শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সহজ সরকার একজন গোলমেলে লোক। বুঝলেন তো!
আজ্ঞে, বুঝলাম বললে ভুল বলা হবে। আসলে সহজ সরকার কে সেটাই আমার জানা নেই কিনা।
সেটা জানা আর তেমন শক্ত কি? জানতে চাইলেই জানা যায়।
তারপরেও একটা কথা আছে। সহজ সরকার সম্পর্কে আমাকে জানতে হবেই বা কেন? আমার তো মশাই, এই তেত্রিশ বছর বয়স অবধি সহজ সরকারকে না জেনেই কেটে গেল, তাতে তো কোনো অসুবিধে হচ্ছে না! আমি তো দিব্যি আছি। এমন কী আমি তো আপনাকেও জানিনা বা চিনিনা। এই তো মাত্র মিনিট দশেক আগে জীবনে আপনাকে প্রথম দেখলুম। নিরিবিলিতে বসে একটু স্মৃতিচারণ করব বলে গঙ্গার ধারটায় এসে একটু বসেছি, আপনি ফস করে উদয় হয়ে পাশে এসে বসলেন! তারপরই সহজ সরকারের কথা ফেঁদে বসলেন।
তা অবিশ্যি ঠিক। আমিও আপনাকে চিনিনা। শুধু জানি আপনার নাম হল গে তপন ঘোষ, আপনি বাগবাজারে থাকেন, আপনার বাড়িতে বুড়ো মা আর বাবা আছেন, আপনার বউয়ের নাম ঊষারানি, আপনার দুটো পাঁচ আর তিন বছরের খোকা আছে, আপনার নিচের তলায় যে ভাড়াটে আছে তার নাম গোপেন মিত্র, ভারী গুন্ডাপ্রকৃতির লোক। আর তার সঙ্গে আপনাদের মামলা চলছে, আর গোপেন মিত্রর জন্যই আপনার মনে শান্তি নেই! কারণ সে প্রায়ই আপনাকে লাশ ফেলে দেওয়ার হুমকিধামকি দেয়। না না, এ ছাড়া আপনার সম্পর্কে আমার আর কিছুই জানা নেই। তাই আমি আপনাকে চিনি বললে খুব ভুল বলা হবে।
আপনি তো সব্বোনেশে লোক মশাই! গোয়েন্দা নন তো? আমি তো আপনাকে জীবনে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। অথচ আপনি আমার সম্পর্কে এত কথা জেনে বসে আছেন!
না মশাই, না। আমি মোটেই গোয়েন্দা নই। তবে কিনা চারদিকে কী ঘটছে না ঘটছে, তার দিকে নজর রাখি। আর কেন রাখি জানেন? যা ঘটছে, তা থেকে কী ঘটতে চলেছে তা অনুমান করে আগেভাগেই সাবধান হওয়ার জন্য।
আপনি তো খুব হুঁশিয়ার লোক মশাই! যা দিনকাল পড়েছে তাতে এখন আপনার মতো লোকই দরকার। কিন্তু আপনার কথা শুনে আমার একটু ভয় ভয় করতে লেগেছে। আপনি গোপেন মিত্রর লোক নন তো?
হাসালেন তপনবাবু! গোপেন মিত্রকে আমি কস্মিনকালেও চিনিনা। শুধু এটুকু জানি, সে একজন লম্বা চওড়া চেহারার লোক। মেজাজ যেমন টং তেমনি মারমুখো। পাড়ার গুন্ডা মস্তানরাও তাকে সমঝে চলে। সে হাওড়ায় একটা নাট বল্টুর কারখানা চালায়। মাসে নাহোক লাখ টাকা কামায়। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে, সে কিছুতেই আপনাদের বাড়ি ছেড়ে উঠে যেতে রাজি নয়। তার বউয়ের নাম নন্দরানি, গোপেনের তিন ছেলে, তাদের বয়স যথাক্রমে দশ, আট এবং চার। তার বাবা রমেশ মিত্র কামারহাটিতে পৈতৃক বাড়িতে বাস করেন। তাঁরও মেলা পয়সা। গোপেনের জীবনের একটা অ্যাম্বিশন হল, আপনাদের হটিয়ে আপনাদের গোটা বাড়িটা দখল করা। না মশাই, এই সামান্য তথ্য শুনে আবার ভেবে বসবেন না যেন যে, আমি গোপেন মিত্রকে চিনি।
আমার মাথা যে ঘুরছে মশাই! আপনি তো ডেনজারাস লোক! এরপরও বলবেন যে আপনি গোপেন মিত্রকে চেনেন না?
শুধু গোপেন মিত্র কেন, তার ভায়রাভাই অ্যাডভোকেট সুখেন পোদ্দার, বড় শালা বড়তলা থানার এস আই গদাধর বোস, ছোটো শালা কাউন্সিলার বেণুধর বোস, শ্বশুর এম এল এ সাত্যকী বোস...কাউকেই আমি চিনি না মশাই! এমনকী তার বন্ধু ম্যাজিস্ট্রেট যোগেন হালদার, আপ্যায়ন রেস্টুরেন্টের মালিক বরেন মল্লিক, ফুটবল প্লেয়ার সুনু ধর, কাউকেই আমি কস্মিনকালেও চিনতাম না। এবার বিশ্বাস হল তো আমার কথা? খামোখা আপনি আমাকে গোয়েন্দা বলে ভয় পাচ্ছিলেন!
আজ্ঞে, ভয়টা যে আমাকে আরও একটু চেপে ধরেছে মশাই! একটু দমসম লাগছে। কী মনে হচ্ছে জানেন? মনে হচ্ছে, আপনাকে দেখতে যতটা সাদামাটা আপনি আসলে ততটা সোজা লোক নন। আপনার ভিতরে একটা প্যাচ আছে। ভয় হচ্ছে আপনি বোধহয় আমাকে কিছু একটা বার্তা দিতেই এসেছেন, যাকে বলে প্রচ্ছন্ন হুমকি।
আরে না মশাই, না। আমাকে দেখতে যেমন সরল সোজা, আমি আদতেও তাই। কোনো প্যাচঘোঁচ আমার মধ্যে পাবেন না। আমার মন মুখ একাকার। লোকে বলে, ওহে, তুমি এ যুগের পক্ষে বড্ড বেমানান। অত সোজা সরল হলে কি চলে! এই তো সেদিন একটা লোক একটা বেশ কাজ করা বাহারি পুরোনো আমলের কাঠের বাক্স নিয়ে আমার বাড়িতে এসে বলল, এই বাক্সতে যা রাখবেন তা চোখের পলকে ডবল বা দুনো হয়ে যাবে। শুনে আমার মোটেই বিশ্বাস হল না। কত ঠগ জোচ্চোর চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে! তা পরীক্ষা করার জন্য আমি বাক্সতে একটি টাকা রাখলুম। তারপর লোকটার কথামতো দশ সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রইলুম। তারপর লোকটা বাক্সের ডালা খুলে দেখাল, সত্যিই টাকাটা ডবল হয়ে গেছে। লোভে পড়ে ক্রমে টাকা বাড়াতে লাগলুম। যা রাখি, তাই দেখলুম সত্যিই ডবল হয়ে যাচ্ছে। আর থাকতে না পেরে একেবারে পঞ্চাশ হাজার টাকা রাখলুম। লোকটা বাক্সের ডালা বন্ধ করার পর যেই না চোখ বুজেছি, লোকটা ফস করে কী একটা যেন আমার নাকে স্প্রে করল মশাই! সেই ঘুম ভাঙতে ঘণ্টাখানেক লেগেছিল। ততক্ষণে লোকটা বাক্স আর টাকা সমেত হাওয়া! এরপরও কি আমাকে আপনার প্যাচালো লোক বলে ভাবতে ইচ্ছে করবে?
আপনি অত কাঁচা লোক বলেও ভাবতে ইচ্ছে যাচ্ছেনা, বুঝলেন মশাই! আপনি বোধহয় আমার সঙ্গে ছলনাই করছেন। তবে আপনাকে আগেই জানিয়ে রাখি যে, আমি কিন্তু আসলে একজন বোকাসোকা মানুষ। আপনার মতো ক্ষুরধার মাথাওয়ালা মানুষের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার এলেম আমার নেই।
এই ভুলটাই সবাই করে! নিজেকে বোকা ভাবা যে কত বড় বোকামি, তা আমি হাড়ে হাড়ে জানি। আমি নিজেও তাই কিনা। তা বলে সহজ সরকারের কথাটা আবার ভুলে যাবেন না যেন! মনে রাখবেন সে একজন গোলমেলে লোক।
তা তিনি কে তা যদি একটু বলতেন তবে ভালো হত।
এই তো মুশকিলে ফেললেন! সহজ সরকার কে তা কি আর আমার জানার কথা? আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে সহজ বড় সোজাপাত্তর নয়। যতদূর শুনেছি, তাকে দেখে মনে হবে, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না। কিন্তু ঘটনা হল, তিনি ভাজা মাছ না উল্টেও খেয়ে ফেলতে পারেন। অর্থাৎ ভাজা মাছ নিজেই তাঁর সুবিধে করে দিতে উল্টে যায়।
একটু বুঝিয়ে বলবেন কী?
বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা পড়া আছে?
তা আর নেই? বঙ্কিম আমার খুব পছন্দের লিখিয়ে।
সেই যে নবকুমার সোঁদরবনে কাঠ আনতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিল, মনে আছে তো! তা তার দেরি দেখে নৌকোর অন্য সবাই বলাবলি করেছিল, তোমার নবকুমার কি আর আছে? তাহাকে বাঘে খাইয়াছে! তা আমাদের সহজ সরকারও একবার সোঁদরবনে বেড়াতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর হল কী জানেন? বললে হয়তো বিশ্বাস হবে না, শেষে বিশাল কেঁদো একটা বাঘই তাকে দেখতে পেয়ে ভারি বিনয়ের সঙ্গে পথ দেখিয়ে এনে তার নৌকোর ঘাটে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল। তারপর ধরুন, লোকের অসুখবিসুখ হলে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে ধর্ণা দিয়ে বসে থাকে। আমাদের সহজ সরকারের ঠিক উল্টো। তার অসুখবিসুখ হলে ডাক্তাররাই ভিড় করে এসে তার বৈঠকখানায় জড়ো হয়ে যায়! যদি সহজ সরকার দয়া করে কাউকে ডাকে। উকিল ব্যারিস্টার বলুন, মন্ত্রী বা আমলা বলুন, সহজ সরকারকে কারও কাছে যেতে হয় না, সবাই তার কাছে এসে হেঁ হেঁ করে আর হাত কচলায়। বুঝতে পারছেন তো? তা ভাজা মাছের আর দোষ কী বলুন? তার ঘাড়েও তো আর দুটো মাথা নেই!
এবার মনে হয় একটু একটু বুঝতে পারছি।
পারবেনই তো। নিজেকে আপনি যত বোকা ভাবেন সত্যিই তো আর আপনি তত বোকা নন! কেউ কেউ তো সহজ সরকারকে কল্কি অবতারও বলে থাকে।
বলে নাকি?
তা বলবে না কেন বলুন? সহজ সরকার যে দুহাতে গরীব দুঃখীকে বিলোয়। শীতে কম্বল, বর্ষায় ছাতা, গ্রীষ্মে হাতপাখা, তার অন্নসত্রে রোজ দশ হাজার গরীব খায়।
এত টাকা?
তা টাকার কথা যদি বলেন, তাহলে রিজার্ভ ব্যাঙ্কও লজ্জা পাবে। লোকে ব্যাঙ্কে, আলমারিতে, সিন্দুকে টাকা রাখে। আর সহজ সরকারকে টাকা রাখতে গোডাউন বানাতে হয়। হাওড়ায় তার সাতখানা টাকার গুদাম বানাতে হয়েছে।
বাপ রে!
হেঃ হেঃ! সবাই একথা শুনে হাঁ হয়ে যায়, আপনার আর দোষ কি!
তা আমার মতো মনিষ্যিকে তার কী দরকার? আমাকে সহজ সরকারকে দিয়ে হুঁশিয়ার করছেন কেন বলুন তো?
আহা! এই সহজ কথাটা বুঝলেন না! যেখানে সমস্যা সেখানেই যে সহজ সরকার! তার নামের পাশেই দেখবেন পর পর পাঁচটা এস থাকে। এস এস এস এস এস।
অতগুলো এস! এর মানে কী?
খুব সোজা। সকল সমস্যার সমাধানে সহজ সরকার। আর তাই
তো আজ আপনার কাছে আসা। গোপেন মিত্রকে নিয়ে আপনি যে মনোকষ্টে আছেন সেটা সহজ সরকারের কানে গেছে। আর তাই আপনার জন্য প্রাণ কেঁদে ওঠায় সে সমাধানও বার করে ফেলেছে। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। বুঝলেন কিনা।
কীরকম মশাই?
খুব সোজা। গোপেনকে ডেকে সহজ সরকার খুব কড়কে দিয়েছে। বলেছে, একজন নিরীহ ভালোমানুষকে এইভাবে ভয় দেখানো চলবে না। অবিলম্বে যেন সামান্য পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে সে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। নইলে বিপদে পড়বে। তা গোপেন গুন্ডা এই প্রস্তাব মুখ বুজে মেনে নিয়েছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন