শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

গঙ্গারামের সবই ভালো, শুধু রেগে গেলে তার কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। আর না রাগলে গঙ্গারামের মতো মানুষ দুটো খুঁজে পাওয়া ভার। নিজের রাগকে ভালোই চেনে গঙ্গারাম, তাই সবাইকে সে সাবধানও করে দেয়, যা করো তা করো ভাই, আমাকে রাগিয়ে দিও না। তাহলেই রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যাবে ভাই।
সবাই তাই একটু সাবধানেই থাকে। গঙ্গারামকে কেউ পারতপক্ষে রাগিয়ে দেয় না।
গঙ্গারাম টের পায়, তার রাগটা প্রথমে শুরু হয় হাঁটুর কাছ থেকে। কেমন যেন টনটনিয়ে ওঠে প্রথমে, তারপর সেটা একলাফে উঠে আসে কোমরে। সেখানে কিছুক্ষণ ঘাপটি মেরে থেকে ঝাঁ করে শিরদাঁড়া ধরে একেবারে বানরের মতো উঠে আসে ঘাড়ে। সেখানে একটু জিরোয়। তারপর একলম্ফে মাথায় উঠে যায়। আর তখনই সর্বনাশ।
প্রতিবেশী রমেশবাবু লোক সুবিধের নন। ঝগড়া কাজিয়ায় খুব পারদর্শী! মামলা মোকদ্দমায় খুব ঝোঁক। তা তিনি গেল বছর বাগানের বেড়া নতুন করে বাঁধতে গিয়ে গঙ্গারামের জমির মধ্যে দু'হাত পরিমাণ ঢুকিয়ে বেড়া দিলেন, বললেন, এ জমি আসলে আমারই ছিল, দলিলেও আছে।
গঙ্গারাম একথা শুনেই টের পেল তার হাঁটু টনটন করছে। সে বলল, দেখুন রমেশবাবু, আপনি বয়সে বড়, আপনার সঙ্গে ঝগড়া কাজিয়া চাইছি না। তবে যাই করুন, আমাকে রাগিয়ে দেবেন না কিন্তু।
রমেশবাবু খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, তোমার রাগের তোয়াক্কা কে করছে হ্যাঁ!
গঙ্গারামের রাগ তখন হাঁটু ছেড়ে কোমরে উঠল। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, রমেশবাবু, আমার কিন্তু রাগ কোমর অবধি এসে গেছে।
রমেশবাবু গঙ্গারামের রাগের কথা মোটেই জানেন বলে মনে হল না। তিনি আরও একটু মাথা উঁচু করে বললেন, যাও, যাও, রাগ দেখাতে এসেছে!
গঙ্গারামের রাগ তখন কোমর ছেড়ে শিরদাঁড়া ধরে ফেলেছে এবং দিব্যি বাঁই বাঁই করে ওপরে উঠছে। ভাগ্য ভালো ঠিক এইসময়ে রমেশবাবুর বাড়ি কাজের মেয়েটা একটা প্লেট ভেঙে ফেলায় সেখানে তুমুল চেঁচামেচি লেগে গেল এবং রমেশবাবু তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।
গঙ্গারামের রাগ ঘাড়ে বসে কিছুক্ষণ ল্যাজ দুলিয়ে ফের গুটিগুটি নেমে গেল। গঙ্গারাম হাঁফ ছেড়ে বলল, যাক অল্পের জন্য রমেশবাবুর ফাঁড়াটা কেটে গেল দেখছি।
সেদিন বাজারে এক মাছওয়ালা গঙ্গারামের পছন্দ করা আটখানা কৈ মাছ তার নাকের ডগা দিয়েই আর একজন শাঁসালো খদ্দেরকে দু'টাকা বেশি দরে বেচে দিল। গঙ্গারামকে গ্রাহ্যই করল না। গঙ্গারাম মাছওলাকে খুব শান্তভাবে বলল, এটা কি ভালো হল যতীন?
যতীন বেশ ডাঁটের সঙ্গে বলল, উনি কে জানেন! সাবজজ, সাবজজকে না দিয়ে আপনাকে দেব নাকি?
গঙ্গারাম তখনই টের পেল, হাঁটু ছেড়ে তার রাগ কোমরে উঠে পড়েছে। সে বলল, কিন্তু এটা কি অভদ্রতা নয়? না হয় দু'টাকা আমি বেশিই দিতুম।
আপনি! বলে হাঃ হাঃ করে বাজারশুদ্ধ লোককে শুনিয়ে যতীন হেসে উঠল। বলল, আপনি দেবেন বেশি? দরদাম না করে একদিনও মাছ কিনেছেন জীবনে? বড় মানুষেরা দরাদরির ধারই ধারে না।
গঙ্গারামের রাগ তখন ঘাড়ে উঠে মাথার দিকে লাফ দেবে কিনা ভাবছে। গঙ্গারাম ঘাড় চেপে ধরে যতীনকে বলল ঠিক আছে, যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমাকে রাগিয়ে দিও না। রাগলেই কিন্তু সর্বনাশ।
যতীন ফের উচ্চকণ্ঠে বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে উঠল। গঙ্গারামের রাগ তখন আর সামলাতে না পেরে, হনুমানের মতো লঙ্কার দিকে লাফ দিয়ে ফেলেছে, লঙ্কাকাণ্ড বাঁধতে বাকি নেই। গঙ্গারাম আর তিলেক না দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেল আলুওয়ালার কাছে। মনে মনে বলল, খুব বেঁচে গেল যতীন!
দুর্গাপুজোর চাঁদা চাইতে এসে কয়েকটা ছেলে বেশ চোখ রাঙিয়েই বলল, আপনার নামে পাঁচশো টাকা চাঁদা ধরা হয়েছে। কম করেই ধরেছি।
গঙ্গারাম যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে বলল, আমি পাঁচশো টাকা দিতে পারব না।
ছেলেগুলো বেশ গরম খেয়ে বলল, দেবেন না মানে? এ পাড়ায় বাস করতে হবে না আপনাকে?
গঙ্গারামের রাগ তখন হাঁটু কামড়ে ধরল, গঙ্গারাম অত্যন্ত ভদ্র গলায় বলল, দেখ ভাই, আর যাই করো আমাকে রাগিয়ে দিও না। রাগলে কিন্তু কুরুক্ষেত্র ঘটে যাবে।
ছেলেগুলো পেছপা না হয়ে আরও যেন বুক চিতিয়ে বলল, ওসব রাগ-ফাগ অন্য জায়গায় দেখাবেন। ভালো চান তো পাঁচশো টাকা ফেলে দিন, চলে যাচ্ছি। এখন অসুবিধে থাকলে পরে আসতে পারি। কিন্তু কনসেশন হবে না, আগেই বলে দিচ্ছি।
ছেলেগুলো চলে গেল। না গেলে খুবই বিপদ ছিল। নিজের রাগকে ভালো চেনে বলেই গঙ্গারাম আর বেগড়বাই না করে ওই পাঁচশো টাকাই চাঁদা দিয়ে দিল। টাকাটা গেল যাক, রক্তারক্তিটা তো হল না।
সেদিন অফিসে বড় সাহেব ডেকে পাঠিয়ে তার কাজে একটা ভুল দেখিয়ে বললেন, এরকম ইডিয়টের মতো কাজ করলে কি করে চলবে বলুন তো!
গঙ্গারামের রাগ ওই 'ইডিয়ট' শুনেই হাঁটুটা কুকুরের মতো কামড়ে ধরল। বলল, স্যার, আর এগোবেন না। খারাপ হয়ে যাবে।
বড় সাহেব অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বললেন, আপনি একটা আস্ত স্টুপিড।
গঙ্গারাম গম্ভীর হয়ে বলে, স্টুপিড অবধি ঠিক আছে। কিন্তু আর এগোলে খুবই বিপদ হয়ে যাবে।
বড় সাহেব উঠে দরজা দেখিয়ে বললেন, গেট আউট! গেট আউট! আপনার মুখ দেখল পাপ হয়।
গঙ্গারাম তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল। বড় সাহেবকে বাঁচানোর জন্যই। রাগটা আর একটু হলেই মাথায় চড়ে বসেছিল আর কি!
সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনাটা ঘটল এক রাতে। চারজন ডাকাত গঙ্গারামের সদর দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড শুরু করল। বাড়ির লোকের চেঁচামেচিতে উঠে পড়ল গঙ্গারাম। ডাকাত দেখে গম্ভীর হয়ে বলল, লাশ পড়ে যাবে কিন্তু! খুব সাবধান।
ডাকাতেরা তাকে একটা রদ্দা মেরে বলল, একদম কথা নয়। কথা বললে কেটে ফেলব।
গঙ্গারামের রাগটা তখন কোমর থেকে ঘাড়ে উঠছে। গঙ্গারাম অত্যন্ত ব্যথিত গলায় বলল, নিজের কবর নিজেরাই খুঁড়ছ! আমার রাগ কিন্তু ঘাড়ে চড়ে বসলো বলে। রাগলে আমি মানুষ থাকি না তা জানো?
ডাকাতরা গঙ্গারামকে বিড়বিড় করতে দেখে গ্রাহ্যই করল না। ট্রাংক বাক্স আলমারি সব ভাঙচুর করতে লাগল।
গঙ্গারামের রাগ তখন ঘাড়ে উঠে জিরিয়ে নিচ্ছে। হাঁটু থেকে ঘাড় অবধি ওঠা তো কম ধকল নয়। এবার লাফ দেওয়ার জন্য ইতিউতি চাইছে।
গঙ্গারাম গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকাতদের উদ্দেশ্যে বলল, তোমরা তো দেখছি খুবই বিপদে পড়বে। আমার রাগ যে মাথায় উঠে গেছে প্রায়।
ডাকাতরা রে রে করে তেড়ে এসে গঙ্গারামকে আরও গোটা দুই রদ্দা কষিয়ে বলল, আহাম্মক! মরতে চাস!
গঙ্গারামের রাগ তখন ঘাড় ছেড়ে মাথায় উঠে গেছে। তারপর মাথা জুড়ে রঙিন ফুলঝুরি ছড়িয়ে পড়ল। গঙ্গারাম মাথাটা দু'হাতে চেপে ধরে বলল, কাজটা কি ভালো করলে তোমরা?
ডাকাতরা ফের গঙ্গারামকে রদ্দা মারতে এসেছিল, কিন্তু যা ঘটল তা নিরীহ ভীতু রোগা-ভোগা গঙ্গারামের কাছ থেকে তারা আশাই করেনি। চারটে ডাকাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই কে কোথায় ছিটকে পড়ল, ঠিক যেন ঘূর্ণী ঝড় এসে তাদের উড়িয়ে দিল। চারটে ডাকাত ঘাড় লটকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল ঘরের মেঝেয়।
গঙ্গারামের বাড়ির লোকেরা ঘটনাটা চোখের সামনে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। গঙ্গারাম তার রাগের কথা বলে বটে, কিন্তু কোনোদিন রাগটা দেখেনি তারা!
তারা গঙ্গারামকে ঘিরে ধরল, পাড়া-প্রতিবেশীরা এল, ক্লাবের সেই চাঁদাওলা ছোকরারাও এল, সবাই হাঁ করে চেয়ে রইল গঙ্গারামের দিকে। এ যে সাংঘাতিক লোক!
এরপর থেকে গঙ্গারামের রাগ উঠলেই লোকে সাবধান হয়ে যায়। অনেকে আবার জিগ্যেসও করে, রাগটা কতদূর উঠল গঙ্গারাম? হাঁটুতে, না মাথায়, না ঘাড়ে?
গঙ্গারামের খাতির বেড়ে গেছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন