গোকুলবাবু

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov70

আজকাল রোজই গোকুলবাবু বাজারে যাবার সময় টের পান, একটা লোক তাঁর পিছু নেয়। কেন নেয়, তা বুঝতে পারেন না। পিছন ফিরে তাকালে লোকটা উলটোদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটতে থাকে। চেহারা রোগা প্যাংলামতো, পরনে একটা আধময়লা সবুজ চেক লুঙ্গি, গায়ে একখানা ঢলঢলে জামা, ভদ্রলোকের মতো পোশাক নয়। মাথায় একটা গামছা জড়ানো থাকায় মুখের ছিরিখানাও বোঝার উপায় নেই। কারণ গামছার একটা দিক দিয়ে মুখখানা আড়াল করে রাখে। ব্যাপারটা বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে গোকুলবাবু ভারি নিরীহ সজ্জন লোক, কারও সাতে-পাঁচে থাকেন না, ঝগড়া-বিবাদ করেন না, টপ করে রেগে যান না। নিরীহ বলেই বোধহয় বাড়ির লোকও তাকে বিশেষ মানে-টানে না, তাঁর বউ ভারি খাণ্ডার মানুষ। গোকুলবাবুকে উঠতে-বসতে উস্তম-মুস্তম করে বকাঝকা করেন। তাঁর দুই ছেলে আর এক মেয়েও তাঁকে বিশেষ গ্রাহ্য করে না। এই নিয়ে গোকুলবাবু ভারি দুঃখেই আছেন। রোজ সকালে তিনি ঠাকুরঘরে বসে ভগবানের কাছে অনুযোগ করেন, আমাকে একটু মানুষের মতো মানুষও তো করতে পারতে?

অবশ্য মানুষ হওয়ার বয়স তাঁর আর নেই। ষাট পেরিয়েছেন। জীবনে আর-কোনও পরিবর্তন তিনি আশা করেন না। এ-ভাবেই জীবনটা কেটে গেলেই হয়।

গোকুলবাবুর মাথাজোড়া টাক, কাঁচা-পাকা ভুড়ো গোঁফ, ভারি নাদুস-নুদুস চেহারা। তাঁর চেহারাটাও তেমন দেখনসই নয়, বরং তাঁকে দেখলেই অনেকের নাকি হাসি পায়। পাড়া-পড়শি, চেনা-পরিচিত লোকেরাও তাঁকে কোনও ব্যাপারেই গুরুত্ব দেয় না। রিক্সাওলা, দোকানদার, মাছওলা, বাড়ির কাজের লোক, পোস্ট অফিসের কেরানি, ছেলের বন্ধুরা, পাড়ার ক্লাবের মেম্বার—কেউ-ই তাঁকে আমলও দেয় না, গুরুত্বও না।

এ রকম একজন নগন্য লোককে ওই প্যাংলামতো লোকটা কেন ফলো করছে, সেটাই বুঝতে পারছেন না গোকুলবাবু। আজও বাজারে বেরিয়ে লোকটাকে দেখতে পেলেন। হাত বিশেক পিছনে লোকটা তাঁর পিছু নিয়ে আসছে। লোকটার মতলব বুঝতে পারছেন না তিনি। সাহায্যপ্রার্থী, না পকেটমার, নাকি খুনী, কিছুই বুঝতে পারছেন না। বেশ উদ্বেগ-বোধ করছেন তিনি। উদ্বেগটা হজমও করতে পারছেন না।

তিনি যে বুদ্ধিমান লোক নন, তা তিনি জানেন। মাথা খাটিয়ে যে একটা মতলব বার করবেন, তেমন মাথাই তাঁর নয়। অথচ ঘটনাটার একটা মীমাংসা হওয়াও দরকার।

তিনি ফিরে তাকালেন। লোকটা বেশ থতমত খেয়ে আকাশ দেখতে লাগল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কয়েক পা হেঁটে গিয়ে ফের আচমকা ফিরে চাইতেই, যেন ভূত দেখে চমকে উঠলেন তিনি। লোকটা এখন তাঁর গজখানেকের মধ্যেই এসে পড়েছে যে!

গোকুলবাবু বেজায় ভয় খেয়ে হঠাৎ তাড়াতাড়ি একটা ছুট লাগাতে গেলেন। কিন্তু অভ্যাস নেই, ধুতিতে পা জড়িয়ে ধড়াস করে পড়ে গেলেন রাস্তায়। ভাগ্যিস আজ রাস্তায় লোকজন ছিল না।

আশ্চর্যের বিষয়, ওই প্যাংলামতো লোকটাই এসে তাঁকে ধরে তুলল।

গামছাটা মুখের ওপর থেকে সরে যাওয়ায় গোকুলবাবু লোকটার মুখ এবার কাছ থেকে স্পষ্ট দেখতে পেলেন। মুখখানা কিন্তু খারাপ নয়, বেশ টানা চোখ, সৌন্দর্যও ভালো, এলেবেলে চেহারা নয়।

তিনি বললেন, 'বাপু হে, তুমি কী চাও? রোজ আমার পিছু নাও কেন?'

'আপনার ভালোর জন্যই।'

'তা ভালোটা কি হয়েছে?'

'হয়েছে মশাই, হয়েছে। আপনার ভালো করার জন্য ক'দিন একটু আপনাকে স্টাডি করা দরকার ছিল। সেটা আজ শেষ হয়েছে।'

'তা বাপু, স্টাডি করে কী বুঝলে?

'বুঝতে আরও সময় লাগবে। ডাটাগুলো অ্যানালাইস না করলে বোঝা যাবে না। সে কাজটা ল্যাবরেটরিতে হয়।'

'ও বাবা! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! তুমি কে?'

'সেন্ট্রাল ডাটাব্যাঙ্কের একজন এক্সটারনাল অপারেটর।'

'এ-সব তো শক্ত শক্ত কথা। সরল করে না বললে বুঝব কী করে?'

'সরল করে বোঝানোর জন্যই আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।'

'কোথায় নিয়ে যাবে বাপু?'

'বেশি দূর নয়, ওই-যে খেলার মাঠটা রয়েছে, ওখানে। আসুন আমার সঙ্গে।'

গোকুলবাবু খুবই অবাক হয়েছেন। তবে এখন তেমন একটা উদ্বেগ বোধ করছেন না। বললেন, 'ফাঁকা মাঠে গিয়ে কী হবে।'

'ওখানেই আমাদের ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি।'

'সে কী? ওখানে তো কোনও বাড়িঘর নেই!'

'আছে বইকী। কাছে গেলেই বুঝতে পারবেন।'

লোকটার পিছু পিছু মাঠের মাঝ-মধ্যিখানে গিয়ে বোকার মতো দাঁড়ালেন গোকুলবাবু। পাগলের পাল্লায় পড়লেন কিনা বুঝতে পারছেন না। কিন্তু তাঁকে একেবারে হতবাক করে দিয়ে শূন্য মাঠের মাঝখানে হঠাৎ যেন বেশ বড় একটা কাচের বাড়ি প্রথমে আবছাভাবে, তারপর স্পষ্ট ফুটে উঠল। চোখের ভুল নয়।

'আসুন—' বলে লোকটা একটা কাচের পাল্লা খুলে তাঁকে ভেতরে নিয়ে গেল। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, সেটা একটা ল্যাবরেটরির মতোই ব্যাপার বটে। চারদিকে অনেক যন্ত্রপাতি, সাদা পোশাক-পরা মুখ-ঢাকা কয়েকজন লোক সেখানে খুব ব্যস্ত হয়ে নানা যন্ত্রপাতির সামনে বসে বা দাঁড়িয়ে কী সব যেন করছে। একটা লোক এসে তাঁর সামনে একটা উত্তল আয়নার মতো কিছু দাঁড় করিয়ে বলল, 'দেখুন তো, আপনাকে কেমন দেখাচ্ছে।'

গোকুলবাবু দেখলেন, আয়নায় তাঁকে খুবই ছোট, কড়ে আঙুলের সাইজের একরত্তি একটা মানুষের মতো দেখাচ্ছে।

সম্বিত ফিরে পেয়ে হঠাৎ তিনি সচেতন হয়ে দেখলেন—বাস্তবেও তাই ঘটেছে। ল্যাবরেটরিটা যেন আকাশের মতো উঁচু আর তেপান্তরের মাঠের মতো, আর লোকজন সব যেন বিশাল বিশাল দৈত্য-দানো। ভয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন।

একটা লোক দু'আঙুলে—যেমন লোকে নস্যির টিপ করে—তেমনিভাবে তাঁকে তুলে নিয়ে একটা টেস্ট-টিউবে ভরে ফেলল। তারপর তাতে ফেলে দিল খানিকটা তরল জিনিস।

গোকুলবাবু বিস্তর হাত-পা ছুড়লেন, চেঁচামেচিও করলেন, কিন্তু সে-সব ওরা কেউ শুনতেও পেল না, গ্রাহ্যও করল না। তিনি তরল জিনিসটার মধ্যে হাবুডুবু খেতে লাগলেন। তবে বুঝতে পারছিলেন, তরল জিনিসটা তাঁর উপরে এসে পড়ার পর তাঁর গা জ্বালা-জ্বালা করছে, চোখে ঝাপসা দেখছেন। লোকটা তাঁকে আর-একটা টেস্ট-টিউবের মধ্যে আরও একটা সবুজ রঙের জিনিসের মধ্যে ফেলে দিল। তারপর একটা যন্ত্রের মধ্যে টেস্ট-টিউবটা ঢুকিয়ে, যন্ত্র চালু করে দিল। তিনি টের পেলেন টেস্ট-টিউবটা থরথর করে কাঁপছে আর তরল পদার্থটা হঠাৎ রং পালটে হলুদ হয়ে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে কাঁপুনিটাও বেড়ে ঢেউ তুলে উঠে গেল। ভয়ে, উদ্বেগে, কাঁপুনিতে গোকুলবাবু দিশেহারা হয়ে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।

জ্ঞান ফিরে এলে দেখেন, তিনি একটা বেশ নরম গদির উপর শুয়ে আছেন। তাঁর চারপাশে কয়েকজন লোক কৌতূহলের চোখে তাঁকে দেখছে।

'কেমন লাগছে গোকুলবাবু?'

গোকুলবাবুর বেশ ভালোই লাগছিল, শরীরটা হালকা, মাথাটা পরিষ্কার, বুকে ভয় বা উদ্বেগটাও নেই, মাথায় হাত দিয়ে দেখেন টাকের বদলে তাঁর মাথায় বেশ ঘন চুল, শরীরের মেদও ঝরে গেছে। তিনি যেন অন্য মানুষ।

গোকুলবাবু বললেন, 'ভালোই লাগছে। আপনারা কারা?'

'বাইরের লোক। পৃথিবীর বাইরের।'

'বুঝেছি। অ্যালিয়েন নন তো?'

'হ্যাঁ।'

'আমার উপর একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন বুঝি?'

'হ্যাঁ। আপনাকে আমরা খানিকটা পালটে দিয়েছি। পনেরো বছর বয়স কমানো হয়েছে। শরীরটা ছিপছিপে করা হয়েছে। মগজেও কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।'

'কিন্তু লোকে কি আমাকে গোকুল বলে চিনতে পারবে?'

'পারবে। তবে এখন থেকে অন্য দৃষ্টিতে দেখবে। আগের মতো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে না। আপনার বয়স মাত্র পনেরো বছর কমানো হয়েছে। আই কিউ বাড়ানো হয়েছে শতকরা ৪৫ ভাগ। সাহস বাড়ানো হয়েছে শতকরা ৩০ ভাগ। ভয় কমানো হয়েছে ৫০ ভাগ। আত্মবিশ্বাস বাড়ানো হয়েছে ৬০ ভাগ আর স্মার্টনেস ২৫ ভাগ। তাতে আপনি আগের গোকুলবাবুই থাকবেন বটে, কিন্তু নবীকৃত।'

'আপনারা কারা? কেন আমার জন্য এতটা করলেন?'

'আমরা বাইরের লোক। আর আপনাকে আমরা গবেষণার গিনিপিগ হিসেবেই বেছে নিয়েছিলাম। এখন আপনি নিজের জীবনযাপন করুন। বিদায়।'

গোকুলবাবু হঠাৎ দেখলেন, তিনি মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছেন, ল্যাবরেটরি হাওয়া হয়ে গেছে।

গোকুলবাবু সদর্পে হেঁটে বাজারে গিয়ে ঢুকলেন। তিনি যে আর আগের সেই ভিতু দুর্বল প্রকৃতির বোকা গোকুলবাবু নেই, সেটা কী-করে যেন বাজারের লোকও টের পেয়ে গেল। খুবই খাতিরটাতির পেতে লাগলেন। চারদিক থেকে সপ্রশংস দৃষ্টি এসে পড়তে লাগল তাঁর উপর। অনেকে যেচে এসে একটু-আধটু তোষামোদও করে গেল।

বাড়িতে ফিরতেই তাঁর খিটখিটে বউ তাঁর মুখের দিকে চেয়ে কী বুঝলেন কে জানে, তাড়াতাড়ি একটা হাতপাখা এনে বাতাস করতে করতে বললেন, 'বড্ড ঘেমে গেছ গো!'

Cov71
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%