গৌতমকুমার দাস
বাঙালীর চা-চক্রে সুন্দরবন নিয়ে কথার আসরে বাঘ কুমীরের সাথে ইলিশ তপসে ফ্যাসা লইট্যা চিংড়ির নাম সমস্বরে উচ্চারিত হয়৷ অতি সুস্বাদু কাঁকড়া চিংড়িরা যদিও মাছ নয়, তবু সাহেবরা এদের Shell fish বলে৷ বৈচিত্র্যময় সুন্দরবনের নদী নালা খাঁড়িতে প্রায় ১২০টি প্রজাতির মাছ, ১৮ প্রজাতির চিংড়ি ও ৩৪ প্রজাতির কাঁকড়া জন্মায়৷ ডিঙি, ছিপ, নৌকা, পাউকা বা ট্রলারের সাহায্যে বছরভর বিভিন্ন মরসুমে হরেক রকম মাছ ধরা চলে৷ মধু বা বাগদামীন সংগ্রহ আর কাঠ কাটার পাশাপাশি সুন্দরবনবাসীর অন্যতম জীবিকা হল মাছ ধরা৷ সুন্দরবনের নামখানা, ফ্রেজারগঞ্জ, কয়লাঘাটা, কাকদ্বীপ, রায়দীঘি, বাসন্তীসহ অধিকাংশ মৎস বন্দর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ সরবরাহ করে পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে৷ যদিও এই ইলিশ ধরা পড়ে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র জলে৷ ইলিশ ছাড়াও পমফ্রেট, পার্শে, ভাঙন, তপসে, গুড়জাউলি, ট্যাংরা, কানমাগুর, চ্যালা সংখ্যাধিক ধরা পড়ে৷ ছোট বড় সব ধরণের কামট শিকার করে নিয়ে আসে গভীর সমুদ্রে ট্রলারে পাড়ি দেওয়া জেলেরা৷ নামখানা ও কাকদ্বীপে মৎস বন্দরে প্রচুর পরিমাণে কামট-এর দেখা মেলে৷ কাকদ্বীপে কামট এর যকৃৎ থেকে তেল বার করার বেশ কয়েকটি কারখানা স্থাপিত হয়েছে৷ বিভিন্ন প্রজাতির কামটের মধ্যে হাতুড়ী মাথা কামট বা হাঙর অজস্র পাওয়া যায়৷
বর্ষার মরসুমে ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে ইলিশ মাছ ধরতে প্রায় ৭০-৮০ কিমি পথ পাড়ি দেয় জেলেরা৷ মোহানায় এখন ইলিশ সাধারণত পাওয়া যায় না৷ ইলিশ প্রকৃতিতে পরিযায়ী৷ এক কিলোগ্রাম প্রমাণ আকৃতির ইলিশের বেড়ে উঠতে সময় লাগে প্রায় চার বছর৷ প্রমাণ আকৃতির ইলিশ যাতে বর্ষার মরসুমে পাওয়া যায় তার জন্যে আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা রয়েছে৷ যেমন আগষ্ট মাস অবধি মোহানায় ইলিশ জাল পাতা বন্ধ করা, মাছ ধরা জালের ফাঁসের আকার নির্দিষ্ট করা যাতে খোকা ইলিশ বা চন্দনা না ধরা পড়ে অর্থাৎ ৯ (নয়) ইঞ্চির থেকে ছোট আকৃতির মাছ না ধরা পড়ে তার ব্যবস্থা করা৷
জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ৯৬৩০ বর্গ কিমি আয়তনের সুন্দরবনে বনাঞ্চল বর্তমানে মাত্র ৪২৬৬ বর্গ কিমি৷ মোট ১০২টি দ্বীপের মধ্যে ৪৮টি দ্বীপে রয়েছে ম্যানগ্রোভ অরণ্য, বাকি দ্বীপগুলি সব মানুষের দখলে৷ সুন্দরবনের যে ৫৪টি দ্বীপে মানুষের বসবাস সেখানে স্ফীতকায়া নাহলেও বেশ কিছু নদী নালা খাঁড়ি আছে যা দ্বীপগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে৷ এই নদী নালায় মাছের পরিমাণ অপর্যাপ্ত কারণ মানুষে মাছ জন্মানোর বা বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয় কম৷ সুন্দরবনের মানুষের বাসভূমি এই দ্বীপগুলি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১৩টি ব্লকে আর উত্তর ২৪ পরগনার ৬টি ব্লকের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ সুন্দরবনের লোকালয়ের ৮৫% দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এবং মাত্র ১৫% উত্তর ২৪ পরগনা জেলার আওতায় পড়ে৷ উল্লেখযোগ্য, সুন্দরবনের মোট আয়তনের ৫৫% এলাকা থেকে জল জঙ্গল জমিন উধাও হয়ে গেছে সেই ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকেই৷

বাণমাছ
ভূমিরূপ ও ভৌগোলিক অবস্থানগত বৈচিত্র্য ভারতীয় সুন্দরবনের সৌন্দর্য মাছ কাঁকড়া সহ বনজ সম্পদহানির কারণ৷ পাত সংঘট্টের (Plate tectonics) কারণে ভারতীয় সুন্দরবন অংশের উত্থান গঙ্গার সঙ্গে সুন্দরবনের নদীগুলির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে৷ ফলে মিষ্টি জলের সরবরাহ বৃষ্টির জল ছাড়া কার্যত বন্ধই৷ নদী নালায় জলের লবণতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে যা ঈষৎ লবণাক্ত জলের মাছ চিংড়ি কাঁকড়ার বেঁচে থাকার পক্ষে পরিবেশ বান্ধব নয়৷ জোয়ারের জল ঢোকার পরিমাণ কমে যাওয়ায় নদীগুলি হয়েছে শীর্ণকায়া ৷ নদীখাত যতই সংকীর্ণ হয়ে চলেছে ততই নদীর দু পাড়ের প্লাবনভূমি মানুষের দখলে চলে যাচ্ছে৷ মাছের ভেড়ি বা ইট ভাঁটা নদীর বুকে গড়ে উঠলে বাসভূমির অভাবে মাছ চিংড়ি কাঁকড়ার দল ক্রমে নিশ্চিহ্ন হবে৷
বাংলাদেশ সুন্দরবনের মাছ
বাংলাদেশ সুন্দরবনের প্রকৃতি লালিত মানুষের অতি প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ হল মাছ যা প্রোটীন উপাদান সরবরাহ করে থাকে৷ এই সুন্দরবনের বিভিন্ন মাছের প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২১০টি৷ এছাড়াও ২৬টি প্রজাতির চিংড়ি, ১টি লবস্টার প্রজাতি এবং ১৩টি কাঁকড়া প্রজাতি রয়েছে৷ বাংলাদেশ সুন্দরবনে উল্লেখযোগ্য মাছগুলির পরিচিত নাম হল— রূপচাঁদা, চিত্রা, কাইন, ভেটকি, ভোলা ভেটকি, কানমাগুর, ট্যাংরা, পাঙ্গাস, তাপসী, মেদ, পোয়া, ছুরি, লইট্যা, পারসে, ভাঙন, কুচে, চান্দা, মুর বাইল্যা, ফাইস্যা, চাপিলা, রাঙা চৌখ্যা, সাগর কৈ, বেলে, ফাংসা, বাটা, চামা, শাপলা পাতা, ইলিশ, চাক চান্দা, মাইট্যা, মোচন, পটকা, চেলা, ফাইমা, আমাদি, উড়াল, কোমা, রাইনা, পাগলাগতি, লাক্কা, থুরিয়া, জডা ইত্যাদি৷ বাংলাদেশ সুন্দরবনে জেলেদের ব্যবহৃত জালের সংখ্যা কমবেশি ১লক্ষ ২০ হাজার৷ এর মধ্যে বাগদা পোনা ধরার জন্য ১ লক্ষ জাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে যা নেট জাল নামে স্থানীয় এলাকায় পরিচিত৷ অন্য মাছ ধরার জন্য বেহুন্দি জালের ব্যবহার চোখে পড়ে৷ অল্প সংখ্যক হলেও শোরগিল নেট মাছ ধরার জন্য কাজে লাগায় জেলেরা৷ শোরগিল নেটের সংখ্যা প্রায় পাঁচশো৷ মাছ ধরার জন্য এই অঞ্চলে প্রায় ১ লক্ষ নৌকা জেলেরা ব্যবহার করে থাকে৷ যন্ত্রচালিত নৌকার সংখ্যা খুবই কম— হাজার খানিক৷ তবে শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে সাধারণ দিশি ডিঙি নৌকাকে গতিশীল করা হয়েছে এবং সেই ধরণের নৌকার সংখ্যা প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি৷ দেশী মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা প্রায় ছিয়ানব্বই হাজার৷
উপকূলবর্তী এলাকার মাছ এবং উপকূল দূরবর্তী এলাকার মাছ— এই দুই ধরণের মাছ সুন্দরবন অঞ্চলের জেলেরা ধরে থাকে৷ সাধারণত উপকূলবর্তী এলাকায় দুই থেকে আট মিটার গভীরতা অবধি ইলিশ ও বেহুন্দি জাল ফেলে দেশী নৌকায় মাছ শিকার করা হয়৷ আর গভীর সমুদ্রে অর্থাৎ উপকূল দূরবর্তী এলাকায় সাগরের ঢেউতে জল সব সময় আন্দোলিত হওয়ায় জালের উপরিভাগে জাল ফেলে মাছ ধরার কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে৷ তবে উপকূলীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের মোট আহরিত মাছের দুই তৃতীয়াংশ ধরা পড়ে৷ সুন্দরবন এলাকার পাশ্ববর্তী অঞ্চলের প্রায় তিন লক্ষ মানুষ মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত থাকে৷ আর বাগদা পোনার শতকরা আশি ভাগ সংগৃহীত হয় বাংলাদেশের সুন্দরবনের নদীর জল থেকে৷
বাংলাদেশ সুন্দরবনে নদীজলে প্রাপ্ত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাছ (স্থানীয় নাম) ও চিংড়ি—
ক্রমিক নং |
এলাকাভিত্তিক নাম |
ইংরাজী নাম |
বিজ্ঞানসম্মত নাম |
১. |
ফাইস্যা |
Mullet |
Liza parsia |
২. |
ভাঙন |
Mullet |
Mugil cephalus |
৩. |
তাপসি |
Paradise threadfin |
Polynemus paradiseus |
৪. |
বেলে |
Gobies |
Glossogobius giuris |
৫. |
ছুরি মাছ |
Ribbon fish |
Trichinnus haumela |
৬. |
মাইট্যা |
Mackrel |
Euthynnus affimis |
৭. |
ফলি চান্দা |
Silver Pomfret |
Pampas argenteus |
৮. |
রূপ চান্দা |
Chinese Promfret |
Pampas chinensis |
৯. |
টাকা চান্দা |
Common Pony Fish |
Leiognathus equulus |
১০. |
রাঙা চৌখা |
John's Snapper |
Lutjanus johrii |
১১. |
সাগর কৈ |
Tripple tails |
Loobotes surinamensis |
১২. |
সাদা দাঁতনে |
Lined Silver Grunter |
Pomadasys hasta |
১৩. |
লইট্যা |
Bombay duck |
Harpodon nehereus |
১৪. |
পোয়া |
Goatee Croaker/Jew fish |
Dentrophysa sp. |
১৫. |
কুচে |
Eel |
Cuchia cuchia |
১৬. |
ফাঁসা |
Smooth Back Herring |
Raconda russelliana |
১৭. |
ফ্যাসা/ফেসা |
Anchovy |
Satipinna taty |
১৮. |
মুর বাইল্যা |
Rough flat head |
Platycephalus scaber |
১৯. |
পাঙ্গাস |
Fatty Catfish |
Pangasius pangasius |
২০. |
চাপিলা |
Shad |
Gadusia chapra |
২১. |
শাপলা পাতা |
Ray |
Amphotistius zugei |
২২. |
বাগদা চিংড়ি |
Tiger shrimp |
Penaeus monodon |
২৩. |
হরিণা চিংড়ি |
Brown shrimp |
Metapenaeus monocerus |
২৪. |
চামা চিংড়ি |
Spotted Brown shrimp |
Metapenaeus spinulatus |
২৫. |
কাঁকড়া |
Crab |
Scylla serrata |
২৬. |
ইলিশ |
Hilsha Shad |
Hilsha ilisha |
ভারতীয় সুন্দরবনে মাছ
সুন্দরবনে প্রায় ৩৩,০০০ হেক্টর জলাভূমি জুড়ে মাছ চাষের ভেড়ি৷ গত পঁচিশ বছরে বহু চাষের জমি এই ধরণের মাছ চাষের জমিতে পরিবর্তিত হয়েছে৷ তার কারণ লবণ-ক্ষারকীয় (Saline Alkaline) ধর্মী মাটির সুন্দরবনের নদীর আশেপাশে চাষের জমিতে বছরে মাত্র একবারই বর্ষার সময় আমন ধানের চাষ হয় যার ফলন বলার মতো নয়৷ লোভ ও লাভের আশায় ধান জমি পরিবর্তিত— এই ভেড়ীগুলির কিছু অংশে ঈষৎ লবণাক্ত জলের মাছ পারসে ভেটকি পায়রাচাঁদা ট্যাংরা তপসে চাষ হলেও প্রধানত অর্থনৈতিক কারণে বাগদা চিংড়ির চাষ হয়ে থাকে৷ প্রতিবছর সুন্দরবনের ৩৩ লক্ষ হেক্টর আয়তনের ভেড়ি প্রায় ২৫,৫১৮ টন মাছ ও চিংড়ির জোগান দেয় যার অধিকাংশটাই কলকাতার মানুষের রসনা মেটায়৷ তার সঙ্গে পূর্ব কলকাতার মিষ্টি জলের ৪০০০ হেক্টর আয়তনের ভেড়ি থেকে ৮,০০০ টন জ্যান্ত রুই, কাতলা, কালবোস, তেলাপিয়া, নাইলোটিকাস, বিগহেড, সিলভার কার্প, গ্র্যাস কার্প, জাপানী পুঁটি কলকাতার বাজারগুলোর চাহিদা মেটায়৷ সুন্দরবনের ভেড়ির তুলনায় পূর্ব কলকাতার ভেড়িগুলোর মাছের উৎপাদন হার অনেকাংশেই কম যা বছরে হেক্টর প্রতি ২০০-৩০০ টন৷ পূর্ব কলকাতার এই ভেড়িগুলিতে কলকাতা মেগাসিটি নিষ্ক্রান্ত নর্দমা নিকাশি বর্জ্য মেশানোয় উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণার সংখ্যাধিক্য ঘটে এবং মাছের পুষ্টি উৎপাদনের চাহিদা পূরণ করে৷ পূর্ব কলকাতার এই ধরণের ভেড়ির সংখ্যা প্রায় ১৩০টি৷ নর্দমা নিকাশী বর্জ্যের উপর নির্ভরশীল পূর্ব কলকাতার ভেড়িগুলিতে মাছের উৎপাদন কম হওয়ার প্রধান কারণ জীবাণুঘটিত রোগ যা শুধু মাছের বৃদ্ধি আটকায় না মাছের মৃত্যুও ঘটায়৷ কলকাতা মেগাসিটির নর্দমা নিকাশী জল এই সংক্রামক জীবাণুগুলির ধারক ও বাহক৷ এছাড়াও ঘোলা জল, পুষ্টি উপাদানের প্রাচুর্য এবং অধিক ফসফেট মাছের বৃদ্ধি মন্দীভূত করে৷
কাঁকড়া
সোঁদরবনের কাঁকড়ার স্থানীয় নাম সোঁদরা কাঁকড়া৷ যে একবার খেয়েছে, সে বারে বারে খাবে৷ অন্যান্য কাঁকড়ার তুলনায় শাঁস বেশী, তাই বাজারে কাটে, বিক্রী হয়৷ এই সোঁদরা কাঁকড়ার বিজ্ঞানসম্মত নাম Scylla serrata. এই কাঁকড়ার বাচ্চারা সাধারণত ধানীঘাসের মাঝে ও শেওলা আবৃত কাদা ও পলির নরম মাটিতে থাকতে পছন্দ করে থাকে৷ বড়রা অবশ্য গর্ত তৈরী করে বসবাসের জন্য আর খাবার খেতে যায় দূরে৷ কর্কর খাদ্য শৃঙ্খলের (Detritus Food Chain) অন্যতম, নাদালভূমি বাসস্থানের এই খাদক সম্বন্ধে বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখরণ ও নটরাজন (১৯৯৪) তাদের গবেষণার কাজে দেখেছেন—‘The population of juvenile mud crabs are higher in the sea grass and algal bed areas of the mangroves. The crabs of 20-30 mm carapace width dominate the population in the shallow intertidal zone of the mangroves.’ বিপণনে বিদেশী মুদ্রা এনে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধকারী এই কাঁকড়ার বাচ্চা বাগদা মীনের বাছাই পর্বে নদী বাঁধে অজস্র মারা পড়ছে৷ খাবার ও ওষুধ খরচ ছাড়া প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা কাঁকড়া ধরে সুন্দরবনের বেশ কিছু সাধারণ মানুষের হাঁড়ি চলে৷ ফলে এই কাঁকড়ার বাচ্চাগুলি যাতে অকালে জালের ফাঁসে আটকে বা শুকনো মাটিতে পড়ে প্রাণ না হারায় তার সংরক্ষণের জন্য জরুরী ব্যবস্থা প্রয়োজন৷ বিজ্ঞানী পুভা চিরানন (১৯৯২) এদের সংরক্ষণের জন্য কিছুটা পূর্বাভাস দিয়েছেন —‘Some possible conservation measures have been suggested which include a ban on fishing during the spawning season (October-February) and restrictions on capture of immature crabs.’ ভারতীয় সুন্দরবনের জেলেরা নিয়মমাফিক নির্দিষ্ট ওজনের কাঁকড়া ধরে থাকে এবং এই কাঁকড়া বিদেশের বাজারে অধিকমূল্যে বিক্রয় হয়৷ কিন্তু বাংলাদেশের সুন্দরবনে অপেক্ষাকৃত কম ওজনের কাঁকড়া ধরা হয় যা দামেও কম এবং অতিরিক্ত কাঁকড়া ধরার ফলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা রয়েছে কারণ কাঁকড়া সুন্দরবন বাস্তুতন্ত্রের কর্কর খাদ্যশৃঙ্খলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য৷ কর্কর অর্থাৎ বিয়োজিত জৈব উপাদান সমুহকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে থাকে কাঁকড়া৷ কাঁকড়া ধরাকে কেন্দ্র করে প্রণীত আইন অনুযায়ী ২০০ গ্রাম কম ওজনের পুরুষ কাঁকড়া এবং ১৩০ গ্রাম কম ওজনের স্ত্রী কাঁকড়া ধরা যাবে না অর্থাৎ বিক্রয়যোগ্য ওজন না হলে আহরণ করা যাবে না৷ আর জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী মাসে কাঁকড়ার প্রজননের সময়ে কাঁকড়া সংগ্রহ করা কার্যত নিষিদ্ধ৷ অথচ ছোট ছোট কাঁকড়া যাকে বাংলাদেশ সুন্দরবনে বলা হয় ‘জাটকা’ কাঁকড়া অবাধে ধরা চলছে৷ আর বিপণনযোগ্য অর্থাৎ খাওয়ার মতো ওজনের কাঁকড়াকে বলা হয় গ্রেড কাঁকড়া৷ অবাধে ছোট ছোট এই জাটকা কাঁকড়া আহরণ চলতে থাকলে একসময় সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া বিলুপ্ত হয়ে যাবে৷ জাটকা কাঁকড়ার দামও কম৷ তাছাড়া মাত্র বিশ-ত্রিশ দিন পরে জাটকা কাঁকড়া পূর্ণতা লাভ করে খাদ্য উপযোগী হয়ে ওঠে৷ দামও হয় ২০০-৩০০ টাকা প্রতি কেজি৷

লাল কাঁকড়া—ওসাইপোডা
বাস্তুতন্ত্রের কর্কর খাদ্য শৃঙ্খলের অন্যতম সদস্য কাঁকড়া শুধুমাত্র বিদেশী মুদ্রা আহরণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে সহায়তা করে না, বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি খাদ্যস্তরের ভারসাম্য বজায় রাখায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে৷ কাঁকড়া থাকলে তবে না অন্যান্য মাছ শামুক ঝিনুক সহ জলজ কীট পতঙ্গের অস্তিত্ব থাকবে, এই লবনাম্বু বাস্তুতন্ত্রে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন