বনদস্যু/জলদস্যু

গৌতমকুমার দাস

সম্প্রতি বাংলাদেশের সুন্দরবন বনদস্যুদের অক্ষত অভয়ারণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ নব্বই এর দশকে ভারতীয় সুন্দরবনে কুখ্যাত বনদস্যু বাচ্চু সর্দার এর প্রতাপ ছিল ভীষণ৷ কিন্তু বর্তমানে বাচ্চু সর্দার দস্যুবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক দলে নাম লিখিয়ে মূল সমাজের স্রোতে নিজেকে সামিল করেছে৷ কিন্তু বাংলাদেশ সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষ এখন অসংখ্য দস্যুবাহিনীর কবলে পড়ে ক্ষতবিক্ষত৷ বনবিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রচ্ছন্ন মদতে বনদস্যুরা কুকর্ম করে বেড়ায় এবং তাদের আশ্রয়ে নিরাপদে থাকে৷

বাংলাদেশের সুন্দরবনে এখন জলদস্যু-বনদস্যু মিলে অসংখ্য দস্যু বাহিনী৷ দলের নেতাদের নামানুযায়ী দলগুলির নাম হয়ে থাকে৷ এই মুহূর্তে যে দলগুলির দাপট বাংলাদেশের সুন্দরবনে, সেগুলি হল—বাবুল বাহিনী, খোকন ওরফে বাম্বা বাহিনী, জামাল বাহিনী, রেজাউল বাহিনী, সেজু বাহিনী, আকরাম বাহিনী, মেজবাই বাহিনী, লাঠিমারা পার্টি, সন্ন্যাসী বাহিনী, শওকত বাহিনী, মোহন বাহিনী, মুকুল বাহিনী, টাইগার খোকা বাহিনী, মেতুল বাহিনী, বড় ভাই পাটি, মামা-ভাগ্নে পার্টি ইত্যাদি৷ শিবসার পূর্বতীরে খুলনা রেঞ্জে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে সাব্বির ও জুলফিকার বাহিনী, শিবসার পশ্চিমতীরে নিয়ন্ত্রণ শহিদ ও মোতালেব বাহিনীর হাতে৷ সাতক্ষীরা অঞ্চলে দাপট বারিক ও বাকিবিল্লাহ বাহিনীর, আবার শহণখোলা রেঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করে বাদল, কামাল ও রুবেল বাহিনী৷ চাঁইপাই রেঞ্জ নূর হাবিব, বি ডি আর ও মাওয়া ও নূর হাবিব এই তিনটি বাহিনী একত্রে একযোগে দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে৷ প্রতিটি বাহিনীতে ২০-২৫ জন করে সদস্য, বিদেশী পাইপগান, বন্দুক, রিভলভার, দেশী বন্দুক, শর্টগান সহ অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে৷ এইসব বনদস্যুরা হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ব্যবহার করে থাকে৷

জলদস্যুরা কাঠুরে, চনারু, জেলেদের উপর নির্মম অত্যাচার করে৷ অর্থ উপার্জন করা হল বনদস্যুদের কাজ৷ এরা নৌকা কাঠ, কাঠুরে, জেলেদের আটক করে মুক্তিপণ চেয়ে বাড়িতে খবর পাঠায়৷ মুক্তিপণ পেলে ছেড়ে দেয়, নইলে কেটে জলে ভাসিয়ে দেয়৷ কোন কোন বনদস্যু বাহিনীকে আগাম অর্থ দিয়ে তবে কাঠুরে বা জেলেরা সুন্দরবনে ঢোকার ছাড়পত্র পায়৷ আবার কোন কোন বাহিনী জঙ্গলে ট্রলার করে ঘুরে বেড়িয়ে মুক্তিপণ আদায় করে থাকে৷

বাংলাদেশ সুন্দরবনের জলদস্যুরা ভারতীয় অংশে ঢুকে পড়ে এখন মুক্তিপণ আদায় করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে৷ একটি দৈনিক সংবাদপত্রে ৫-ই এপ্রিল, ২০১৪-এ প্রকাশিত ‘জলদস্যুদের কবলে হিঙ্গলগঞ্জের মৎসজীবী’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন অভিযোগের প্রতিফলন ঘটেছে— ‘মাছ ধরতে গিয়ে বাংলাদেশি জলদ্যুদের হাতে অপহৃত হলেন এক মৎসজীবী৷ ঐ মৎসজীবীর নাম অসিত বাউড়িয়া৷ তাঁর বাড়ি হিঙ্গলগঞ্জের কালীতলা অঞ্চলে৷ শনিবার বিকেলে তিনি রণজিত বাউড়িয়া এবং রমেশ মন্ডলকে সঙ্গে নিয়ে নৌকায় করে কালিন্দী নদীতে মাছ ধরতে যান৷ অভিযোগ, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি দুটি নৌকায় করে প্রায় জনা পনের জলদস্যু তাদের নৌকাটি ঘিরে ফেলে৷ অসিতবাবুকে তুলে নিয়ে যান৷ বাকি দুজনকে ছেড়ে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলে৷ তখন ঐ দুই মৎসজীবী, হেমনগর উপকূল থানায় এসে অভিযোগ দায়ের করেন৷ পুলিশ বি.এস.এফ. কে সঙ্গে নিয়ে ঐ মৎসজীবীর সন্ধান করছে৷ যদিও গভীর রাত পর্যন্ত অপহৃত ওই মৎসজীবীর সন্ধান পাওয়া যায় নি৷ তল্লাসি চালাচ্ছে বি.এস.এফ৷’

বনবিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে বলে এদেরকে কেউ ধরতে পারে না৷ এদের জন্য সরকারের কোন আইন কানুন নেই৷ সুযোগ বুঝে জলদস্যুরা লোকালয়ে ফিরে আসে৷ আবার জনশ্রুতি যে সুন্দরবনে থাকার সময় খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে বনবিভাগের লোকজন৷ বনদস্যুদের থেকে মোটা টাকা কোনও পরিশ্রম ব্যতিরেকে উপার্জন করে থাকে বনবিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা৷ অথচ গরীব মৌয়াল, বাওয়ালী, চনারু, জেলেদের অতি কষ্টে উপার্জিত অর্থ লুটপাট হয়, না দিলে বেঘোরে তারা প্রাণ হারায়৷

বনদস্যুদের সামাল দেওয়ার জন্য বনদপ্তরের লোকবল অর্থাৎ বনরক্ষী অপ্রতুল৷ অল্পকিছু পুরানো বন্দুক আছে যেগুলিতে প্রয়োজনের সময় গুলিবর্ষণ হয় না৷ আবার অনেক অকেজো রাইফেল গুদামঘরে পড়ে থাকে এবং বন্দুকের গুলি বহু পুরানো, চল্লিশ—পঞ্চাশ বছরেরও পুরানো গুলি বন্দুকের ট্রিগার টিপলেও ফোটে না৷

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মোহানায় জেগে ওঠা নবীন পলিসমৃদ্ধ লবণাক্ত উদ্ভিদের শ্যামল চাঁদোয়ায় মোড়া সুন্দরবনের প্রকৃতি যতটা নয়ন মনোহর, বিপরীতে ঠিক ততটাই বিপদসঙ্কুল, ভয়ঙ্কর ও কঠিন সুন্দরবনের গা ঘেঁষে বেঁচে থাকা মানুষগুলির প্রান্তিক জীবন৷ সুন্দরবনের এক-তৃতীয়াংশ ভারতীয় অংশে ও বাকী দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশ সুন্দরবন৷ কিন্তু এই সুন্দরবনের পূর্বে ও পশ্চিমে মানুষ ও প্রকৃতির বিস্ময়কর বৈপরীত্য লক্ষ্যণীয়৷ বাংলাদেশের সুন্দরবনের প্রকৃতি দু’হাত ভরে উজাড় করে দিয়েছে নিজেকে কেননা এই সুন্দরবনে মিষ্টি জল নিয়মিত সরবরাহ করে থাকে কপোতাক্ষ, গড়াই, মধুমতী, রূপসা, ভোলা, আড়পাংশা, আড়িয়াল খাঁ নদীর মিষ্টি জলপ্রবাহ৷ কিন্তু প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সুন্দরীগাছে সমৃদ্ধ এই সুন্দরবনে মানুষ অবলীলায় ধ্বংস করে সুন্দরী, গরান, পশুর আর হত্যা করে মায়াবী চিতল হরিণ, বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত সুন্দরবনের বিপন্নপ্রায় বাঘকে৷ এখানে অবৈধভাবে চলে কাঠ পাচার, আর পাশাপাশি বনদস্যুর নির্মম অত্যাচার৷ প্রকৃতি এখানে অহরহ ধর্ষিত ও লাঞ্ছিত৷ বিপরীতে ভারতীয় সুন্দরবনে প্রকৃতি তার সব কটি লবণাম্বু প্রজাতির বৃক্ষরাজি দিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারেনি কারণ এই সুন্দরবনের নদীগুলিতে মিষ্টি স্বাদু জলের সরবরাহের অভাব৷ সপ্তমুখী, মাতলা, ঠাকুরাণ, গোসাবা, বঙ্গদুনী, রায়মঙ্গল, ঝিল্লা নদীগুলির সঙ্গে মিষ্টি জলের নদী বা অন্য কোন উৎসের সঙ্গে যোগ নেই৷ ভারতীয় সুন্দরবনের নদীগুলিকে নদীর সংজ্ঞানুযায়ী নদী বলা চলে না৷ এরা বড় বড় খাঁড়ি৷ কিন্তু এই ভারতীয় সুন্দরবনে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বাঘ হরিণ কামট শুয়োর বানর গোসাপ শশুক জাতীয় বন্যপ্রাণীদের ক্ষেত্র৷ এখানে সুন্দরী বিরল৷ মউলেরা সরকারী সাহায্য পায়, বাঘের হাত থেকে বাঁচার জন্য মুখোসের ব্যবহার সহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ পায়৷ বনজ সম্পদের অবৈধভাবে পাচার ধরা পড়লে কড়া শাস্তির আওতায় আনা হয় পাচারকারীদের৷ কিন্তু বাঘ সাপ কুমীর কামটের সঙ্গে লড়াই চালাতে হয় সুন্দরবনের এই প্রান্তিক মানুষদের৷ মাছ কাঁকড়া ধরার সময় অথবা মধু কাঠ, সংগ্রহকালীন বছরে দু চারটে প্রাণ যায়৷ শুধু কি বাঘ কুমীর সাপের কারণে দুর্বিসহ প্রান্তিক মানুষের জীবন, বাঘ সাপ কুমীর কামটের সঙ্গে ম্যালেরিয়ার দাপটে আরো ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ১৪০ বছরের পুরানো অবিভক্ত সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষের জীবন বৃত্তান্তের কথা বলেছেন হান্টার সাহেব (W. W. Hunter, 1875 page no. xxix)--This lower region of the Sundarbans forms a sort of drowned land, covered with jungle, smitten by malaria, and infested by wild beasts; broken up by swamps, intersected by a thousand river channels and maritime backwaters'৷ তবু অপরূপ সৌন্দর্যের আধার এই সুন্দরবনের সুন্দরী, গোলপাতা, হেঁতাল, মাছ, কাঁকড়া, বাঘ, কুমীর, কামট, গোসাপ, মউলে, বাউলে, জেলে সহ মানব সম্পদের সমাহারে সুন্দরবনের প্রকৃতি ও প্রান্তিক জীবনের গতিশীল সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র সব কিছু বুকে ধারণ করেও আশ্চর্য নীরব সুন্দরী সুন্দরবন৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%