শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

এই রে! বাবু কি জেগে আছেন নাকি?
জেগে আছি কি আর সাধে রে বাপু! এই তোদের মতো চোর ছ্যাঁচোড়দের জ্বালায় জেগে থাকতে হয়।
তা বাবু, দুনিয়ায় চোর ছ্যাঁচোড়দেরও তো টিঁকে থাকতে হয় কিনা। কিন্তু এই মাঝরাত্তির অবধি রোজ জেগে থাকলে কি আপনার শরীরে সইবে কর্তা? হজমে গোলমাল হবে, বায়ুর ঊর্ধ্বগতি হবে, পেট ফাঁপবে, অনিদ্রায় ধরবে, ঠিক কিনা!
ওঃ,আমার জন্য যে তোর দরদ একেবারে উথলে উঠল! তা এতই যদি দরদ তাহলে আমার বাড়ির আশপাশে নিশুত রাতে ঘুরঘুর করিস কেন? রাত জেগে তোর পেটে কি বায়ু হয় না? নাকি তোকে বদহজম বা অনিদ্রায় ধরে না?
কী যে বলেন বাবু! আমাদের শরীর কি আর মনিষ্যির শরীর! তবে কথাটা বড্ড জব্বর বলেছেন। এই সব অধর্মের কাজ করা আমাদের উচিত হচ্ছে না। দিনে ঘুমনো, রাতে জাগা, পরের জিনিস হাতিয়ে নেওয়া, এসব কি আর ভালো কাজ কর্তা? মাঝে মাঝে ভারি চিন্তা হয়, যমরাজা যখন জেরা করবে তখন কী জবাব দেব?
ওঃ, একেবারে ধম্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির এলেন! তা এত টনটনে ধর্মজ্ঞান নিয়ে চুরি ধারি করিস কেন? গতর খাটালে কি ভাত জোটে না?
আজ্ঞে সেসবও কি ভাবিনি বাবু? তবে এ হল সেই বাপ পিতেমোর বৃত্তি। বাপ দাদাকেও দেখেছি কিনা। দিনমানে পড়ে পড়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমত, আর নিশুতরাতে সিঁধকাঠি আর আরও সব যন্ত্রপাতি নিয়ে বেরোত, পাপ-তাপ কাটানোর জন্য কার্তিক ঠাকুর আর মা কালীর পুজোও করত।
বাপ রে! তুই তো চোর-বংশের ছেলে!
আজ্ঞে। তা বংশ তেমন খারাপ ছিল না। ঠাকুর্দা পীতাম্বরের ভারি নামডাক ছিল, দারোগাবাবু অবধি খাতির করে কথা কইত, বাপ জনার্দনও বেশ নাম করেছিল। আমারই তেমন হাতযশ হল না, এটাই দুঃখ।
আহা, দুঃখের কি? তোর এখনও তো বয়স পড়ে আছে।
তা আছে। তবে বয়স পাকলেই কি হাতও পাকবে? এই যে আপনার কাছে আজ ধরা পড়ে গেলুম, আমার বাপ-দাদা হলে কি পড়ত?
ধরা পড়েছিস! ধরা পড়লি কোথায়? তুই জানলার বাইরে, আর আমি ঘরের মধ্যে।
না, জাপটে হয়তো ধরেননি, পুলিশও ডাকেননি, কিন্তু একরকম ধরেই তো ফেললেন, এটাও তো লজ্জার কথা! পাঁচজন যে দুয়ো দেবে আমাকে।
ওরে, ঘাবড়াসনি। আমি তো আর থানা পুলিশ করতে যাচ্ছি না। সেই মতলবে রাত জেগে বসে আছি বলে ভেবেছিস নাকি?
না কর্তা, থানা-পুলিশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। এই অনেকটা বাপ-ছেলের মতোই। তারা আমাদের ভালো-মন্দ দেখে, আমরাও তাদের ছেদ্ধা-ভক্তি করি, ও নিয়ে ঘাবড়াচ্ছি না। এই যে আপনার নজরে পড়ে গেলুম তাতেই জিব কাটতে ইচ্ছে যাচ্ছে। তেমন তেমন চোরকে ধরা ছোঁয়া দূরে থাক, চোখের দেখাটাও শক্ত ব্যাপার কিনা, তাই একটু একটু আত্মগ্লানি হচ্ছে কর্তা।
আত্মগ্লানি ভারি ভালো জিনিস, বুঝলি! আত্মগ্লানি হলেই চট করে মানুষের উন্নতির পথ খুলে যায়। এই আমার কথাই ধর না, ক্লাস সিক্স-এ ফেল করে বাবার মারের ভয়ে আত্মগ্লানিতে নদীতে ঝাঁপ দিলুম মরব বলে। কিন্তু মরব কি, কিছুতেই ডুবজল পাচ্ছি না, পায়ের তলায় কী যেন ঠেকছে। তখন হাতড়ে হাতড়ে জিনিসটা তুলে এনে দেখি, একজন বুড়ো মানুষ। কী আর করা, তখন বুড়োর পেট চেপে জল বার করতে হল। বুড়োও কঁৎ করে শ্বাস ছেড়ে উঠে বসে বলল, বাবা, তুমি আমার প্রাণরক্ষা করেছ, তোমার জন্য কী করতে পারি বলো। আমি কাঁদো কাঁদো হয়ে বললুম, আমার জন্য আর কারও কিছু করার নেই মশাই। আমি ক্লাস সিক্সে ফেল করেছি। আমার আর বাঁচার ইচ্ছে নেই! তখন উনি বললেন, ক্লাস সিক্সে তো! ওতে তো বেশিরভাগই ফেল মারে, আমি ক্লাস সিক্সেই ফেল করেছিলাম। তা তুমি আমার সঙ্গে চলো, আমি তোমার একটা হিল্লে করে দেব।
তা দিল নাকি হিল্লে করে, কর্তা?
তাহলে আর বলছি কী? সেই বুড়োই আমার দাদাশ্বশুর হল কিনা। তারই বাড়িঘর, জমিজমা ভোগ করছি, বুঝলি?
তা বাবু, আপনার বাড়িতে তো আজ আর সুবিধে হল না। তা আমাদেরও তো বিষয়কর্ম আছে! তাহলে আজ আসি গিয়ে? নমস্কার।
ওরে দাঁড়া দাঁড়া, সবে গৌরচন্দ্রিকা করেছি, কথাটা শেষও হয়নি ভালো করে, এর মধ্যেই চলে যাচ্ছিস যে বড়! বলি অদ্রতা ভদ্রতা বলেও কি কিছু নেই নাকি রে? তা তুই ভাবলি কী? আমারও কি বিষয়কর্ম নেই নাকি? এই রাত জেগে কি এমনি এমনি বসে আছি? চোর ছ্যাঁচড়াদের সঙ্গে রঙ্গ রসিকতা করব বলে?
কী যে বলেন কর্তা! আমাদের মতো অধম মনিষ্যিদের সঙ্গে আপনার মতো মানুষের কি আর বিষয়কর্ম থাকতে পারে বলুন।
আহা, চোর বলে কি আর পচে গেছিস নাকি? ভালো করে ভেবে দেখলে সমাজে চোরও ফ্যালনা নয়। তারাও দেশের কাজই করে। তবে কিনা ঘুরপথে। থেমে-থাকা টাকারে ওরাই তো সচল করে, তাতে ব্যবসা বাণিজ্যের সুসার হয়, দেশের সম্পদ বাড়ে।
বটে কর্তা! এ তো তাজ্জব কথা শুনছি!
হক কথা শুনলে অনেক সময়ে আজব লাগে বটে। তবে যা বলছি একেবারে ন্যায্য কথা।
তা বাবু, কথাটা কী?
কথাটা অতিশয় গুহ্য। পাঁচকান যেন না হয়!
আজ্ঞে, মা কালীর দিব্যি।
ব্যাপারটা হল আমার দাদাশ্বশুর যা কিছু দিয়ে থুয়ে গেছে তা ওই নিজের নাতনির নামে। আমার দাদাশ্বশুর নিতাইপদ দাস অতি ঘুঘু লোক ছিল, বুঝলি। তার নাতনির সঙ্গে বিয়ে ইস্তক আমি একরকম ঘরজামাই হয়ে আছি বটে, কিন্তু ভারি হাততোলা হয়ে থাকতে হয়। ইচ্ছেমতো কানাকড়ি খরচা করার উপায় নেই। নিতাইপদর নাতনি, অর্থাৎ আমার বউ বাতাসীও ভারি হুঁশিয়ার মেয়ে, দাদুর মতোই, বাজার করার খরচা দিলে পাই পয়সার হিসেব নেয়, এক পয়সা এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই। তাই জীবনটায় ঘেন্না ধরে গেছে। বুঝতে পারলি কিছু?
একটু একটু যেন পারছি কর্তা। আর একটু ভেঙে বলুন।
বাতাসী হুঁশিয়ার মহিলা বটে, কিন্তু ঘুমলে একেবারে কাদা। পটকা ফাটালেও তার ঘুম টসকায় না। তার আঁচল থেকে চাবিটা খসিয়ে নিয়ে সিন্দুকটা খুলে, বেশি নয়, এক বান্ডিল টাকা সরিয়ে নিবি বাপু? তোকে না হয় ওর থেকে দশটা টাকাই দেব।
মোটে! বান্ডিলে কত থাকার কথা?
ওরে, সে বেশি নয়, হাজার দশেক হবে মেরে কেটে। এ বাজারে সে আর কত টাকা?
তাহলেই বুঝুন, দশ টাকা এ বাজারে আরও কত কম! চোখেই দেখা যায় না।
আহা, না হয় পঞ্চাশই পাবি।
না মশাই ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে পারব না। আমার সময় নষ্ট হচ্ছে। ও কাজ তো আপনি করলেই পারেন।
চেষ্টা কি আর করিনি রে বাপু। কী জানিস, আমি কাছাকাছি গেলেই বাতাসী যেন আমার গায়ের গন্ধ পায়। বাড়ি ভর্তি ছেলে-মেয়ে আত্মীয়দের সামনে এ বয়সে হেনস্থা হতে কার ভালো লাগে বল।
সে আপনি যাই বলুন, পাঁচ হাজারের নীচে হবে না। রাজি থাকলে বলুন, আমার সময় নষ্ট হচ্ছে।
তাহলে দু'বান্ডিল সরাস।
তাহলে দশ হাজার।
তুই তো ভারি সেয়ানা দেখছি।
সে তো আপনিও কর্তা। রাজি?
অগত্যা। আয় বাপু, পাছদুয়ারটা খুলে দিচ্ছি।
যে আজ্ঞে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন