কিছুক্ষণ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov16

পতিতপাবনের দুটো গুণ। সে ভারি ভালো সাইকেল চালায় আর দুর্দান্ত ফুটবল খেলে। সাইকেল সে এতই ভালো চালায় যে, একবার মহামায়া সার্কাস তাকে সাইকেলের খেলা দেখানোর জন্য চাকরি অবধি দিতে চেয়েছিল। আর ফুটবলের কৃতিত্বও তার এতই সুবিদিত যে, কলকাতার ভালো-ভালো ক্লাব তাকে টানাটানি করতে লেগেছে। পতিতপাবনের অবশ্য বেশি বড় হওয়ার লোভটোভ নেই। সে খেলে বা সাইকেল চালিয়ে আনন্দ পায় আর তাইতেই সে খুশি।

হেমন্তের এক বিকেলে পতিতপাবন কুসুমপুরে তার বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। চার মাইল দূরে নয়াগঞ্জে আজ তার শীতলাষষ্ঠী ক্লাবের সঙ্গে গঙ্গাধরপুরের যুবকবৃন্দ ক্লাবের মধ্যে তারাময়ী স্মৃতি শিল্ডের ফাইনাল খেলা। তারাময়ী হলেন নয়াগঞ্জের জমিদার হরিকিশোরের স্বর্গগতা ঠাকুমা। শুধু শিল্ড নয়, বিজয়ী দলের প্রত্যেককে হরিকিশোর পাঁচশো টাকা করে পুরস্কার দেন, শ্রেষ্ট খেলোয়াড়কে এক ভরির সোনার মেডেল। তাছাড়া রাতের ভূরিভোজ তো আছেই। শীতলাষষ্ঠী ক্লাব গত তিন বছর তারাময়ী স্মৃতি শিল্ড জিতেছে আর পতিতপাবন তিনবারই পেয়েছে নিরেট সোনার মেডেল।

এবারও জিততে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। শীতলা ক্লাবের সবাই ভালো খেলে। পতিতের তাই দুশ্চিন্তা নেই। সে শিস দিতে দিতে সাইকেল চালাচ্ছিল।

জয়দেবের মোড় অবধি ফাঁকা রাস্তা। বেশ জোরেই চালাচ্ছিল সে। মোড়ের কাছ-বরাবর তার হঠাৎ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জেগে উঠল। মনে হল বাঁ ধার থেকে একটা কালো মোটরগাড়ি যেন বড্ড বেশি গতিতে এগিয়ে আসছে। পতিত গাড়িটা এক ঝলক নজর করে মনে মনে হিসেব করে নিল, গাড়িটা মোড় পর্যন্ত আসার আগেই সে মোড়টা ঠিক পেরিয়ে যাবে। গতিটা একটু বাড়িয়েও দিল পতিত।

সাধারণ নিয়মে মোড়টা গাড়ির আগেই পেরনোর কথা পতিতের। কিন্তু কালো গাড়িটা যেন পতিতকে ধরবে বলেই হঠাৎ স্পিড বাড়িয়ে দিল।

ঘটনাটা ঘটছিল মোড়ের কাছাকাছি। জনমনিষ্যি ছিল না রাস্তায়। গাড়িটারও ভীম গতি দেখে বিপদ বুঝে সাইকেলের ব্রেক চেপেও ধরেছিল পতিত। কিন্তু সাইকেলকে রোখা গেল না। গাড়িটা বাঁদিক থেকে ধেয়ে এসে সোজা পেল্লায় ধাক্কা মারল সাইকেলে।

পতিতের আর কিছু মনে নেই।

যখন চোখ মেলল তখন সে একটা গাড়ির সামনের সিটে বসে আছে। পাশে একজন বেশ সুদর্শন ভদ্রলোক গাড়ি চালাচ্ছেন বসে। তাকে চোখ চাইতে দেখে ভদ্রলোক বললেন, 'এই যে, কেমন আছ?'

মাথাটা আবছা লাগছে। কী হয়েছিল তা মনে পড়ছিল না পতিতের। সে বলল, 'ভালোই আছি।'

'শরীরে ব্যথাট্যথা নেই তো?'

'না। কিন্তু আপনি কে?'

'আমার নাম নির্জন সেন।'

'আমি গাড়িতে বসে আছি কেন?'

'তোমার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল।'

'তাই নাকি! কীভাবে হল?'

'অত জানি না। দেখলাম তুমি রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছ, তাই তুলে নিলাম।'

'ও। কিন্তু আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি? হাসপাতালে নাকি?'

'না। হাসপাতালে যাওয়ার মতো কিছু হয়নি তোমার।'

সামনে বিরাট চওড়া মসৃণ পাকা রাস্তা। অদ্ভুত সব গাড়ি উলটো দিক থেকে এসে পেরিয়ে যাচ্ছে সাঁ সাঁ করে। অবশ্য বাইরের কোনও শব্দই শোনা যাচ্ছে না গাড়িতে বসে ।

পতিত হঠাৎ জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা, আমরা কোথায় যাচ্ছি যেন!'

'ফুটবল খেলতে।'

'ওঃ, তাই বলুন।'

'তুমি যে ফুটবল খেলো তা মনে আছে তো?'

'আছে। কিন্তু আর কিছু মনে নেই।'

'আর কিছু মনে রাখার দরকারটা কী? শুধু ফুটবলটা মনে রাখলেই হবে।'

'তাই নাকি? আচ্ছা, আমার বাড়ি কোথায়?'

'বাড়ির কথা ভাবছ?'

'না। আসলে আমার কিছু মনেই পড়ছে না।'

'এরকমটাই তো ভালো। মনখারাপ নয় তো?'

'নাঃ।'

'তোমার বাড়িটাড়ি কিছু নেই!'

'বাঃ, বেশ তো! এই শহরের নাম কী?'

'শহর! শহর কোথায় দেখছ? এটা তো একটা রাস্তা।'

'ওঃ, তাই তো! খেলাটা কোথায় হবে?'

'স্টেডিয়ামে। আর মাত্র দশ মাইল।'

'সেখানে কারা খেলবে?'

'দুটো ক্লাব। ক আর খ।'

'বাঃ, সুন্দর নাম। আমি কোন দলে খেলব?'

'খ দলে। আজকের খেলাটা খুব ইম্পর্ট্যন্ট।'

'সব খেলাই ইম্পর্ট্যন্ট, তাই না?'

'ঠিক বলেছ। সব খেলাই ইম্পর্ট্যন্ট। তবে আজকের খেলার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে।'

'কেন বলুন তো!'

'খ দলের সবাই নতুন। কেউ কাউকে চেনে না। আজই তারা প্রথম একসঙ্গে খেলবে।'

'বাঃ বেশ মজা তো!'

'তোমাদের জার্সির রং নীল। ক দলের জার্সি লাল। মনে থাকবে?'

সামনেই গাছপালার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ মস্ত স্টেডিয়ামটা দেখা গেল।

'ওটা কী?'

'ওটাই স্টেডিয়াম। এক লক্ষ লোক ধরে।'

'এত লোক?'

'হ্যাঁ। স্টেডিয়াম আজ কানায় কানায় ভরা।'

'কিন্তু হইচই নেই তো?'

'না। আজকাল হইচই হয় না। সবাই মন দিয়ে খেলা দেখে, নোট নেয়, চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করে। হইচই হবে কেন?'

কথাটা খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হল পতিতের কাছে। সে বলল, 'ঠিকই তো।'

নির্জন সেন গাড়িটা স্টেডিয়ামের সিঁড়ির নীচে একটা ফটকের সামনে এনে দাঁড় করালেন।

চারদিকে একটা ঝলমলে ভাব। একটা মস্ত ড্রেসিং রুমে তাকে এনে দাঁড় করিয়ে নির্জন সেন বললেন, 'আর পনেরো মিনিটের মধ্যে খেলা শুরু হবে। ড্রেস আপ করে নাও। বুট, জার্সি সব গোছানো আছে। তৈরি হয়ে বেরিয়ে এসো। ওয়ার্ম আপ করার জন্য পাঁচ মিনিট সময় পাবে। আজ খ দলের মস্ত পরীক্ষা।'

লক্ষ্মী ছেলের মতো আদেশ পালন করল পতিত। তারপর বেরিয়ে এল। নির্জন সেন দরজার বাইরেই ছিলেন। তাকে নিয়ে মাঠের ধারে এসে বললেন, 'বাঁ ধারেরটা ক দল। ডান ধারে খ। রাইট আউটের জায়গাটা খালি দেখছ তো! ওটাই তোমার পজিশন। যাও, নামো।'

পতিত নামল।

বিশাল মাঠ, সবুজও বটে, কিন্তু মাঠে পা দিয়েই পতিত বুঝতে পারে, পায়ের নীচে মাটি নয়, একটা কৃত্রিম আস্তরণ। কিন্তু পতিতের তাতে কিছু ইতরবিশেষ মনে হল না।

কাদের বিরুদ্ধে সে খেলছে এবং সহ-খেলোয়াড়রাই বা কারা তা সে জানে না। কিন্তু তাতেও তার কোনও অসুবিধে হল না। সে এটাও লক্ষ করল, মাঠে রেফারি বা লাইন্সম্যান নেই। একপাশে একটা বিশাল বোর্ডে একটা ইলেকট্রনিক ঘড়িতে দেখাচ্ছে খেলা শুরু হতে আর পনেরো সেকেন্ড বাকি।

একটা মিষ্টি বাঁশি অলক্ষে বেজে উঠল। বিপক্ষ ক দল সেন্টার করে খেলা শুরু করে দিল।

পতিত কিছুক্ষণ বল যেদিকে সেদিকে লক্ষ করে দৌড়তে লাগল। তাকে বুঝতে হবে খেলাটা কোন গতিতে হচ্ছে এবং কোন কায়দায়। তার খ দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে যে বোঝাপড়া নেই এবং ক দল যে অতি সুসংবদ্ধ তা বুঝতে তার লহমাও লাগল না। সেন্টারের পর ক দলের খেলুড়েরা দুর্দান্ত গতিতে নিজেদের মধ্যে পাস খেলে এগিয়ে যাচ্ছে। খ দলের হাফলাইন বরাবর তারা লোক বাড়িয়ে নিয়ে খেলাটা বাঁ-দিকে উইং-এ নিয়ে যাচ্ছে। অতি, অতি দ্রুত তাদের পায়ের কাজ, নির্ভুল মাপা পাস এবং নিখুঁত জায়গা দখল। এত ভালো ফুটবল খেলা পতিত কখনও দেখেনি, তুলনায় তাদের দলকে ছন্নছাড়া, বিপর্যস্ত এবং হতচকিত মনে হচ্ছে।

বাঁদিকের উইং থেকে ক দলের লেফট আউট অতি অনায়াসে দু'জনকে কাটিয়ে বল ঠেলে দিল। ফরওয়ার্ডের একজন এগিয়ে গিয়ে সেটা গোলে প্লেস করে দিল। ১—০।

না, মাঠে কোনও চেঁচামেচি হল না, উল্লাসধ্বনি হয়। খেলা শুরুর তিন মিনিটের মধ্যে গোল। রেফারির বাঁশি বাজল। পতিত বুঝতে পারল খেলা পরিচালিত হচ্ছে নেপথ্য থেকে। সম্ভবত কম্পিউটারই এ-খেলায় রেফারি।

এবার তাদের সেন্টার। নিজেদের খেলোয়াড়দের একটু চিনে নিচ্ছে পতিত, দশ নম্বর জার্সি পরা লোকটাকে চেনা-চেনাও লাগছিল তার। সেন্টারের পর সেই দশ নম্বর লোকটা বল নিয়ে খুব মসৃণ গতিতে ক দলের গোলের দিকে এগোচ্ছিল। দু'জনকে ডাইনে-বাঁয়ে, মাইনাস করে দিল ছবির মতো। তারপর বল বাড়াল ডান দিকে। একজন বলটা ধরতে যেতেই ক দলের একজন ঈগলের মতো বলটা তুলে নিল পায়ে। তারপর ফের অনবদ্য এবং সঙ্ঘবদ্ধ সেই চোখধাঁধানো খেলা। গতি, ছন্দ, নির্ভুল আদানপ্রদান। দশমিনিটের মাথায় ক দল দু' নম্বর গোল করে ফেলল। এরকম চললে নব্বই মিনিটে দশ-বারো গোল খেতে হবে। কিন্তু পতিতের কী করার আছে তা বুঝল না। একটা ছন্নছাড়া দল একটা সঙ্ঘবদ্ধ দলের বিরুদ্ধে খেললে তো এরকমই হওয়ার কথা।

দ্বিতীয়বার সেন্টারের পর দশ নম্বর খেলুড়ে হঠাৎ বলটা পতিতের দিকে বাড়িয়ে দিল। পতিত বলটা ট্র্যাপ করে লাইন বরাবর ছুটতে লাগল। এই প্রথম বল পেয়েছে, বেশ টগবগ করছিল সে। একজন বাধা দিতে আসছিল, তাকে একটা হাফ টার্নে কাটিয়ে একটু ভেতরে ঢুকে আবার লাইনের দিকে সরে গেল সে। কর্নার ফ্ল্যাগের কাছবরাবর বলটা সেন্টার করতে যেতেই একজন অতি তৎপর প্রতিপক্ষ অতি অবিশ্বাস্য শারীরিক দক্ষতায় শূন্যে লাফিয়ে তার শট করা বল পায়ে নামিয়ে নিয়ে ক্লিয়ার করে দিল। বোকার মতো পতিত দেখল, খেলাটা ওরা আবার ধরে নিয়েছে।

তৃতীয় গোলটা অবধারিতই ছিল। ডান ইনসাইড খেলোয়াড়ের কামানের গোলার মতো শটটা খ দলে লম্বা গোলকিপার অবশ্য ঝাঁপ খেয়ে বুকে জাপটে নিয়ে বাঁচিয়ে দিল। তবে তিন নম্বর গোলটা হল আরও পাঁচ মিনিট খেলা চলার পর। ডান ধার থেকে একটা বুলেটের মতো ফ্রি কিকে।

ক দল সারাক্ষণ চেপে আছে। খ দল হিমসিম খাচ্ছে ঘর সামাল দিতে। বল তারা ছুঁতেই পাচ্ছে না ভালো করে। পতিত এবং অন্য সব ফরওয়ার্ডরা নীচে নেমে এসেছে প্রতিরোধ করতে। আক্রমণ গেছে চুলোয়।

ফের ওই দশ নম্বর লোকটা বল পেল। পেয়েই এক আশ্চর্য পায়ের জাদুতে ক দলের তিনজন খেলোয়াড়কে পর পর কাটিয়ে নিয়ে চিতা বাঘের মতো মাঝমাঠ পেরিয়ে ছুটছে। লোকটা একা। পতিতও তাই লঘু পায়ে তীব্র গতিতে বাঁ ধার ধরে ছুটতে লাগল।

দশ নম্বরের সামনে প্রতিপক্ষের তিনজন পজিশন নিচ্ছে, দু'জন পাশে পাশে দৌড়ে আসছে, আর একজন ডিপ ডিফেন্স থেকে আসছে কোনাকুনি। লোকটার পক্ষে অতিমানব হলেও এই জাল কেটে বেরনো অসম্ভব।

পতিত যা আশা করেছিল তাই হল, লোকটা হঠাৎ বলটা তার দিকে ঠেলে দিল। পতিত বা পাঁয়ে বলটা নামিয়ে লাইন বরাবর একটু ছুটতেই গোটা ডিফেন্স তার দিকে ধেয়ে আসছিল। পতিত দেওয়াল টপকে বলটা ফেলল দশ নম্বরের পায়ে। দশ নম্বর বলটা ধরলই না, চলতি বলে বাঁ পায়ে চকিতে একটা ভলি মারল, যে ভলি দেখার জন্য লাখ টাকা খরচ করা যায়। বলটা যেন একটা বিদ্যুৎঝলকের মতো গোলে ঢুকে জালে ঢেউ তুলে দিল। ৩—১।

দশ নম্বর এগিয়ে এসে তার হাতটা নেড়ে দিয়ে বলল, 'ওয়েল ডান।'

লোকটা কে বুঝতে পারছিল না সে। কিন্তু মুখটা চেনা-চেনা ঠেকছে।

দশ নম্বর দ্বিতীয় গোলটা করল ভগবানের মতো। প্রতিপক্ষ সেন্টার করার পরই লোকটা একজন প্রতিপক্ষের পা থেকে বলটা আলতো টোকায় তুলে নিল, তারপর বুক আর কাঁধের ওপর বলটাকে এক অলৌকিক দক্ষতায় নাচাতে-নাচাতে দৌড়ে যেতে লাগল। তারপর ডান আর বাঁ পায়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডজ। ইনস্টেপ, আউটস্টেপ দিয়ে নৃত্যের ভঙ্গিতে লোকটা একা টেনে নিয়ে গেল বলটাকে। তারপর অত্যাশ্চর্য সেই গোলটা করল বলটা বাঁ পায়ে একটু তুলে কোমরের সমান উঁচু থেকে চাঁটানো শটে। সেই শটের এত জোর যে বলটা প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল। শুধু জালটা অনেকটা ফুলে উঠল সেই বলের গতিতে।

দু'গোলের পর খ দলের বিপর্যস্ত ভাবটা কেটে একটা ছন্দ এল। ধীরে ধীরে খেলাটা ধরতে পারছে তারা।

পতিত বলটা পেল দ্বিতীয় গোলের পাঁচ মিনিটের মধ্যে। মাঝমাঠ থেকে সে বল ধরে ছুটতে-ছুটতে দশ নম্বরকে বল বাড়াল। কিন্তু দশ নম্বরকে ওরা প্রায় ঘিরে ফেলেছে। বুঝতে পেরেছে, এ অতি বিপজ্জনক খেলোয়াড়। দশ নম্বর তাই বলটা ফের ফিরিয়ে দিল পতিতকে। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে বলে পতিত বলটা ছাড়ল না। লাইন ছেড়ে হঠাৎ ডান দিকে একটা প্যারাবোলা রচনা করে সে হরিণের গতিতে তিনজন প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে নিল। সহজ শট নিতে একটু দ্বিধা করল সে। গোলরক্ষকটি বুদ্ধিমান। সুতরাং সে বলটা একটু তুলল, মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিল একটা বিপজ্জনক হাফভলি। এ শট সে ভালোই মারে। গোলকিপার হাঁ করে দেখল, বল জালে।

ছ'নম্বর গোলটা এল ঠিক দু'মিনিট পর। সেই দশ নম্বর। রাইট আউটের সঙ্গে পাস খেলে এগিয়ে সেন্টার থেকে ডাইভিং হেড-এ।

খেলা শেষ। কোনও হাফটাইমের বালাই নেই। খেলা শেষ হতেই ক দলের খেলোয়াড়রা কোন রন্ধ্রপথে বেরিয়ে গেল কে জানে। দাঁড়িয়ে শুধু খ দলের খেলোয়াড়রা।

নির্জন সেন এগিয়ে এসে তাদের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। একটু হেসে বললেন, 'আপনাদের একটু কষ্ট দিয়েছি। এ খেলাটা হল আপনাদের সময়ের বহু বহু বছর পর। বিভিন্ন যুগ থেকে আমরা এক-একজন খেলোয়াড়কে তুলে এনেছি। কাউকে একশো, কাউকে দেড়শো, কাউকে দুশো বা আড়াইশো-তিনশো বছর আগে থেকে। এই দু'হাজার তিনশো এক খ্রিস্টাব্দে আপনাদের খেলা আমরা রেকর্ড করে নিলাম। ফুটবলকে উন্নত করার জন্য এই ঘটনাটার দরকার ছিল।'

সবাই নির্বাক। বলে কী লোকটা!

নির্জন সেন এগিয়ে এসে দশ নম্বর খেলোয়াড়ের হাত ধরে বললেন, 'ধন্যবাদ পেলে, আপনার খেলা আমাদের মুগ্ধ করেছে।'

পেলে! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না পতিত।

নির্জন এগিয়ে এসে তাকে বললেন, 'তুমিও দারুণ খেলেছ, আমি যে-সময় থেকে তোমাকে তুলে এনেছি তখনও তোমার নামডাক তেমন হয়নি। কিন্তু পরবর্তী কালে তুমি বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড় হয়েছিলে। আমরা তোমার ওই কম বয়সের খেলাই দেখতে চেয়েছিলাম। যাকগে, এবার তোমাদের ফেরার পালা। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে তার সময়কার পাঁচ লক্ষ টাকা বা সমমানের ডলার বা পাউন্ড পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে। আশা করি আমাদের কথা সকলের মনে থাকবে।'

নির্জন সেন তার গাড়িতেই ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন পতিতকে। সেই মোড়ের কাছে।

'ওই তোমার সাইকেল। আর ওই তোমার সময়। নিজের সময়ে ফিরে যাও পতিত। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা কোরো।'

একটু রাত হয়ে গেছে। শিল্ডের ফাইনালে খেলতে পারেনি পতিত, কিন্তু তার জন্য দুঃখ নেই। তার বদলে অভিজ্ঞতা বড় কম হল না। কিট ব্যাগে পাঁচ লাখ টাকাও কি সোজা কথা।

সাইকেল চালিয়ে পতিত বাড়ি ফিরতে লাগল।

Cov17
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%