বাগদামীন

গৌতমকুমার দাস

সুন্দরবনের প্রকৃতিতে জন্মানো আর এক রুপোলী ফসলের নাম বাগদা৷ আহার্য হিসাবে বাগদা মীন অতীব সুস্বাদু৷ যশোর-খুলনার ইতিহাসে সতীশ চন্দ্র মিত্র (পৃঃ-৬৮) এই বাগদার নামের উৎপত্তি নিয়ে বেশ সরস মন্তব্য করেছেন— ‘যে বকদ্বীপ বা বগদি কথা হইতে জাতিবাচক ‘বাগদী’ শব্দের উৎপত্তি, সেই কথা হইতেই চিংড়ি মাছের এই স্থানবোধক বাগদা নাম হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়৷’

প্রকৃতিদেবীর আপন খেয়ালে গড়ে ওঠা নয়নাভিরাম সুন্দরবন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি গতিময় বাস্তুতন্ত্র৷ প্রতিনিয়ত মেলে ধরে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অপূর্ব পসরা৷ পরিবর্তনেরও৷ সুন্দরবনের প্রকৃতি উদার হাতে তার সকল সম্পদ দানের জন্য সদা প্রস্তুত৷ প্রকৃতির সম্পদের প্রাচুর্য্য শুধুমাত্র স্থলভাগের অরণ্যস্থিত কাষ্ঠসম্পদ, মধু কিংবা বন্যপ্রাণী নয়, অজস্র জলরাশির মধ্যে প্রচুর মৎস্যসম্পদ নয়, সাম্প্রতিককালে হাজারো সুন্দরবনবাসীর জীবিকা নির্বাহে অতি গ্রহণযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ— বাগদামীন৷ নদী, নালা, খাঁড়ির সংগৃহীত বাগদামীন বিভিন্ন ভেড়ীতে লালিত পালিত হওয়ার পরে বাগদা চিংড়ি হিসাবে দেশে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আহরণে সহায়তা করে চলেছে৷ আজ কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য অধিকাংশ সুন্দরবনবাসীর কাছে বাগদামীন সংগ্রহ খুবই জরুরী৷ আশির দশকের শেষ থেকে শুরু করে বাগদামীন এমনই অবৈজ্ঞানিক উপায়ে সংগৃহীত হচ্ছে যে, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রেখে পথ চলার কথা আজ ভাববার সময় এসেছে৷

সুন্দরবনে জোয়ার জলে পুষ্ট নদী-নালা খাঁড়িতে বাগদামীন ধরা পড়ে৷ জোয়ার ভাটায় নদী নালায় গতিপথ হয়ে যায় আঁকাবাঁকা৷ তাই মীন বেশী সংখ্যক ধরা পড়ে— (১) সাধারণত যেখানে নদীগুলির বাঁক বেশী, স্রোত অত তীব্র নয়৷ (২) নদীর যেখানে ক্ষয় কার্য্য চলছে ও জলে পলির কণা কম৷ (৩) নদী এঁকেবেঁকে চলে বলে ভাঁটার টানে জল যেখানে বেরিয়ে যেতে অপেক্ষাকৃত বেশী সময় নেয়৷ (৪) ম্যানগ্রোভ যেখানে স্বাভাবিক নদীবাঁধ বা প্রান্তিক চর চারদিক থেকে ঘিরে রাখে৷ (৫) নদীতীর যেখানে ক্ষয়ে ক্ষয়ে কয়েকটি ধাপ তৈরী করে, জোয়ার ভাঁটার বিভিন্ন গভীরতায় মীন সংগ্রহের জাল টানতে সুবিধা হয়৷ (৬) নদীর যে অংশে জোয়ার ভাটার সৃষ্ট দৈর্ঘ্য বরাবর স্রোত অপেক্ষা প্রস্থ বরাবর তরঙ্গায়িত স্রোত বেশী, সেখানে মীনগুলি দ্রুত স্রোতে ভেসে যেতে পারে না৷ (৭) বাগদা মীনের সুন্দরবনের লোনাজলে সারাবছর দেখা মেলে, কিন্তু বর্ষার সময় অর্থাৎ মৌসুমী কালে নদীর মাঝখান অপেক্ষা নদীতীরে অপেক্ষাকৃত বেশী সংখ্যক পাওয়া যায়৷

লবণান্বু উদ্ভিদের উপস্থিতির অর্থ বাগদা মীনের প্রাচুর্য্য৷ লবণাম্বু উদ্ভিদের পাতা, ছাল, ফুল, ফল দৈনন্দিন কিংবা বিভিন্ন মরসুমে নরম পলিতে পড়ে অনুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয় এবং জৈব এবং অজৈব পদার্থে পরিণত করে৷ এভাবেই সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভূ-জৈব রাসায়নিক চক্রের দ্বারা পুষ্টির উপাদানের পুনরাবর্তন চলে, ঐ পুষ্টি যেখানে বেশী স্বভাবতই সেখানে খাদ্যশৃঙ্খলের সব ধরণের খাদক উপস্থিত৷ বাগদা মীন, এর ব্যতিক্রম নয়৷ এ কারণেই ম্যানগ্রোভস্ এর ঘন জঙ্গল এর নিকটস্থ নোনা জলে বাগদা মীন বেশী সংখ্যক পাওয়া যায়৷

১৯৯১ সাল থেকে ২০১৪ অবধি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় মীন সংগ্রহ বিষয়ে নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণগুলি হল—

(১) ব্যক্তি প্রতি দৈনিক সংগৃহীত মীনের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে যদিও সংগ্রহকারীদের মীন সংগ্রহের দক্ষতা বেড়েছে৷

(২) মীন ধরার পর থেকে ভেড়ীতে সরবরাহ করা পর্যন্ত মীনের মৃত্যুর হার কমেছে কারণ সম্প্রতি বাগদামীন পরিবহনের সময় আরো বেশী করে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে৷

(৩) মীন সংগ্রহের হার ক্রমহ্রাসমান হবার সাথে হাজার প্রতি মীনের দাম বিশগুণ বেড়ে গেছে৷

(৪) বিভিন্ন ভেড়ীতে নব্বই এর দশকে যে সংখ্যায় বাগদামীন সুন্দরবন থেকে সরবরাহ করা হতো, সেই সংখ্যা সম্প্রতি প্রায় একশো গুণ কমে গেছে৷

বাগদা মীন ধরার সময় ম্যানগ্রোভের চারা মারা পড়ছে৷ অসংখ্য সংগ্রহকারীর চলাফেরায় নদী-তীরে ভূমিক্ষয় হচ্ছে৷ দেখা যাচ্ছে নদী বাঁধ ভাঙন৷ জাল টানার পরে বাছাই পর্বে কেবলমাত্র বাগদামীন নিয়ে অন্যান্য প্রাণীগুলির লার্ভা পোনাগুলি নদীতীরে শুকনো জায়গায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে ইচ্ছে মতো, ফলে নির্বিচারে শেষ হয়ে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যস্তরের বিভিন্ন উপাদানগুলি৷ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ভারসাম্য হারাচ্ছে৷ এভাবে চললে প্রকৃতির আপন খেয়ালে সৃষ্ট এই সম্পদের ভাঁড়ারে টান পড়বে অচিরেই৷ ফলে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সহ প্রতিকার ভাবতে হবে এখনই এবং এভাবে—

(১) সাধারণ মানুষদের (মীনসংগ্রহকারী) নদী নালার প্রকৃতি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা দিতে হবে যার ফলে তারা নদী তীরে সর্বত্র জাল না টেনে নির্দিষ্ট স্থানে জাল টানলে প্রয়োজনীয় সংখ্যায় মীন ধরতে পারবে, তৎসহ ক্ষয়ীভবন স্থানে জাল না টানার দরুন কম চলাফেরার জন্য ভূমিক্ষয় রোধ করা যাবে৷

(২) সুন্দরবনের দায়িত্বে থাকা সরকারী সংস্থাগুলি যেমন সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ, সুন্দরবন জীব পরিমণ্ডল, সেচ দপ্তর, জেলা পরিষদকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে, সংগ্রহ করতে হবে জলগতিবিদ্যার পরিসংখ্যানজনিত তথ্য৷ কোনও ক্ষতির পূর্বাভাস— কিছুটা হলেও রক্ষা করবে সুন্দরবন বাস্তুতন্ত্র৷

(৩) নদীতীরে ধানীঘাস কিংবা লবণাম্বু উদ্ভিদের চারা যাতে মীন সংগ্রহকারীরা জাল টানার সময়ে মাড়িয়ে নষ্ট না করে তার জন্য পঞ্চায়েত সমিতি ও স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যবৃন্দকে সজাগ থাকতে হবে৷

(৪) ভূমিক্ষয় রোধ করার জন্যে মাটি পরীক্ষা করে কাদা, বালি, পলির শতকরা ভাগ জেনে ওই এলাকার নদীতীরের তলদেশের নমুনা বিশ্লেষণ করতে হবে এবং যদি দেখা যায়, মৃত্তিকার ক্ষয় হয়ে যাবার সম্ভাবনা বেশী, ওই স্থানে মীন সংগ্রহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে৷

(৫) জাল টানার পরে বাগদা মীন বাছাই করে নেওয়ার পরে জালে যে অংশ পড়ে থাকবে তা আবার নদীর জলেই ফেলতে হবে৷ তাহলে কোনও প্রাণীর লার্ভা বা পোনা মারা পড়বে না৷

বাগদা মীন ধরতে গিয়ে অসংখ্য প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া সহ অন্যান্য মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী প্রাণীর পোনা নির্বিচারে নষ্ট হচ্ছে৷ অকল্পনীয় ক্ষতি৷ বাইরের থেকে সুন্দরবনের প্রকৃতির ও সমস্যার সমাধান একেবারেই অসম্ভব৷ তাই কাজল, মালা, প্রভাতীদের মোটা চালের দুমুঠো ভাত এর স্বপ্ন আবার অন্যদিকে এই প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের মাধ্যমে যে আয়ের উৎস, তাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস—নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অভিপ্রেত উভয় বিষয়েই৷

বাছাই পর্বে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য কম্বোজ, অঙ্গুরীমাল, একনালীদেহী, সন্ধিপদী কিংবা কন্টকত্বক প্রাণীর লার্ভার সঙ্গে সুন্দরবনের মানুষের আর্থ সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত মাছের ১৫টি এবং চিংড়ির ৮টি প্রজাতি সনাক্ত করা গেছে৷ অসংখ্য প্রাণীরা এভাবে হারিয়ে গেলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজাল অনিয়মিত হয়ে পড়বে৷ শক্তি প্রবাহ ব্যহত হবে৷ বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হবে৷ জীবভর ক্রমশ ক্ষীণ হবে৷ খারাপ থেকে আরও খারাপ হবে মীন সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল সুন্দরবনের মানুষগুলির আর্থ-সামাজিক অবস্থা৷

সুন্দরবনের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলি ও স্থানীয় পঞ্চায়েত যদি অনতিবিলম্বে মীন সংগ্রহের উপরে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার খসড়া তৈরী ও তার রূপায়ণ না করেন, তা হলে সুন্দরবনের অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রটি অতি শীঘ্রই নিষ্ফলা হয়ে যাবে৷ সরকার ও জনসাধারণের নির্দিষ্ট কর্মসূচী তৈরী ও তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ এর এটিই সঠিক সময়৷ তবে সুন্দরবন অঞ্চলে বাগদা চিংড়ির চাষ ক্রমশ কমছে৷ প্রতি হাজার মীনের দাম ২০১০ সালের ১৬০০ টাকা থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র ৬০০ টাকায় নেমে এসেছে৷ হুগলী নদীর বারাতলার ট্যাঁকে মীন সংগ্রহ করতে করতে সালাউদ্দিন বলে, এই চৈত্র মাসে দিনে মেরে কেটে ২০০-২৫০টি মীন ধরে ১০০-১৫০ টাকা উপার্জন হয়৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%