শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

১৯৫৩। শীতকাল। জানুয়ারি।
প্রফেসর চক্রবর্তী ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার সময় শান্তর দিকে তাকিয়ে বললেন—এই পিরিয়ডের পরই খেলা অ্যারেঞ্জ করো। ইটস এ পারফেক্ট ডে ফর ক্রিকেট।
শান্ত মাথা নাড়ল। তার চোখ দু'খানা বড় বড়, ঘাড় পর্যন্ত লম্বা কোঁকড়ানো কালো চুল, গায়ের রং মাজা, একটু বেঁটে, কিন্তু সুপুরুষ। তার স্বভাব ঠান্ডা, মুখে কথা খুবই কম। সে ত্রিপুরার রাজবাড়ির আত্মীয়, আসামে তাদের বিশাল ব্যবসা।
প্রফেসর চক্রবর্তীর পিছু পিছু ক্লাসের ছ'টা রোগা, নিষ্প্রাণ লাজুক মেয়ে সারবদ্ধভাবে তাদের কমনরুমে চলে যায়। তারপর ছেলেরা নিয়মমতো হৈ-হৈ করতে থাকে।
খেলা মানেই ছুটি নয়। শুধু খেলোয়াড়দের ছুটি। টিম তৈরি করার সম্পূর্ণ ভার শান্তর ওপর। কাজটা খুব সহজ নয়। ক্লাস ছেড়ে অনেকেই খেলার মাঠে যেতে রাজি হয় না। পারসেনটেজের ভয় তেমন নেই, কারণ সেটা পরে প্রফেসর চক্রবর্তী ম্যানেজ করেন। কিন্তু পড়াশুনোয় ফাঁকি দিতে অনেকেই তেমন রাজি নয়। ক্রিকেট-পাগল চক্রবর্তীর পাল্লায় পড়ে ক্রিকেট খেলুড়েদের রোজ ক্লাস মার যাচ্ছে।
শান্ত তার ফোর্থ ইয়ারের পাঁচজনকে ইশারা করল। অনুগত এই পাঁচজন কোনোদিনই আপত্তি করে না। কিন্তু দরকার বাইশজন। অন্য ইয়ার থেকে নিতে গেলেই মুশকিল বাধে।
শান্ত বারান্দায় বেরিয়ে এসে চারদিকে চাইল। সামনেই চমৎকার সবুজ মাঠ ঘিরে বাগান। গাদা গাদা ক্রিসেনথিমাম ডালিয়া ফুটে আছে। চোখ জুড়িয়ে যায়।
শান্ত একটা নতুন ছেলের কথা ভাবছিল। সদ্য ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। রোগা, সাদা, লম্বা চেহারা। ভারি লাজুক আর অপ্রতিভ ধরনের ছেলে। খুব নার্ভাস। ছোকরা যে ক্রিকেট বা খেলাধুলোর কিছু জানে তা দেখলে মনেই হয় না। বরং কবি কবি ভাব আছে একটা।
শান্ত ছোকরাকে প্রথম নজর করে এক অদ্ভুত ঘটনা থেকে। সেদিনও খেলা চলছিল। মাঠের বাইরে শীতের রোদে অনেকে গুলতানি করছে। চঞ্চল মিত্র-র হাতে ব্যাট। মহা মারকুটে খেলোয়াড়। একটা লোফফা বল পেয়ে চঞ্চল সেটা অফ-ড্রাইভ মেরেছে। এত জোরে যে চোখে দেখা যায় না। কিন্তু সেটা আদতে ছিল ক্যাচ। অফের ফিলডসম্যান বলের গতি দেখে ধরার চেষ্টাই করেনি। বেকায়দায় ধরতে গেলে হাতের তেলো ফাটিয়ে বা আঙুলের হাড় মটকে সেটা বেরিয়ে যেত। জোরালো মারের বলটা ছোট মাঠ পেরিয়ে বিদ্যুৎবেগে সোজা যাচ্ছিল যেখানে প্রফেসর দেবনাথ, প্রফেসর সরকার আর প্রফেসর দত্ত বসে গভীরভাবে কিছু আলোচনা করছিলেন। দেবনাথের পিঠে বলটা গিয়ে নির্ঘাত লাগত। সেই আশঙ্কায় দু'-একজন চেঁচিয়েও উঠেছিল। শান্ত অবাক হয়ে দেখল, রোগা ফর্সা ও দুর্বল চেহারার সেই ছেলেটা হঠাৎ কোত্থেকে ভুঁইফোঁড় উঠে এসে খুব হেলাফেলায় বলটা লুফে নিয়ে মাঠের মধ্যে ছুঁড়ে দিল। তারপর গিয়ে বসল কয়েকজন বন্ধুর মাঝখানে শীত-দুপুরের আড্ডায়।
ছোকরাটি কে, এই প্রশ্ন তখনই মাথায় খেলেছিল শান্তর। খেলার পর খোঁজ নিতে গিয়ে দেখল, ছোকরাকে আদতে কেউই প্রায় চেনে না। অনেককে জিজ্ঞেস করতে করতে অবশেষে কে একজন বলল—ও বোধহয় ফার্স্ট ইয়ার আর্টসের ছাত্র কুশল। হোস্টেলে থাকে।
শান্ত বর্মন নিজেও হোস্টেলে থাকে। দু'নম্বর ব্লকের দক্ষিণ কোণের ঘরে তার রাজসিক বিছানা, চমৎকার সাজানো টেবিল। প্রচুর বকশিস পায় বলে হোস্টেলের চাকর-বাকরেরা তার ব্যক্তিগত চাকরের মতো খেটে দেয়। রোজ ভালো হোটেল থেকে তার জন্য খাবার-দাবার আসে। সবাই জানে, শান্ত বিরাট বড়লোকের ছেলে, রাজবাড়ির আত্মীয়। কারো সঙ্গে হুটোপাটি করে মিশতে পারে না শান্ত। তার ব্যক্তিগত বন্ধুবান্ধব আছে কয়েকজন, তাদের সঙ্গেই আড্ডা মারে। তবে ভালো স্বভাবের দরুন সে প্রায় সকলেরই প্রিয়। তার বিরুদ্ধে কারো কিছু বলার নেই। মাঝে মাঝে সে দেদার খরচ করে হোস্টেলের ছাত্রদের ফিস্টির আয়োজন করে।
সেই রাতেই শান্ত খোঁজখবর করে জানল, কুশল ভট্টাচার্য এক নম্বর ব্লকের নীচের তলায় ছাব্বিশ নম্বর ঘরে থাকে। চাকরকে দিয়ে তাকে ডাকাল শান্ত।
ভারি লাজুক আর ভীতু ছেলেটা খুবই নার্ভাস অবস্থায় রাত আটটা নাগাদ শান্তর ঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে বলল—আপনি ডেকেছেন?
শান্ত খুব স্নেহভরে ডাকল—এসো।
ছেলেটা এল, দাঁড়িয়ে রইল। মুখে-চোখে একটা অনিশ্চিত ভয়-ভয় ভাব। শান্ত তার ডেসকের খোপ থেকে দুটো কমলালেবু বের করে ছেলেটার হাতে দেয়। কেউ এলে তাকে কিছু দিয়ে আপ্যায়ন করাটা তার পরিবারগত, জন্মগত অভ্যাস।
ছেলেটা লজ্জা পায়, কিন্তু নেয়।
শান্ত খুব নীচু গলায় জিজ্ঞেস করে—তুমি ক্রিকেট খেলতে জানো?
—একটু-আধটু।
—এত রোগা কেন?
চেহারা সম্পর্কে ছেলেটার কমপ্লেক্স আছে বোধহয়। 'রোগা' কথাটা শুনে খুব লজ্জিত হয়ে পড়ল।
শান্ত খুব স্নিগ্ধ হেসে বলল—রোগারা অবশ্য বেশ চটপটে হয়।
ছেলেটা কথা বলছিল না। মৃদু হাসছিল শুধু। কিন্তু শান্ত টের পায়, লজ্জা ঘুচলে ছোকরা বিস্তর কথা বলবে।
সেই দিন আর বেশি কথা হয়নি।
আজ টিম করার সময় শান্ত সেই ছেলেটার কথা ভেবে ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসঘরের সামনে আসে।
কলেজের সব ছেলেই একবাক্যে শান্ত বর্মনকে চেনে। কলেজ ক্রিকেট টিমের ক্যাপটেন এবং বড়লোক বলে তো চেনেই, আর চেনে তার শ্যামবর্ণ, বেঁটে, কিন্তু অসম্ভব অভিজাত চেহারার জন্য। সে যে বড় বংশের ছেলে তা দেখলেই যে কেউ টের পায়।
ফার্স্ট ইয়ারে ক্লাসে কিছু হৈ চৈ চলছিল, শান্ত দরজায় দাঁড়াতেই গোলমালটা মন্ত্রবলে থেমে যায়। শান্ত দৃকপাত না করে নৈর্ব্যক্তিকভাবে ক্লাসঘরের ভিতরে চেয়ে মৃদু গলায় বলে—কুশল আছে?
—এই তো কুশল! থার্ড বেঞ্চ থেকে কয়েকজন ছেলে ঠেলেঠুলে কুশলকে দাঁড় করিয়ে দেয়।
শান্ত তার দিকে চেয়ে গম্ভীর মুখে বলে—একবার মাঠে এসো, কাজ আছে।
বলেই শান্ত আবার ধীর পদক্ষেপে খেলোয়াড় জোগাড় করতে রওনা দেয়।
ভিক্টোরিয়া কলেজ আর জেংফিনস স্কুলের মাঝ বরাবর চমৎকার ঢালু মাঠ শীতের রোদে মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে। মাঝখানে সযত্নে তৈরি করা ক্রিকেটের পিচ।
এবার শীত পড়েছে সাঙ্ঘাতিক। এই দুপুরেও হিম হাওয়া টেনে নিচ্ছে রোদের তাপ। দক্ষিণ দিকে মিশনারি স্কুল, পাশে বিশাল রাসমেলার মাঠ। শীতের দুপুরে টিফিনের ছুটিতে চারদিকে পিল পিল করছে ছেলেরা।
মাঠের পাশে বটগাছতলার প্যাভিলিয়নে রাশিকৃত প্যাড, ব্যাট, স্টাম্প জড়ো হয়েছে। পূর্বোক্ত বাইশজন খেলোয়াড়। অফ পিরিয়ডে ছেলে-মেয়েরা বইখাতা হাতে আড্ডা মারতে এসে বসছে মাঠের সীমানার বাইরে।
কুশল প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেছে। শান্ত বর্মন তাকে মাঠে কেন ডেকেছে তা খানিকটা বুঝেছে সে। সেইদিন সেই যে ক্যাচটা ধরেছিল সেটাই বুমেরাং হয়ে ফিরে এল বুঝি! সেদিন কেউ সশব্দে বাহবা দেয়নি বটে, কিন্তু কুশল টের পেয়েছিল সে বেশ শক্ত একটা ক্যাচ ধরেছে।
ছেলেবেলা থেকেই তার দুরারোগ্য এক লজ্জা। পাঁচজন লোকের সামনে, অচেনাদের সামনে সে আপনা থেকেই কুঁকড়ে যায়। তার তখন কথা আসে না, হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে আসে। বিস্তর ভুগেছে সে এর জন্য। এই ষোলো এবং সতেরোর মাঝামাঝি বয়সে সে বুঝে গেছে, এই দুরারোগ্য লজ্জা আর স্নায়ুদৌর্বল্যের জন্যই এ-জীবনে সে কিছু করতে পারবে না। নইলে সে ক্রিকেট কিছু খারাপ খেলে না। মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় প্রথম প্রথম লজ্জায় সে কাউকে বলতে পারেনি যে, সে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলতে পারে। একদিন হঠাৎ একটা ছিটকে আসা ফুটবলে শট মেরে সেটা আবার মাঠের মধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিল সে। সেইদিনই তার শটের ভঙ্গি দেখে জোর করে ছেলেরা তাকে মাঠে নামায়। মন্দ খেলেনি সেদিন। পরে সংকোচ চলে যাওয়ায় সে অপ্রতিরোধ্য সেন্টার ফরোয়ার্ড হয়ে উঠেছিল। স্কুলে সে ক্রিকেটও খেলেছে পাকা হাতে। তবে কোনওদিনই ম্যাচের সময় মাঠে নামেনি। দলে নাম থাকা সত্ত্বেও সে পালিয়ে ফিরেছে।
আসলে কুশল ভালোবাসে কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়তে, ভালোবাসে ভাবতে, একা থাকতে। স্কুল থেকেই তার হোস্টেল জীবনের শুরু। আর কে না জানে হোস্টেলের ছেলেরা কেমন দ্বিধাহীন, মুক্ত, আনন্দময়, হুল্লোড়ের জীবন কাটায়। কিন্তু কুশলের তা নয়। বরাবর এক দ্বিধা, আত্মপ্রত্যয়ের অভাব, সংকোচ তাকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছে। নিজের এই অপদার্থতা সে হাড়ে হাড়ে টের পায়, কিন্তু তার কিছু করারও নেই।
বটগাছের ছায়ায়, যেখানে খেলোয়াড়েরা তৈরি হচ্ছে সেখান থেকে অনেকটা দূরে কুশল থামে এবং অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। যদি ডাকে যাবে, নইলে পালাবে।
শান্তই ডাকে—কুশল!
সে এগোয় পায়ে পায়ে জড়তা নিয়ে।
প্রফেসর চক্রবর্তী একটা ফোল্ডিং চেয়ারে বসে ভ্রূ কুঁচকে চেয়েছিলেন। বললেন—বরুণ লাহিড়িকে খবর দাওনি শান্ত?
—উনি আসছেন।
—ভালো।
—এই নতুন ছেলেটিকে আজ ট্রায়াল দিচ্ছি স্যার। বলে শান্ত তাকে চোখের ইশারায় ডাকে।
প্রফেসর চক্রবর্তী সচকিত হয়ে বলেন—কে?
—এই যে। শান্ত কুশলের পিঠে হাত দিয়ে সামান্য ঠেলে আনে সামনে।
প্রফেসর চক্রবর্তী ভ্রূ কুঁচকেই তাকে দেখেন। চক্রবর্তী কাঠবাঙাল, মাঝে মাঝে দেশি কথা বলে ফেলেন।
এখন বললেন—তোমার বাড়িতে খাইতে-খুইতে দেয় না নাকি হে! শরীরটায় তো কিছুই নাই। ব্যাট আলগাইতে পারবা?
শরীরের কথা উঠলেই কুশল লজ্জায় মরে যায়। বাস্তবিকই এই রোগা, ফ্যাকাসে, ফিনফিনে চেহারা নিয়ে তার যে অস্তিত্ব, সেটা প্রায় অনস্তিত্বের পর্যায়ে পড়ে। এই শরীর নিয়ে সে যে খেলাধুলো করে এটা প্রায় সকলের কাছেই অবিশ্বাস্য। কুশল এমনিতেই লাজুক, তার ওপর রোগা বলে নিজেকে সে প্রায় সবসময়েই লুকিয়ে রাখে। প্রফেসর চক্রবর্তীর কথার সে কোনও জবাব দিল না, তবে লাল হয়ে গেল লজ্জায়।
শান্ত তাকে লজ্জা থেকে রেহাই দিতেই এগিয়ে এসে বলল, রোগা হলেও স্যার, কুশলের কাঠামোটা ভালো। হি হ্যাজ গুড বোনস।
চক্রবর্তী নাক কুঁচকে বললেন, দেখো ট্রায়াল দিয়ে তোমার নাম কী হে ছোকরা?
কুশল ভট্টাচার্য।
দেশ কোথায়?
ঢাকা, বিক্রমপুর।
কও কী! তুমি তো আমার দেশের পোলা। কোন গ্রাম কও তো?
বারদি।
উরেব্বাস! বারদি তো আমার পাশের গ্রাম। তিন মাইল দূর মাত্র। কার বাড়ি কও তো! মন্মথ ভট্টাচার্য কি তোমাগো কেউ হয়?
আমার দাদু!
ঠার্কুদা? তুমি কার পোলা, চারু, হারু আর নাড়ু, তিনজনের কোনজন তোমার বাপ?
আমার বাবার ডাকনাম নাড়ু।
সর্বনাশ! আরে, তুমি যে...আরে ছিঃ ছিঃ, এতকাল পরিচয় দাও নাই! অ্যাঁ! নাড়ুর পোলা! নাড়ু আছিল আমাগো হিরো। এ টেরিফিক স্পোর্টসম্যান। খেলার পর দেখা কইরো। বাড়িতে লইয়া যামু। বাই দি বাই, নাড়ু এখন কই আছে কও তো?
লামডিং।
রেলে কাম করে তো!
হ্যাঁ।
তুমি আমাগো লতায়-পাতায় আত্মীয় হও। ছিঃ ছিঃ, এতকাল পরিচয় হয় নাই।
কুশল জানত যে প্রফেসর চক্রবর্তী তাদের আত্মীয় এবং তার বাবার একজন প্রিয় পাত্র। কিন্তু অত্যধিক লাজুক আর মুখচোরা বলে সে কখনো চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় করার কথা ভাবতেও পারেনি।
খেলোয়াড়রা এসে গিয়েছিল। বিভিন্ন গাছতলায় জড়ো হয়ে তারা তৈরি হচ্ছে। বেয়ারা মুকলাল তার দু'জন সহকর্মীর সঙ্গে ধরাধরি করে ক্রিকেটের সাজসরঞ্জাম এনে ফেলল। দেখা দিল ব্যস্ততা।
ভিড় থেকে একটু সরে এসেছিল কুশল। শান্ত এসে বলল, তোমাকে প্রফেসর চক্রবর্তীর দলে দিচ্ছি। আমার দলে আক্রাম নামে একজন বোলার আছে। রিয়েল ফাস্ট। একটু এরাটিক। আমি চাই তুমি তাকে ফেস করো। ভয় পাবে না তো!
না।
এই তো চাই। বলে শান্ত তার কাঁধটা নেড়ে দিয়ে চলে গেল।
খেলা শুরু হয়ে গেল। চক্রবর্তীর দল ব্যাটিং করছে। ওপেন করতে নামলেন চক্রবর্তী আর মানস রায় নামে কলেজের নিয়মিত ওপেনার। চক্রবর্তী দারুণ খেলেন। মানস একটু ডিফেনসিভ।
আক্রাম কেমন বল করে তা আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করছিল কুশল। দৌড়টা একটু কোনাচে। বল ফেলেও ডায়াগোনাল। মারাত্মক হল প্রত্যেকটা বলই গুড লেংথে পড়ে কাঁধ সমান উঁচু হয়ে আসে। এসব বল ছেড়ে দিলে ক্ষতি নেই, এল বি ডবলিউ বা বোল্ড হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু খেলতে গেলে বা মারতে গেলেই বিপদ। আক্রাম বেশ লম্বা। ছিপছিপে গড়ন। অতটা দৈর্ঘ্যের জন্য তার পক্ষে বলকে গুড লেংথ থেকে তোলা সম্ভব হচ্ছে।
কুশল দেখল, চক্রবর্তী বা মানস কেউই আক্রামের বল খেলতে পারছেন না। তিনটে মেডেন ওভার নিল আক্রাম। উইকেট অবশ্য পেল না।
কুশলের মনে হচ্ছিল, আক্রামের বল যদি খেলতেই হয় তবে অনেকটা ফরোয়ার্ডে খেলতে হবে। তাতে ঝুঁকি আছে। কিন্তু বল পিচ পড়ার আগে না খেলতে পারলে কিছুই করার নেই। তাকে যদি আক্রামের বল খেলতে হয় তবে ক্রিজ ছেড়ে ফরোয়ার্ডই খেলবে, স্টাম্পড হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও।
অন্যদিকে বল করছিল মিডিয়াম পেসার সতু। ভালো বল করে। তবে তেমন জোরালো বল না। দু'রকম সুইং আছে। আড়াআড়ি বাতাস ছিল বলে বল ভালোই বাঁক খাওয়াচ্ছে। ফলে রান উঠছে না। চক্রবর্তী অধৈর্য হয়ে পড়ছেন। তিনি মারকুট্টা খেলোয়াড়, ড্রাইভ মারতে ভীষণ ভালোবাসেন। হুক বা সুইপ তাঁর প্রিয় শট নয়, এটা কুশল মাঝে মাঝে মাঠের বাইরে থেকে দর্শক হিসেবে দেখেছে। কিন্তু কুশল এও জাননে, সতুর শর্ট পিচ ডেলিভারি যখন লেগ স্টাম্পে আসে তখন হুক বা সুইপ করলেই ভালো।
চক্রবর্তী আউট হলেন সপ্তম ওভারে, তেরো রান করে। আক্রামের বল ব্লক করতে গিয়ে ক্যাচ দিলেন উইকেট কিপারকে। খুবই হতাশা মুখে মেখে ফিরে এলেন। পরের ওভারে সতু তুলে নিল মানসকে। পরপর আরও তিনজনকে ধরাশায়ী করে দিল আক্রাম তার অদ্ভুত ধরনের বলে।
পাঁচ উইকেটে পঞ্চান্ন রান। সেটা কিন্তু বড় কথা নয়। মফস্বলের ক্রিকেটে এ রকমই হয়। কথা হল, আক্রাম যে সাধারণ মানের বোলার নয় এটা কুশল বুঝতে পারছিল।
চক্রবর্তী বসেছিলেন গাছতলায় একটা ফোল্ডিং চেয়ারে। কাঁধের পিছনে দু'হাত। কুশলকে ডেকে বললেন, প্যাড আপ কর। রাউন্ড অ্যাবাউট একশো রান উঠলেই যথেষ্ট। কত রান করতে পারবা?
কুণ্ঠিত কুশল বলল, জানি না স্যার।
আরে, জানবা কেমনে? ক্রিকেট হল এ গেম অফ গ্রেট আনসার্টেনটি। কথা হইল ইন প্রেজেন্ট কন্ডিশন হাউ ডু ইউ ফিল? নার্ভাস অর কনফিডেন্ট?
কুশল একটু হাসল, দেখা যাক স্যার।
যদি পনেরো রানও করতে পারো আমি তোমারে একখানা প্রাইজ দিমু। যাও, প্যাড আপ কর।
কুশল প্যাড পরল। অ্যাবডোমেন গার্ড নিল। তিনখানা ব্যাটের মধ্যে ভারীখানাই বেছে নিল সে। গ্লাভস পরে ব্যাটখানা একটু নানাদিকে ঘুরিয়ে দেখে নিল। রোগা হলেও সে দুর্বল নয়।
ছয় নম্বর ব্যাটসম্যান পড়ল মিনিট দশেক বাদে। ছ'জনের কেউই আক্রামকে খেলতে পারেনি। আক্রাম তার অদ্ভুত ধরনের বলে পাঁচ উইকেট পেয়ে গেছে।
কুশল যখন নামছিল ততক্ষণে মাঠের চারপাশে লোক জমে গেছে। দর্শকদের মধ্যে অর্ধেক বা তারও বেশি হল মেয়েরা। চেঁচাচ্ছে, বাদাম খাচ্ছে, হাসছে, কুশলের দারুণ লজ্জা করছিল। এত বে-আব্র& নিজেকে তার কোনওদিন বোধ হয়নি।
বিপদ হল, তাকে ফেস করতে হবে আক্রামকেই। এই ওভারের প্রথম বলেই আক্রাম উইকেট পেয়েছে, আরও পাঁচ বল বাকি। কুশলের জুটি শ্যামল এগিয়ে এসে বলল, দেখে খেলো। ডোন্ট বি হেস্টি।
কিন্তু কুশল যতদূর বুঝেছে, আক্রামের বল দেখে খেলতে গেলেই বিপদ বেশি। এ বলে ডিফেন্স খেলার মানেই হয় না। খেলতে হলে ফরোয়ার্ড এবং ক্রিজ ছেড়ে অন্তত দু'-তিন হাত বেরিয়ে গিয়ে। কুশলের পায়ের কাজ ভালো। সে ফনফন করে দৌড়াতে পারে। সুতরাং সে তার স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে নিল।
আক্রাম বল করছে রাউন্ড দি উইকেট, কোনাচে রান আপ। সুতরাং প্রতিটি বলই যাবে অফ স্ট্যাম্পের ওপর দিয়ে। এই হিসেব যদি না মেলে তাহলে কুশলের দুর্ভাগ্য।
আক্রাম দৌড়ে আসছে। কুশল স্থির দাঁড়িয়ে। কিন্তু আক্রামের হাত ওপর উঠতেই কুশল ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এল।
যেরকম ভেবেছিল বলটা এল সেরকমই, তবে পিচ পড়ল একটু বেশি। ফলে কুশল সেটাকে ফুল পিচে পেয়েও ব্যাটের নীচে এবং ঠিক কেন্দ্রস্থলে লাগাতে পারল না। তবু বলটা মিড অফ-এর ভিতর দিয়ে অনেকটাই ছিটকে যাওয়ায় দুটো রান এসে গেল।
তেমন কোনও জমকালো শট নয়। কাজেই মাঠে কোনও প্রতিক্রিয়া হল না।
কুশল মনে মনে হিসেব কষতে লাগল। ক'পা এগোলে ঠিকঠাক ফুল পিচে বলটাকে পাওয়া যাবে।
আক্রামের তৃতীয় বলটা খেলতে ফের ক্রিজ ছাড়ল কুশল, কিন্তু এগোল দু'পা। বলটা একটু বেশি বাঁক খেয়েছে বাইরের দিকে। কুশল শরীরটা পিছনে টেনে ব্যাটটাকে এগিয়ে বলটাকে ফের মিড অফ দিয়ে বের করে দিল। আবার পেয়ে গেল দু'রান। চক্রবর্তী তাকে বলেছেন, পনেরো রান করলেই প্রাইজ। সেই হিসেবে তার আরও এগারো রান করতে হবে।
আক্রামের চতুর্থ বলটা কুশলের হিসেবে ঠিকঠাক এল। কুশল ঠিক মাপে এগোল এবং ব্যাটের নীচের দিকের মাঝখান দিয়ে মারতে পারল। সামান্য বাঁ-দিকে মোচড় দিয়েছিল বলে বলটা আক্রামের পায়ের কাছ দিয়েই একটা বুলেটের গতিতে গিয়ে মাঠ পেরোলো।
চক্রবর্তী বাইরে থেকে চেঁচিয়ে বললেন, আন্দাকোন্দা মাইরো না হে, বিপদে পড়বা।
কিন্তু কুশল তার রণকৌশল স্থির করেই নিয়েছে। আক্রামকে খেলতে হলে এভাবেই খেলতে হবে। অন্য পন্থায় নয়।
পঞ্চম বলটা হুবহু একইভাবে খেলল কুশল, তবে কোণ পাল্টে দিল। বলটা মাঠ পেরোলো মিড অফ দিয়ে ঘাসে চুমু খেতে খেতে। পরিষ্কার মার।
আরে স্ট্যাম্পড হইয়া যাইবা যে! চক্রবর্তী আবার চেঁচালেন।
আক্রামের ষষ্ঠ বলটা যথেষ্ট বাইরের বল। একটু এগিয়ে গিয়ে কুশল বুঝতে পারল সোজা ব্যাটে খেললে বলটা সে ফসকাবেই। উইকেট কিপারের হাতে গেলে নির্ঘাত আউট।
কুশল ব্যাটটাকে বাড়িয়ে বলটাকে খুব আলতো করে চামচের মতো তুলে দিল। ক্যাচ? না, কুশল তার বাবাকে দেখেছে স্লিপের মাথার ওপর দিয়ে বল ওড়াতে। থার্ডম্যানে লোক না থাকলে ভয় নেই। থাকলে মৃত্যু।
থার্ডম্যানে ছিল না। থাকলেও বিপদ হত না। কারণ আক্রামের জোরালো বল ব্যাটে পা রেখে গ্লাইডারের মতো বাতাসে ভর দিয়ে উড়ে গিয়ে সাইট স্ক্রিনের ধার ঘেঁষে মাঠের বাইরে পড়ল। ছক্কা।
পাঁচটা বলে আঠারো রান কম নয়। চারদিকে প্রচুর হাততালি পড়ল।
গুড গোয়িং। চক্রবর্তী বললেন।
ফিল্ডিং বদল হওয়ার সময় ফাইন লেগ থেকে শান্ত এগিয়ে এসে কুশলের কাঁধে হাত রেখে বলল, আমার মুখ রেখেছ। তুমি যে ব্যাট বেশ ভালোই করো এ তো জানতাম না।
কুশল লাজুক হাসি হাসল।
খেলে যাও। কনসেনট্রেট।
সতুর প্রথম বলে শ্যামল একটা রান করল। কুশল ফেস করবে। তার গা যথেষ্ট গরম হয়ে গেছে। আত্মবিশ্বাস আসছে। তবে সতুর বলে স্পিড না থাকলেও কারিকুরি আছে। সহজ নয় খেলা।
কুশল দ্বিতীয় বলটা ছাড়ল। তৃতীয় বলে একটা হুক মেরে বাউন্ডারি করল। চতুর্থ বল ছাড়ল। পঞ্চম বলে নিল আরও এক রান। ষষ্ঠ বলে শ্যামল লোফফা ক্যাচ দিল গালিতে। আউট হয়ে ফিরে গেল। নামল সুনীল।
আক্রামকে আবার খেলতে হবে। মারা ছাড়া উপায় নেই। কুশল তৈরি হল। আক্রামের প্রথম বল ফের কোনাচে, সঠিক লেংথ, কুশল এগিয়ে আবার ফুল টস করে নিয়ে মিড উইকেটে বাউন্ডারি পেল সে।
আক্রামও বোধহয় বুঝতে পারছিল, কুশল তার বল খেলার পদ্ধতি জেনে গেছে। ফলে সে লেংথ কমাল। ওভারপিচও দিল। কিন্তু কুশল, একগুঁয়ে। কুশল তার রণকৌশল না বদলে প্রত্যেকটি বলই খেলতে লাগল ইচ্ছেমতো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে লাফিয়ে লাফিয়ে পঞ্চান্নয় পৌঁছে গেল।
মোট রান উঠে গেল একশো ত্রিশ।
কিন্তু উল্টো দিকে এক এক করে উইকেট পড়ছিল। শেষ উইকেট পড়ল একশো ত্রিশে। পার্টনারের অভাবে পঞ্চান্নতেই থামতে হল কুশলকে।
ফিরে আসতেই চক্রবর্তী উত্তেজিতভাবে ধমকে উঠলেন, আরে, এতদিন তুমি করতাছিলা কী কও তো! এত ভালো হাত, তবু তোমারে ডিসকভার করন যায় নাই! শান্ত, এই ছ্যামড়ারে কলেজ টিমে লইয়া লও।
শান্ত মৃদু হেসে বলল, নেওয়া একরকম হয়েই গেছে স্যার!
শান্ত বর্মনের টিম প্রাণপণ চেষ্টা করল বটে, কিন্তু চক্রবর্তীর টিমের রানকে ছুঁতে পারল না। হেরে গেল। কুশলকে দিয়ে চক্রবর্তী কয়েক ওভার বল করাল। দুটো উইকেট সে পেয়েও গেল।
খেলার শেষে কাঁধে হাত দিয়ে স্নিগ্ধ গলায় বললেন, অনেক দিন পর একজন ইনটেলিজেন্ট ক্রিকেটার দেখলাম, বুঝলা! ভেরি ইনটেলিজেন্ট। আক্রামের ওই বল ওই রকমভাবে ছাড়া খেলন যায় না। তোমার খেলা দেইখ্যা বুঝলাম। চলো, ইউ হ্যাভ আর্নড প্রাইজ।
চক্রবর্তীর কোয়ার্টার কাছেই। বাগানে ঘেরা ছোট্ট একখানা লাল ইটের বাড়ি। সামনে কাঠের জাফরি-ওলা বারান্দা। সামনে দিয়ে অনেকবার কুশল যাতায়াত করেছে। ভিতরে ঢুকল এই প্রথম।
বাইরের ঘরখানা হালকা পলকা চেয়ার-টেবিলে সাজানো। সর্বত্র বই পড়ে আছে। চক্রবর্তী ঘরে ঢুকেই হাঁক দিলেন, আরে কই গেলা গো? দেইখ্যা যাও কারে ধইরা আনছি।
যে রোগা ফর্সা মহিলা এই হাঁকডাকে বেরিয়ে এলেন তার চোখ দু'খানা ভারি ঠান্ডা, স্নিগ্ধ। একটু রুগ্নতার স্পর্শ আছে বটে, কিন্তু রূঢ়তার লেশমাত্র নেই।
চক্রবর্তী উচ্চস্বরে কুশলের পরিচয় দিয়ে বললেন, রিলেটিভ, বুঝলা! কিন্তু এতদিন লজ্জায় পরিচয় দেয় নাই। আহম্মক আর কারে কয়! অ্যান্ড হি ইজ ইন দি মেকিং অফ এ গুড ক্রিকেটার! কী খাওয়াইবা খাওয়াও।
ভদ্রমহিলা কুশলের দিকে চেয়ে স্নিগ্ধ চোখ দিয়ে নিষিক্ত করে দিলেন তাকে। তারপর বললেন, অনেকক্ষণ কিছু খাওনি না?
সত্যিই তাই। কুশল সেই সকালে হোস্টেলে ভাত খেয়েছিল। ক্রিকেটের উত্তেজনায় খাওয়ার কথা মনে হয়নি, সুযোগও পায়নি। পেট জ্বলে যাচ্ছে খিদেয়। সে মাথা নীচু করে হাসল।
লুচি খাবে?
থাকগে, হোস্টেল গিয়ে—
ওমা, কী লজ্জা ছেলের! বোসো, আসছি।
জীবনে এমন সুন্দর দিন খুবই কমই এসেছে কুশলের। লজ্জা-সংকোচের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারা এবং কিছু করা—এর মতো বন্ধনমুক্তি আর নেই। তার ওপর এ-রকম মায়ের মতো গলায় কেউ যদি সারাদিনের সব গ্লানি ধুয়ে দেয় তাহলে কেমন হয়? মনে হয়, আমার চেয়ে সুখী এ পৃথিবীতে আর কে আছে?
খেতে খেতেই কুশল শুনল, চক্রবর্তীর এক ছেলে আর এক মেয়ে। তারা দু'জনেই কলকাতায় পড়াশুনো করে। বালিগঞ্জে চক্রবর্তীদের বাড়ি আছে। ছেলে তারই বয়সী, মেয়ে কিছু ছোট। অ্যালবামে মেয়েটির দিকে চেয়ে কুশলের বুকে একটু তরঙ্গ উঠল। কী অসাধারণ ধারালো মুখশ্রী, কী ছিপছিপে শরীর! একটু অহংকারী কি? হবেও বা। অহংকার ছাড়া কি সুন্দরীদের মানায়!
বুকে নতুন একটু স্বপ্ন নিয়ে কুশল ফিরে এল হোস্টেলে।
দশ বছর পরেকার কথা। কুশলকে আর আগের কুশল বলে চেনা যায় না। তার বয়স এখন ছাব্বিশ বছর। পনেরো বছর আগের তুলনায় সে আর একটু লম্বা হয়েছে। এখন তার চেহারা ছিপছিপে হলেও আর আগের মতো কৃশ নয়। প্রফেসর চক্রবর্তী তার মধ্যে বড় ক্রিকেটারের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। কুশল তত বড় কিন্তু হয়নি। মফস্বল ছেড়ে কলকাতার কলেজে পড়তে এসেছিল সে থার্ড ইয়ারে। কলকাতার ভিড়ে তাকে নতুন করে কেউ আবিষ্কার করতে আগ্রহী ছিল না। সুতরাং ক্রিকেট চুলোয় গেল। সে শুরু করল কবিতা লিখতে। তার কবিতা ছাপবার মতো সমঝদার সম্পাদকও কেউ ছিল না। এক-আধটা ছোট কাগজে ছাপা হল বটে, কিন্তু তাতে কোনও তরঙ্গ উঠল না কোথাও। কুশল কবিতা লেখাও একরকম বন্ধ করে দিল। খুব ভালো ছাত্র সে কোনওদিনই ছিল না। মাঝারি ফলাফল করে সে কলেজের পড়া শেষ করল।
চাকরির বাজার খুবই খারাপ। একটা ইস্কুল মাস্টারি জোটাতেও দম বেরিয়ে যায়। চারদিকে দরখাস্ত পাঠায় কুশল। মাঝে মাঝে ইন্টারভিউ পায়। অল্পের জন্য চাকরি ফসকায়। কয়েকটা মাত্র টিউশানি সম্বল করে কলকাতার প্রচণ্ড অস্তিত্বের লড়াইতে সে নিজেকে যুক্ত রাখে মাত্র। জানে, তার মতো নির্জীব, লাজুক, সঙ্কুচিত যুবকের জন্য পৃথিবীর কোনও চাকরি, সুন্দরী মহিলা বা মেডেল নেই। সফল যুবকদেরও সে দেখতে পায়। তারা কেউই তার মতো নয়। তারা আলাদা রকমের।
শীতের দুপুরে রাসবিহারী ধরে হাঁটছিল কুশল। উদ্দেশ্যহীন সময় কাটানো। রাস্তাটা চমৎকার। ঝকঝকে দোকানপাট, সুন্দর সব বাড়ি। কলকাতার সুন্দর রাস্তা বা পাড়ায় ক্যাবলার মতো ঘুরে বেড়ানো তার প্রিয় অভ্যাস। বেলা পড়লে দেশপ্রিয় পার্কের কাছে একটা বাড়িতে টিউশানি করতে যাবে।
হাঁটতে হাঁটতে পার্কের ধারে এসে দাঁড়াল কুশল। শীতের রোদে ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। সম্মোহিতের মতো সে রেলিঙে ভর দিয়ে চেয়ে রইল। দশ বছর আগের একটা দিন ফিরে আসছিল তাকে ঘিরে। পঞ্চান্ন রানের সেই দুর্ধর্ষ ইনিংস, খেলার পর কাঁধে প্রফেসর চক্রবর্তীর উষ্ণ হাত, আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
কাঁধে আজও কে যেন হাত রাখল। চোখ বুঝে ফেলল কুশল। কে? শান্তদা? প্রফেসর চক্রবর্তী? রঞ্জি ট্রফির কোন নির্বাচক?
কুশল ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল। সাদা চুলের এক বুড়ো মানুষ। প্রায়ই একে পার্কের বেঞ্চে বসে থাকতে দেখেছে সে।
ভদ্রলোক সামান্য হাসলেন, ছোকরা বেশ খেলছে না? ব্যাক লিফট বেশি নেই, অথচ মারের হাত ভালোই। না?
কুশল মাথা নাড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল বুক থেকে।
যত মানুষ ক্রিকেট খেলেছে, খেলা ছেড়েছে, তাদের অনেকেই এ রকম মাঠেঘাটে বসে থাকে খেলা দেখতে। নিজের অতীতকে ফিরে পায় হয়তো।
কুশল আর দাঁড়াল না। কোথায় হারিয়ে গেছে শান্তদা, প্রফেসর চক্রবর্তী, মফস্বলের সেই সব ক্রিকেটের দিন। আজ বাহবা পাওয়ার মতো কিছুই করে উঠতে পারে না সে।
তবু তার মতো করে, নিজস্ব নিয়মে আমৃত্যু বেঁচেও তো থাকতে হবে তাকে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন