গৌতমকুমার দাস
রাজার মতো মেজাজ স্বভাব চালচলন তাই তার নাম রয়েল বেঙ্গল টাইগার৷ চলনে বলনে অন্যান্য বাঘের তুলনায় যতই গম্ভীর হোক না কেন, রয়েল বেঙ্গল টাইগার কিন্তু বড্ড চঞ্চল৷ চলাফেরায় তার কোন বিরাম নেই৷ এক জায়গায় দাঁড়ানো বসা শোয়া ঘুমানো এ বাঘের ধাতে নেই৷ দিনে রাতে চব্বিশ ঘন্টায় শুকনো ভেজা জল কাদার সোঁদা মাটির নোনা জলে কম করে আট-দশ কিলোমিটার এরা হেঁটে বেড়ায়৷ রয়েল বেঙ্গল চলাফেরা করে একাকী, নিঃসঙ্গ৷
বাঘ বললেই হিংস্র কথাটি সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে৷ অথচ রয়েল বেঙ্গল টাইগার কিন্তু প্রকৃতিতে লাজুক৷ শুধু হিংস্র হয়ে ওঠে শিকার সামনে দেখলে৷ সামনের থেকে শিকার না ধরে পেছন থেকে আক্রমণ শানায়৷ স্বভাবে চঞ্চল অথচ শিকার ধরার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা ঝোপেঝাড়ে ওৎ পেতে থাকে নিঃশব্দে৷ ক্যাট স্পিসিস কিনা৷
আদি বাসস্থান থেকে বিস্তর দুর্গম গিরিপথ পাড়ি দিয়ে রয়েল বেঙ্গল এখন সুন্দরবনে৷ পূর্ব নিবাস সাইবেরিয়া৷ পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটে ছেড়ে মধ্য এশিয়া থেকে হিমালয় ডিঙিয়ে আসামের উত্তরাঞ্চল হয়ে ভারতে ঢুকে পড়েছিল সেই কবে৷ এখন বাস শুধু সুন্দরবনে৷ আকারে ওজনে পূর্বপুরুষদের তুলনায় কিছুটা কমতির দিকে৷ সাইবেরীয় বাঘেরা এখনও ওজনে কম বেশি তিনশ কেজি হলেও রয়েল বেঙ্গল পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ ১৩০-১৪০ কেজি আর রয়েল বেঙ্গল স্ত্রী মাত্র ১০০-১১০ কেজি৷ তুষার শীতল বা অত্যুষ্ণ অঞ্চল থেকে এককালে চলে এলেও সুন্দরবনের পলি কাদার ম্যানগ্রোভ জলাভূমিতে বিচরণে বেশ অভ্যস্থ এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার৷ এরা অভিযোজন বান্ধব৷
শুধু কি সুন্দরবনের নোনা কাদা জল আর ঝোপঝাড়ে প্যাচপ্যাচে গরমে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, নিজের খাবার দাবারের মেনুতেও রয়েল বেঙ্গল এনেছে পরিবর্তন৷ হরিণ বুনো শুয়োর একটা ধরতে পারলে তো কথাই নেই তাহলে রয়েল বেঙ্গলের সারা দিনের খাবারটা অন্তত জোগাড় হয়ে যায়৷ অন্তত ১০-১৫ কেজি খাবার না হলে যে ওদের পেট ভরে না৷ প্রতি দিনই তো আর এমন ভালো খাবার জোটে না, না পেলে বেজি, সজারু, ব্যাঙ, কান মাগুর, ভাঙন, শেলে মাছ এমনকি কেউটে, শঙ্খচূড়ও খাবারের মেনুতে যুক্ত হয়৷ নেতি ধোপনিতে এক মরা বাঘের পাকস্থলী কেটে বনদপ্তরের পশু চিকিৎসক শঙ্খচূড় ও কেউটে সাপের দেহাবশেষ পেয়েছে৷ সদ্য খাওয়া সাপের দেহ তখনো হজম হয়নি৷ তাহলে শঙ্খচূড়ও সুন্দরবনে আছে৷ ভাগ্যিস বাঘটা সাপটাকে খেয়ে ফেলেছিল৷ রয়েল বেঙ্গল ভোজন রসিকও বটে৷
খাবার না পেলে মরা পচা জীব জন্তুর দেহও খেয়ে ফেলে৷ এমনিতেই সুন্দরবনে খাবারের অভাব নেই৷ কিন্তু কষ্ট করে শিকার ধরলে তবে না খাওয়া৷ বুড়ো হয়ে গেলে শিকারের জন্য ওৎ পেতে থেকেও শিকার কখনো সখনো ফসকে যায়৷ আর তখনই নদী, খাঁড়ি পেরিয়ে গাঁয়ে হানা দেয় রয়েল বেঙ্গল৷ গাঁয়ে গরু, ছাগল, কুকুর মেরে খায়৷ সম্প্রতি সামসেরনগরের বাচ্চা মেয়ে রূপালী বাউরি ছাড়া গাঁ গেরামে কোন মানুষ ধরে খাবার খারাপ নজির রয়েল বেঙ্গলের অন্তত নেই৷ রূপালী বাউরি ঘরের দাওয়ায় উবু হয়ে বসে স্কুলের পড়া করছিল ঠিক সুন্দরবনের বানর যেভাবে বসে থাকে বাদাবনের মাটিতে৷ আর সেটাই হল ওর কাল৷ অবশ্য জলে জঙ্গলে জেলে বাউলে মউলেদের বাঘে নেয়৷ মানুষের মতো সহজ শিকার তো আর হয় না৷ বাঘ দেখে মানুষ না পারে দৌড়তে, অথবা যুঝতে৷ কিন্তু গাঁয়ে ঢুকে পড়া বুড়ো দুর্বল বাঘের কপালে জোটে দুর্ভোগ৷ নিজের মাটিতে বীর পুঙ্গব মানুষরাই তখন তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে৷
বুনো জন্তু অন্য পশুদের মারে খাবারের প্রয়োজনে আর মরে বেশীর ভাগটাই হিংসায়৷ নইলে এই মাত্র একশ বছর আগেও সুন্দরবনের বেশ কিছু সাথী ছিল রয়েল বেঙ্গলের৷ গন্ডার হাতি বাইসন বুনো মোষ ছাড়াও আরো কত রকমের যে প্রাণী ছিল এই সুন্দরবনে৷ আবুল ফজল সুন্দরবনে দেখেছিলেন হাতি৷ একথা লিখেছিলেনও তাঁর আইন-ই-আকবরীতে৷ সুন্দরবনের রাজা প্রতাপাদিত্য দক্ষতার সঙ্গে গন্ডার শিকার করতেন৷ বিংশ শতকের প্রথম দিকেও সুন্দরবনে গন্ডারের বাস ছিল৷ আর ছিল অফুরন্ত বুনো মোষ৷ দোনলা বন্দুকের গুলিতে লর্ড কার্জন অসহায় তৃণভোজী বুনো মোষ মেরে তাঁর পৌরুষ জাহির করেছিলেন৷ গন্ডার হাতি বাইসন বুনো মোষ সুন্দরবন থেকে আজ একেবারেই হারিয়ে গেছে৷ মাঝে মধ্যে জল জঙ্গলে এখনো দেখতে পাওয়া হাতি মোষ গন্ডার বাইসনের অস্থি কঙ্কাল মনে করিয়ে দেয় সুন্দরবনের এক সময়ে তাদের দৃপ্ত পদচারণার স্মৃতি সম্বলিত অতীত৷ বাঘের নিজের জ্ঞাতিগুষ্ঠির মধ্য থেকে অনেকেই বিশ্ব থেকে আজ নিশ্চিহ্ন৷ আটটির মধ্যে তিনটি বাঘের প্রজাতি— বেলিনিজ, ক্যাসপিয়ান ও জাভান পৃথিবী থেকে এখন বিলুপ্ত৷ এবং এর পেছনে অবদান একমাত্র সভ্যতার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষেরই৷ আর তার মগজাস্ত্র৷

রয়েল বেঙ্গল টাইগার
শুধু মার খেয়েই বা আর কটা বাঘ মরে৷ বেশীর ভাগটাই মরে চোরা শিকারীদের হাতে৷ তবে এপার বাংলার সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের দাপট অতটা নয়৷ ওপার বাংলার সুন্দরবন থেকে এক একটা বাঘের চামড়া মধ্য প্রাচ্যে চালান হয় পঁচিশ ত্রিশ লাখ বাংলাদেশী টাকায়৷ প্রকৃতিও এখন সুন্দরবনে বাঘের বসতি ও বেঁচে থাকার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রকোপে সুন্দরবনে ফি বছর পাঁচ মিলিমিটার করে জল বাড়ছে৷ দ্বীপ জলমগ্ন হয়ে রয়েল বেঙ্গলের ঘোরাফেরার এলাকা কমছে৷ লবণতার প্রভাবে দ্বীপের জঙ্গলে গাছের জন্মহার হয় কমছে নইলে বামন আকৃতির ছোটখাটো ঝোপঝাড়ের মতো হয়ে যাচ্ছে৷ সুন্দরবনের মনুষ্য বসতির ৪৮টি দ্বীপের চাষবাসের কীটনাশক নালা খাঁড়ি হয়ে সুন্দরবনের মোহানায় এসে মেশে৷ এদিকে বৃষ্টি ছাড়া মিষ্টি জলের উৎস সুন্দরবনে নেই৷ বনে বাঘের পানীয় জলের বড্ড অভাব৷ নোনা জল খেয়ে কখনো সখনো লিভার সিরোসিসে ভুগছে রয়েল বেঙ্গল৷ তাতে মরছেও বেশ৷ জলের লবণতা ওদের এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় যেতে বাধ্য করে৷ আর এই নোনা আবহাওয়া ওদের লাজুক প্রকৃতিকে করে তোলে আরো হিংস্র৷ তখন ভয়ঙ্কর রয়েল বেঙ্গল জঙ্গলের কাঠুরে জেলে মউলেদের শুধু ভয় পেয়ে আক্রমণ করে না, ওদের শিকার করে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে পেট ও ঊরুর মাংস খেয়ে ফেলে৷ অবশ্য বাঘে যেখানে শিকার ধরে সেখানে খায় না৷ অন্যরা নজর দিতে পারে তো৷ খাবারের ভাগ কে কাকে দেয়৷
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে সুন্দরবনের নদী নালা খাঁড়ির জল যেমন বাড়ছে তেমনি সাগর থেকে জোয়ার জলে বয়ে নিয়ে আসা পলি নদী বুক ভরে তুলছে৷ অগভীর নদী সাঁতরে রয়েল বেঙ্গলের লোকালয়ে চলে আসার প্রবণতা ক্রমে বাড়ছে৷ এমনিতেই এরা ভাল সাঁতারু৷ টানা আট দশ কিলোমিটার সাঁতরে পার হয়ে যাবার ক্ষমতা আছে এদের৷ তবে মাঝে মধ্যে পথ ভুল করে গাঁয়ে ঢুকে পড়ে রয়েল বেঙ্গল৷ বনের রাজা হলে কি হবে ভুল এদেরও হয়৷
সুন্দরবনের জঙ্গল রয়েল বেঙ্গলের, সেখানে মানুষের ঢোকার তো কথা নয়৷ তবু পেটের দায়ে প্রাণ ঘাড়ে করে মানুষ সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢোকে৷ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মোকাবিলার জন্য বন দপ্তর শুয়োর চাষ করে বনে ছেড়েছে কয়েক বছর ধরে, নাইলনের নেট গরান ডালে বেঁধে দ্বীপ ঘিরে ফেলেছে, বাউলে জেলে মউলেদের মাথার পেছনে অবিকল মানুষের মুখের মতো প্লাস্টিকের মুখোশ পরার পরামর্শ দিয়েছে, কাঠুরে বাউলের মাটির পুতুলের ড্যামি বানিয়ে তাতে বিদ্যুতের ব্যবস্থাপনা করে জঙ্গলে গাছের তলায় বসিয়েছে যাতে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও বোঝে শুধু মানুষ ধরে খেলে হবে, খরচা আছে৷
সদা সতর্ক বনের জাগ্রত প্রহরী রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে সুন্দরবনের চাই-ই, শিকারী ও শত্রুর হাত থেকে সুন্দরবনের বনজ ও জলজ সম্পদ এই বড়ে মিঁয়াই রক্ষা করে৷ আর তেমনই পর্যটকদের থেকে আদায় করে নেয় ভয় মিশ্রিত সম্ভ্রম৷ সবুজ বাদাবনের ঝোপে হলদে ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গলের অপরূপ বর্ণিল সংমিশ্রণ কোন মানুষের চোখকেই না মুগ্ধ করে৷ কিন্তু জঙ্গলের ভেতর এই মানুষেরই ‘‘ঢাকের তালে কোমর দোলে...’’ উদ্দাম নাচে ও গানে আর ডেনিম জাতীয় সেন্টের উগ্র গন্ধে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সত্যি সত্যিই লজ্জা পেয়ে জঙ্গলের আরো গভীরে চলে যায়৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন