বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Cov28

সকাল থেকে বীরেনবাবুকে ঘরে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বারান্দায় বা বাথরুমেও নেই। সদর দরজা ভিতর থেকেই বন্ধ। তিনি বাইরে গেলে ভিতরের ছিটকিনি আর বাটাম দেওয়া থাকত না। বীরেনবাবুর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা খুবই অবাক হলেন। যদি বাইরে গিয়েই থাকেন তাহলে কোথা দিয়ে বেরোলেন। খাটের তলা, আলমারি এবং রান্নাঘরের কাবার্ড অবধি খুঁজতে বাকি রাখেনি কেউ। বীরেনবাবু বেশ লম্বা চওড়া মানুষ, ছোটখাটো জায়গায় লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়।

যথারীতি পাড়া-প্রতিবেশী এবং তারপর পুলিশ এল। বহু প্রশ্ন উঠল, বহু জবাবও উঠল। কিন্তু সমস্যার কোনও সমাধান দেখা গেল না। কেউ কেউ বলল, হয় উনি অদৃশ্য হয়ে বা মলিকিউলে রূপান্তরিত হয়ে এখানেই আছেন, নইলে পঞ্চভূতে মিলিয়ে গিয়েছেন।

বাড়িতে কান্নাকাটি শুরু হল। দু'চারজন বলল, তোমাদের এখন অশৌচ পালন করা উচিত। এগারো দিনে শ্রাদ্ধাটাও করে ফেল। এই মতের বিরুদ্ধেও মত দেখা দিল, লোক পাওয়া না গেলে মৃত্যু প্রমাণিত হয় না।

বীরেনবাবু কিন্তু এসব ঘটনার বিন্দু-বিসর্গও জানেন না। তিনি যথারীতি সকালে বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গেছেন। প্রাতঃকৃত্য সেরে ঘরে এসে হঠাৎ তাঁর মনে হল, ঘরের জিনিসপত্রগুলো যেন অন্যরকম। পুবের জানালাটা দিয়ে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে উত্তরের জানালা দিয়ে। জানালার বাইরে কদম গাছটা নেই। যে মহিলা চা নিয়ে এল তাকে তিনি চিনতে পারলেন না। কয়েকটা অচেনা ছেলেমেয়েকেও দেখতে পেলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, এসব কী হচ্ছে?

একটা বাচ্চা ছেলে ঘরে ঢুকে জিগ্যেস করল, ভালো লাগছে?

বীরেনবাবু বললেন, তুমি কে?

আমি! আমি এখানে থাকি।

আমি এখানে কেন?

আপনাকে এখানে আনা হয়েছে।

কিভাবে?

একটা বিশেষ পদ্ধতিতে আপনার শরীরটাকে একটা নলের ভিতর দিয়ে বের করে আনা হয়েছে।

কিন্তু কেন?

আপনার বায়ু পরিবর্তনের জন্য। অনেকদিন আপনি কোথাও বেড়াতে টেড়াতে যাননি। আমরা ভাবলাম আপনাকে কাছেপিঠে কোথাও ঘুরিয়ে আনি।

তা এ জায়গাটার নাম কি?

নজম।

নজম! এ নামটা তো শুনিনি। কোন জেলা?

ছেলেটা হাসল, বলল, আমাদের জেলা নেই। নজম একটা আলাদা জগৎ।

বীরেনবাবু বললেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এখানে কি উত্তরদিকে সূর্য ওঠে?

হ্যাঁ।

আমি কি গ্রহান্তরে?

হ্যাঁ।

তুমি আসলে কে?

আমি নজমের চর। চারদিকে ঘুরে বেড়াই। মাঝে মাঝে বিভিন্ন জগৎ থেকে এক-আধজনকে নিয়ে আসি।

তারপর কি করো?

সাতদিন পর রেখে আসি।

মাত্র সাত দিন?

হ্যাঁ। তবে আমাদের এই গ্রহের একটা দিন কিন্তু অনেক লম্বা।

কত লম্বা?

আপনাদের দশ বছরের সমান।

ও বাবা। তাহলে আমি কবে ফিরব? সত্তর বছর পর?

হ্যাঁ।

ততদিনে তো আমার ছেলেপুলেরা বুড়ো হয়ে যাবে। আমি মরেই যাব।

না, আপনি যেমন আছেন তেমনি থাকবেন। এখানে বয়স বাড়ে না। আমার বয়স কত জানেন?

কত? আপনাদের হিসেবে আটশো বছর। এখানকার হিসেবে মাত্র আশি দিন। অর্থাৎ দেড় মাসের কিছু বেশি।

আমার যে বাড়ির জন্য মন কেমন করছে।

ছেলেটি মিষ্টি হেসে বলল, সকলেরই করে। কিন্তু এখানে এত আনন্দের আয়োজন, এত উৎসব, এত খাদ্য পানীয়, এত উদ্বৃত্ত যে আপনি বাড়ির কথা ভুলে যাবেন। এ ঘর থেকে কিছু বোঝা যায় না। তবু জানালার কাছে এসে বাইরে একটু তাকান।

বীরেনবাবু জানালার কাছে এসে বাইরে তাকিয়ে হাঁ হয়ে গেলেন। এরকম গভীর নীল আকাশ, চারদিকে অফুরান এত সবুজ, এত সুন্দর বিশাল-উপত্যকা আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া বাড়ি-ঘর তিনি আর কখনও দেখেননি।

ছেলেটি বলল, এখানে শীত-গ্রীষ্ম নেই। শুধু মনোরম একটিই ঋতু। গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে এক হাজার গুণ বড়। এখানে অভাব নেই, ক্ষুধা নেই, অসুখ নেই, মৃত্যু নেই।

বীরেনবাবু মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তবু চোখে জল এল। বললেন, তবু আমি ফিরে যেতে চাই।

কেন?

আমার ওই নোংরা পৃথিবীই ভালো।

ছেলেটি হেসে হঠাৎ হাত নাড়তেই ঘরের মাঝখানে একটা দেয়াল উঠে এল। তাতে একটা দরজা। ছেলেটি বলল, যান, ফিরে যান।

বীরেনবাবু দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই দেয়াল অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, নিজের শোওয়ার ঘরেই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

তাঁর বউ ছেলে-মেয়ে ছুটে এসে ঘিরে ধরল তাঁকে।

এ কী কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ?

বীরেনবাবু সারা জীবন এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি।

Cov29
সকল অধ্যায়
১.
ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ
২.
রাজা
৩.
বিদ্যে
৪.
কথার দাম
৫.
কোট
৬.
বাজি ও কুকুর
৭.
কিছুক্ষণ
৮.
পায়রাডাঙায় রাতে
৯.
দেখা হবে
১০.
আকাশ গঙ্গা
১১.
নতুন গ্রহ
১২.
পড়শি
১৩.
বিপিনবাবুর কাণ্ড
১৪.
বীরেনবাবুর প্রত্যাবর্তন
১৫.
ওর হবে
১৬.
সংবর্ধনা
১৭.
নীল গ্রহের বেঁটে লোকটা
১৮.
গঙ্গারামের রাগ
১৯.
গোপেনবাবু
২০.
রামলাল আর শ্যামলাল
২১.
ভূতনাথের বাড়ি
২২.
তরকারির নাম
২৩.
গোপীনাথ ও চতুর চোর
২৪.
বলাইবাবু
২৫.
খেলা
২৬.
পটলবাবু ও উড়ন্ত চাকি
২৭.
ফটিকবাবু ও লালমোহন
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
নবজীবনের আঁচিল
৩০.
সোনার তাল
৩১.
জাম্বোর নামডাক
৩২.
সেয়ানে সেয়ানে
৩৩.
একটি দিন
৩৪.
দুগ্গা
৩৫.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৬.
অঙ্ক
৩৭.
দু'নম্বর পুরুত
৩৮.
'সাতপুরার হাট'
৩৯.
গোকুলবাবু
৪০.
সহজ সরকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%