গৌতমকুমার দাস
জলের আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য, তাই সুন্দরবন-সহ শহরের জলাভূমি শ্রান্ত পথ চলতি মানুষের কাছে এক চিলতে বিশ্রামের ঠাঁই৷ ছায়া সুনিবিড় প্রকৃতির মাঝে অলস মধ্যাহ্নে সময় কাটানোয় জলাভূমির জুড়ি মেলা ভার৷ জলের উপরের স্তরে ছোট ছোট ঢেউ-এর আকর্ষণ তো রয়েছেই— বোধ হয় তাই শান্ত শীতল জলাভূমির পাড়ে বসে জলের দিকে তাকিয়েই সময় কেটে যায় সবার৷ কখনো নিঃস্তব্ধ নিঝুম দুপুরে জলাভূমির পাড়ে ছিপ নিয়ে বসে অধীর অনন্ত অপেক্ষা কখন রুই-কাতলা উঠবে বড়শিতে, কখনো কাক ভোরে জেলের দল জালে টেনে তোলে জলাভূমির রুপোলী ফসল কিংবা শীতের দুপুরে জলাভূমির চারদিক কোলাহলময় হয়ে উঠে চড়ুইভাতির হৈ-হুল্লোড়ে৷ আবার এই জলাভূমির পাড়েই প্রকৃতির আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠা সর্বজয়া, নয়নতারা, বুনো হাসনাহেনার রূপ রস গন্ধে মাতোয়ারা হয় চারপাশ৷ সকালে হাঁটা, দুপুরবেলায় কাঠফাটা রোদ্দুরের পথ চলতি মানুষের খানিক বিশ্রাম কিংবা বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় অবসর বিনোদনে জলাভূমির জুড়ি নেই৷ এককথায় অবসর যাপনে কিংবা বিনোদনে জলাভূমির আকর্ষণ সবসময়েই৷
জলাভূমি হল প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম স্থায়ী বা অস্থায়ী, বদ্ধ বা প্রবহমান, মিষ্টি বা নোনা জলের এলাকা— যার গভীরতা কোনো মতেই ৬ মিটার কিংবা ২০ ফুটের বেশী হবে না৷
সুন্দরবনের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের জন্য জলাভূমির শ্রেণীবিন্যাস প্রায় অসাধ্য৷ আবার প্রকৃতি, জল, মাটি ও তাদের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলী বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানের জলাভূমির ক্ষেত্রে বিভিন্ন হওয়ায় শ্রেণী নির্ধারণ করা খুবই কঠিন৷ জলাভূমির জলে এবং জলার পাড়ে জীব বৈচিত্র্য উল্লেখ করার মতো৷ মাটির তলায় সঞ্চিত জলের ভাণ্ডার বৃদ্ধিতে, পলল ও বন্যা নিয়ন্ত্রনে, ঝড়ের বেগ প্রশমনে, পুষ্টি উপাদান উৎপাদন ও সংরক্ষণে জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম৷
সুন্দরবন লাগোয়া এলাকায় অধিক সংখ্যক জলাভূমি থাকাটা অত্যন্ত জরুরী৷ জলাভূমির জল শহরে বিভিন্ন কারণে বেড়ে যাওয়া পারদস্তম্ভকে নিম্নমুখী করতে সাহায্যে আসে৷ এছাড়া বিনোদন, জলক্রীড়া, মাছচাষ, প্রাতঃ ও সান্ধ্যভ্রমণ, অবসর বিনোদন প্রভৃতিতে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের পাঠ্যসূচীতে জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র অন্তর্ভুক্তও বটে৷ ফলে জলাভূমির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা হওয়া দরকার৷ বর্তমানে পঞ্চায়েত ও পুরসভা রাজ্য সরকারের সহায়তায় জলাভূমির উপযোগিতা গুরুত্ব সহকারে দেখভালসহ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছেন৷ তবু কলকাতার জলাভূমির আয়তন কমেছে অনেকটাই— প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ৷ কলকাতার মোট ১২,৫০০ হেক্টর এলাকার মধ্যে অর্ধেক প্রায় ৬,০০০ হেক্টর জলাভূমি এখন অবশিষ্ট রয়েছে৷ জলাভূমির সংরক্ষণ এ কারণে আশু প্রয়োজন৷
মানুষ বেশী করে শহর অভিমুখী হওয়ায় জলাভূমি বুজিয়ে তৈরি হয়েছে বহুতল৷ অথচ এই জলাশয়গুলির ওপর দিয়ে বয়ে আসা সতেজ অক্সিজেন কলকাতা শহরকে জোগায় দুষণহীন প্রাণবায়ু৷ মে-জুন মাসের প্রচণ্ড দাবদাহে কলকাতা শহরে তাপমাত্রা বাড়তে দেয় না৷ এখনো কলকাতার যে কিছুটা সবুজ দেখা যায়, তার অধিকাংশই এই জলাভূমিগুলির পাড় জুড়ে৷ ঘাসের ঝোপে ঢাকা পাড়ের কাঁকড়া, ব্যাঙ, জলফড়িং, ঢোড়া সাপের দল জলাভূমির খাদ্য শৃঙ্খল ও খাদ্যজাল নিয়ন্ত্রণ করে৷ এই জলাভূমির পাড়েই অনাদরে অবহেলায় বেড়ে ওঠে অসংখ্য ভেষজ উদ্ভিদ যার থেকে তৈরী হয় জীবনদায়ী ওষুধ৷ সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জলাভূমি পাড় পরিষ্কার করার সময়ে কম করে ১০টি প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ সনাক্ত করা গেছে৷ ভেষজ উদ্ভিদগুলি হল— বাসক, কালমেঘ, ব্রাহ্মি, কুলেখাড়া, ধুতরা, তুলসী, কেশদাম, গিমা, আমরুল, থানকুনি, অশ্বগন্ধা, কাঞ্চিরা, মুথা প্রভৃতি৷
পঞ্চায়েত বা পুরসভা সাম্প্রতিককালে বিশ্ব ব্যাঙ্কের টাকায় বড় জলাভূমিগুলির পাড় সিমেন্ট দিয়ে কংক্রীট করে ফেলেছে৷ এই কাজে জলাভূমির সার্বিক উন্নতি এবং সংরক্ষণের নামে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে৷ সিমেন্ট দিয়ে জলাভূমির পাড় কংক্রীট করার ফলে ঝোপের ঢাকা পড়ে থাকা প্রাণীদের গুরুত্বপূর্ণ ও উপযোগী বাসস্থান হারাতে হচ্ছে৷ জলাশয়ের পাড়েই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীব বৈচিত্র্য বিরাজ করে৷ পাড় কংক্রীটের করার ফলে জল ও ডাঙ্গায় শামুক, কাঁকড়া, ব্যাঙ, জল ঢোড়া সাপের ওঠানামা করতে অসুবিধা হয়৷ পাড়ে ঘাস, কচু, উলুখাগড়ার ঝোপ সৃষ্টি হয় না৷ ঝোপঝাড়ের উদ্ভিদ, জীবাণু আর ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক, জল ঢোড়া সাপের দল শুধুমাত্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে না, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ায়, মশককুলের লার্ভা ধ্বংস করে, অধিক পুষ্টিমূল্যের নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশের আধিক্য নিয়ন্ত্রণ করে৷ ভারী ধাতু শোষণ করে দূষণের মাত্রা কমায় এবং জলের দ্রব্যগুণ নিয়ন্ত্রণ করে৷ জলাভূমির পাড়ের গাছে মাছরাঙা, ডাহুক, পানকৌড়ি, বক ভিড় জমায় আর পুকুরপাড়ে গাছের ছায়ায় ঝোপের ধারে মাটির গর্তে বানায় নীড়৷ ঐ নীড়ে ডিম পাড়ে, বাচ্চা জন্মে, জলাভূমির পাড় জুড়ে ছড়িয়ে থাকে তাদের কাকলি৷ ডাহুক, বুলবুল, কুবো, চড়াই, শালিকের দল গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে তেষ্টা মেটায় পাড় থেকে সন্তর্পণে নেমে জলাভূমির জল পান করে৷
পুকুরের পাড়ের ঢেউ-এর জন্য পাড়-এর ক্ষতি আহামরি কিছু হয় না৷ বাতাসের কারণে পুকুরে ঢেউ ওঠে খুব বেশী হলেও ৪-৫ ইঞ্চি যা প্রশমিত করে পাড়েই জন্মানো কচু, হোগলা, উলুখাগড়ার ঝোপঝাড়৷ এই সামান্য ঢেউ-র জন্য পাড় সিমেন্ট দিয়ে কংক্রীট করার কোনো মানেই হয় না৷ জলাভূমির ধার দিয়ে রাস্তা থাকলে কাঠের খুটি পুঁতে দলমা দিয়ে মাটি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে৷ আর পাড় যদি বাঁধাতেই হয় তাহলে মাটি ও ইঁটের টুকরো বা নুড়ি দিয়ে ঢাল বেশী রেখে প্রাকৃতিক উপায়ে পাড় বাঁধানো যেতে পারে৷ এতে উভচর প্রাণীদের ওঠানামা করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়৷
জলাভূমির পাড়ে বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা করতে গিয়ে নিশাচর প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রতিবন্ধকতা আসে৷ ফলে জলাশয়ের দিকে আলো না ফেলে রাস্তার দিকে আলোকস্তম্ভ তৈরী করলে নিশাচর কিংবা উভচর প্রাণীদের জীবনচক্র রাতের বেলায় বিঘ্নিত হবে না৷ ব্যাঙাচি, তেচোখা, খলসে, রুই মাছ মশার লার্ভা খেয়ে মশককুলকে যেমন বাড়তে দেয় না, তেমনি জলঢোড়া সাপ পাড়ের ইঁদুর কুল-এর বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে৷
জলাভূমি সংরক্ষণের জন সর্বপ্রথম যে আইন তৈরী হয়েছিল তা হল বঙ্গীয় কচুরী পানা আইন৷ ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ আমলে এই আইনটি মূলত কচুরীপানার হাত থেকে জলাভূমির রক্ষার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল৷ স্বাধীন ভারতবর্ষে জল দূষিত হলে জলাশয় অধিগ্রহণ করা হবে এই মর্মে একটি আইন পাশ করানো হয় ১৯৫২ সালে৷ ১৯৭৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন এবং ১৯৭৬ সালের জলাশয় অধিগ্রহণ এবং সেচের অধিকার আইন অনুযায়ী জলাভূমি বোজানোর চেষ্টা হলে সরকার অধিগ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে৷ ১৯৭৪ সালে জলাভূমি বাঁচাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে ক্ষমতা দেওয়া হয়, জলদূষণ ও প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়৷ কলকাতা পুরসভার অন্তর্ভুক্ত এলাকার পুকুর নোংরা করলে সাজা দেওয়ার জন্য ১৯৮০ সালে কলকাতা পুরসভা আইন তৈরী হয়৷ প্রোমোটারদের হাত থেকে জলাশয় রক্ষা করার তাগিদে সরকারের মৎস্য দপ্তর ১৯৮৪ সালে মৎস্যচাষ আইন প্রণয়ণ করেন৷ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরমন্ত্রক বৃষ্টির জল ধরে রেখে পানীয় জলের জন্য জলাভূমির সংরক্ষণের কারণে পশ্চিমবঙ্গ পুরসভা আইন ১৯৯৩ সালে তৈরী করেন৷ ১৯৮৪ সালের মাছচাষ আইন আবার পরিমার্জিত হয়ে আসে জলাশয়ে মৎস্যচাষের সংশোধিত আইন আকারে, ১৯৯৩ সালে৷ উদ্দেশ্য ছিল জলাভূমি বুজিয়ে বহুতল বাড়ির নির্মাণ স্থগিত করার সঙ্গত কারণে৷
প্রাকৃতিক উপায়ে জলের গুণগত মানগুলি স্বাভাবিক থাকে৷ জলের জৈব পদার্থসমূহ যেমন গাছের পাতা, মাছ ও অন্যান্য উভচর ও জলজ প্রাণীদের রেচন পদার্থ ও মৃত দেহাবশেষ ছত্রাক, ব্যাক্টিরিয়া বা অনুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয়৷ এক্ষেত্রে সূর্যালোক ও দ্রবীভূত অক্সিজেন এই সমস্ত জীবাণুগুলিকে বেশী করে সক্রিয় হতে সাহায্য করে৷ স্বভাবতই পদার্থগুলি বিয়োজিত হয়ে শোষণোপযোগী অজৈব পদার্থে রূপান্তরিত হয় এবং ব্যাক্টিরিয়া ছত্রাক ও আদ্যপ্রাণীরা বিয়োজক এবং পরিবর্তক-এর ভূমিকা পালন করে থাকে৷ তবে পলল জলাভূমি স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রবল অন্তরায়৷ অন্তত পাঁচ বছর অন্তর জলাভূমির তলদেশ থেকে মাটি তুলে ফেলা অত্যন্ত জরুরি৷ জলাভূমির পাড় বাঁধালে জলের গুণগত মান সহনশীল মাত্রার নীচে নেমে যায়৷ হেঁদুয়া, কলেজ স্কোয়ার, ঢাকুরিয়া লেক, ঝিলরোডের জলাশয়ের পাড় সিমেন্ট দিয়ে কংক্রীট করার পর ঐ সব জলাশয়ের জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে জলের দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে এবং বেড়েছে জলের দ্রবীভূত ভাসমান ও কঠিন পদার্থ এবং তেলের পরিমাণ৷ এবং উল্লিখিত সকল ক্ষেত্রেই এদের পরিমাণ স্বাভাবিক এবং সহনশীল মাত্রার নীচে নেমে গেছে অর্থাৎ জল ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেছে৷ স্নান, কাপড়কাচা, খাবারের বাসন মাজা প্রভৃতি কারণে জলাভূমির জলে তেলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়৷
সুন্দরবনসহ শহরের জলাভূমিগুলির ক্রমে যদি বিদায়ের বিষণ্ণ সঙ্গীত বেজেই চলে তবে অদূর ভবিষ্যতে পরিণতি হিসাবে শহরের তাপমাত্রা ক্রমশ চড়তে থাকবে৷ এখনই মে-জুন মাসে পারদস্তম্ভ ৪২ ডিগ্রী সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়৷ সঙ্গে কমতে শুরু করবে তাজা অক্সিজেনের সরবরাহ৷ আর ব্যাঙ, তেচোখা, কই ল্যাটার দল মশার লার্ভা খেয়ে মশার বংশ ধ্বংস না করলে শহরে শুধু পুরকর্মীদের ছড়ানো কীটনাশকে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, এনকেফেলাইটিস রদ করা দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়াবে৷ পরবর্তী প্রজন্মের সকাল-সন্ধ্যায় শরীরচর্চার প্রাতঃ ও সান্ধ্যকালীন ভ্রমণ থেমে যাবে৷ কিশোর-কিশোরী আর খুঁজে পাবে না নিভৃতে কথা বলার জায়গা, শোনা যাবে না ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, জোনাকীর মিটি মিটি করে জ্বলা আলো, বর্ষায় ব্যাঙের মিলনেচ্ছার আকুল আবেদন, বকের অধ্যবসায়ী অপেক্ষা, মাঝরাঙার ক্ষিপ্রতা, কিংবা কালো-হলুদে মোজাইক ছিপছিপে শরীরের জলঢোড়া সাপের সর্পিল সাঁতার৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন