শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ফটিকবাবুর সামনে ও পিছনে অন্ধকার। ওপরে ও নীচে অন্ধকার। শুধু তাঁর নৌকোর সামনের দিকে নীলচে ইন্ডিকেটরগুলো জ্বলছে। আর কোনও আলো নেই। তিনি অভিজ্ঞ মানুষ, বহুবার আকাশগঙ্গা পাড়ি দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও ভুলচুক হতেই পারে। ভরসার কথা তাঁর নাওটিতে অটো নেভিগেটর আছে। ঘণ্টা খানেক আগে নেভিগেটর তাঁকে একটা সাংকেতিক নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তিনি মহাকাশের এমন একটা জায়গায় রয়েছেন সেখান থেকে নক্ষত্রমন্ডলীর চেনা মানচিত্রটা বোঝা যাচ্ছে না। একটু বেশি দূরে এসে পড়লে এই গন্ডগোলটা হয়। গত এক ঘণ্টা যাবৎ নেভিগেটর চুপচাপ রয়েছে। কোনও সংকেত দিচ্ছে না।
ফটিকবাবুর তাঁর কনসোলের দিকে তাকিয়ে ভ্রু-কোঁচকালেন। সেখানেও একটা স্থিতাবস্থা দেখতে পাচ্ছেন। কোনও ইন্ডিকেটরে? কোনওরকম চঞ্চলতা বা ক্রিয়াশীলতা নেই। শুধু এটুকু বুঝতে পারছেন যে তাঁর অত্যাধুনিক নৌকাটি অতি দ্রুত আলোর চেয়েও অন্তত দু-হাজার গুণ বেশি গতিতে ধাবিত হচ্ছে। প্রতিবস্তুজাত শক্তি এবং মনোগতি নামক নতুন এক সাইকো অ্যানালিটিক্যাল প্রযুক্তি দ্বারা সংঘটিত এই গতি অবশ্যই আগের দিনে বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে দিত। কিন্তু নানা রক্ষা কবচের ফলে তা আজকাল হয় না। এই দুর্বার গতিতেও তাঁর নৌকো অক্ষত রয়েছে এবং তিনিও।
তিনি যে একটি নিউট্রাল জোনে পৌঁছে গেছেন সেটা একটু একটু করে বুঝতে পারছেন ফটিকবাবু। এ হল অনেকটা সুন্দরবনের নদীতে যেমন 'ঘোলা' নামক নিউট্রাল ওয়াটারের এলাকা থাকে। সেখানে নৌকো ঢুকে পড়লে এগোতেও পারে না। পিছোতেও পারে না। মহাকাশের এই নিস্তরঙ্গ নিথর এলাকাগুলি অতীব ভয়ের। ফটিকবাবু গত পঁচিশ বছর আকাশগঙ্গায় বহুবার অভিযান করেছেন বটে, কখনও এ রকম নিউট্রাল জোনে পড়তে হয়নি। এ যাবৎ যে কটি নৌকো এ রকম এলাকায় ঢুকে পড়েছে তারা কেউ আর পৃথিবীতে ফিরে যতে পারেনি। ঘুরে ঘুরে মরেছে।
ফটিকবাবু কিছুক্ষণ যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করলেন। বুঝতে পারলেন তার নৌকো বৃত্তাকারে ঘুরে চলেছে। ফটিকবাবুর বেশ ঘাম হচ্ছে, ভয় হচ্ছে, দুশ্চিন্তায় বিভ্রম দেখা দিচ্ছে। পৃথিবীতে একটা বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করে দেখলেন, কাজ হচ্ছে না।
ফটিকবাবুর নৌকোয় তিনি ছাড়া আর মানুষ নেই বটে। কিন্তু বেশ কয়েকজন বিচক্ষণ ও বহু কর্মক্ষম যন্ত্রমানব এবং অতি আধুনিক কম্পিউটার রয়েছে। তিনি নৌকো চালু রেখে নৌকোর খোলের ভিতরে ঢুকে গেলেন। ভিতরে চমৎকার ব্যবস্থা। খাওয়ার ঘর, বিশ্রামের ঘর, রান্নাঘর, টয়লেট সবই বিদ্যমান। যান্ত্রিক মানুষেরা নিঃশব্দে নানা কাজ করে চলেছে। তিনি মূল কম্পিউটারটির সামনে বসে নিজের সঠিক অবস্থান জানার চেষ্টা করে দেখলেন তাঁর নৌকো সত্যিই একটি নিস্তরঙ্গ এলাকায় অজান্তে ঢুকে পড়েছে।
হঠাৎ পিছনে একটা হাই তোলার মতো শব্দ হল। ফটিকবাবু চমকে পিছনে চেয়ে দেখলেন, ওপাশের জানালা ঘেষে যেন একটা ছায়ামূর্তি বসে আছে। কিন্তু এই মহাশূন্যে এই সুরক্ষিত নৌকোয় কে আসতে পারে? চোখে ভুল দেখছেন নাকি? তবু বললেন, কে ওখানে?
জবাব এল, লালমোহনকে চিনতে পারলে না?
কে লালমোহন?
পীরগঞ্জের গোঁসাইবাড়ির ছেলে, মনে নেই?
মনে পড়ল। তাঁর বাল্যবন্ধু লালমোহন ঘোষ। লালমোহন বহুকাল আগেই সাধু হবে বলে সংসার ত্যাগ করেছিল। তারপর আর তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিন্তু লালমোহনই বা এখানে আসে কি করে? তিনি বোধহয় সত্যিই ভুলভাল দেখছেন। মানসিক বিকার শুরু হয়ে গেছে তাঁর।
ভূত নই হে, ভুলও দেখছ না।
তাহলে তোমাকে দেখতে পাচ্ছি কেন?
তুমি বিজ্ঞানী, জড়বস্তু নিয়ে পড়ে থাকো, সাধনভজনের জগতের খবর তো রাখো না।
ওসবে আমি যে বিশ্বাস করি না।
তা জানি, বিশ্বাস করার দরকারও নেই। আমার সঙ্গে এসো।
কোথায় যাব?
তোমার নৌকোর পিছন দিকে মেঝের নীচে একটা লাল সুইচ আছে ওটা দেখিয়ে দিচ্ছি, এসো।
ফটিকবাবু খুব বিস্ময়াবিষ্ট হলেন। তবু লালমোহনের পিছু পিছু গেলেন। লালমোহন মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে একটা জায়গা দেখিয়ে দিয়ে বলল, এই ঢাকনাটা তোলো।
ফটিকবাবু ঢাকনাটা তুলে সত্যিই একটা লাল সুইচ দেখতে পেলেন। বললেন, এটা কী বলো তো?
ওটা তোমাদের ভাষায় ডিসট্রেস নেভিগেটর।
তাই তো! এটার কথা তো আমি যেন শুনেওছিলাম।
ওটা টিপে দাও, তাহলেই হবে।
ফটিকবাবু অবাক হয়ে বললেন, তা না হয় হল, কিন্তু তুমি কি করে এই নৌকায় এলে, কেন এলে কিছুই তো বুঝতে পারছি না।
বুঝবার দরকার কি? তোমাকে মহাকাশচারণা করতে হলে অনেক যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে হয়। আমার তার দরকার হয় না। তুমি যন্ত্রনির্ভর অসহায় মানুষ, আমি তা নই। তোমার কাছে এই মহাশূন্য রহস্যময়, আমার কাছে এ এক আনন্দময় আলোর রাজ্য তোমার কাছে যা অন্ধকার আমার কাছে তা জ্যোতির্ময়। সুইচটা টিপে দাও।
ফটিকবাবু তাই করলেন। লালমোহন অদৃশ্য হল।
নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসার তিনদিন পর ফটিকবাবু চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। তারপর খোঁজখবর নিয়ে লালমোহনের আশ্রমে গিয়ে হাজির হলেন।
ভাই লালমোহন, আমি এসেছি।
লালমোহন হেসে বললেন, ভালো করেছ। তোমার জন্যই তো বসে আছি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন