গৌতমকুমার দাস
লবণে লাবণ্যে লাবণ্যময়ী সুন্দরবন৷ এখানে সব কিছুতেই লবণ৷ নোনা জল, নোনা মাটি, নোনা গাছ, নোনা মাছ৷ নুনের অভাব নেই৷ এখানে নুন তৈরীকে বলা হয় নুন চাষ৷ হাস মুরগী চাষ, ধানচাষের মতো৷ নুন চাষীর পৃথক নাম আছে৷ যেমন আছে কাঠুরে অথবা মধু সংগ্রহকারীদের আলাদ আলাদা নাম৷ সুন্দরবনের জঙ্গলে কাঠ কাটতে গেলে বাউলে, মধু আনতে গেলে মউলে, মাছ ধরতে গেলে জেলের মতোই নুন চাষীদের নাম মোলঙ্গী৷ এরা কবে থেকে সুন্দরবনে নুন তৈরী করে তার কথা ইতিহাসের পাতায় নেই৷ তবে মুঘল আমলে, ইংরেজ আমলে এদের শুধু যে অস্তিত্ব ছিল তাই নয়, এদের থেকে নুন তৈরীর জন্য মস্ত কর আদায় করত শাসককুল৷ শুধু সুন্দরবন নয়, অখন্ড বাংলার উপকূল জুড়ে ছিল মোলঙ্গীদের কাজ কারবার৷ পশ্চিমের মেদিনীপুরের হিজলি থেকে পুবের চট্টগ্রামের পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলভাগে এরা নুন তৈরীর কাজে যুক্ত ছিল৷ তবে নুন তৈরীর আদি মোলঙ্গীরা কিন্তু সুন্দরবনেরই প্রাচীন আপন উপজাতি চন্দভনদাস৷ প্রায় হাজার বছর ধরে চন্দভনদাসেদের কোন খোঁজ খবর পাওয়া যায় না৷ হয়তো এরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথবা জঙ্গল পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোন জনজাতির সঙ্গে মিশে নিজস্বতা হারিয়ে ফেলেছে৷ স্বতন্ত্রতা হারালে নামও হারায়৷ মোলঙ্গী হিসাবে পরিচিত চন্দভনদাসেদের হয়েছে তাই৷ তবে সুন্দরবন নামের সৃজনে বিলুপ্ত বিবরণহীন মোলঙ্গী শ্রেণীর এই উপজাতি ‘চন্দভনদাস’ নামটি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য গুরুত্বের দাবী রাখে৷ নুন চাষে বেশ আয় দেখে ইংরেজ কোম্পানির শাসকদের নুনচাষী অর্থাৎ মোলঙ্গীদের উপর দরদ উথলে ওঠে৷ জজ ও কালেক্টর সাহেবটিলম্যান হেঙ্কেল ১৭৮১ তে যশোর জেলার দায়িত্ব হাতে পেয়েই মোলঙ্গীদের মঙ্গল কামনার কাজে আদাজল খেয়ে লেগে পড়েন৷ প্রথমেই তিনি ফড়েদের দাদনের থাবা থেকে মোলঙ্গীদের মুক্ত করেন৷ ফলে মোলঙ্গীরা তাদের মজুরী ঠিকঠাক পায়৷ বছরভর নুনভাত অন্তত জোটে যা পূর্বে পেত না৷ হেঙ্কেল সাহেব মোলঙ্গীদের নুন কেনাবেচার জন্য ইছামতীর পাড়ে একটা বাজার তৈরী করে দিয়ে বাজারের নাম রাখেন হেঙ্কেলগঞ্জ৷ হেঙ্কেলগঞ্জ হেঙ্কেল সাহেবের জীবিতকালেই পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় হিঙ্গলগঞ্জ৷ এর জন্যে লেখাপড়া না জানা মোলঙ্গীদের উচ্চারণকে অযথা দোষ দিয়ে লাভ নেই৷ তবে ইছামতী পারের মোলঙ্গীরা হেঙ্কেল সাহেবকে দেবতার আসনে বসিয়েছিল৷ মোলঙ্গীদের পরিত্রাতার ভূমিকায় থাকাটিলম্যান হেঙ্কেল-এর মূর্তি বানিয়ে সুন্দরবনের মানুষকে পুজো করতে দেখেছে ইংরেজরা এবং তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ক্যালকাটা গেজেটে (২৪এপ্রিল, ১৭৮৮)৷ যদিও মোলঙ্গীরা কোনদিন বুঝে উঠতে পারে নি যে বেনের জাত ইংরেজরা নুন ব্যবসাটা বেশ ভালোই বুঝে গেছিল৷ নুন প্রস্তুতে কোম্পানির তরফে খরচাপাতি কিছুই নেই৷ টাকা খাটাতে হয় না৷ শুধু ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক করতে পারলেই কর বাবদ অগাধ আয়৷ নোনা জলেই নুন ওঠে৷
হেঙ্কেল সাহেবের মোলঙ্গী কল্যাণ কর্মের প্রায় ১০০ বছর পরে হান্টার সাহেব (১৮৭৬ খ্রিঃ) সুন্দরবনে গিয়ে মোলঙ্গীদের নুন প্রস্তুতের প্রস্তুতিপর্ব ঘুরে ফিরে দেখেছেন৷ সুন্দরবনের উপকূলবর্তী অঞ্চলে যেখানে ঘন জঙ্গল নেই, অথচ চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লম্বা লম্বা গুঁড়ির গাছ, সেই সমস্ত জায়গা অল্প বিস্তর পরিষ্কার করে নিয়েই নুন প্রস্তুতের কাজে লেগে পড়ে মোলঙ্গীরা৷ একালে সুন্দরবনে নুন উৎপাদন না হলেও প্রায় ৩০০ বছরের পুরানো নুন ফোটানোর ইঁটের তৈরী লম্বাটে উনুনের ভগ্নাবশেষ এখনো সুন্দরবনের উপকূলবর্তী অঞ্চলে পড়ে থাকতে দেখা যায়৷
এমনই এক মোলঙ্গী ছিলেন গৌড়ের অন্যতম এক সুলতান৷ ফকরুদ্দিন মুবারক শাহ৷ কিশোর বয়সে তার নোয়াখালির সমবয়সী বন্ধুরা সবাই তাকে ফকরা বলে ডাকে৷ ভাগ্যচক্রে তিনিই পরে গৌড়ের সুলতান ফকরুদ্দিন মুবারক শাহ৷ বহু কঠিন পথ পেরিয়ে মোলঙ্গী ফকরা পরবর্তীকালে গৌড়ের শাসনকর্তা ফকরুদ্দিন হয়েছিলেন৷ প্রথমে সোনারগাঁও-এর আঞ্চলিক শাসনকর্তা বরহাম খানের তরবারি বাহক, ক্রমে সেনানী, সেনাধিনায়ক ও সবশেষে গৌড়ের সুলতান৷ সেই কবেকার বালকবেলার তার মোলঙ্গী পরিচিতি তিনি ভুলতে বসেছিলেন৷ কিন্তু তার মোলঙ্গী বন্ধুরা তাদেরই এক বন্ধু ফকরা-র এমন উন্নতির কথা শুনে নোয়াখালি থেকে গৌড়ে এসে বন্ধুর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়৷ কিন্তু বন্ধুর সাক্ষাৎ আটকায় সুলতানের প্রহরী৷ স্বয়ং বাংলার ভাগ্য নির্ধারকের সঙ্গে জীর্ণ পোশাকের দীনবেশের মোলঙ্গীদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে অন্য রাজপুরুষদের কেউই রাজী হয় না৷ অগত্যা নোয়াখালী থেকে আসা সুলতানের বালকবেলার বন্ধুরা লাঠির মাথায় নুনের বস্তা নিয়ে নোয়াখালির ভাষায় ‘‘নুনের রাজা ফকরুদ্দিন; লাঠির আগায় থালা চিন’’ ছড়া কাটতে কাটতে রাস্তা পরিক্রমণ শুরু করে৷ বন্ধুদের ছড়া কাটার কথা সুলতানের কানে যায়৷ সুলতানের মোলঙ্গী-বেলার কথা মনে পড়ে যায়৷ মোলঙ্গী বন্ধুদের চিনে ফেলতে সত্যি তার আর দেরী হয় না৷
সেকালে মোলঙ্গীদের এই নুনচাষে বেশ পরিশ্রম ছিল৷ নুন মাটি চেঁছে তোলা, তাতে নোনা জল গুলানো, মাটির তৈরী দ্রোনে জলে গোলা নোনা মাটি থিতিয়ে গেলে তাকে ছেঁকে কলসিতে ধরে রাখা, তারপর ঘন গাঢ় নোনাজল কাঠের আঁচে ফুটিয়ে তবে নুন তৈরী হতো৷ একালে বিঘের পর বিঘে নীচু জমিতে প্লাস্টিক বিছিয়ে সমুদ্র থেকে নোনা জল ঢুকিয়ে ৩-৬ সেমি উচ্চতায় রোদ্দুরে রেখে দিলেই কয়েকদিন পরে বাষ্পীভবনে নুন প্রস্তুত হয়ে যায়৷ নুন তৈরীতে সেকালের মতো এখন পরিশ্রম যেমন নেই, খরচও নেই৷
চাষের জমির এলাকা বাদ দিলে সুন্দরবনের নদীপাড়ে কিংবা সমুদ্রোপকূল নুন তৈরীর বাদা৷ সুন্দরবনে অকর্ষিত জলাজংলায় ভর্তি বিস্তীর্ণ জমিকে বাদা বলে৷ এখনো৷ লাঙ্গলচষা জমির চারদিকে বাঁধ থাকতো তাই নোনাজল ঢুকতে পারতো না৷ সেকালে এই ধরণের জমি পরিচিত ছিল ‘মাধুর’ নামে৷ আর নদীর বিস্তীর্ণ পাড় যেখানে পূর্ণিমা অমাবস্যার ভরা কোটালে নোনা জল বিছিয়ে যেত, সেও জমি৷ তাকে ‘বহরিবন্দি’ বলত লোকে৷ ওখানেই নুন চাষ হতো৷ ওখানে নোনা মাটির উপর নুনের সাদা স্তর ঝিনুক দিয়ে চেঁছে এক জায়গায় জড়ো করত মোলঙ্গীরা৷ তারপর ওই মাটি নদীর নোনা জলে গুলিয়ে নদীপাড়ে বানানো দ্রোনে হেঁতাল পাতা বিছিয়ে পাতন-কৃত সংগৃহীত গাঢ় লবণাক্ত জল ফুটিয়ে লবণ পাওয়া যেত৷ যেখানে নোনা মাটি সঞ্চয় ও নোনাজল থেকে বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় নুন তৈরী করা হোত, সেই স্থানের নাম ছিল খালারি৷ খালা অর্থাৎ নীচু জায়গা৷ এমনই এক একটি খালারি-তে ইংরেজ শাসককুলের হিসেবে ৭ জন মোলঙ্গীর পরিশ্রমে বছরে ২৩৩ মন নুন পাওয়া যেত৷ নুন তৈরী চলত নভেম্বর থেকে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত৷ নুন তৈরীর সময় পেরোলে বছরের বাকি দিনগুলিতে মোলঙ্গীদের পেটের দায়ে, মাধুর অর্থাৎ কৃষিজমিতে মজুরগিরির কাজে হাজির হতে হতো৷ ওখানে ওদের পরিশ্রমের বহর দেখে তবে মজুরী জুটতো৷ ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে মোলঙ্গীদের মজুরী কিছুটা হলেও বেড়েছিল৷ প্রতি ১০০ মন লবণ উৎপাদনে মাথা পিছু ২২ টাকা পেত মোলঙ্গীরা৷ একালেও নদীর ধারে এমন সব দরিদ্র পরিবার তাদের বছরের প্রয়োজনীয় নুন টুকু মোলঙ্গীদের সেই সেকেলের পদ্ধতি অনুসরণে তৈরী করে নেয়৷
নুন চাষে তখন বেশ আয়৷ মেঘনা নদীর দু’পাশে সেকালের আধিকারিকরা ফতিয়াবাদ সরকার ৬৪৪৪ টাকা ও চাটগাঁ সরকার ১৮৯৩৮ টাকা নুন তৈরী বাবদ আদায় করেছিলেন৷ এই পরিসংখ্যান ১৫৮২ খ্রিঃ-এর৷ তখন মুঘল আমল৷ নুন চাষে আয় পরে আরো বাড়ে৷ আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর বছরে (১৭০৭ খ্রিঃ) হিজলি সহ ২৮ পরগনার মোট ৩৪১,৩৮৪ টাকা আদায়কৃত করের মধ্যে ৪৩,৫৬৫ টাকা নুন চাষের কর হিসাবে মুঘল সরকারের তরফে বাংলার সুবেদার আদায় করেছিল৷ মুঘল আমলে ৪৫০০ জন মোলঙ্গী বছরে গড়ে ২০ লাখ মন লবণ তৈরী করত৷ ইংরেজ কোম্পানির সরকার হালে পানি পেয়েই ১৭৮১ সালে সুন্দরবনে ৬০,০০০ জন মোলঙ্গীর দেখা পায়৷ এবং এই ৬০,০০০ জন মোলঙ্গী বছরে গড়ে ২৮ লাখ মন লবণ প্রস্তুত করে যার সেকালে বাজার মূল্য ৫৪,৫০,০০০ টাকা৷ মোলঙ্গীদের মজুরী মিটিয়ে কোম্পানি ওই বছরেই মুনাফা পায় ৩৫,০০,০০০ টাকা৷ গেজেটিয়ার প্রণেতা ও ম্যালি সাহেব ২৪ পরগণা জেলা গেজেটিয়ারে প্রায় তিনশ বছরের নুন চাষে লাভের অঙ্কের ওঠানামার পরিসংখ্যান দিয়ে গেছেন৷
নোনাজল ফুটিয়ে নুন তৈরী করত সুন্দরবনেরই চন্দভনদাস নামের এক উপজাতি৷ চন্দভনদাস-রা সুন্দরবনের জঙ্গলে বসবাসকারী একমাত্র উপজাতি যাদের ইংরেজ আমলের বহু আগে থেকেই আর খোঁজ মেলে না৷ এরা নাকি বেশ একগুঁয়ে ও ক্ষ্যাপাটে প্রকৃতির ছিল৷ কথায়বার্তায় সভ্যতা ভব্যতার লেশমাত্র না থাকায় এক ব্রাহ্মণকে তিনটি গ্রাম দান করার সময় মাধবসেনা নামের এক রাজা উপজাতি সম্প্রদায়ের নুন চাষ জীবিকার মোলঙ্গী এই চন্দভনদাসদের শাস্তি দান করার অধিকার ওই ব্রাহ্মণকে দান করে গেছিলেন৷ বাখরগঞ্জে আদিলপুরে (১১৩৬ সম্ভাত; ১০৭৯ খ্রিঃ) গন্ড লিপিতে সংস্কৃতে লেখা এক তাম্রশাসনে এমন তথ্য সংগ্রহ করেছেন ইংরেজ শাসককুল৷ তবে সুন্দরবনের প্রথম মোলঙ্গীদের ‘চন্দভনদাস’ উচ্চারণ না করতে পেরে ইংরেজরা বলত ‘সন্দভনদাস’ এবং ক্রমে তার থেকে সন্দরবন্দস এবং সবশেষে সুন্দরবনস৷ সুন্দরবন নামের স্রষ্টা তারই প্রকৃতির কোলে একসময়ে বসবাসকারী মোলঙ্গী চন্দভনদাস নামের এক উপজাতি৷ সুন্দরবন আছে, অথচ তার নামের উৎস-মানুষ মোলঙ্গী চন্দভনদাস-রা আর নেই৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন