নবজীবনের আঁচিল

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov52

আপনিই কী নবজীবনবাবু?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

শুনেছিলুম নবজীবনবাবুর নাকের বাঁ-পাশে একটা কালো রঙের বড় আঁচিল আছে!

আছে নাকি? তা থাকতে পারে।

কিন্তু আপনার তো সেটা নেই দেখছি!

তাহলে নেই। কী করা যাবে বলুন! তা আপনি খুঁজছেন কাকে? নবজীবনবাবুকে না তার নাকের পাশের আঁচিলটাকে?

কী যে বলেন স্যার! আঁচিলকে খুঁজতে যাব কেন? আঁচিলের সঙ্গে আমাদের দরকারটাই বা কি? তবে কিনা একটা আইডেন্টিটি মার্ক হিসেবে আঁচিলের মাঝে মাঝে প্রয়োজন হয়—এই যা।

তা বৈ কি! কোনও ছোটখাটো জিনিসকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা উচিত নয়। কখনও কখনও আঁচিল, তিল, ট্যারা চোখ, বাঁকা ঠোঁট অতি গুরুতর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমার ছোট মামা অবনী তালুকদার তো তাঁর বাঁ-হাতের ছয় নম্বর আঙুলটার জন্যই মরতে মরতেও বেঁচে গেলেন।

বটে! তাঁর বাঁ-হাতে ছ'টা আঙুল ছিল বুঝি?

ছিলও বলা যায়, আবার ছিল নাও বলা যায়।

পরিষ্কার বোঝা গেল না।

আসলে ছোট মামার বাঁ-হাতে ছ'টা আঙুলই ছিল। বুড়ো আঙুলের পাশ দিয়ে আরও একটা খোকা আঙুল এমনভাবে উঁচিয়ে থাকত যে, একটা ইংরিজি ভি অক্ষরের মতো দেখা যেত। আমরা জ্ঞান হয়ে ইস্তক দেখে আসছি। কিন্তু একদিন বব্বর সাহুর গুণ্ডারা যখন তাঁকে খতম করতে এল এবং মারার জন্য ভোজালি, চাকু এবং পিস্তল নাচাতে নাচাতে যখন ঘিরে ফেলেছে প্রায়, আর মামা যখন দু'হাত তুলে 'মেরো না বাপু, মেরো না বাপু' বলে আর্তস্বরে চিৎকার করছেন তখনই গুণ্ডাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, আরে, এ তো অবনী তালুকদার নয়! অবনীর তো বাঁ-হাতে ছ'টা আঙুল! একে মারলে যে মহাপাতক হবে। আমার ছোট মামা ওই এক আঙুলের জন্যই বেঁচে গেলেন।

কিন্তু তাঁর ছ'নম্বর আঙুলটা গেল কোথায়?

তা কে বলতে পারে মশাই! আঙুল তো আর ঠিকানা রেখে যায়নি।

কিন্তু আঙুল তো আর অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না। ভগবানের দয়ায় আমাদেরও আঙুল নিয়েই বসবাস করতে হয়। কখনও শুনিনি যে, কারও হাত বা পায়ের আঙুল হঠাৎ করে গায়েব হয়ে গেছে। এ তো আর হাউনির ম্যাজিক নয়!

আচ্ছা ম্যাজিক হতে যাবে কেন? ম্যাজিকের কথা হচ্ছে না। আর হাউনি সাহেব কখনও আঙুল অদৃশ্য হওয়ার ম্যাজিক দেখাননি। তবে তিনি নিজে মাঝে মাঝে অদৃশ্য হতেন বটে।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে বলুন তো!

আসলে ছোট মামা একটু বেখেয়ালী লোক। দেয়ালে পেরেক পুঁততে গিয়ে ওই ছয় নম্বর আঙুলটায় পেরেকের একটা খোঁচা লেগেছিল। উনি চোটটা তেমন গ্রাহ্য করেননি। পরে সেপটিক হয়ে আঙুলটা ফুলে যখন কলাগাছ না হলেও প্রায় ছোটখাটো মোচার সাইজ নিল তখনই, ডাক্তারেরা বললেন আঙুলটা কেটে বাদ না দিলে পরে হয়তো গোটা হাতটাই কেটে বাদ দিতে হবে। কারণ, মামার ওই ছয় নম্বর আঙুলটায় গ্যাঙগ্রিনের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল।

তাহলে আপনি বলছেন যে, ভগবান যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন, তাই না?

না মশাই, চট করে একটা সিদ্ধান্তে লাফিয়ে পড়াটা ঠিক নয়। ভগবান যা করেন তা যদি মঙ্গলের জন্যই হবে তাহলে ছয় নম্বর আঙুলটা মামাকে দিতেই বা গেলেন কেন বলুন! পাঁচ আঙুলেই যখন সকলের দিব্যি কাজ চলে যাচ্ছে তখন এই বাড়তি আঙুলটা বড্ড বাড়াবাড়ি নয় কি?

সেটা ভেবে বলতে হবে।

তা ভাবুন না। ভাবতে কে বারণ করেছে?

ভেবে ফেলেছিও মশাই!

কী ভাবলেন?

ওই ছয় নম্বর আঙুলটা ভগবান দিয়েছিলেন বলে এবং শেষে সেটা কাটা পড়েছিল বলেই না বব্বর সাহুর গুণ্ডারা ওঁকে প্রাণে মারেনি। তাহলেই বুঝুন ভগবান মঙ্গলময় কিনা!

আহা, বব্বর সাহুর দিকটাও তো একটু ভাববেন। সে যে মামার খুনটা করাতে পারল না বলে নিজেই হাবু দাসের হাতে খুন হয়ে গেল, তার বেলা?

বব্বর সাহু কি খুন হয় গেছে নাকি মশাই?

তবে? ভগবান কিন্তু একচোখা মানুষ, বুঝলেন?

তবে আপনার ছোট মামাও কিন্তু বিশেষ ভালো লোক নয় কী বলেন?

ছোট মামার কথা আর বলবেন না। তাঁর কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। অবনী তালুকদারের নামে অগুন্তি ফৌজদারি দেওয়ানি মামলা ঝুলছে। রোজই বাড়িতে দিনে-রাতে পুলিশের আনাগোনা। তা আপনারা যেন কার খোঁজে এসেছিলেন?

নবজীবন রায়বিশ্বাস।

হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক। সেইসঙ্গে একটা আঁচিলেরও খোঁজ করেছিলেন যেন, তাই না?

যে আজ্ঞে। নাকের বাঁ-দিকে বড় একটা কালো আঁচিল। আপনার সেটা নেই।

তাহলে কি নাকের বাঁ-দিকে একটা বড় কালো আঁচিলওলা লোক হলেই আপনার চলবে? সেরকম লোক আমার হাতেই আছে। তবে দুঃখের বিষয় তার নাম নবজীবন রায়বিশ্বাস নয়।

বড্ড মুশকিলে ফেললেন মশাই। বেচু ঘড়াই পৈ পৈ করে বলে দিয়েছে টাকাটা ঠিকঠাক নবজীবন রায়বিশ্বাসের হাতেই পৌঁছোনো চাই।

টাকা! কিসের টাকা? কত টাকা? এসব আগে বলবেন তো?

আহা! উত্তেজিত হবেন না। শুধু টাকা শুনেই যদি এত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন তাহলে টাকার অঙ্ক শুনলে যে আপনার হার্টফেল হবে! বরং এক গেলাস ঠান্ডা জল খেয়ে নিই।

আরে না মশাই, টাকাপয়সার ব্যাপার। সিরিয়াস কিনা। বেচু ঘড়াইটা কে বলুন তো আচ্ছা আপনারা কি চা খাবেন? সঙ্গে দুটো করে বিস্কুট?

আজ্ঞে না। কাজের সময় আমরা এসব খাই-টাই না।

আচ্ছা, টাকাটা তাহলে কত বলুন তো!

তা মন্দ নয়। দু'লাখ বত্রিশ হাজার।

ওরে বাবা! সে যে বেশ অনেক টাকা!

যে আজ্ঞে। কিন্তু আঁচিলটা ছাড়া যে টাকাটা হস্তান্তরের উপায় নেই নবজীবনবাবু। আঁচিল যে কী সাঙ্ঘাতিক জিনিস এবার বুঝুন। আহা হা, আপনি অমন হাউমাউ করে কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন কেন?

দুঃখের কথা আর কবেন না মশাই! পাওনাদারদের ঠেলায় এই দুই সপ্তাহ আগে আঁচিলটা অপারেশন করে তুলে ফেলেছি, সিঁথি পালটে ফেলেছি। এখন আমি নবজীবন বললেও লোকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু যদি জানতাম—

তাহলে আজ আসি নবজীবনবাবু? টাকাটা দেওয়া গেল না বলে ভারি দুঃখ হচ্ছে। তবে এই নব জীবনটা আপনি বরং উপভোগ করুন।

Cov53
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%