শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

গোপেনবাবু অতি নিরীহ এবং সজ্জন মানুষ। ধার্মিক বলেও তাঁর বেশ খ্যাতি আছে। তবে গোপেনবাবু নিতান্তই একজন গরিব লোক। একজন বদমেজাজী, হাড়কেপ্পন, সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত মহাজনের গুদামে তিনি হিসেব-রাখা কেরানির কাজ করেন। বেতন খুবই যৎসামান্য। তাতে গোপেনবাবু, তাঁর বৃদ্ধা মা, স্ত্রী এবং ছেলের পেট চলে না। ইদানীং খরচ বাঁচানোর জন্য গোপেনবাবু খাওয়া এতই কমিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর মাথা আজকাল প্রায়ই ভোঁ ভোঁ করে, চোখে অন্ধকার দেখেন। নিজের খাওয়া কাটছাঁট করে তিনি তাঁর বৃদ্ধা মা আর ছেলেকে দুটো বেশি ভাত খাওয়ার সুযোগ করে দেন। আর কেউ টের না পেলেও তাঁর স্ত্রী ব্যাপারটা ঠিকই টের পান। বলেন, এত কম খেলে শরীর টিঁকবে কী করে? গোপেনবাবু ভারি মধুর হেসে বলেন,—আজকাল একটু বয়স হয়েছে তো, তাই আর আগের মতো খেতে পারি না। বড় আইঢাই হয়। এই বলে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে উঠে পড়েন।
অফিসে তাঁর খাটনি প্রচুর। মালপত্র আসছে, যাচ্ছে, সেসব হিসেব রাখা, টাকাপয়সা গোনা এবং খাতায় হিসেব মেলানো। এইসব করতে-করতে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায় অনেক। ধুঁকতে-ধুঁকতে ফিরে পুজোপাট সেরে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। এর ওপর আছে মালিকের ধমক-চমক, শাসানি, কথায়-কথায় মাইনে কেটে নেওয়া বা তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো।
মালগুদামের কাজে উপরি পয়সা আছে। যেসব মহাজন মাল সরবরাহ করে তারা তাঁর সঙ্গে 'বন্দোবস্ত' করতে চেয়েছিল। বস্তায় কম মাল দিয়ে বেশি মাল দেখানোর জন্য। কিন্তু গোপেনবাবু হাতজোড় করে বলেছেন, বেশি খেয়ে মরার চেয়ে না খেয়ে মরাটাই আমার বেশি পছন্দ। ওই পাপের পয়সা আমি নিতে পারব না।
গোপেনবাবু যে ভালো লোক তা তাঁর মালিক বদ্রীপ্রসাদ-ও জানে। বদ্রীপ্রসাদের নিয়ম হল কর্মচারীরা দু-তিন বছরের পুরোনো হলেই কোনও ছুতোয় তাকে বিদেয় করে দেওয়া। তার ধারণা পুরোনো হলেই কর্মচারীরা চুরি করতে শুরু করে। একমাত্র গোপেনবাবুকেই বদ্রীপ্রসাদ বকাঝকা করলেও তাড়ায়নি। টানা এগারো বছর গোপেন এখানে চাকরি করছেন।
কিন্তু শেষ অবধি গোপেনবাবুরও শিয়রে শমন এল। বর্ষাকালে একদিন অনেক রাত অবধি বসে গুদামের হিসেব মেলাচ্ছিলেন গোপেনবাবু। হঠাৎ বদ্রীপ্রসাদ তাঁকে ডেকে বলল,—দেখো গোপেন, তুমি ভালো লোক আমি জানি। কিন্তু ভালো লোকদের নিয়ে বিপদ কী জানো? তাদের ভালোমানুষির সুযোগে অন্যেরা গুছিয়ে নিতে পারে। আমি ভাবছি, ক'দিনের জন্য আমার দেশ রাজস্থানে যাব। তোমার ওপর গুদামের ভার দিয়ে যেতে আমার ভরসা হয় না। ভালো হলেও তুমি শক্তপোক্ত লোক নও। তাই ঠিক করেছি আমার ভাতিজা এখন মাস দুই কাজকর্ম সামলাবে। দু-মাস বাদে ফিরে এসে আমি তোমাকে ডেকে পাঠাব। তবে এ দুই মাসের মাইনে তুমি পাবে না।
গোপেনবাবুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কিন্তু কী আর করেন। ঘাড় কাত করে বললেন,—তাই হবে।
বদ্রীপ্রসাদ বলল,—কাল থেকেই আমার ভাতিজা চার্জ নেবে। কাল থেকে তোমারও ছুটি?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গোপেনবাবু হিসেবের খাতা জমা দিয়ে নীরবে বেরিয়ে পড়লেন। প্রতিবাদ বা হাতে-পায়ে ধরা তাঁর স্বভাব নয়। বাইরে অন্ধকার রাস্তায় বেরিয়ে তাঁর মনে হল, দু-মাস অনেক লম্বা সময়। এতদিন তিনি বাঁচবেন না, কারণ তাঁর আর বাড়তি সম্বল নেই। তাঁর একমাত্র সম্বল হলেন ভগবান। তা ভগবানের যদি ইচ্ছে হয় তবে তিনি সপরিবারে মরবেন।
মনটা খারাপ বলে তিনি সরাসরি বাড়ি গেলেন না। ভাবলেন, নদীর ধারটায় গিয়ে খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে মাথাটা একটু ঠান্ডা করেন।
তা ওখানকার নদীটা তেমন চওড়া নয়, তবে জলে খুব স্রোত। নদীর ধারটা এই বর্ষার রাতে যেমন অন্ধকার, তেমনি নির্জন। নদীর ধারে একটা গাছের তলায় বসে গোপেনবাবু চুপচাপ অন্ধকারে স্রোতের দিকে চেয়ে রইলেন। বাড়ি গিয়ে সত্যি কথাটা যখন বলবেন তখন কী হবে সেটাই ভেবে তিনি চিন্তিত হচ্ছিলেন। না, ভাগ্যের ওপর তাঁর রাগ নেই, ভগবানের ওপর তাঁর অভিমান নেই, কারও ওপর তাঁর হিংসে নেই, কাউকে তিনি শত্রু বলেও মনে করেন না। যা ঘটে, যা ঘটছে সবই তিনি মেনে নেন।
হঠাৎ দেখলেন, সামনেই নদীর ধার থেকে একটা লোক উঠে আসছে। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি বলেই মনে হল। কিন্তু এত রাতে তো খেয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা! লোকটা নদী দিয়ে এল কী করে?
ভদ্রলোক সোজা তাঁর দিকে আসছেন দেখে গোপেনবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
ভদ্রলোক কাছে এসে বললেন,—আচ্ছা বিদ্যেধরপুর কী করে যাওয়া যায় বলুন তো, আমার বিশেষ দরকার। আমার ছেলের আজ বিয়ে। বরযাত্রীরা বর নিয়ে এগিয়ে গেছে। আমার নৌকোটাই পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু না গেলেই নয়।
গোপেনবাবু অবাক হয়ে বললেন,—কিন্তু বিদ্যেধরপুর যে অনেক দূর। মাইল দশেক তো হবেই। বাস তো কখন বন্ধ হয়ে গেছে।
ভদ্রলোক মাথায় হাত দিয়ে বললেন, সর্বনাশ! আমি না গেলে যে বিয়ে ভেস্তে যাবে। কোনও উপায় হয় না?
গোপেনবাবু একটু ভেবে বললেন,—আমি একটা গুদামে কাজ করি। ভাগ্যক্রমে আমার সঙ্গে ম্যাটাডরওলাদের জানাশুনা আছে। যদি তাতে যেতে চান তবে ব্যবস্থা হতে পারে।
বাঁচালেন মশাই। এখন ম্যাটাডরই আমার পুষ্পকরথ।
গোপেনবাবুকে সবাই ভারি ভালোবাসে। বাজারের একজন ম্যাটাডরওলাকে গোপেনবাবু গিয়ে বলতেই রাজি হয়ে গেল। ভদ্রলোক ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলেন। গোপেনবাবু বাড়ি ফিরে এলেন।
পরদিন দুর্বল শরীরে ঘুম থেকে উঠে পুজোপাঠ সেরে একটু চা খেয়ে এক চিলতে বারান্দায় গিয়ে বসে রোদ পোয়াতে লাগলেন। আজ আর কাজে যেতে হবে না। বদ্রীনাথ এ মাসের মাইনেটাও দিয়ে যায়নি। সুতরাং হাঁড়ি চড়বে কি না কে জানে, বসে-বসে তিনি কালকের লোকটার কথা ভাবতে লাগলেন। লোকটা কী ছেলের বিয়েতে গিয়ে ঠিক সময়ে হাজির হতে পেরেছিল?
বসে-বসে একটু ঢুলুনি এসেছিল গোপেনবাবুর।
হঠাৎ গোপেনবাবু, ও গোপেনবাবু, ডাক শুনে চোখ চাইলেন। সামনে কাল রাতের সেই ভদ্রলোক। দিনের আলোয় দেখা গেল, মানুষটির বেশ সম্ভ্রান্ত চেহারা, সুপুরুষ এবং অমায়িক।
গোপেনবাবু শশব্যস্তে উঠে বললেন,—আপনার ছেলের বিয়ে ঠিকমতো হয়ে গেছে তো?
হ্যাঁ, সব ভালোয়-ভালোয় মিটে গেছে। কিন্তু ম্যাটাডরওলা বলছিল, আপনার নাকি চাকরি গেছে?
আজ্ঞে, ওরকম ঘটনা তো ঘটেই। আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না।
শুনুন মশাই, সম্প্রতি আমার দিদিমা মারা গেছেন। মরার সময় তিনি আমাকে নগদ দশ লাখ টাকা আর বিষয়-সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। টাকাটা পড়ে আছে সিন্দুকে। ভাবছি এই তায়ের গঞ্জে একটা ব্যবসা করব। আপনার মালিক যা করে তাই। পাইকারি মাল বেচাকেনা। ব্যবসা দেখার সময় আমার নেই। তাহেরপুরে আমার নিজের আরও কয়েকটা বড় কারবার আছে। ব্যবসাটা দেখবেন আপনি। শুনেছি আপনি বড় সৎ লোক। আপনি আমার কর্মচারী হবেন না কিন্তু, হবেন ওয়ার্কিং পার্টনার। ব্যবসার সব দায়িত্ব আপনার। শুধু লাভের অর্ধেকটা আমাকে পাঠিয়ে দেবেন। টাকা ফেলে রেখে লাভ কী বলুন, কাজে লাগুক। টাকা যত নড়ে, তত বাড়ে।
গোপেনবাবু ভরি লজ্জায় পড়ে আপত্তি করতে লাগলেন। কিন্তু ভদ্রলোক ছাড়লেন না। বললেন,—আমি লোক চিনি মশাই, আমাকে ফেরাতে পারবেন না।
গোপেনবাবু রাজি হলেন, ভদ্রলোক একটা দশ লাখ টাকার চেক কেটে তাঁর হাতে দিয়ে বললেন,—আজই বড় একটা গোডাউন ভাড়া নিন।
গোপেনবাবু বদ্রীপ্রসাদের ব্যবসার সব মারপ্যাঁচ জানেন। কর্মচারীদেরও চেনেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর ব্যবসা জাঁকিয়ে উঠল। বদ্রীপ্রসাদের খদ্দেররা এসে ভিড় করতে লাগল গোপেনবাবুর গুদামে।
মাসখানেকের মধ্যে টাকার বান ডেকে গেল। কিন্তু গোপেনবাবুর মাথা গরম হল না। শান্তভাবে খুব বিচক্ষণতা আর দক্ষতার সঙ্গে তিনি হাল ধরে রইলেন। ভোগ বিলাসিতার দিকে গেলেন না। অমিতব্যয়ের পথে হাঁটলেন না। সঞ্চয়ে মন দিলেন। ব্যবসা আরও বাড়িয়ে ফেললেন। লাভের অর্ধেক নিয়মিত কৃষ্ণকিশোরবাবুর কাছে পৌঁছে দিতে লাগলেন। সবাই খুশি।
দু-মাস বাদে বদ্রীপ্রসাদ ফিরে নিজের ব্যবসার হাল দেখে মাথা চাপড়াতে লাগল। তার অপদার্থ ভাতিজা ব্যবসা ডুবিয়ে বসে আছে। লোকমুখে গোপেনবাবুর নামডাকও শুনল সে।
একদিন নিজের চোখে গোপেনের ব্যবসা দেখতে এসে বলল,—গোপেন, তুমি আমাকে পিছন থেকে ছুরি মারলে তাহলে?
গোপেনবাবু দুঃখিতভাবে বললেন, না শেঠজি, ছুরি আপনি যে নিজেই নিজেকে মেরে বসে আছেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন