শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ক্ষেতের কাজ শেষ করে সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে দাওয়ায় বসে জিরোচ্ছিলেন পটল নস্কর। হঠাৎ অন্ধকার উঠোনে দড়াম করে একটা মস্ত বড় তাল পড়ল, শব্দে বাড়িটা কেঁপে উঠল।
রান্নাঘর থেকে তার বউ বাতাসী চেঁচিয়ে উঠল, কী হল গো!
পটল বলল, তাল পড়েছে।
বাতাসী বলল, তোমার কি মাথা খারাপ? মাঘ মাসে তাল আসবে কোথা থেকে। আর আমাদের দুটো তাল গাছই তো সেই পুকুরের ধারে।
তাই তো! পটল নস্কর ঘর থেকে টেমিটা এনে উঠোনে নেমে যা দেখল তাতে তার চোখ ছানাবড়া, সোনাদানা সে চেনে না বটে, কিন্তু মস্ত গোলাকার হলদেটে রঙের চকচকে জিনিসটাকে তার সোনা বলেই মনে হল। টেমিটা রেখে বস্তুটাকে তুলতে গিয়ে দেখল, বেজায় ভারী।
বাতাসী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ওটা কী গো?
পটল ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলল, সোনাদানাই তো মনে হচ্ছে।
সোনা! মরণ! সোনা আবার কোত্থেকে আসবে?
মাথা চুলকে পটল বলল, তাই ভাবছি।
বস্তুটা উঠোনে ফেলে রাখা ঠিক নয় বিবেচনা করে পটল সেটাকে কষ্টেসৃষ্টে তুলে ঘরে নিয়ে এল।
বাতাসী আরও একটা টেমি নিয়ে এল। দুটো টেমির আলোয় ভালো করে বস্তুটা দেখে পটল বলল মনে হয় উড়োজাহাজ থেকে ফসকে পড়ে গেছে। বাতাসী বলে দূর! উড়োজাহাজ গেলে শব্দ পেতুম না!
তাহলে? একি সত্যি সোনা নাকি?
তাই বা বলি কি করে? সোনা কি আর চিনি! আমরা গরিব মানুষ। তবে জিনিসটা তো আর আমাদের নয়। ঘরে রাখা কি ঠিক হবে?
সে তো বটে, কিন্তু ফেলেও তো দিতে পারা যায় না।
তাহলে বরং পুলিশকে খবর দিই! কী বলো?
তাই দাও বরং।
পরদিন সকালেই পটল নস্কর সাত মাইল দূরের থানায় গিয়ে হাজির হল। প্রথমে সেপাইরা তাকে ঢুকতেই দিতে চায় না। দারোগার সঙ্গে দেখা করতে চায় শুনে সেপাইরা তো প্রায় ঘাড় ধাক্কা দেয় আর কি! শেষমেষ সে যখন বলল মশাই, সোনাদানার ব্যাপার আছে তখন সেপাইরা তাকে যেন একটু আগ্রহের সঙ্গেই বড়বাবুর কাছে নিয়ে গেল। দারোগাবাবু কাউকেই বড় একটা পাত্তা দেন না। কিন্তু সোনার তালের কথা শুনে তিনি মোটা শরীর নিয়েও শশব্যস্তে উঠে পড়লেন। টুপি পরতে পরতে বললেন, হরে চল চল, আর দেরি নয়। জিপগাড়িটা বের কর তাড়াতাড়ি...
ধুলো উড়িয়ে দারোগাবাবু পটলের বাড়িতে এলেন। সোনার তালটা দেখে বললেন, ওহে পটল, এটা আমি বাজেয়াপ্ত করলাম। তোকেও গ্রেফতার করতাম, কিন্তু আপাতত ছেড়ে দিচ্ছি। ব্যাপারটা পাঁচকান করার দরকার নেই। তাহলে কিন্তু বিপদে পড়বি, বুঝেছিস?
পটল বলল, যে আজ্ঞে।
দারোগাবাবু সোনার তাল নিয়ে চলে গেলেন।
বাতাসী বলল যার জিনিস তাকে কি আর ফেরত দেবে?
পটল বলল, যাকগে, যা খুশি করুক। আমাদের ঘাড় থেকে তো নেমেছে।
নিশুত রাতে হঠাৎ পটলের দরজায় কে যেন ধাক্কা দিল। ঘুম ভেঙে পটল বলল কে?
পটল, দরজা খোলো, দরকার আছে।
পটল গরিব মানুষ। চোর-ডাকাতের ভয় তার নেই। সে উঠে গিয়ে দরজা খুলে অবাক হয়ে দেখল, হাতে সোনার তালটা নিয়ে দারোগাবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ-মুখ ভয়ে সাদা। কাঁপতে কাঁপতে বললেন, বাবা পটল, তোমার সোনার তাল ফেরত নিয়ে আমাকে রেহাই দাও।
পটল শশব্যস্তে বলল, আজ্ঞে ওটা যে আমার নয় দারোগাবাবু।
দারোগাবাবু ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললেন, সে আমি জানি না। সোনার তাল থানায় নিয়ে যাওয়ার পর যে কী কাণ্ড শুরু হল, বলার নয়। হঠাৎ আকাশ থেকে একটা পেটমোটা খাস্ত কচুরির মতো দেখতে বিরাট একটা জিনিস নেমে এল। আর তা থেকে পিল পিল করে এক দেড় হাত লম্বা মতো কিম্ভুত চেহারার লোক নেমে এসে কী অত্যাচার রে বাবা। চুল ধরে টানছে, ল্যাং মেরে ফেলে দিচ্ছে, গ্যাট্টা মারছে, কাতুকুতু দিচ্ছে, বুকের ওপর বসে নাচানাচি করছে। দেখতে ছোট হলেও তাদের গায়ে বেজায় জোর। আমরা তো কয়েক মিনিটেই কাহিল। শেষে তাদের সর্দার এসে আমার বুকে একটা বন্দুকের মতো জিনিস ঠেকিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বলল ওটা আমরা একজন গরিব আর ভালো লোককে পুরস্কার দিয়েছি। তোমরা ওটা এনে খুব অন্যায় করেছ। যদি ফেরত না দাও তাহলে তোমাদের দুর্দশার সীমা থাকবে না।
পটল আর্তনাদ এর উঠল, কিন্তু দারোগাবাবু, আমি যে মোটেই ভালো লোক নই।
তা বললে হবে কেন বাপু? তারা পরিষ্কার বলেছে সারা পৃথিবী খুঁজে তারা দশ জন ভালো লোককে বেছে বের করেছে। সবাইকেই একটা করে সোনার তাল দিয়েছে। এখন বাপু তোমার জিনিস তুমি ফেরত নাও।
কিন্তু বড়বাবু, এরা সব কারা?
ওরে বাপু এরা আমাদের দুনিয়ার লোক নয়। আকাশে আরও কত পৃথিবী আছে কে জানে। সেখান থেকেই এসেছে। এখন বাপু, জিনিসটা নিয়ে আমাকে বাঁচাও।
পটল তালটা নিল। লাজুক মুখে বলল, আজ্ঞে আমি গরিব মানুষ এ নিয়ে কী করি।
সে তোমার মাথাব্যথা। আমি চললুম।
দারোগাবাবু চলে যাওয়ার পর পটল অন্ধকার উঠোনটার দিকে চেয়ে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন