সকলেরই প্রচণ্ড খিদে। আর খিচুড়িটাও হয়েছে দারুণ। হইহট্টগোলে পুরুতের প্রসঙ্গটা কারও মনে উদয় হল না। পুরুতকে আর কে মনে রাখে?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন