শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আজ্ঞা, আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখছি, একেবারে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে আছেন, কোনও নড়াচড়া নেই, একদৃষ্টে জলের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করেননি গত চল্লিশ মিনিট। জানতে বড় কৌতূহল হচ্ছে, আপনার কি মন খুব খারাপ? বাড়িতে কারও অসুখ-বিসুখ, নাকি গিন্নির সঙ্গে ঝগড়া, নাকি ছেলে ফেল মেরেছে, নাকি কেউ মারা-টারা গেছে...?
আজ আসলে আমার খুব আনন্দেরই দিন, মনটাও বেশ ভালোই থাকার কথা।
তাহলে মুখখানা অত ভার কেন মশাই? দেখে তো মোটেই আপনাকে আনন্দ পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না!
আনন্দ যে হচ্ছে না তা নয়। ভিতরে ভিতরে গুড়গুড় করে আনন্দের ভুরভুরি উঠছে। আনন্দ হওয়ারই তো কথা কিনা, আজ প্রায় পাঁচ বছর পর বীরচাঁদের হদিস পেয়েছি যে।
বটে! বাঃ, এ তো বেশ ভালো খবর! তা এই বীরচাঁদ লোকটা কে বলুন তো!
বললেই কি আর চিনবেন! বীরচাঁদ একটি অতি নচ্ছার লোক।
তা নচ্ছার লোককে দেখে কি আনন্দ হওয়ার কথা? আমার তো নচ্ছার লোক দেখলে একটুও আনন্দ হয় না। আপনার হচ্ছে কি করে বলুন তো!
তা হবে না? পাঁচ বছর খোঁজাখুঁজির পর দেখা পেয়েছি যে!
ও তাই বলুন, বীরচাঁদকে আপনিই খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন? তা বীরচাঁদ কি আপনার টাকাপয়সা বা দামি কোনও জিনিস নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল? নাকি টাকা ধার নিয়ে শোধ দেয়নি। কিংবা সে কি কোনও ফেরারি আসামি যাকে ধরে দিতে পারলে আপনি পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার পাবেন!
আপনি বেশ চালাক মানুষ। অনেকটা আন্দাজ করেছেন বটে, কিন্তু বীরচাঁদ আমার টাকাপয়সা বা দামি জিনিস নিয়ে পালায়নি। তাকে কস্মিনকালে টাকা ধার দিয়েছি বলেও মনে পড়ছে না। যতদূর জানি ফেরারি আসামিও সে নয়।
তাহলে বীরচাঁদকে খামোকা আপনি খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছিলেনই বা কেন?
সেটা শুনলে আপনি হাসবেন। এমন কি আমাকে পাগল বলেও ভাবতে পারেন।
সেটা শোনার পর ঠিক করা যাবে, হাসব না আপনাকে পাগল বলে ভাবব।
বলতে বড় সংকোচ হচ্ছে। ব্যাপারটা এত তুচ্ছ যে বলার মতোই নয়। শুধু শুধু আপনার সময় নষ্ট করা হবে।
আরে না। আমি রিটায়ার হওয়া মানুষ, সময়ের অভাব নেই। সময় কাটাতেই তো লেকের ধারে আসা।
ব্যাপারটা হল, দু'হাজার ছাপ্পান্ন সালে জানুয়ারি মাসের তিন তারিখে সকালবেলায় আমি দাড়ি কামাচ্ছিলাম।
কত বললেন?
আগেই জানতাম আপনার বিশ্বাস হবে না।
ঠিক আছে, বলুন, দু'হাজার ছাপ্পান্ন তো? তাই সই।
হ্যাঁ, দু' হাজার ছাপ্পান্ন সালের সেই সকালে হঠাৎ আমার ফুলার ফর্টি সেকেন্ড সেকটরের অ্যাপার্টমেন্টে বীরচাঁদ এসে হাজির। বহুকাল পরে তার সঙ্গে দেখা। শুনেছিলাম সে বৃহস্পতির একটা চাঁদে ন্যাচারাল অ্যাটমসফিয়ার তৈরির কাজে বহুদিন যাবৎ ব্যস্ত রয়েছে। অনেকদিন দেখা নেই।
কী বললেন? বৃহস্পতি না কি যেন?
যে আজ্ঞে। আর এগোব কি? আমাকে পাগল বলে মনে হলে ব্যাপারটা এই পর্যন্তই থাক।
আরে না। বৃহস্পতিই বা মন্দ কি? বলে ফেলুন।
আজ্ঞে হ্যাঁ। তা মনিটরিং স্ক্রিনে তার হাসি মুখে প্রোজেকশন দেখে দরজা খুলে দিলাম। বীরচাঁদ আমার বন্ধু বটে, কিন্তু তার সঙ্গে আমার আবার একটু প্রফেশনাল রাইভ্যালরিও আছে। বয়সে আমার চেয়ে দেড় বছরের ছোট হয়েও সে চাকরি করে আমার এক ধাপ ওপরে। তাছাড়া সে দু'বার নোবেল প্রাইজ পেয়েছে, আমি মোটে একবার।
কী প্রাইজ বললেন যেন!
থাকগে মশাই, এসব শুনে আপনার কাজ নেই।
আহা, নোবেল প্রাইজ তো খারাপ জিনিস নয়। পেলে খারাপটা কি? বলে ফেলুন মশাই, বলে ফেলুন।
আজ্ঞে বলারই তো চেষ্টা করছি। বীরচাঁদ ঘরে ঢুকে চারদিক দেখে নাক সিঁটকে বলল, এঃ, এ তোকে কী অ্যাপার্টমেন্ট দিয়েছে রে? এ তো থার্ড ক্লাস অ্যাপার্টমেন্ট! তোর পারসোনাল ল্যাবরেটরি নেই? রোবট চাকর নেই? প্রোজেকশন রুম নেই? সত্যি কথা বলতে কি আমার চাঁদের অ্যাপার্টমেন্টটা যে তেমন অত্যাধুনিক নয় তা আমিও জানি। কিন্তু চাঁদে তখন এত মানুষের ভিড় যে বাসা জোগাড় করাই মুশকিল। তাই কাঁচুমাচু মুখে তার বিদ্রূপ সহ্য করতে হল।
ইয়ে, কি যেন শুনলাম। চাঁদ। না কি যেন!
ঠিকই শুনেছেন, চাঁদ, আপত্তি থাকলে—
আরে না মশাই, বৃহস্পতি হজম করলাম আর চাঁদ তো কোন ছাড়। চাঁদও কিছু খারাপ লাগছে না।
আজ্ঞে চাঁদ খারাপ নয়ও, তবে কিনা টাটকা সব্জি, দুধ, ডিম, মাংস, বাসমতি চাল এসব সেখানে হয় না। যাও বাজারে আসে তা অগ্নিমূল্য। টাটকা ফল বা মিষ্টি পাওয়াই যায় না। আমাদের দিনের পর দিন কৃত্রিম বা টিনে প্যাক করা খাবার খেতে হয়। তাতে শরীরের পুষ্টি হয় বটে, কিন্তু একঘেয়ে খাবার খেয়ে জিব অসাড় হওয়ার জোগাড়। বীরচাঁদ আবার পেটুক মানুষ। নিজেই গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে ফ্রিজ-ট্রিজ দেখে নাক সিঁটকে বলল, ইস, ছিঃ ছিঃ, এসব খেয়ে থাকিস কি করে?
বীরচাঁদ বেশ ভোজনরসিক তো!
যে আজ্ঞে। তা সব দেখেশুনে বলল, চল, আজ আমিই তোকে খাওয়াব, বাইরে আমার গাড়ি আছে, বেশিক্ষণ লাগবে না। বীরচাঁদ সাঙ্ঘাতিক জেদী ছেলে। কিছুতেই ছাড়ল না। তার গাড়ি বলতে আলোর চেয়ে বহুগুন বেশি গতিসম্পন্ন একটা স্পেসবোট। নতুন আবিষ্কার। তাইতে চেপে বৃহস্পতির সেই উপগ্রহে গিয়ে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি, চারপাশটা যেন রূপকথার রাজ্য। যেমন মিঠে আবহাওয়া, তেমনি চোখ-জুড়োনো প্রাকৃতিক সব দৃশ্য। কোথায় লাগে সুইজারল্যান্ড বা কাশ্মীর। বীরচাঁদ আমাকে একটা রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল। আহা, কী সুন্দর রেস্তোরাঁ! ভিতরে ঢুকতেই সুন্দর গন্ধে জিবে জল আসছিল। বহুকাল পরে পেট পুরে খেলাম। জিব যেন প্রাণ পেল এতদিন পর।
ইয়ে, তা বৃহস্পতি উপগ্রহেই খেলেন তো!
আজ্ঞে। তারপর বীরচাঁদ আমাকে আবার পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেল। সেই থেকে অশান্তি মশাই।
কিসের অশান্তি?
বীরচাঁদ আমাকে পাঁচ-সাত রকমের জিনিস খাইয়েছিল, সব কটাই অসাধারণ, কিন্তু তার মধ্যে একটা পদ ছিল যার কোনও তুলনাই নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই পদটার নাম কিছুতেই আমার মনে পড়ছিল না। কী একটা নামের সঙ্গে যেন ইয়ান যোগ করে নামটা। তাই আমি বীরচাঁদকে ফোন করলাম। কিন্তু শোনা গেল বীরচাঁদ একটা খুব গোপন প্রোজেক্টের কাজ নিয়ে মঙ্গলগ্রহে চলে গেছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা নিষেধ।
মঙ্গল! না? মঙ্গলই তো বললেন, ভুল শুনছি না তো?
আজ্ঞে না। ঠিকই শুনেছেন। আর শুনবেন কি?
মঙ্গলের জয় হোক মশাই, বলুন।
হ্যাঁ, কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না। ক্রমাগত বীরচাঁদের খোঁজ-খবর নিতে লাগলাম। ওই বিশেষ খাবারটির নাম আর রেসিপি আমার চাই-ই চাই। কিন্তু যা খবর পেলাম তা খুবই হতাশাজনক। বীরচাঁদ নাকি টাইম ট্রাভেল প্রোজেক্টের কাজ নিয়ে শুক্রগ্রহে চলে গেছে।
ওরে বাবা! শুক্রও ছাড় পায়নি তাহলে!
না। তারপর বীরচাঁদ আমাদের দু'হাজার ছাপ্পান্ন থেকেই উধাও হয়ে গেল। কখনও তিন হাজার সতেরো, কখনও পাঁচ হাজার বাইশ, কখনও সতেরোশো বারো নানা টাইম জোনে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
তিন হাজার সতেরো থেকে সতেরোশো—ঠিক শুনেছি?
ঠিকই শুনেছেন। তবে এবার পাকা খবর পেয়ে আমিও এই দু'হাজার ছয়ে পৃথিবীতে এসে ঘাপটি মেরে বসেছি। শুনেছি, বীরচাঁদ এখন এখানেই আছে। তার দেখা পেলে তরকারির নামটা জেনেই ফের দু' হাজার ছাপ্পান্নোয় ফিরে যাব।
আচ্ছা মশাই, আচ্ছা, আমি বরং আজ উঠি, মাথাটা বড্ড ঘুরছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন