শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বাজির শব্দে কুকুরটা ভয় পেয়ে খাটের তলায় ঢুকেছে। আর সেখান থেকেই পরিত্রাহি আর্তনাদ করে যাচ্ছে। একটানা একঘেয়ে, স্নায়ুবিদারক। ডিউক খুবই ভালো জাতের অ্যালসেশিয়ান কুকুর। কখনও কাঁদে না বা ডাক ছেড়ে চেঁচায় না। ধমক শোনে, আদর সোহাগ বোঝে। কিন্তু কালী পুজোর দিন তার সব শিক্ষাদীক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে সে রাস্তার কুকুরের মতোই চেঁচায়।
রণেন অনেকবার চেষ্টা করেছেন ডিউককে ঠান্ডা করতে অন্তত চুপ করিয়ে রাখতে। পারেননি। এখন কুকুরের চিৎকারে তাঁর স্নায়ু বিকল হওয়ার জোগাড়।
ডিউকের সঙ্গে রণেনের তেমন মাখামাখি নেই। গৃহপালিত পশুপাখি তাঁর পছন্দ নয়। ছেলেবেলায় আদরের কুকুর, বেড়াল ও পাখির মৃত্যু কয়েকবার দেখেছেন, পোষা খরগোশ তাঁর কোলেই মরে গিয়েছিল। সেই থেকে তিনি আর পশুপাখি পোষেননি।
ডিউককে কোন এক কুকুর-ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কিনে এনেছিল তাঁর ছেলে লুকু। এনেছিল তাঁর জন্যই। বছর দেড়েক আগে রণেনের স্ত্রী রত্নাবতী আকস্মিকভাবে মারা যান। রণেন যে খুব ভেঙে পড়েছিলেন তা নয়। তবে একটু চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। লুকু ধরে নিয়েছিল, তিনি পত্নীশোকে ভেঙে পড়েছেন। নানাভাবে রত্নাবতীর শূন্য স্থান পূরণের একটা অক্ষম চেষ্টা লুকু করেছে। কাজটা সে ছেলে বলেই করেছে। কিন্তু ফলটা ভালো হয়নি। রত্নাবতী মারা যাওয়ার পর তাঁকে পুরী এবং ভুবনেশ্বর ঘুরিয়ে এনেছিল লুকু এবং তার জন্য নিজের বউ সুমিতার কাছে যথেষ্ট কটু কথা শুনেছে। আদিখ্যেতা আজকালকার মেয়েরা পছন্দ করে না। তার ওপর এই কুকুর। লুকুর ধারণা, কুকুরটা সঙ্গী হিসেবে থাকলে রণেনের মনটা একটু ভালো থাকবে। তবু লুকু পাছে দুঃখ পায় সেই ভেবে তিনি প্রথম প্রথম জোর করে কুকুরটাকে একটু একটু লাই দিতেন। তারপর সম্পূর্ণ নিরাসক্ত হয়ে পড়েন। আসলে বুড়ো বয়সে একটাই অভাব থাকে। কথা বলার লোক থাকে না। আর বুকে একগাদা কথা জমে থাকে কাউকে বলবার জন্য। যেমন ছিল তাঁর নাতি জয়। কিছু বুঝত না, কিন্তু শুনত। বলতও অজস্র। ঠিক যেমন বন্ধুরা হয় আর কি।
একদিন লুকুকে তিনি বলে ফেলেছিলেন, 'জয়টা যদি কাছে থাকত তবে বেশ হত।'
লুকু অবাক হয়ে বলল, 'সেটা কী করে সম্ভব?'
রণেন জানেন, সম্ভব নয়। তাঁর একমাত্র নাতি জয়কে বছরখানেক হল নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুলে যে ভর্তি করা হয়েছে। ওরকম নামী স্কুলে ভর্তি করা গেছে সেইটাই লোকে সৌভাগ্য বলে মানবে। সুতরাং তাকে আর কাছে পাওয়ার আশা করা বৃথা। তবে স্কুল বন্ধ থাকলে আসে। এখন যেমন এসেছে। তবে সেই আগের জয় আর নেই। এক বছরের মধ্যেই কেমন একটু সাবালক এবং ভারিক্কি হয়েছে। দাদু-দাদু এখনও করে বটে, কিন্তু কেমন যেন একটু কেজো মানুষ হয়ে গেছে, সেই-আঁকড়ে আবদেরে ভাবটা আর নেই।
ঘাড়ে দীর্ঘদিনের স্পন্ডেলাইটিসের ব্যথা। তবু নীচু হয়ে চৌকির তলায় কুকুরটাকে দেখবার চেষ্টা করছিলেন রণেন। গলা তুলে কেঁ-উ কেঁ-উ করে ডাকছে। সন্ধে থেকে ডাকছে বলে গলাটা কি একটু ভাঙা ভাঙা?
বাড়িতে রণেন আর রান্নাবান্নার লোকটি ছাড়া কেউ নেই। সুমিতাদের বাড়ি বাগবাজারে বিরাট কালী পুজো হয়। অনেক টাকার বাজি পোড়ে, গোটাকয়েক পাঁঠা বলি হয়। ওরা আজ ওখানেই থাকবে। তবে লুকু ফিরে আসতে পারে। সেইরকম বলে গেছে।
শিবু। শিবু। আবার ডাকলেন রণেন। এ পর্যন্ত বহুবার ডেকেছেন। শিবু ফ্ল্যাটে বা আশেপাশে নেই। রান্নাঘর খোলা পড়ে আছে, বাতি জ্বলছে। পনেরো-ষোলো বছরের ছেলেকে আজকের রাতের অন্যমনস্কতার জন্য দোষ দেওয়া যায় না। দশতলার ছাদে বাজি পোড়ানো হচ্ছে, একতলায় পুজো। তারই কোথাও গিয়ে সেঁটে আছে। ডাল-ভাত-তরকারি-ঝোল সব ওবেলাই রেঁধে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। রাতে শুধু গরম করে দেবে। রণেন রাত দশটা-সাড়ে দশটার আগে খান না। সুতরাং শিবু নিশ্চিন্ত।
রণেনের ফ্ল্যাটটা বেশ বড়ই। দেড়হাজার স্কোয়ার ফুট। সস্তাগণ্ডার সময়েও সোয়া লাখ দাম পড়েছিল। এখন হেসে খেলে ছ-সাত লাখ টাকা। রত্নাবতীর নামেই আছে। এই ফ্ল্যাটে রণেনের নিজস্ব একখানা ঘর আছে। সবচেয়ে ছোট ঘরখানাই তিনি বেছে নিয়েছেন। সেই ঘরে জিনিসপত্র বলতে গেলে কিছুই নেই। খরচ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনকেও সঙ্কুচিত করে ফেলেছেন তিনি। জামাকাপড়ের ওয়ার্ডরোব একসময়ে উপচে পড়ত। আজকাল একজোড়া হাওয়াই আর একজোড়া বেরোনোর চপ্পল। বারোটা লাইটার ছিল। সিগারেট ছেড়েছেন তিন বছর আগে। এখন একটাও লাইটার নেই। বক্স খাটটা ছেলেকে দিয়ে একখানা সাধারণ চৌকি পেতে নিয়েছেন ঘরে। আর একখানা ইজিচেয়ার। ছোট্ট একটা টেবিল। রণেনের বিষয় সম্পত্তি বলতে এইটুকুই। তবে বইপত্র কিছু আছে, কিছু সাময়িক পত্রিকা। এগুলোই তার অবসরের সঙ্গী।
কাচের শার্শি সবই বন্ধ। তবু বীভৎস লাগাতার বাজির শব্দ ঠেকানো যাচ্ছে না। এরকম ছেদহীনভাবে বাজি পোড়াতে হলে কত টাকা খরচ হতে পারে তা রণেন ভেবে পান না। তার ওপর এই শব্দ সহ্য করার জন্য শক্ত নার্ভও চাই। বাজির শব্দের সঙ্গে ডিউকের চিৎকার রণেনকে যেন খানখান করে ভেঙে ফেলেছে।
অন্য সব ঘরের দরজা বন্ধ এবং চাবি দেওয়া। কেন কে জানে, ওরা কোথাও বেরোলে ঘরগুলো সব বন্ধ করে রেখে যায়। শুধু বসার ঘর আর রান্নাঘর খোলা থাকে। রণেনের অন্য কোনও ঘরে গিয়ে আত্মরক্ষা করার উপায় নেই, বসার ঘর ছাড়া। কিন্তু বসার ঘরটা গিয়ে শেষ হয়েছে গ্রীল দেওয়া বারান্দায়। সেখানে কোনও কাচের শার্শি নেই। এই সাংঘাতিক, প্রাণঘাতী বাজির শব্দ সেখানে আটকানো যাবে না। আর তিনি গেলে ডিউকও তাঁকে অনুসরণ করবেই।
অসহায়ভাবে রণেন ইজিচেয়ারে বসে একটা ম্যাগাজিন খুলে অন্যমনস্ক হওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ভিতরটা এমন কাঁপছে, এত অস্থির লাগছে যে, উঠে পড়তে হল।
ঘাড়ের ব্যথা নিয়েই আবার নীচু হলেন। 'ডিউক! ডিউক!'
ডিউক ফিরে তাকাল এবং বলল, 'কী বলছ?'
রণেন ছিটকে পড়লেন মেঝেয়। মাথাটা ঝিমঝিম করল। আজকাল বুড়ো বয়সে কি ভীমরতি ধরল। না কি স্বপ্ন দেখছেন?
বাঁ কনুইতে একটু চোট পেলেন। তবে তেমন কিছু নয়। ফের উঠলেন রণেন। সভয়ে নিচু হয়ে ডিউকের দিকে চাইলেন। ডিউক দু'থাবার মধ্যে মাথা রেখে কেঁউ কেঁউ করে কাঁদছে।
'ডিউক!'
'তখন থেকে কেন ডাকছ! আমি বেরোব না যাও।'
বুকটা ধক করে উঠেই যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। তবে ফের চলল। ধড়াস ধড়াস করে। একটু শ্বাসকষ্টও হতে লাগল রণেনের।
সাবধানে আবার ডাকলেন, 'ডিউক!'
'তখন থেকে কেন যে ফ্যাচ ফ্যাচ করছ! কী চাও বলো তো!'
অবিশ্বাস্য। সম্পূর্ণ ভৌতিক! অলৌকিক! তবু রণেন এবার নিজেকে শক্ত রাখলেন। কাঁপা গলায় বললেন, 'তুই কি কথা বলতে পারিস!'
'পারি। তবে এখন কাঁদছি। কাঁদতে দাও।'
'কাঁদছিস কেন?'
'আমার পূর্বজন্মের কথা মনে পড়েছে।'
'পূর্বজন্ম? ওরকম কিছু সত্যিই আছে নাকি?'
'আছে। না থাকলে মনে পড়বে কেন?'
'পূর্বজন্মে তুই কি ছিলি? কুকুরই তো!'
'না। তবে কুকুরের অধম। বারোটা ছেলেপুলে ছিল। না খেয়ে খেয়ে, রোগে ভুগে চোখের সামনে মরেছে। দুটোকে চোর বলে পিটিয়ে মারে। একজন জেল খাটত। সে বেঁচে আছে কিনা জানি না। রাস্তার কুকুরের মতো এঁটো-কাটা খুঁটে খেতুম। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতুম, কুকুরের মতোই যদি বেঁচে আছি তবে কুকুরই করলে না কেন? সেই প্রার্থনা ভগবান বোধহয় শুনেছেন। বাজির শব্দে মাথাটা কেমন টলমল করছিল, হঠাৎ সব মনে পড়ল।'
'এ জন্মে তোর কেমন লাগছে?'
'সুখে আছি, বেশ সুখে। আগের জন্মের চেয়ে ঢের ভালো মাংসের সুরুয়া খাই, গমের খিচুড়ি, সাততলায় বাস, সুখের বাকি কী? শুনলুম তোমার ছেলে আমাকে সাত'শ টাকায় কিনেছে। শুনে ভারি আনন্দ হল। আমার এত দাম হবে ভবিনি কখন।'
'চুপ, চুপ। অত টাকায় তোকে কেনা হয়েছে তা খবরদার বলিসনি। তাহলে লুকুকে তার বউ বকবে।'
'জানি লুকু কমিয়ে বলেছে। সত্তর টাকা। তাইতেও বাপান্ত হচ্ছে। কিন্তু যার জন্য কেনা হল সে তো পাত্তা দিচ্ছে না।'
'তুই মাদী নাকি?'
'তাও জানো না! আচ্ছা লোক বাপু!'
'তোর নাম যে ডিউক।'
'সে যদি তোমরা নাম দাও তাতে আমার কী করার আছে?'
'আগের জন্মে মদ্দা ছিলি?'
'না, মাদীই। বললুম না রাস্তার কুকুরের মতো জীবন ছিল।'
'খুব কষ্ট ছিল তোর!'
'এখনও আছে। বড় কষ্ট। এখন যাও ইজিচেয়ারে বসে থাকো গে আমি একটু কাঁদি।'
কাঁদ ডিউক। রণেন ইজিচেয়ারে এসে বসলেন। একাই একটু হাসলেন তিনি। খুশিই লাগছে মনটা। কথা বলার মতো একজনকে পাওয়া গেল এত দিনে। সময়টা কেটে যাবে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন