গৌতমকুমার দাস
মিশ্র সমাজ, ভাষাভাষি ও জনসংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যময় অবস্থান-সুন্দরবন৷ সুন্দরবনের মানুষ সহজ সরল অনাড়ম্বর ও সাধারণ৷ অল্পেই তারা তুষ্ট৷ নবীন জনগোষ্ঠী এরা৷ মূলত অভিভাসিত৷ এদের জীবন প্রবাহে আধুনিকতাও নেই, ঐতিহ্যও নেই৷ বর্তমান সুন্দরবনে পাঁচমিশালি জনগোষ্ঠী৷ এই জনগোষ্ঠীর কাঠামো মূলত জীবিকাভিত্তিক৷ পোদ, মাহিষ্য, নমঃশূদ্র, কৈবর্ত্য, জালিয়া, কাওরা, বাগদি, দলুই, রাজবংশী, কর্মকার, কুম্ভকার, ধোবা, তাঁতি, হাড়ি, তিলি, পাটনি, সদগোপ, সূত্রধর, গোয়ালা, মুচি, নাপিত, ডোম, যুগী, শুঁড়ি, সচ্চাষি, করণ, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, পতিত ব্রাহ্মণ, জোলা, শঙ্খ বণিক, মোদক, সাপুড়িয়া, বেদে সুন্দরবনের জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সব সম্প্রদায়৷ পৌন্ড্রক্ষত্রিয়দের পোদ বলে৷ শুধু পৌন্ড্রক্ষত্রিয় নেই, আছে ব্যগ্র ক্ষত্রিয় ও উগ্র ক্ষত্রিয়৷ পোদ চার প্রকার— চাষি পোদ, তাঁতি পোদ, মেছো পোদ ও ভাসা পোদ বা ঢ্যামনা পোদ৷ অন্ত্যজদের মধ্যে হাড়ি-রা সবচেয়ে উপেক্ষিত৷ এই সম্প্রদায়ের মেয়েরা ধাই-মার কাজ করে৷ হাড়ি পাঁচ প্রকারের— কাহার, মেথর, কদমা, ভুঁইমাল ও ফুলহাড়ি৷ একসময় সুফি মতবাদের ঢেউ উঠেছিল এই বাংলায়৷ উচ্চবর্ণের দ্বারা অত্যাচারিত অন্ত্যজরা সুফি মতবাদে দীক্ষিত হয়৷ এরা সুন্দরবনের জনগোষ্ঠীর অন্যতম অংশীদার৷ মুসলমানদের সংখ্যা এখানে বেশ৷ ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের দেখা পাওয়া গেলেও বৌদ্ধ বা জৈন সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর মানুষের দেখা মেলে না৷ তামিলনাড়ু থেকে একসময় বাংলার রাঢ় অঞ্চলে চলে এসেছিল বাগদী সম্প্রদায়৷ ভাটির দেশে তাদের রাজা ছিল, রাজ্যও ছিল৷ রাজ্যের নাম ছিল বাগড়ি৷ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বেনের মেয়ে’ উপন্যাসে রাজা রূপা বাগদি তার রাজ্যে দশ হাজার বাগদি নিয়ে পলটন বানিয়ে ফেলেছিল৷ বাগদি পাঁচ প্রকার—দুলে বাগীদ, তেঁতুলে বাগদি, জেলে বাগদি, মেটে বাগদি, ও তিহর বাগদি৷ বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রতাপাদিত্য উত্তরবঙ্গ থেকে রাজবংশীদের এনে তাঁর সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন৷ সেই থেকে রাজবংশীরা সুন্দরবনে থেকে যায়৷ এরা সিংহ, বর্মন, রঙ প্রভৃতি তাদের পদবি—নামের সঙ্গে যুক্ত করে৷ রাজবংশীদের পদবি ‘রঙ’ একালে পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘রায়’৷
১৮২৪ ও ১৮৩৪ খ্রিঃ এর ঘূর্ণিঝড়ে ঘর বাড়ি সম্পদ সবকিছু হারিয়ে সুন্দরবনে জলে ভেসে আসা মেদিনীপুরের মানুষ এখন অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী৷ পোদ, নমঃশূদ্র, তাঁতী, কৈবর্ত্য, মাহিষ্য, ব্রাহ্মণ, করণ ও কায়স্থ সম্প্রদায় মেদনীপুরীদের মধ্যে দেখা যায়৷ একসময় মেদনীপুর থেকে সুন্দরবনে চলে আসা পটুয়া সম্প্রদায় এক বিচিত্র জনগোষ্ঠী৷ এদের প্রত্যেকের নাম দুটি৷ একটি হিন্দুনাম, অন্যটি মুসলমান৷ যদিও বাড়ির বউরা হাতে শাঁখা পরে কপালে সিঁদুর টিপ দেয়৷ ওপার বাংলা থেকে বাংলাদেশী উদ্বাস্তুরা সুন্দরবনে ব্যাপক সংখ্যায় এসে বসবাস শুরু করে৷ মালো, কপালী, জোলা, যুগী, রাজবংশী, পোদ, নমঃশূদ্র এদের মধ্যে প্রধান সম্প্রদায়৷ বহু উড়িয়া সুন্দরবনে এখনো বাস করে৷ রান্নাবান্না বা পালকির বেহারার কাজে সেকালে জমিদাররা উড়িষ্যা থেকে এদের এনেছিল৷ সুন্দরবনের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বেশ কয়েকটি সম্প্রদায় সুন্দরবনে বসবাস করে৷ আদিবাসীদের মধ্যে প্রধানত সাঁওতাল, ভূমিজ, বেদিয়া, সবিঙা, ওরাঁও, হো, মুন্ডা, খেড়িয়া, লোধা, মাহাত, ঘাসি, কোরা ও তুরি সম্প্রদায়৷ মধ্যসত্ত্বভোগী চকদার, লাটদার, গাঁতিদার, জমিদাররা আড়কাঠি নিয়োগ করে জমির লোভ দেখিয়ে সিংভূম, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, মানভূম, হাজারিবাগ, রাঁচি, ছোটনাগপুর, ময়ূরভঞ্জ, কেঁওনঝড়, সুন্দরগড়, বিলাসপুর, ছত্রিশগড় থেকে আনিয়েছিল৷ বাঙাল, মেদনীপুরী, মুসলমান ও আদিবাসীদের নিয়ে গঠিত সুন্দরবনের নবীন এই মিশ্র জনগোষ্ঠীর না আছে কোন ঐতিহ্য, অথবা প্রাচীনত্ব৷
মাত্র আড়াইশো বছরের পুনরাভ্যুদয়ের সুন্দরবনের জীবনস্রোতে নিজস্ব জনগোষ্ঠী নেই যেমন, তেমনই নেই নিজস্ব ভাষা৷ ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর অভিভাসনের সাথে সাথে ভাষারও অনুপ্রবেশ ঘটেছে৷ তবে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর মূলভাষা বিবর্তিত হয়েছে৷ এদের ভাষা অন্যের ভাষার জায়গা দখল করেছে৷ জগাখিচুড়ি ভাষার কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে৷ এই যেমন সুন্দরবনের আদিবাসীদের ভাষা—সাদরি, সাঁওতালি, মুন্ডারি, কুরুখ, কুর্মালি, পাঁচপরগনিয়া, গোলওয়ারি, নাগপুরিয়া প্রভৃতির শুদ্ধ ভাষায় কাউকে কথা বলতে শোনা যায় না৷ ভাষাভাষির নিরিখে সুন্দরবনের জীবনস্রোতকে চারটি গোষ্ঠীতে চিহ্নিত করা যেতে পারে— আদিবাসী, মেদনীপুরী, মুসলমানী, ও বাঙাল জনগোষ্ঠী৷
সুন্দরবনের এই চার ভাষা গোষ্ঠীর সংগৃহীত কথ্যভাষার নমুনার সাহায্যে আঞ্চলিক ভাষার রূপ তুলে ধরার একটা চেষ্টা করা হল৷ মূল পাঠ হল—‘‘আমাদের মেয়েদের লেখাপড়া শিখতে হবে৷ আমাদের বড় হতে হবে৷ মানুষ হতে হবে৷ বিলেতে যেতে হবে৷ ডাক্তার হতে হবে৷ আমাদের মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা করতে হবে৷’’
গ্রাম— ভান্ডারখালি, অঞ্চল-সন্দেশখালি, থানা-সন্দেশখালি, নাম-সদাশিব মন্ডল, জাতি--পৌন্ড্রক্ষত্রিয়৷
‘‘আমাগো মাইয়া গুলোনেরে লিখাপড়া শিখতে ওইবো৷ আমাগো বড়ো ওইতো ওইবো৷ আমাগো মানুষ ওইতে ওইবো৷ বিলাত যাইতে ওইবো৷ দাক্তার ওইতে ওইবো৷’’
গ্রাম— আমলামেথি, অঞ্চল— গোসাবা, থানা— গোসাবা, নাম— আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা, জাতি— মুসলমান৷
‘‘আঙ্গা (র) মাইয়াগুলার লিখাপড়া শিখতি হোবে৷ আঙ্গা (র) বড় হোতি হোবে৷ আঙ্গা (র) মানুষ হোতি হোবে৷ বিলেত যেতি হোবে৷ দাক্তার হোতি হোবে৷ আঙ্গা (র) মাইয়াগুলার ইজ্জত রক্ষা করতি হোবে৷’’
গ্রাম— রাধানগর, অঞ্চল— শিবরামপুর, থানা— নামখানা, নাম— ইন্দুবালা দাস, জাতি— করণ
‘‘মোরহরে মেয়াঝিগুলার লিখাপড়া শিখতে হবে৷ আমানকে বড় হইতে হবে৷ আমানকে মানস হতে হবে৷ বিলাতে যাইতে হবে৷ ডাক্তার হইতে হবে৷ মোরহরে মেয়াঝিগুলার ইজ্জত রক্ষা করতে হবে৷’’
সুন্দরবনের বাউলে মউলে জেলেরা পুরুষানুক্রমে নিরক্ষর৷ এখন অবশ্য ওদের ছেলেমেয়েরা স্কুল অভিমুখী হচ্ছে৷ সর্বশিক্ষা মিশন, মিড ডে মিল ও কন্যাশ্রী প্রকল্পের সৌজন্যে৷ এখন চাষি, তাঁতি, করণ, যুগী, জেলে, কাঠুরেদের পরিবারের কচিকাঁচারা স্কুলে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষকের সংস্পর্শে আসে৷ ওদের নিজস্ব কথ্য ভাষা মেশানো আধো বাংলায় ওরা কথা বলে৷ পরে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় লিখবে, কথা বলবে৷ এখনকার মোবাইল কেবল টিভির যুগে হাটের দোকানদার, বেপারি, রাস্তার অটোচালক, মেশিন ভ্যানওয়ালারা কথ্যভাষার ব্যবহার প্রায় ছেড়েছে৷ এমন ব্যবহারের কারণ অবশ্যই গেঁয়ো ভাষা ছেড়ে লজ্জার আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদেরকে আধুনিক করে তোলার একটা চেষ্টামাত্র৷ এই আধুনিকতার গন্ডীর সীমারেখা নিজ নিজ গঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ৷ এসবেই কথা হারায়৷ কথ্যভাষা হারায়৷ সুন্দরবনের আজকালকার ছেলে ছোকরা ‘কোকতুল’ মানে ঘুঘু ও ‘বনি’ পাখি মানে শালিক আজ আর জানে না৷ বিশ্বায়নে বিপণনের ঢেউ সুন্দরবনেও এসে পড়েছে৷ ‘ঝিঙা’ কে ‘তরি’ বা ধুঁধুলকে ‘ননা’ কাউকে বলতে শোনা যায় না৷ অব্যবহারে হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের কথ্যভাষার বেশ কিছু শব্দ যেগুলির আর কোথাও ব্যবহার দেখা যায় না৷ সেইসব শব্দগুলির তালিকাভুক্তির একটা চেষ্টা করা হল৷ শুরুটা অন্তত হোক৷



নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন