রামলাল আর শ্যামলাল

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov38

মনসাপোঁতা গাঁয়ের রামলাল আর শ্যামলালের ঝগড়া-বিবাদের এই বারো বছর চলছে। কুমোরপাড়ায় তাদের পাশাপাশি বাড়ি। গত বারো বছর তাদের মুখ দেখাদেখি নেই। রামলালের বাড়ির যে দিকটায় শ্যামলালের বাড়ি, সেদিকটার সব জানলা কটকটে করে বন্ধ, শ্যামলালের বাড়িতেও একই ব্যবস্থা। তাদের কেউ কারও মুখ দেখে না বলে মুখোমুখি ঝগড়াও এখন আর হয় না। তবে রামলাল আকাশ বাতাসকে উদ্দেশ্য করে তর্জন গর্জন ছাড়ে, শ্যামলাল তার পাল্টি দেয়। শুধু মনসাপোঁতা নয়, রামলাল আর শ্যামলালের ঝগড়ার কথা আশেপাশের আরও দশটা গাঁয়ের লোক জানে। আর ঝগড়া তাদের এমনই সাঙ্ঘাতিক যে, শ্যামলালের নেড়ি কুকুরটা কখনও রামলালের বাড়ি এঁটো ঘাঁটতে যায় না, আর রামলালের বাড়ির বেড়ালটা কোনওদিন শ্যামলালের বাড়ির দুধ বা মাছ চুরি করতে যায় না। রামলালের ছেলের সঙ্গে শ্যামলালের ছেলের, বা শ্যামলালের মেয়ের সঙ্গে রামলালের মেয়েরও কোনও ভাবসাব নেই। রামলালের গিন্নি করুণাময়ী আর শ্যামলালের গিন্নি জ্যোতির্ময়ীর কোনও সম্পর্কÅ নেই।

গত বারো বছর ধরে রামলাল আর শ্যামলালের ঝগড়া শুনবার জন্য গাঁয়ের লোক জমা হয়ে আসছে। এই ঝগড়ার জন্য দু'জনেরই নানা প্রস্তুতি আছে। দু'জনেই ব্যায়াম করে, ভোরবেলায় গলা সাধে, নুন গরম জল দিয়ে রোজ গার্গল করে এবং গলার নানারকম যত্নও নেয়। রোজ সকাল দশটা নাগাদ রামলাল প্রস্তুত হয়ে সামনের বারান্দায় বেরিয়ে আসে। শ্যামলালও তাই। তারপরই শুরু হয় ঝগড়া।

গাঁয়ের লোকের মধ্যে অবশ্য বিভাজন আছে। কারও কারও মতে রামলালের গলার জোর খুবই বেশি। কারও কারও মতে শ্যামলালের যুক্তির জোর বেশি। কারও মতে রামলালের রসিকতা বোধ খুব ভালো, কারও মতে টিপ্পনীতে শ্যামলালই সরেস। ঘড়ি ধরে দেড় ঘণ্টা ঝগড়া করার পর রামলাল আর শ্যামলাল স্নানাহার করতে চলে যায়। রোববার নিয়মিত ঝগড়া বন্ধ থাকে। বারো বছর ধরে এ নিয়মই চলে আসছে।

একবার রামলাল শ্যামলালকে ভয় দেখানোর জন্য বিখ্যাত পালোয়ান বটেশ্বর বলকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে এনে মাংস-পরোটা খাইয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, এই যে বটেশ্বর বল আমার বাড়িতে এসেছেন, ইনি কে তা কি আমার পাড়া-প্রতিবেশী জানে? বটেশ্বরবাবু গ্যাঁড়াপোতার বিখ্যাত পালোয়ান নিমচাঁদ হালুই, ঘোলা-গুপ্তিপাড়ার কালুচরণ সর্দার, দুর্গাচকের পঞ্চানন পাল, ভারতপুরের কালা পালোয়ান কাকে না হারিয়েছেন! লোকের ভালোর জন্যই বলছি, আমার সঙ্গে লোকে যেন একটু সমঝে চলে।

শ্যামলালের বাড়ি থেকে অবশ্য কোনও উচ্চবাচ্য শোনা গেল না। কিন্তু পরের রোববারই শ্যামলাল কুখ্যাত মস্তান জব্বর সিংকে তার বাড়িতে মাংস-লুচির নেমন্তন্ন করে নিয়ে এল। তারপর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, জব্বর সিংজী, আপনি যেন ক'টা লাশ নামিয়েছেন! পাঁচজনকে একটু শুনিয়ে দিন তো। এ পাড়ার পিঁপড়েদের একটু পাখা গজিয়েছে। তাই তাদের একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।

রামলালের বাড়ি থেকেও কোনও প্রতিক্রিয়া শোনা গেল না।

গাঁয়ের খোঁড়া ভিখিরি কানাই বেসুরো গান গেয়ে ভিক্ষে করে বেড়ায়। কেউ বড় জোর একটা আধুলি বা এক মুঠো চাল দেয়। তা একদিন রামবাবুর বাড়িতে ভিক্ষে করতে এসেছে, রামবাবু বারান্দা থেকে আড়চোখে দেখল পাশের বাড়ির বারান্দায় শ্যামলাল দাঁড়িয়ে। রামলাল ফস করে একটা দশ টাকার নোট কানাইয়ের অ্যালুমিনিয়ামের বাটিটায় ফেলে হেঁকে বলে উঠল, ওরে কানাই, কত দিলুম বল তো!

কানাই আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলে, উরেব্বাস রে! রামবাবু, আপনি যে দশ টাকা দিয়ে ফেলেছেন! লটারি মেরেছেন নাকি বাবু?

রামলাল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে, দশ টাকা দিতে কি আর লটারি মারতে হয় নাকি রে! বুকের পাটা চাই, কলজের জোর চাই। সেটা কি আর সবার থাকে? দেখ না পাড়া ঘুরে, কে কত দেয়। সবার মুরোদ তো আমার জানা আছে কিনা।

শ্যামলালের কানে সবই গেছে। কানাই গিয়ে দাঁড়াতেই শ্যামলাল বাঁকা হাসি হেসে বলল, শুনলি তো কানাই দশ টাকার কেমন গরম! এ বাজারে দশ টাকায় আধ কিলো চালও তো মেলে না রে। এক পলা সর্ষের তেলের কত দাম জানিস? অনেকেই জানে না কিনা যে দশ টাকার বাজারদর এখন দশ পয়সায় নেমে গেছে।

বলে শ্যামলাল কুড়িটা টাকা কানাইয়ের বাটিতে ফেলে হেঁকেই বলল, ওরে কানাই, কত দিলুম যেন! একটু চেঁচিয়ে বলিস, পাঁচজনে শুনুক।

কানাই বেশ গলা তুলেই বলে, আজ্ঞে আজ যে কার মুখ দেখে উঠেছিলুম বাবু, চোখে ভুল দেখছি কিনা কে জানে। তবে মনে হচ্ছে একটা পেল্লায় কুড়ি টাকার নোটই দিয়ে ফেলেছেন।

আরে কুড়ি টাকাতেই বা আজকাল কি হয় বল!

পরদিন রামলাল কানাইকে চল্লিশ টাকা ভিক্ষে দিয়ে খুব হোঃ হোঃ করে হেসে বলে, জানি রে কানাই, তুই এখন ধন্য ধন্য করবি, কিন্তু আমি বলি, এ আর এমন কি!

শ্যামলাল আশি টাকা ভিক্ষে দিয়ে বলল, বুঝলি কানাই, নিজের ঢাক আমি নিজেই পেটালে কি ভালো দেখায় রে? কিন্তু আজকাল দেখছি, লোকে এক পয়সা দিয়ে এক টাকার বড়াই করে। বেশ হেঁকে সারা গাঁয়ে জানিয়ে দে তো, দান ধ্যান করে তা লোককে জানানো গর্হিত কাজ।

মাস দুই পরে কানাই ভিক্ষে করা ছেড়ে দিয়ে দিব্যি একটা মনোহারী দোকান খুলে বসল, আর দোকানও দিব্যি চলতে লাগল।

একদিন সকালে গাঁয়ের মাতব্বর বিষুবাবু আর তার স্যাঙাৎরা এসে রামলালের বাড়িতে হাজির, ওহে রামলাল, জরুরি কথা আছে যে।

যে আজ্ঞে বিষ্টুখুড়ো, বলুন।

দেখ বাপু, তোমার আর শ্যামলালের বিবাদ এক সাঙ্ঘাতিক জিনিস। লোকের মুখে মুখে তোমাদের ঝগড়ার কথা শোনা যায়। আমাদের এই অজ পাড়া গাঁর নাম এই তোমাদের সুবাদেই বহুদূর ছড়িয়ে পড়েছে। নানা জায়গা থেকে তোমাদের ঝগড়া শুনতে লোকজন চলে আসে। তা বাপু, তোমাদের এই বিখ্যাত ঝগড়ার এই বারো বছর আগামী বারোই অগ্রহায়ণ পূর্ণ হবে। গাঁয়ের সবাই চাইছে, তোমাদের বিবাদের বারো বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা উৎসব হোক।

রামলাল উজ্জীবিত হয়ে বলে, হোক। এ তো ভালো কথা।

আমরাও তাই বলি। তা বাপু গাঁ শুদ্ধু লোককে খাওয়াতে তো কিছু খরচও আছে। আর তোমরাই আমাদের ভরসা।

আজ্ঞে, সে তো বটেই।

শ্যামলালও প্রস্তাব শুনে সোজা হয়ে বসে বলল, তা তো খুবই ভালো কথা মশাই, হওয়াই উচিত।

তাহলে খরচের ব্যাপারটা?

ও নিয়ে আপনারা ভাববেন না।

উৎসবের দিন গ্রামের প্রধান সড়কে মস্ত লাল শালু টাঙানো হল। তাতে লালের ওপর সাদায় লেখা 'রামলাল ও শ্যামলালের বিখ্যাত বিবাদের দ্বাদশ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে মহোৎসব।'

শুধু মনসাপোঁতা নয় আশপাশের পাঁচটা গ্রাম থেকেও ঝেঁটিয়ে লোক এল উৎসবে সামিল হতে। লোকে লোকারণ্য।

এই কাণ্ড দেখে রামলাল আর শ্যামলাল দু'জনেই ভারি খুশি। তারা যে এত বিখ্যাত হয়ে পড়েছে তা তাদেরই জানা ছিল না।

খাতরাসপুর পুরসভার চেয়ারম্যান ভূতনাথ অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন, রামলাল ও শ্যামলাল ঝগড়ার যে ঐতিহ্য স্থাপন করেছে তা জাতির সামনে এক উদাহরণ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। তারা ঝগড়া-বিবাদের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ঝগড়াকে করে তুলেছে শিল্প... ইত্যাদি।

গাঁয়ের মাতব্বর বিষুবাবু বললেন, আমাদের মনসাপোঁতা গাঁ ছিল নিতান্তই অজ পাড়া গাঁ। কিন্তু রামলাল ও শ্যামলালের কল্যাণে আজ সারা দেশ এই গ্রামকে চেনে। মনসাপোঁতার এই দুই বীর সন্তানকে আমরা অভিনন্দন জানাই।

সমবেত জনগণ হাততালিতে সভা গরম করে দিল।

মঞ্চের একধারে পাশাপাশি দুটি চেয়ারে রজনীগন্ধার মালা গলায় রামলাল আর শ্যামলাল বসে বসে অশ্রুবিসর্জন করছিল আনন্দে।

হঠাৎ রামলাল বহুকাল পর শ্যামলালের মুখের দিকে চেয়ে ডুকরে উঠে বলল, ভাই শ্যামলাল। কী থেকে কী হয়ে গেল বল তো ভাই!

শ্যামলালও রুমালে চোখ মুছতে মুছতে ধরা গলায় বলল, ভাই রামলাল। আমরা যে এমন কেউকেটা হয়ে গেছি তা তো জানতাম না।

মনসাপোঁতার পক্ষে দুঃখের কথা হল, এখন রামলাল আর শ্যামলালে গলায় গলায় ভাব।

Cov39
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%