ইলিশ

গৌতমকুমার দাস

ভুবনমোহিনী রুপোলী সুন্দরী ইলিশের জিবে জল আনা স্বাদ গন্ধতো আছেই, তার সঙ্গে এমন কিছু মেছো বাঙালী আছেন, যারা শুধু ইলিশ দেখেই আত্মহারা, বা খেপে ওঠেন কিংবা জ্ঞান হারানোর অবস্থায় চলে আসেন৷ ইলিশ-কেন্দ্রিক এ ধরণের বাঙালির কাছে ঈশ্বরের পৃথিবীতে এমন বস্তু আর দ্বিতীয়টি বোধহয় সৃষ্টি হয়নি৷ ইলিশ নিয়ে একটি মহাকাব্যই রচনা করে ফেলা যেতে পারে— এমনটা ইলিশ দেখেই বিগলিত ‘ডেভিড লারমোর সাহেব’এর অন্তত তাই অভিমত৷ প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’ উপন্যাসে দেখা যায় এই সাহেব যৌবনকালে সুদূর আয়ারল্যাণ্ড থেকে মিশনারির কাজে এসেছিলেন সুজলা সুফলা বাংলাদেশে৷ দীর্ঘ চল্লিশ পঞ্চাশ বছর কাটিয়ে সজল সরস বাংলাদেশকে দেখার মুগ্ধতা ও বিস্ময় অথবা বাংলাদেশকে নিয়ে তার গৌরব ইলিশের কাছে যেন কিছুই নয়৷ ইলিশের দেখা পেলে লারমোর সাহেবের জিব একধাক্কায় বেড়ে অন্তত সাত হাত হয়ে যেত৷ রুপোলী সুন্দরী দর্শনে সাহেব মঙ্গল কাব্য থেকে বেছে বেছে ইলিশ মাছের জায়গাটা পুঁথি পড়ার মতো করে বলা শুরু করতেন—

পয়লা পাতে কিছু তিক্ত

ঘৃত দুই হাতা

তাহার পর মুগ দাইল (ডাল)

সহ ইলিশ মাথা৷

সরিষা পাক দিয়া ইলশার ঝাল, কাঁচা মরিচ ফোঁড়ন দিয়া ইলশার ঝোল এর সাথে পাই যদি ভাজা খান চার, স্বর্গতো থাকে না রামা বেশি দূরে আর৷

শাস্ত্রমতে রাইন্ধো ইলিশ

অন্যথা না হয়

অন্যথা করিবে যে, আমার

মাথা খায়৷

ইলিশ মাছের ভাজা, ইলিশ ভাতে, ইলিশের ঝোল, ঝাল, ডিম দিয়ে টক খেতে খেতে ইলিশের স্বপ্নিল স্বাদে গ্রামবাংলার একাত্ম হয়ে যাওয়া প্রফুল্ল রায়ের লারমোর সাহেব ইলিশ নিয়ে গান জুড়ে দিতেন—

এসো মনোহর  রসের আগর

নবনী-মাখানো অঙ্গ

তোমারে দেখিয়া  তোমারে চাহিয়া

মোহিত এ ভূমিবঙ্গ৷

এহেন ইলিশ পরিত্রাতার প্রতীক, সৌন্দর্যে রুপোলি সুন্দরী আর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ফুটবল জয়ের এক অনন্য পুরস্কারও বটে৷ টুর্নামেন্টে জিতলে ইস্টবেঙ্গল কোচের কপালে একটি প্রমাণ আকৃতির ইলিশ লেখা থাকতো৷ সমর্থকেরা কালবিলম্ব না করেই দ্রোণাচার্যের সামনে জয়ের স্বাদু পুরস্কারটি তুলে ধরেন একালেও৷

ইলিশ

মাছোত্তম— ইলিশ

সমুদ্রতীরবর্তী একশ্রেণীর তামিল উপজাতিরা মাছকে বলে ‘ইল্লি’৷ আর ‘ঈশ’ অর্থে শ্রেষ্ঠ, ইল্লির ঈশ’ অর্থাৎ ইলিশ৷ মাছ-এর শ্রেষ্ঠ হল ইলিশ৷ ইলিশ মোহানার মাছ৷ ডিম পাড়ার জন্য বর্ষা এলে নদীতে ঢোকে৷ প্রকৃতিতে এরা পরিযায়ী, গঙ্গা, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী, নর্মদা, তাপ্তী, মহানদী, শবরমতী, রূপনারায়ণ সহ ভারতের প্রায় সমস্ত উপকূলবর্তী এলাকার নদীতে ইলিশ মাছের দেখা মেলে৷ ইলিশ— অন্ধ্রে হিলসা, ওড়িশায় ইলিশা, মহারাষ্ট্রে পালা আর তামিলনাড়ুতে উল্লাম নামে পরিচিত৷ বিশেষত করমণ্ডল উপকূল থেকে সালরোর উপকূলে ইলিশ অধিক সংখ্যায় পাওয়া যায়৷ প্ল্যাংকটনভোজী হওয়ায়, সমুদ্রের জলের উপরিস্তরে দলবদ্ধ ভাবে ঘুরে বেড়ায় ইলিশ৷

প্রাণীজগতে ইলিশের অবস্থান—

পর্ব — মেরুদন্ডী

শ্রেণী — পিসিস

উপশ্রেণী —টিলিওস্টি

গোত্র — ক্লুপিডি

গণ — হিলসা

প্রজাতি — ইলিসা

খাবো আর পাবো

ইলিশ হেরিং জাতীয় মাছ৷ হেরিং জাতীয় মাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল থাকার জন্য এরা খুব সুস্বাদু হয়৷ দেহে অধিক পরিমাণে তেল থাকায় জলের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম৷ আবার তেল বেশি থাকার কারণে প্রোটিনের পরিমানও কম৷ ইলিশ মাছে সাধারণত তেল বা চর্বি ১০%, প্রোটিন ২০%, খনিজ পদার্থ ১.৪%, এবং জল থাকে ৬৮.৬%৷ ২০০ গ্রাম ইলিশ মাছ খেলে আমরা যে খাদ্যগুণ পেতে পারি, সেগুলি হল শক্তি ২৬০০ ক্যালরি, ভিটামিন B1১.৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন B2১.৮ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ১.২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন D ৪০০ আই.ই, লোহা ১২ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ১.৫ গ্রাম ইত্যাদি৷

পাকচক্রে ইলিশের সুবাস

পাকশালে ইলিশের বিভিন্ন পদের মধ্যে দই ইলিশ, ইলিশ মাছের ভাপা, সরষে ইলিশ, ইলিশের ঝাল, ঝোল, টক. ভাজাসহ চাটগাঁর ইলিশের মাথা দিয়ে কচু শাক, বাঁকুড়ার পোস্ত ইলিশ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ইলিশ ঝাল, নোয়াখালির ইলিশ ভাতে, ঢাকার দই ইলিশ, মেদিনীপুরের ইলিশের দই বেগুন, বরিশালের ইলিশ ভাপা প্রভৃতি হল আঞ্চলিক ইলিশ প্রীতির পঞ্চব্যঞ্জন৷ তবে এপার বাংলা ওপার বাংলার সব জেলার ইলিশ রন্ধনের ঐতিহ্যের পাশাপাশি বর্ষায় কলকাতাবাসীর খিচুড়ি সহযোগে ইলিশ মাছের ভাজা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদেরও অজানা নয়৷ শাসক ইংরেজ বাঙালির পাল্লায় পড়ে ইলিশের স্বাদ গন্ধ নিয়ে ইলিশের সমঝদার হয়ে ওঠেন৷ কিন্তু বাদ সাধে ইলিশের কাঁটা৷ বিলিতি বাবুদের কাঁটা-চামচেতে তো আর ইলিশ কাঁটা মুক্ত হয় না৷ কাঁটার কারণে রাজা ইলিশ খাবে না, বাঙালি প্রজা বসে বসে দেখবে, তা তো হয় না৷ সুতরাং বাঙালির বিলিতি প্রেমে ইলিশের কাঁটা মুক্তকরণে হেঁসেলে হেঁসেলে ইলিশের অ্যানাটমির রসায়ণ চর্চা শুরু হয়ে যায়৷ ইলিশের সাবেকি ঐতিহ্যের পাশাপাশি বোনলেশ ইলিশ নবজাগরণের মতো হাজির হয়৷ অবশ্য বিলিতি সংযোজন৷ তবে বাঙালির কাঁটাই পছন্দের৷ ‘কাঁটা হেরি ক্লান্ত’— বাঙালি কখনোই নয়৷

এত সুস্বাদু, তাহলে ইলিশ খায় কী?

হোটেল রেস্তোরাঁয় ইলিশের ডিম মহার্ঘ্য৷ কিন্তু ইলিশের নিজের খাবার মেনু অতি সাধারণ—প্ল্যাংটন৷ প্ল্যাংটনভোজী ইলিশ মাছের মুখ গহ্বরে কোনো দাঁত নেই৷ ইলিশের পাকস্থলী গৃহীত খাবারকে একেবারে পাউডারের মতো গুঁড়ো করার জন্য তৈরি হয়েছে গিজার্ড৷ এদের অন্ত্র বেশ লম্বা আর পাকানো৷ কারণ এরা তৃণভোজী৷ পৌষ্টিকনালীতে পাইলোরিক সিক্কা থাকে৷ এই পাইলোরিক সিক্কার কাজ অন্ত্রের মতোই খাবারের আসল খাদ্যগুণ শুষে নেওয়া৷ ইলিশ মাছ নাকি নদী আর সাগরের জলে ভেসে থাকা গবাদি পশু সহ বিভিন্ন মৃত দেহাবশেষ থেকে পাঙ্গাস, ট্যাংরা, কানমাগুরের সঙ্গে পচামাংসে ভাগ বসায়৷ ধারণাটি সবৈব ভুল৷ কারণ ওই পচা মাংস খুবলে কিংবা টেনে, ছিড়ে বা চিবিয়ে খাওয়ার জন্য যে দাঁতের প্রয়োজন হয়, তা ইলিশের মুখবিবরে কোনো চোয়ালেই নেই৷

প্ল্যাংটনভোজী ইলিশমাছের ফুলকার আঁকশি পাতলা এবং লম্বা৷ এদের ঘন অবস্থান একটা মিহি ছাঁকনি তৈরি করে৷ জল থেকে প্রয়োজনীয় অংশ নিয়ে বাদবাকি অপ্রয়োজনীয় অংশগুলি ছেঁকে ফেলা হল আঁকশিগুলির কাজ৷ মাছের খাবারের প্রকৃতি আর খাবার সংগ্রহের পদ্ধতি অনুসারে ফুলকার খিলানের অভ্যন্তরে আঁকশিগুলির সৃষ্টি হয়৷

প্রাপ্তিস্থান

গঙ্গার ইলিশ ধরে যে ঘাটে তোলা হত তার উপর নির্ভর করে প্রাচীন কলকাতায় ইলিশের কৌলিন্য, বনেদিয়ানা ইত্যাদি নিয়ে রসালো গপ্পো চালু ছিল৷ কুমোরটুলি ঘাট, বাগবাজার ঘাটে জেলেরা যেসব ইলিশ গঙ্গা থেকে তুলতো সেসব ইলিশের চাহিদা, বাজারদর আর অভিজ্ঞতাই ছিল আলাদা৷ এসব ঘাটের ইলিশ মায়ের আলতা রাঙা পায়ের ধোয়া জলে নাকি হয়ে উঠত গোলাপ-সুন্দরী৷ কল্যাণী দত্তের ‘থোড় বড়ি খাড়া’র আদি কলকাতবাসীদের অন্তত তাই অভিমত৷

এখনকার মতো আগেও পূর্ববঙ্গে ইলিশ ধরা পড়ত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি৷ গঙ্গার ইলিশের চাইতে পদ্মার ইলিশ স্বাদে অতুলনীয়৷ পশ্চিমবঙ্গে পদ্মার ইলিশ বাজারে বিরল, বিপন্ন প্রায় প্রজাতি৷ তাই এপার বাংলার বাঙালীকে এখন কোলাঘাটের রূপনারায়ণের ইলিশে সন্তুষ্ট থাকতে হয়৷ এরাও এখন প্রায় বিপদাপন্ন প্রজাতি৷

স্বাধীনতার আগে থেকেই বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় ইলিশ চালান এর বিধি বন্দোবস্ত রয়েছে৷ ওপার বাংলার নদী পাড়ের ছোটো বড়ো মাঝারি শহরগুলির আড়ত থেকে শয়ে শয়ে মন ইলিশ কাঠের পেটিতে বরফে আচ্ছাদিত হয়ে কলকাতায় আসত৷ সেকালে একালে আড়তদারদের ভেতর বাইরের দৃশ্য প্রায় এক৷ আড়তগুলোর ঠিক তলায় নদী৷ পালতোলা সেকেলের ছোটো ছোটো জেলে ডিঙিগুলো এসে ঠেকত ঠিক আড়তের তলায়৷ ইলিশ নামত৷ ইলিশ জমতে জমতে হয়ে উঠত ইলিশের পাহাড়৷ কাঠের পেটিতে পরতের পর পরত বরফের টুকরো দিয়ে মাছ সাজিয়ে ইলিশ চালান হত৷ মাছির ভনভনানির মতো ইলিশ গণনার সুর শোনা যেত কাঠের বাক্সে ইলিশ সজ্জার সময়— রামে এক, রামে দুই, রামে তিন—৷ এ দৃশ্য কেয়াপাতার নৌকার নকুলের আড়তের৷ তবে কেতুগ্রামের কেদারনাথ ‘পদ্মানদীর মাঝি’ কুবেরের ধরে আনা ইলিশ গোনার সময় আরও একটু আধুনিক৷ সেইজন্য কেতুগ্রামের কেদারনাথ-এর পরিচয় তিনি চালানবাবু এবং এ কারণে তার পারিশ্রমিকও নির্দিষ্ট— প্রতি একশোটি ইলিশ গণনায় চালানবাবু কেদারনাথের চাঁদা পাঁচটি মাছ৷ এবং ওই চাঁদা ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সরানোর জন্য মেছোবিড়ালের মতো একটি চাকর গণনার সময় ছিল তার সহযোগী৷

চালানের বিধি বন্দোবস্তের তেমন কোনো তফাত নেই সেকেলে আর একেলে৷ কাঠের প্যাকিং বাক্সে পরত পরত বরফ দিয়ে ইলিশ সাজানো হয়৷ ওই ইলিশ স্টিমারে কিংবা রেলের ওয়াগন করে কলকাতায় আসত সেকালে৷ একালে ইলিশ ভরতি অজস্র পেটি লরি, ম্যাটাডোর করে আসে কলকাতায়৷ বর্ষায় ইলিশ হাতে করে ফেরেন কেরাণিবাবুরা৷ পদ্মার ইলিশের গন্ধে ম ম করে ওঠে কলকাতার পথঘাট, অলি, গলি, রাজপথ৷ সন্ধ্যায় ইলিশ মাছের ভাজা সহযোগে খিচুড়ি খেয়ে জমে ওঠে বাঙালির বর্ষামঙ্গল৷

মূল্যায়ণ

বাংলাদেশে সেকালে ইলিশের দাম, টাকায় ছয়টা, আটটা এবং অবশ্যই সেগুলি সেরা ইলিশ৷ সে সব খোকা ইলিশ বা চন্দনা নয়৷ আর চালানের বরফ যেদিন অপ্রতুল, সেদিন টাকায় একশোটি৷ একালে প্রতি কেজি ইলিশের দাম একশো পঞ্চাশ থেকে পাঁচশো হাজার বারোশ’ পর্যন্ত৷ ইলিশের আকার, ওজন ও গুণমানের ওপর নির্ভর করে দাম ওঠানামা করে৷ আর একালে চালানের বরফ পর্যাপ্ত না পেলে লরি ম্যাটাডোরের তেল খরচ ওঠে না বলে মৎস্য বন্দরের আশেপাশে মাটি খুঁড়ে ইলিশ পুঁতে ফেলা হয়৷ সাধারণ মানুষের মুখে ইলিশ ওঠে না তখন৷

ইলিশের অভিপ্রয়ান

গঙ্গা পদ্মা ভাগীরথী নদীতে ইলিশের শ্রোণি পাখনার নীচে ট্যাগ লাগিয়ে ইলিশের স্থানান্তরে যাওয়া আসার অর্থাৎ অভিপ্রয়ানের পরীক্ষানিরীক্ষা, বেশ কিছু বছর ধরে চালানো হয়েছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ নজরে এসেছে৷ যেমন, ফারাক্কা ব্যারেজের নীচের দিকে ট্যাগ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া ইলিশ ব্যারিকেড পেরিয়ে ওপরের দিকে চলে আসে৷ আবার বিপরীত ঘটনাও লক্ষ্য করা গেছে৷ ব্যারেজের ওপরের দিকে ধরা পড়া ইলিশ ট্যাগ দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর ব্যারিকেড পেরিয়ে ব্যারেজের নীচে চলে আসে৷ ইলিশের এই অভিপ্রয়ান কেবলমাত্র গঙ্গা পদ্মানদীর ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা গেছে৷ ভাগীরথী-হুগলী নদীর ক্ষেত্রে ট্যাগ করা ইলিশকে ব্যারেজ এপার ওপার করতে দেখা যায়নি৷ ভাগীরথী-হুগলীর ক্ষেত্রে ফিডার ক্যানেলের আউটলেটে বাধা থাকায় ট্যাগ করা ইলিশের অভিপ্রয়ান সম্ভব হয়নি৷

পর্যবেক্ষণে আরও পাওয়া গেছে যে ইলিশ ব্যারেজের উপরের অংশে প্রজননে সক্ষম, এমনকি তাদের জীবনচক্রও সম্পন্ন হয়েছে৷ ধরা পড়া ইলিশের জননাঙ্গ পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে আসা সম্ভবপর হয়েছে৷ পূর্বে ধারণা ছিল যে মিষ্টি জলে এই সব ইলিশের জীবনচক্র সম্পন্ন হয়৷ কিন্তু ব্যারেজের ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে ট্যাগ করা ইলিশের পর্যবেক্ষণে আগেকার ধারণা বদলেছে৷ নদীর উচ্চ গতিপথে দেখা পাওয়া ইলিশ আসলে ব্যারেজ পেরোনো নদীর নিম্নগতিপথ থেকে চলে আসা ইলিশ৷ অভিপ্রয়ান— ইলিশের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং এই বৈশিষ্ট্য কেবলমাত্র পরিযায়ী প্রকৃতির মাছের থাকে৷

অধরা রুপোলি সুন্দরী

গঙ্গা পদ্মার রুপোলি ফসল ইলিশের দেখা মেলা এখন ভার৷ কলকারখানা থেকে নির্গত দূষিত জল গঙ্গা পদ্মার জলে মেশে এবং জলের প্রকৃতির বিভিন্ন পরিবর্তনের ফলে ইলিশ মাছ পূর্বের মতো প্রজননক্ষম থাকছে না৷ ফলে নদীর জলে ইলিশের সংখ্যা কমছে৷

বিজয়া দশমী থেকে শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী অবধি ইলিশ মাছ খাওয়া সামাজিক ভাবে নিষিদ্ধ বাঙালির কাছে৷ স্বভাবতই এই সময়ে জেলেরা ইলিশ ধরতে নদী বা সমুদ্রে পাড়ি দিত না৷ ইলিশ ডিম পাড়ত নির্বিঘ্নে৷ তার থেকে চারাপোনা জন্মাত৷ খোকা ইলিশ ফিরত পৈতৃক ভিটেয়—সমুদ্রে৷ ইলিশ অ্যানাড্রোমাস প্রকৃতির৷ অ্যানাড্রোমাস প্রকৃতির পরিযায়ী মাছেরা ডিম পাড়তে নোনাজল থেকে মোহানা হয়ে নদীর মিষ্টি জলে চলে আসে বর্ষার সময়৷

এখন এই দুর্গাপুজোর বিসর্জন থেকে সরস্বতী পূজা অবধি ইলিশ না খাওয়ার রীতি বা চল কেউ মেনে চলে না৷ তাই ইলিশ-সন্তান যাতে জালে না ধরা পড়ে তার জন্য সরকারের তরফে তিন ইঞ্চির থেকে কম মাপের ফাঁস যুক্ত জাল ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ কিন্তু সরকারের মৎস্য দপ্তরের এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খোকা ইলিশ ধরা চলছেই৷ ফলে ইলিশের আর পরিণত হওয়ার সুযোগ থাকছে না৷ পুরোনো দিনের পরিণত ইলিশের সেই জিভে জল আনা স্বাদ আর পাওয়া যায় না৷ তাছাড়া প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে ইলিশের সংখ্যা কমছে আর বংশবৃদ্ধি না হওয়ায় পর্যাপ্ত ইলিশ এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ বর্তমানে ইলিশ অধরাই৷

বর্ষার মরশুমে মাছ ধরা ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে ইলিশ ধরতে প্রায় ৭০-৮০ কিমি পথ পাড়ি দেয় সুন্দরবনের জেলে সম্প্রদায়৷ দক্ষিণবঙ্গে মূলত সুন্দরবন সবচাইতে বেশি পরিমাণে ইলিশের জোগান দেয় বাঙালির পাতে৷ বিশেষত দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানা, কাকদ্বীপ, ফ্রেজারগঞ্জ, রায়দীঘি, আটনম্বর লট, রামগঙ্গা, পাথরপ্রতিমা, ডায়মন্ডহারবার সহ অধিকাংশ মৎস্যবন্দর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ সরবরাহ করে থাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে৷ ইলিশ পরিযায়ী প্রকৃতির কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত জলে ঢোকার আগেই ডিম ভরতি ইলিশ ধরা পড়ে৷ শুখা মরশুমে কমবয়সী খোকা ইলিশ বা চন্দনা ধরে নেয় জেলেরা৷ মোহানায় এক কিলোগ্রাম প্রমাণ আকৃতির একটি ইলিশের দেখা মেলা ভার৷ কলকাতা শহর ও শহরতলীর জনবসতির বর্জ্যপদার্থ নিকাশি নালা দিয়ে নদীতে এসে পড়ে৷ এই বর্জ্যপদার্থ নদীর জলের উদ্ভিদকণা বা ফাইটোপ্ল্যাংটনের বৃদ্ধি ও ঘনত্ব বাড়িয়ে তোলে৷ যার ফলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে এবং মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও জননের পরিবেশ বিনষ্ট করে৷

প্রমাণ আকৃতির ইলিশ যাতে বর্ষার মরশুমে সহজলভ্য হয় তার জন্যে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে৷ যেমন, পেটে ডিম ভরতি ইলিশ ধরা রদ করা জরুরী৷ চন্দনা বা খোকা ইলিশ ধরতে দেওয়া যাবে না৷ জালের ফাঁস নির্দিষ্ট করে দিতে হবে যাতে ওই জালে নয় ইঞ্চির থেকে ছোট আকৃতির ইলিশ মাছ ধরা না পড়ে ইত্যাদি৷ এমনিতেই নদী মোহানায় ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে জল দূষিত হওয়ায় ইলিশের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে৷

হরিদ্বার থেকে শুরু করে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত গঙ্গার জলের পরীক্ষা করে দেখা গেছে নূরপুরে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা সর্বাধিক৷ নূরপুরের গঙ্গায় (পড়ুন হুগলী) ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা প্রতি ঘনলিটার নদীজলে ৫২৭×১০০৷ নূরপুরে হুগলীতে এসে পড়েছে রূপনারায়ণ৷ ইলিশ এত দূষিত জলের রূপনারায়ণে ঢোকে এবং কোলাঘাটে যায়৷ অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে কোলাঘাটের ইলিশের সংখ্যা, স্বাভাবিক বৃদ্ধি, প্রজনন ও স্বাদ যাচ্ছে কমে৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%