লৌকিক দেবদেবী

গৌতমকুমার দাস

‘নদীর ধারে বাস, ভাবনা বারো মাস৷’ তার উপর খাল খাঁড়ির বাঘ সাপ কুমীরের দাপট৷ প্রাণটুকু ছেড়ে রাখতে হয় বিশ্বাসে৷ প্রাণের ভয়ে দেবদেবীর কল্পনা আপনা হতেই চলে আসে৷ কল্পিত এই দেবদেবীদের কেউ কেউ স্বর্গীয় অলৌকিকতায় মূর্ত৷ আবার কেউবা এই মাটির পৃথিবীর যারা ভাটির দেশে কল্যাণকর কাজের ব্রত নিয়ে মানুষের পূজা পেয়ে আজ লোক-দেবতা৷ সুন্দরবনের লোক সমাজে লোকধর্মের এক বিরল বিচিত্র রূপ এই সুন্দরবনের লৌকিক দেবদেবী৷ সুন্দরবনের বনজীবী ও জলজীবী মানুষদের বাঘ, কুমীর ও কামট-এর হিংস্রতার ভয়কে উপেক্ষা করার সাহস জোগায় এই দেবদেবী ও পীর গাজীরা৷ সুন্দরবনের গ্রাম প্রধান সামাজিক জীবনে গ্রামের দেবতার প্রভাব সুস্পষ্ট৷ এইসব দেবদেবীর পূজা পার্বন ও পীর গাজীদের শিরণী ওরস দিয়ে সুন্দরবনের শ্বাপদ সঙ্কুল জঙ্গলে কাঠ মধু মাছ আহরণে বেরিয়ে পড়ে এখানকার সব সম্প্রদায়ের প্রান্তিক মানুষ৷ এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকার একমাত্র রসদ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ৷

জঙ্গল হাসিলের পূর্বে সুন্দরবনের আশেপাশে জঙ্গলের গা ঘেঁষে বাস করত অন্ত্যজ তপশিলী সম্প্রদায় ও আদিবাসি শ্রেণীভুক্ত মানুষ৷ এদের উপর কতিপয় বর্ণহিন্দুর অত্যাচার লেগেই থাকত৷ বরাবরই এরা অত্যাচারিত অবহেলিত ছিল৷ উচ্চ বর্ণের মানুষ এদের ঘৃণার চোখে দেখত৷ সেই সময়ে ত্রয়োদশ শতকে এই ভাটির দেশেও সুফি মতবাদ ছড়িয়ে পড়েছে৷ হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ের সুফিবাদ অন্ত্যজদের যে সময়ে প্রাণে বাঁচায়৷ এই সুযোগে নেয় সেই সময়কার কিছু মুসলমান ধর্মপ্রচারক৷ তারা কখনো তরবারির ঝলসানিতে, কখনোবা ভালোবেসে জয় করে নেয় নিম্নবর্গের এইসব মানুষের মন৷ শুরু হয় ধর্মান্তরিতকরণ৷ চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে অসংখ্য আদিবাসি ও তপশিলী নিম্নবর্গের মানুষ মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে৷ এদের নব্য মুসলমান বলে৷ সুন্দরবন অঞ্চলের অধিকাংশ মুসলমান তাই ধর্মান্তরিত হওয়া নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়৷ আর এই প্রেক্ষিতেই সুন্দরবনের লৌকিক দেবদেবীদের সঙ্গে পীর গাজীদের উত্থান৷ একই দেব বা দেবী তাই এলাকাভিত্তিক হিন্দু সমাজে বা মুসলমান পোষাকে পূজিত হন৷ মুসলমানদের আরাধ্য দেবতা নিরাকার৷ কিন্তু সুন্দরবন অঞ্চলে লোক সমাজে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বনবিবি বা পীর গাজীদের মূর্তি পুজো করে থাকে৷ নৈবেদ্যও হয়ে থাকে মানুষের সান্নিধ্য ও জোগানের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে৷ কোথাও তা যেমন চাল কলা বাতাসা, সেটাই আবার কোথাও মুরগী দিয়ে দিলেই হয়৷ তবে মুরগী বলি দেওয়া হয় না, বনবিবির নামে মুরগী জঙ্গলে ওড়াতে হয়৷ সুন্দরবনের জঙ্গলে যে বন মুরগীর দেখা মেলে তা সবই বনবিবির নামে জেলে বাউলে ও মউলেদের উৎসর্গ করা মুরগীর দল৷ জঙ্গলের পরিবেশে ঠিক মতো খাবার খেতে না পাওয়া গৃহস্থের মুরগীরা ক্রমে বন মুরগী হয়ে তাই শীর্ণকায়া৷

সুন্দরবনের লোকসমাজে আরাধ্য সব দেবদেবীই কাল্পনিক৷ পোষাক, পরিচ্ছদ, নৈবেদ্য, পূজা পদ্ধতি সবই সম্প্রদায়ভিত্তিক ও স্থান কাল পাত্র ভেদে বৈচিত্র্যের দাবি রাখে৷ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় যেমন দক্ষিণ রায় পূজিত, তেমনি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে কালু গাজী, শাহ জঙ্গুলী, বড় খাঁ গাজী পীর হিসাবে অধিষ্ঠিত৷ তবে বনবিবি হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে সমান ভাবেই পূজা পায়৷ কারণ কল্প কাহিনীর বনবিবি প্রথম দিকে মুসলমান সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবী হলেও এক হিন্দু গরীব অন্ধ বিধবার একমাত্র শিশুসন্তান দুখেকে দক্ষিণ রায়ের কোপ থেকে বাঁচিয়েছিল৷ বনবিবি তাই হিন্দুদের কাছে তখন থেকেই মা বনবিবি৷ এই বনবিবির নামে সুন্দরবনের ভাটির দেশে মা বনবিবি পালা গান এখন সর্বাধিক প্রচারিত৷ একদিকে নারী, অন্যদিকে মাতৃস্নেহ, দুখেকে নিকট মৃত্যু থেকে রক্ষার কাহিনীর কারণে সাধারণ মানুষের আবেগের কাছে বনবিবি গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচারিত৷ সুন্দরবনের যেকোন ফরেস্ট রেঞ্জার অফিসের কাছেপিঠে বনবিবির মন্দির না দেখতে পাওয়াটাই যেন এখন আশ্চর্যের৷ জেলে কাঠুরে মউয়ালদের সঙ্গে সরকারি চাকুরে বনকর্মিরাও বাঘ সাপ কুমীরের হিংস্র আক্রমণ থেকে বাঁচার তাগিদে বনবিবির পূজো করে থাকে৷

চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত সহায় সম্বলহীন গ্রামের মানুষ সুন্দরবন অঞ্চলে অসুখ বিসুখ থেকে রেহাই পেতেও বনবিবির মানত করে থাকে৷ বনবিবি দক্ষিণ রায়ের পরে সুন্দরবন অঞ্চলে গাজির প্রভাব৷ ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘‘গাজী’’ শব্দের অর্থ ‘‘বিজয়ী’’৷ অস্ত্রশস্ত্র বা ভাব ভালোবাসায় অথবা পরোপকার ও সমাজ সংস্কারে মানুষের কাছের হয়ে উঠতে পারলে একজন মুসলমান ধর্ম প্রচারক ‘গাজী’ উপাধিতে তখন সন্মানিত হতেন৷ এমনই যে দুই গাজী সুন্দরবনাঞ্চলে দেবদেবীর সমকক্ষ হয়ে উঠেছেন তারা হলেন কালু গাজী ও বড় খাঁ গাজী৷

শুধু ধর্মযুদ্ধ বা তাতে বিজয়ী হয়েই এই সব ঐতিহাসিক চরিত্ররা এক যাত্রায় পীর গাজী বা লৌকিক দেবদেবী হয়ে যায়নি৷ লোক সমাজে সেবা ও সংস্কার এদের দেবত্বে উন্নীত করেছে৷ যেমন দেবতা আটেশ্বর বাবা গ্রামীন জনপদের রক্ষক যার তৎকালীন প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত৷ তাঁর সময়ে চুরি ডাকাতি তো দূর অস্ত, বাইরের কোন শত্রু বাদাবনে ঢোকার সাহস পেত না৷ সেরকমই মানিক পীর ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এক হেকিমী চিকিৎসক যিনি কিনা গৃহপালিত পশু পাখির রোগ সারানোয় যথার্থ দক্ষ ছিলেন৷ আবার মাকাল ঠাকুরকে পুজো করলে জল থেকে জাল সাদা করে উঠে আসে রাশি রাশি মাছ৷ ফলে ঐতিহাসিক চরিত্র, রাজা রাজড়া, ধর্ম প্রচারক কিংবা সাধারণ মেয়ে থেকে রাজকন্যে সবই স্ব স্ব প্রভাব প্রতিশ্রুতি সেবা মাধুর্য সংস্কারে সুন্দরবনের সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে লোক সমাজে লৌকিক দেবত্ব অর্জনে সামর্থ্য লাভ করেছেন৷ বছরের নির্দিষ্ট কোন এক তিথিতে এই সব লৌকিক দেবদেবীর জাঁতাল পূজানুষ্ঠান হয়ে থাকে৷ ‘জাঁতাল’ কথাটি ‘জাতিবাচক’ একটা শব্দ থেকে এসেছে৷ লৌকিক দেবদেবীর পূজায় বিশেষ জাতি বা সম্প্রদায়ের অংশ গ্রহণের কারণে জাঁতাল শব্দটি ব্যবহৃত হতো৷ বর্তমানে লৌকিক দেবদেবীর ‘জাঁকজমক’ করে পূজা পার্বণ মেলা করার জন্য জাঁতাল কথাটি প্রচলিত৷

বনদেবী বনবিবি

সুন্দরবনের লোক সমাজে লৌকিক দেবদেবীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সমন্বয় ও সহাবস্থানের অকৃত্রিম উদাহরণ হল বনমাতা বনবিবি যে বাউলে মউলে সহ সুন্দরবনের শ্রমজীবী মানুষদের জল জমিন জঙ্গলে হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাকে বলে বিশ্বাস৷ হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এই বনবিবিকে বনে ঢোকার পূর্বে ও বন থেকে ফিরে এসে নিয়মিত পুজো করে থাকে৷ সুন্দরবনের বনাঞ্চলে সবচেয়ে বেশী পূজিত বনবিবি হয়তোবা প্রাচীন যুগে অরণ্যে আরাধ্যা বনদুর্গা৷ অরণ্য জীবনে মধ্যযুগীয় নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা এই বনদুর্গাকে পুজো করতো৷ পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে দক্ষিণবঙ্গে মুসলমান শাসকের আক্রমণ, আগ্রাসন ও তার প্রভাবে বনদুর্গার নাম বদলে হয়েছে বনবিবি কারণ দুর্গা শুধু নাম নয়, হিন্দুদের আরাধ্য দেবীও বটে৷ বিবি শব্দটি সম্পূর্ণভাবে মুসলিমদের সামাজিক জীবনে ব্যবহৃত একটি পারিবারিক শব্দ তবু আশ্চর্যের এই যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বনবিবির পূজো করে থাকে যা সম্পূর্ণভাবে ইসলাম ধর্মাচরণের রীতি বিরুদ্ধ৷ বনমাতা বনবিবি শুধু এক বনদেবী নন, তিনি যেন সুন্দরবনের মা মাটি মানুষের মমতাময়ী ভিত্তি৷

বনবিবি সব ধর্মের মানুষের অতি কাছের৷ জেলে বাউলে মউলেরা এই বনদেবীকে তাদের আপনজন বলেই মনে করে থাকে৷ এক অন্ধ বিধবার একমাত্র সন্তান দুখে নামের এক বালককে বাঘ রূপ ধারণকারী দক্ষিণ রায়ের রোষানল থেকে বাঁচানোর মানবিক কারণে বনবিবির দেবী হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা সুন্দরবনের লোকসমাজে সর্বাধিক৷ তাছাড়া দেবী ও নারী হওয়ার সুবাদে স্নেহ মায়া মমতা লোকসমাজে অধিক কাঙ্খিত৷ তাই বনবিবির দেবীমূর্তি তৈরীর সময় বালক দুখেকে কখনো কোল কখনোবা পদতলে প্রতিষ্ঠা করে তার স্নেহময়ী মাতৃত্বের প্রকাশে বনবিবিকে দেবী থেকে মানবী করে তোলে হিন্দু মুসনমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ যদিও তাঁর পোষাকে সম্প্রদায়ভিত্তিক কিছুটা বৈপরিত্য লক্ষ্য করা যায়৷ মুসলমান সম্প্রদায়ের বনবিবির মাথায় টুপি ওটিকলি, পরনে ঘাঘরা ও চোলি, পায়ে জুতো ও মোজা আর চুল বিনুনি করে বাঁধা থাকে৷ আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে পরণে শাড়ি, আলতা পরা পদযুগল, মাথায় চূড়া বা মুকুট ও এলোকেশী চুলে সজ্জিতা হিন্দু দেবীমূর্তির মতো বনবিবির রূপ৷ তবে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢোকার পূর্বে বনবিবির নামে মুরগী ওড়ায়৷ মুরগী বনবিবির বাহন৷ মুরগীর পিঠে চড়ে মুহূর্তের মধ্যে বনের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে বনবিবি ভক্তের ডাকে সাড়া দিতে পাড়ি দেয় বলে স্থানীয় মানুষের স্থির বিশ্বাস৷

মা বনবিবি

কথিত বনবিবি এক অভিশপ্ত মায়ের যমজ সন্তানের একজন৷ মা তার মক্কাবাসী বেরাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি৷ সতীনের ষড়যন্ত্রে সুন্দরবনে নির্বাসনের সময় গুলাল বিবি গর্ভবতী ছিলেন৷ তাঁর গর্ভ থেকে বনবিবির সঙ্গে শাহ জঙ্গুলি যমজ ভাই বোন জন্ম নেয়৷ হরিণ বানর সহ অন্যসব বন্যপশুর সাহচর্যে সুন্দরবনের জঙ্গলে শৈশব কাটে বনবিবির৷ ‘বনবিবি জহুরানামা’ পুঁথিতে সাবলীল ভঙ্গিতে বনবিবির বাল্যকালের জঙ্গলে বড় হয়ে ওঠার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে৷

‘বনের হরিণ সব খোদর মেহের

হামেশা পালন করে বনবিবি’র তরে৷

বেহেশতের হুর এসে কোলে কাঁখে নিয়া

তুষিয়া মায়ের ফেরে বেড়াইয়া৷’’

বনের সব ধরণের পশুপাখিই বনবিবির আবাল্য সহচর৷ বড় হয়ে ওঠার পথে সুন্দরবনের জেলে বাউলে মউলেদের দুঃখ দুর্দশা তার চোখে ধরা পড়ে৷ তাই সুন্দরবনের এই দুঃখী ও দুর্বল মানুষকে রক্ষা করার জন্য বনবিবি ও তার যমজ ভাই শাহ জঙ্গুলী এই জঙ্গল পরিবেশে থেকে যান৷ দক্ষিণ রায় তখন ভাটির দেশের দেবদেবীদের রাজা৷ কথিত, সাধারণের উপর তার অত্যাচার ক্রমেই বেড়ে চলছিল৷ সুন্দরবনের থেকে আহরণ করে কোন সম্পদ পেতে গেলে দেবতা দক্ষিণ রায়ের কাছে শিশু বালক বলি দিতে হত৷ আর দক্ষিণ রায় বাঘের রূপ নিয়ে এসে তাকে খেয়ে ফেলত৷ মোহাম্মদ মুনশী তাঁর বনবিবির পালায় দুখে নামক বালকের এমনই এক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন৷ ধোনাই মোনাই নামের দুই সদাগর বরিজহাটি থেকে সপ্তডিঙা করে মধু সংগ্রহ করতে সুন্দরবনে ঘন জঙ্গলে পাড়ি দিয়েছিল৷ সেই দলে ছিল এক অন্ধ দুখিনী বিধবা মায়ের একমাত্র বালক সন্তান এই কাহিনীর দুখে৷

ধোনাই মোনাই সাতদিন ধরে সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলের অনাচে কানাচে হন্যে হয়ে ঘুরে মধুর ছিটে ফোঁটাও সংগ্রহ করে উঠতে পারেনি৷ মধু পাবে কি করে— বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের ছলনায় মৌমাছি মৌচাক মধু সবই উধাও হয়ে যায় বন থেকে৷ এমনই এক মাঝ রাতে ধোনাই, মোনাই স্বপ্নাদেশে শোনে দক্ষিণ রায়ের দৈববানী, ‘‘মধু পাবি যদি দুখেকে আমার কাছে বলি দিস৷’’ সকালে উঠে দুভাই সিদ্ধান্ত নেয় মধু পাবার জন্য দুখেকে দক্ষিণ রায়ের ভোগে দেবে বলি কিন্তু একথা ওদের দলের কাউকে ঘুনাক্ষরেও বলা যাবে না৷ এরপর যা হয়, দক্ষিণ রায়ের আশীর্বাদে সব মৌচাকে মধু ভরে ওঠে৷ আর ধোনাই মোনাই-এর সপ্তডিঙা ভর্তি হয় মধু ভান্ডে আর শেষদিনে দেশে ফিরে যাবার বেলায় দুখেকে রান্নার জন্য সুন্দরবনের জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে পাঠিয়ে ধোনাই মোনাই বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে তাদের সপ্তডিঙা ছেড়ে দেয়৷ এবার শর্ত অনুযায়ী বাঘরূপী দক্ষিণ রায় বালক দুখেকে খেতে আসে৷ বালক দুখে তখন তার আরাধ্য মা বনবিবির নাম স্মরণ করে৷ ভক্তের ডাকে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেয় বনমাতা বনবিবি৷ ঘটনাস্থলে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে বালক দুখেকে দক্ষিণ রায়ের গ্রাস থেকে মুক্ত করে কোলে তুলে নেয় বনবিবি৷ মায়ের নিরাপদ আশ্রয়ের মতো বনবিবির কোলে আশ্বস্ত ও ভয়মুক্ত দুখে চোখ বন্ধ করে ফেলে৷ আর বনবিবি তার ভাই শাহ জঙ্গুলীকে দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে যুদ্ধের নির্দেশ দেয়৷ যুদ্ধে পরাজিত বাঘরূপী দক্ষিণ রায় লেজ গুটিয়ে পালায়৷ বনবিবির দয়ায় দুখের জীবন রক্ষা পায়৷ এমন কি বালক দুখের প্রার্থনায় বনবিবি দুখের মায়ের অন্ধত্ব মোচন করে৷ তখন বনমাতার আশীর্বাদে দুখে বিত্তবান হয়ে ওঠে৷ সওদাগর ধোনাই তখন দুখেকে তার জামাতা রূপে বরণ করে নেয়৷ এই হল মোহাম্মদ মুনশী লেখনীতে বনবিবি পালার কল্পিত কাহিনী৷

বনবিবি সুন্দরবনের মানুষের কল্পিত এক লৌকিক দেবী৷ লোক সমাজের প্রয়োজনে তাঁর আবির্ভাব৷ সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দরবনের গ্রামীন জনপদের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সামান্য নৈবেদ্যেও তাঁকে আরাধনা করে থাকে৷ কোথাও সিন্নি, কোথাও চাল কলা বা বাতাসায় সন্তুষ্ট হয় বনমাতা বনবিবি এ বিশ্বাস জেলে মউলে ও বাউলেদের৷ তবে সুন্দরবনের লোকালয় এমনকি বনে জঙ্গলেও বনবিবির থান লক্ষ্য করা যায়৷ দক্ষিণবঙ্গের নিম্ন গাঙ্গেয় অঞ্চলের সুন্দরবন ঘেঁষা গ্রামীণ জনপদে মুসলমানদের অভ্যুত্থান এবং বনবিবি—দুখের কল্পিত কাহিনীর কারণে ভাটির দেশের প্রবল পরাক্রমশালী দক্ষিণ রায়ের প্রভাব ক্রমে খর্ব হয়৷ বনবিবির থানের সংখ্যা, পূজো পাঠ ইত্যাদিতে দক্ষিণ রায়কে জাগ্রতা দেবী রূপে বনবিবি ছাড়িয়ে যায়৷ নারী হওয়ার সুবাদে এবং বনবিবির অসাম্প্রদায়িক কীর্তিকলাপ অন্যের থেকে অধিক পুজো পাওয়ার মুখ্য কারণ৷

বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়

সুন্দরবন অঞ্চলের সুদর্শন, সুপুরুষ, তেজস্বী ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক দেবতা দক্ষিণ রায়৷ দ্বাদশ শতকের পরে মুসলমানরা বাংলাদেশে শাসন ভার তুলে নেওয়ায় হিন্দু দেবতা দক্ষিণ রায়ের প্রভাব বেশ খর্ব হয়ে যায়৷ দুখেকে দক্ষিণ রায়ের হাত থেকে বাঁচানোর কল্প কাহিনীর কারণে বনবিবি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে ষোড়শ শতকেই৷ অথচ ভয়াল ভয়ংকর প্রতি মুহূর্তে বিপদসংকেত বয়ে আনা সুন্দরবনের জল জঙ্গল জমিনে বনবিবি জমানার পূর্বে অলৌকিক ক্ষমতাধারী একমাত্র লৌকিক দেবতা এই দক্ষিণ রায়৷ সুন্দরবনের দেবতা দক্ষিণ রায় কোন কোন গবেষকের মতে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব যার লৌকিক পরিচয় অলৌকিকত্বের আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে৷ পরে দক্ষিণ রায় হয়ে ওঠেন একজন লৌকিক দেবতা৷ সুন্দরবনের অন্যান্য লৌকিক দেবদেবীর তুলনায় দক্ষিণ রায়ের পূজোর সময় ঢাক ঢোল বাদ্যি সহযোগে যাত্রা পালাগান ও গ্রাম মেলার আয়োজনে সমারোহ ও অনুষ্ঠান অধিক হয়ে থাকে৷ এছাড়াও দক্ষিণ রায় সুন্দরবনের একমাত্র লৌকিক দেবতা যাকে নিয়ে রচিত হয়েছিল এক মঙ্গলকাব্য যার নাম ‘রায়মঙ্গল’ যা অন্তত সুন্দরবনের অন্য কোনও লৌকিক দেবদেবী এমনকি বনবিবির ঝুলিতেও নেই৷ অথচ অল্প বয়সী বালক দেখলেই দেবতার কাছে বলির নামে চাগাড় দিয়ে ওঠা ভোগের বাসনা দক্ষিণ রায়ের লৌকিক দেবতা হিসাবে প্রতিপত্তি বিনাশের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ৷ শুধু তাই নয় জিবের লালা ঝরা ভোগের ওই বাসনার জেরে তাঁর অমিত বিক্রমের সুপুরুষালী মূর্তির বদল ঘটে গিয়ে সম্প্রতিকালে কোন বনবিবির মন্দিরে বাঘরূপী দক্ষিণ রায় হয়ে অবস্থান ঘটেছে৷ বাঘরূপী দক্ষিণ রায় এখন বনবিবির সঙ্গে পুজোয় কিঞ্চিৎ ভাগ পায়৷ যদিও দক্ষিণ রায়ের জন্য এই বলিদান সম্পূর্ণ কল্পনা প্রসূত মোহাম্মদ মুনশী এর বর্ণনা৷ বা এখনো মনে করা যেতে পারে যে দক্ষিণ রায়ের প্রভাব খর্ব করার জন্য বনবিবি-দুখের কাহিনী ইচ্ছে করেই তৈরী করে ‘‘বনবিবি জহুরানামা’’ রচিত হয়েছিল৷

দক্ষিণরায়

সুন্দরবনের লোকসমাজে দক্ষিণ রায়ের লৌকিক দেবতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার একটি বড় কারণ হল এই যে তিনি কারো বাড়িতে অধিষ্ঠান করেন না৷ নিম বট পাকুড় গাছের তলায় দক্ষিণ রায়ের পূজো হয়৷ আর এই ধরণের একটি গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে কবি কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যের উপাখ্যান৷ পুষ্পদত্ত নামে এক সওদাগরের বাণিজ্য তরী নির্মানের জন্য রতাই নামের এক কাঠুরে তার নিজের ছেলে ও ছয় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে কাঠ কাটতে জঙ্গলে ঢোকে৷ প্রয়োজন মতো কাঠ কেটে ফেরার সময় জঙ্গলের মধ্যেই একটি লম্বা ঋজু পাকা পোক্ত গাছ দেখেই রতাই ও তার ছয় ভাই গাছটাকে কেটে ফেলে৷ দক্ষিণ রায়ের আবাসস্থল ছিল ঐ গাছ৷ রাগে গরগর করতে করতে দক্ষিণ রায় সঙ্গে সঙ্গে ছয়টি বাঘ পাঠায় রতাই-এর ছয় ভাইকে সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলে৷ রতাই ভাইদের ফেরৎ পাবার জন্য কান্নাকাটি জুড়ে দিলে দক্ষিণ রায়ের দৈববানী হয়, যদি সে তার ছয় ভাইকে ফেরত পেতে চায় তাহলে তার শিশু সন্তানকে তার কাছে বলি দিতে হবে৷ রতাই তার সন্তানকে দক্ষিণ রায়ের ভোগে দিলে সে তার ছয় ভাইকে ফেরৎ পায়৷ দক্ষিণ রায়ের লৌকিক দেবতা হয়েও মানুষের শিশু সন্তান বা বালককে দেখলেই জিভ লকলক করে ওঠে বলে সুন্দরবনের আরণ্যক সমাজে ক্রমশ প্রভাব কমেছে৷ সওদাগর পুষ্প দত্ত দক্ষিণ রায়ের মহিমা কাঠুরে রতাই-এর থেকে শোনে৷ তারপর পুষ্প দত্ত সপ্তডিঙা তৈরী করে দক্ষিণ রায়ের পূজো করে ওর নিরুদ্দিষ্ট পিতার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে৷ নদীপথে বহু পথ অতিক্রম করে সে গঙ্গাসাগরে পৌঁছায়৷ গঙ্গাসাগর যাওয়ার পথে মাঝ দরিয়ায় এক ভাসমান প্রাসাদ পুষ্প দত্ত দেখতে পায় এবং এই অলৌকিক দৃশ্যের কথা তুরঙ্গ শহরে পৌঁছে সেখানকার রাজার কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করে৷ রাজা ওর কথা শুনে পুষ্প দত্তকে ঐ দৃশ্য দেখাতে নিয়ে যেতে বলে৷ কিন্তু পুষ্প দত্ত সেসব দেখাতে না পারায় রাজা তার গর্দান নেবার আদেশ দেয়৷ কারাগারে বন্দি অবস্থায় পুষ্প দত্ত লৌকিক দেবতা দক্ষিণ রায়ের বন্দনা শুরু করে দেয়৷ বাঘরূপী দক্ষিণ রায় এরপর জহ্লাদের গোঁফ দাড়ি ছিঁড়ে নেয় ও রাজাকে হত্যা করে৷ রাজার মৃত্যুর কথা শুনে রানী সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধস্থলে চলে আসে৷ সঙ্গে সঙ্গে দৈববানী হয় পুষ্প দত্তের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলে রাজা তার প্রাণ ফিরে পাবে৷ রাণী ঐ দৈব কথায় রাজী হওয়ায় রাজা প্রাণ ফিরে পায় ও রাজকণ্যের সঙ্গে পুষ্প দত্তের বিয়ে হয়ে যায়৷ পুষ্প দত্তের পিতা ঐ কারাগারে বন্দী জীবন কাটানোর দিনও শেষ হয় দক্ষিণ রায়ের আশীর্বাদে৷ সপ্তডিঙার সবচেয়ে সুন্দর ডিঙা মধুকরে রাজকন্যা ও পিতাকে নিয়ে নিজভূমে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যের পরিসমাপ্তি ঘটে৷

একথা অনস্বীকার্য যে দক্ষিণ রায় ভাটির দেশের একজন প্রবল পরাক্রমশালী রাজা৷ দক্ষিণ রায় নামের এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিটি আবার পৌন্ড্র বা পোদ জন গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য ও পৃষ্ঠপোষক এবং এই পোদেদের পূজা পেয়ে থাকে দক্ষিণ রায়৷ এ বিষয়ে ঐতিহাসিকরা একমত যে দক্ষিণবঙ্গে ভাটির দেশে, দক্ষিণ রায় পঞ্চদশ ষোড়শ শতকে ইসলাম ধর্মের প্রচারক মুসনমান গাজী পীরদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করে স্বীয় প্রদেশে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুপ্রবেশে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন৷ তাঁর এই ধর্মযুদ্ধের জন্য তাঁর রাজ্যের মানুষের কাছে স্বধর্মরক্ষক দক্ষিণ রায় শ্রদ্ধা ও ভক্তি লাভ করে৷ এই শ্রদ্ধা ও ভক্তি ক্রমে দক্ষিণ রায়কে দেবত্বে উপণীত করে৷ এখনো বারুইপুর সংলগ্ন ধপধপিতে দক্ষিণ রায়ের মূর্তির হাতে রাইফেল, পায়ে ভারী গাম বুট এবং যোদ্ধার সাজসজ্জা লক্ষ্য করা যায়৷ ঐতিহাসিক চরিত্র দক্ষিণ রায় দেবত্ব লাভ করে কোন সময় থেকে বাঘরূপী দক্ষিণ রায় হয়ে গিয়েছিল তা’ এখন তর্কের বিষয়৷ তবে চাল কলা পাটালী গুড়ের সাধারণ নৈবেদ্যে খুশী পোদেদের দেবতা দক্ষিণ রায় আজো সুন্দরবন অঞ্চলে নিজে পোদ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় লৌকিক দেবতা রূপে পুজো পায়৷

বারাঠাকুর

সুন্দরবনের পূজিত একমাত্র মুন্ডমূর্তির দেবতা বারাঠাকুর৷ প্রাচীন মুন্ডমূর্তি ভাটির দেশ সুন্দরবনে আজো প্রচলিত৷ একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী মূর্তি উলটানো ঘটের উপর রঙ বেরঙে এঁকে পয়লা মাঘ পূজা করা হয়৷ পুরুষ মুন্ডটি দক্ষিণ রায়ের এবং স্ত্রী মুন্ডটি তার মা দেবী নারায়ণীর বলে কথিত৷ কাটা মুন্ডমূর্তির সঙ্গে দক্ষিণ রায়ের অস্তিত্ব মিলে মিশে বর্তমানে দক্ষিণদ্বার নামে সুন্দরবনে পূজিত হন৷ ফলে মুন্ডমূর্তির এই বারাঠাকুর স্বয়ং লোকদেবতা দক্ষিণ রায় নন, তাঁর প্রতীক মাত্র৷ দক্ষিণ রায় কি করে যে বারাঠাকুরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে গেলেন, তার কোন ঐতিহাসিক তথ্য নেই৷ কথিত, ভাটির দেশ দখলে মুসলীমদের সঙ্গে যুদ্ধে গাজীরা দক্ষিণ রায়ের মুন্ড কেটে ফেলায় দক্ষিণ রায় মুন্ডমূর্তির বারাঠাকুর রূপে পূজিত হন৷ এই ঘটনা যদিও কোন পুঁথি বা মঙ্গলকাব্য প্রামাণ্য হিসাবে সমর্থন করে না৷

বনমাতা নারায়ণী

সুন্দরবনের শ্রমজীবী ও বনজীবী মানুষের কাছে বনদেবী যেমন বনবিবি, তেমনই বনমাতা হলেন নারায়ণী৷ এই লৌকিক দেবী নারায়ণী আসলে নন্দনকাননের বিষ্ণুর স্ত্রী নারায়ণী বৈদিক যুগীয় শাস্ত্রীয় দেবী নন৷ ঐতিহাসিকদের মতে এই বনমাতা নারায়ণী হলেন দক্ষিণ রায়ের মা৷ ভাটির দেশের দখল যখন বনবিবি নিতে আসে ও দক্ষিণ রায়ের কর্তৃত্ত্ব মানতে নারাজ হয় তখন দক্ষিণ রায় বনবিবির সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করে৷ কিন্তু পুরুষ মানুষ হয়ে স্ত্রীলোকের সঙ্গে যুদ্ধ কোনভাবে সম্ভব নয় জেনে মা নারায়ণীকে সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে আড়ালে যুদ্ধের অন্যান্য সব কিছুর দেখভাল করেন দক্ষিণ রায়৷ ঐ যুদ্ধে কেউ বিজয়ী বা বিজিত হয়নি৷ তাই বনবিবির সঙ্গে দক্ষিণ রায়ের সন্ধি হয় মাতা নারায়ণীর উপস্থিতিতে৷ কথিত বনমাতা নারায়ণী সুন্দরবন অঞ্চলের সব চেয়ে প্রাচীন এক লৌকিক দেবী৷ খড়ের চাল মাটির দেওয়ালে এমনকি তালপাতার ছাউনি দেওয়া ছোট্ট ছোট্ট মাটির দেওয়ালের থানে এক দেড়শো বছর পূর্ব থেকে পূজিত মাতা নারায়ণী আরণ্যক সভ্যতার অন্যতম সাক্ষী হয়ে রয়েছেন৷ দুশো আড়াইশো বছরের পুরানো বাস্তুভিটেয় এখনো আগাছা জন্মানো ঝোপঝাড়ে অথবা বনবাদাড়ে বনমাতা নারায়ণীর থান প্রমাণ করে সুন্দরবনের এই লৌকিক দেবী সবচেয়ে প্রাচীন৷

ধর্মঠাকুর

বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের জন্মদিনে ধর্মঠাকুরের পুজো হওয়ায় ধর্মঠাকুরের পরিচিতি নিয়ে প্রশ্ন আসে ধর্মঠাকুরের পূজা কি আসলে বুদ্ধের পূজা? ধর্মরাজের বার্ষিক জাঁতাল পূজা উপলক্ষে মেলা বসে৷ ধর্মের গাজন উৎসব জাঁকজমক করে পালিত হয়৷

প্রাচীন যুগ থেকে ধর্মঠাকুর নিম্নবর্গের অন্ত্যজদের দেবতা৷ সূর্যকে ধর্মঠাকুর রূপে পুজো করত অত্যাচারিত অবহেলিত মানুষ৷ ক্রমে ধর্মঠাকুরের পূজার চল কমে আসে৷ বৈশাখী পূর্ণিমায় ধর্মঠাকুরের গাজন উৎসব দখল করে নেয় চড়ক সংক্রান্তির গাজন৷ শিবঠাকুরের প্রভাবে ধর্মঠাকুরের পূজার আধিক্য আজ আর নেই বললেই চলে৷ শিবঠাকুরের পূজা হ্রাস পেতে থাকায় বৌদ্ধধর্মকে চাপে রাখতে ধর্মঠাকুরের পূজার প্রচলন হয়েছিল বলে মনে করা যেতে পারে৷ যদিও ধর্মঠাকুরের পূজা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল৷ শৈব ধর্মাবলম্বীরা বৌদ্ধদের সহ্য করতে পারত না৷ তাই শিবতন্ত্রের পুঁথিতে দেখা যায়—

বহুদেশ বহুমঠ না হয় কখন

নীচ জাতিগৃহে দেখ ধর্ম সনাতন৷

বৌদ্ধধর্ম বৌদ্ধচর্চা করিতে নির্মূল

এতাদৃশ অনুষ্ঠান করে সাধুকুল৷৷

ধর্মঠাকুরের কোনো মূর্তি পূর্বে ছিল না৷ বড় পাথর বা মাটির চাঁই ধর্মঠাকুরের প্রতীক হিসাবে পুজো পেত৷ কল্যাণপুরের কালিকাপুরে ধর্মঠাকুরের থানে দেওয়ালের একটা অংশ ধর্মঠাকুর রূপে পূজিত হয়৷ আবার মন্দিরবাজারে ধর্মঠাকুরের সুন্দর মূর্তি পূজা পায়৷ অনার্য অন্ত্যজদের ধর্মঠাকুর মুসলীম প্রভাবে কোথাও ইসলামিক পোষাকে বুটজুতো পরে যেমন পরিবর্তিত, তেমনি আবার কোথাও শিবঠাকুরে রূপান্তরিত হয়ে উচ্চবর্ণের মানুষের কাছে বৈদিক দেবতারূপে পূজা পেয়ে থাকে৷

কুমির ঠাকুর কালু রায়

সুন্দরবনের জঙ্গল জমিন রয়েল বেঙ্গলের বাসভূমি হলেও জলে রয়েছে অজস্র কুমির কামট৷ বনে জঙ্গলে বাঘের ভয় থেকে মুক্তি পেতে যেমন বাউলে মউলে জেলেরা বনবিবি, দক্ষিণ রায়, মা নারায়ণী, বড় খাঁ গাজীর স্মরণ করে, তেমনই জলে কুমির কামটের হাত থেকে বাঁচতে কালু রায়ের পূজো করে এরা৷ সাধারণ এক শিকারীর মূর্তি কালু রায় নামের এই কুমির দেবতার৷ এর মূর্ত্তির দু’হাতে টাঙ্গি ঢাল, কোমর বন্ধ থেকে ঝোলে নানা রকমের অস্ত্রশস্ত্র, আর পিঠে তার ঝোলানো তীর ধনুক৷ তবে কুমির দেবতা কালু রায়ের পুজো পাঠে তেমন কোন খরচ খরচা নেই৷ এই দেবতার জন্য নৈবেদ্য বরাদ্দ শুধু বন ঝাউ এর ফল৷ রাইফেলধারী বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের সহচর হিসাবে কোন কোন থানে পূজা পায়৷ মা কালীর মতো কালু রায়ের পুজো সাধারণত শনি মঙ্গলবারে হয়৷ জঙ্গলে ঢোকার সময় যেদিনই হোক না কেন জেলে কাঠুরে মধু সংগ্রহকারীরা বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়কে পূজো করার সঙ্গে সঙ্গে কালু রায়কেও স্মরণ করে থাকে৷ তবে তিথি মেনে কোথাও কোথাও কালু রায়ের এখনো পুজো হয় মকর সংক্রান্তির মাঝ রাতে৷ পশু পাখীর দেবার চল রয়েছে এখনো এই কালু রায়ের পুজোয়৷

বসন্তের দেবতা বসন্ত রায়

আদি ব্যধি নিয়ন্ত্রক লৌকিক দেবতার নাম বসন্ত রায়৷ সুন্দরবনে পৌন্ড্র সমাজে বসন্ত রোগ নিরাময়ের জন্য পূজিত হন বসন্ত রায়৷ লৌকিক দেবদেবীর মধ্যে দৈহিক সৌন্দর্যে কার্ত্তিক ঠাকুরের মতো রূপবান দেবতা এই বসন্ত রায়৷ এই দেবতা শীতলার পুত্র রূপে পরিচিত৷ তাই লৌকিক দেবতা রূপে বসন্ত রায়ের অস্তিত্ব নেই৷ পূজার সময় পুত্র রূপে বসন্ত রায়ের মূর্তি মা শীতলার পাশে বসিয়ে পূজা করে থাকে সুন্দরবনের সাধারণ মানুষ৷ হাম বসন্ত পীলে রোগ ছাড়াও গৃহপালিত পশুপাখির রোগ নিরাময়ে লৌকিক দেবতা বসন্ত রায়ের আরাধনা করা হয়ে থাকে৷ বসন্ত রায়ের পূজার নৈবেদ্য অতি সাধারণ এবং এই পূজায় ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয় না৷ ভাটির দেশে কুলবধূরা বসন্ত রায়ের পূজায় পৌরোহিত্য করে থাকেন৷

মৎস্যদেব মাকাল ঠাকুর

সুন্দরবনের লৌকিক দেবদেবীর মধ্যে মাছের দেবতা মাকাল ঠাকুর সম্ভবত আদিমতম৷ মাকাল ঠাকুরের পুজো প্রবর্তনের সময় গ্রামীণ জনপদে মূর্তি পূজার প্রচলন হয়নি৷ হয়তো তাই মাটির স্তূপ তৈরী করে এখনো মাকাল ঠাকুরের পুজো করে জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ৷ মাকাল ঠাকুরের কোন মন্দির বা থান নেই৷ জেলেরা সুন্দরবনের নদীনালায় মাছ ধরতে যাবার আগে নদীর ধারে বা খাল পাড়ে কাঁচা মাটির স্তূপ আকারে মাকাল ঠাকুরের মূর্তি তেরী করে পুজো করে৷ মাকাল ঠাকুর সবচেয়ে প্রাচীন দেবতা হলেও এর নৈবেদ্যে যুক্ত হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া৷ আতপ চাল, কলা, বেল, এসবের অভাব ঘটলে ছোট বাচ্চাদের চকলেট দিয়ে পুজোর ভোগ দেওয়া হয়৷ মাকাল ঠাকুরের ঠিকমতো পূজো করলে অধিক মাছ জালে ধরা পড়ে বলে জেলে সম্প্রদায়ের স্থির বিশ্বাস৷ এই ঠাকুরের পুজোয় মাছের প্রাপ্তি ও পরিমাণ বাড়ে৷ সুন্দরবনের এই লৌকিক দেবতার রক্ষকের কোন ভূমিকা নেই৷

শিশুর দেবতা পাঁচু ঠাকুর

নিরক্ষরতার কারণে ও চিকিৎসার অভাবে সুন্দরবনাঞ্চলে শিশু মৃত্যুর অস্বাভাবিক হার ঠেকানোর দায় জনপদের গৃহস্থ শ্রমজীবী মানুষেরা পাঁচু ঠাকুরের ওপর দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকে৷ পাঁচু ঠাকুর সুন্দরবনের গ্রামীণ জনপদের সন্তান রক্ষক৷ পুরুষ লৌকিক দেবতা পাঁচু ঠাকুরের পাশাপাশি স্ত্রীদেবতা পাঁচি ঠাকুরাণিও কোন কোন মন্দির বা থানে অবস্থান করে৷ স্থানীয় মানুষ এই দুই দেবতাকে একযোগে পেঁচা-পেঁচি নামে সম্বোধন করে থাকে৷ বারবার মৃত সন্তানের গর্ভধারিনীও পাঁচু ঠাকুরের নামে মানত করে৷ দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলায় এখনো পাঁচু ঠাকুরের থানে নিয়মিত পূজো অর্চ্চনা হয়ে থাকে৷ বিভিন্ন তিথিতে এখানে মেলা পার্বণ হয়৷ পাঁচু ঠাকুরের মূর্তি সাদামাটা গোছের যাতে কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া দেখা যায় না৷ মন্দির ছাড়াও পুকুর পাড়ে, দিঘীর ধারে, বটতলা ও তালতলার খোলামেলা পরিবেশে পাঁচু ঠাকুরের অস্থায়ী পুজোর প্রচলন আছে৷ পারিবারিক পুজোয় পাঁচু ঠাকুরের নামে ঘট স্থাপন করে পুজোর ব্যবস্থা করা হয়৷ সন্তানসম্ভবা মা তার সন্তানের জন্য এই পাঁচু ঠাকুরের কাছে আগাম মানত করে থাকে৷ বিভিন্ন মন্দির বা থানে পাঁচু ঠাকুরের পুজোয় স্ত্রীলোকদের প্রাধান্য অতি মাত্রায় লক্ষ্য করা যায়৷

গো-দেবতা রাখাল ঠাকুর

বাড়ির মধ্যে বা উঠোনে নয়, কৃষ্ণরূপী রাখাল ঠাকুর মাঠের মধ্যিখানে খড়ের ছাউনির মাটির থানে পূজা পেয়ে থাকেন৷ গাভীর থেকে বেশি দুধ, বলদের সুস্থতা কামনা ও চাষবাসে বেশি কাজে লাগানোর জন্য এই রাখাল ঠাকুরের পুজোর চল৷ রাখাল ঠাকুর কোথাও কোথাও গোষ্ঠ ঠাকুর নামে পরিচিত৷ এই ঠাকুরের মূর্তি কৃষ্ণের মতো, হাতের আড়বাঁশি মুখে ধরা, তবে সঙ্গিনী রাধা অনুপস্থিত৷ সুন্দরবনের মাঠে প্রান্তরে গোচারণ ক্ষেত্র আর খুঁজে পাওয়া ভার৷ রাখাল বালকদের শিশু শ্রমের বন্দিদশা ঘুঁচেছে সর্বশিক্ষা মিশনের সৌজন্যে৷ শিক্ষার অধিকার আইন আর মিড ডে মিল বর্তমান কালের রাখাল বালকদের বিদ্যালয় অভিমুখী করেছে৷ লেখায় ও ছবিতেই রাখাল বালক থাকুক, রাখাল ঠাকুরের পুজোও চলুক৷ দেবনগর গ্রামে বৈশাখ মাসে রাখাল ঠাকুরের পুজো হয়৷ পুজো শেষে গাভী বলদ বাছুরের গলায় মালার মতো এক গাছি লাল সুতো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়৷ বাটা হলুদের রঙে শিঙ হলদে হয়ে যায়৷ দেবনগর পূর্বপাড়ার গ্রামবাসীদের রাখাল ঠাকুরের এই পুজো গোষ্ঠ পূজা নামে পরিচিত৷

অরণ্য রক্ষক আটেশ্বর

মল্লবেশী অমিত বিক্রমশালী লৌকিক দেবতা আটেশ্বর এর উদ্ভব সম্ভবত ‘আটন’ শব্দ থেকে৷ ‘আটন’’ কথাটির অর্থ সীমানা রক্ষক৷ সুন্দরবনের আরণ্যক পরিবেশে জনপদের কোনও সাহসী সুপুরুষ আটন ক্রমে লৌকিক দেবতায় রূপান্তরিত হয়েছেন যা তার মূর্তির মধ্যে সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়৷ কার্তিকের মতো সুমুখশ্রী মূর্তির ডান হাতে থাকে ছাটা মুগুর যা সুন্দরবনের বাউলে মউলেরা জঙ্গলে ঢোকার আগে তৈরী করে নেয়৷ গরাণ গর্জন গাছের তিন চার হাত লম্বা গোড়ার দিকটা কেটে নিয়ে শেকড় বাকড় পরিষ্কার করে দিলেও এবড়ো খেবড়ো মুগুরের মতো দেখতে লাগে৷ বনজীবী মানুষ একে বলে ছাটা মুগুর যা দিয়ে বাঘ বুনো শুয়োরের আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়৷ এই ছাটা মুগুর ডান হাতে নিয়ে ধুতি মালকোচা মেরে মাথায় পাগড়ি বাবরি চুলের আটেশ্বর ঠাকুরকে রীতিমতো মল্লযোদ্ধা মনে হয়৷ খাবার দাবারেও বাবা আটেশ্বর আমিশাষী৷ এর নৈবেদ্য তৈরী হয় সেদ্ধ ভাতের সঙ্গে একটা গোটা শোল মাছ পুড়িয়ে কলাপাতায় সাজিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে৷ পুজো শেষে নৈবেদ্য ঝোপঝাড়ের কাছে কোন নির্জন স্থানে দিয়ে চলে আসতে হয়৷ তখন পেছন ফিরে তাকানোর কোন নিয়ম নেই৷ নেশা ভাঙ করায় সুনাম আটেশ্বরের নামে গ্রামের প্রধানরা এখনো ছড়া কাটে—

‘জয় বাবা আটেশ্বর

হুকো ছেড়ে কলকে ধর৷’’

আদিম আরণ্যক দেবতা আটেশ্বর হয়তোবা কোন লোক চরিত্র যা ক্রমে তার কীর্তি ও কাজের মধ্য দিয়ে তাকে লৌকিক দেবতায় উপনীত করেছে৷

ব্যাঘ্রবাহিনী বিশালাক্ষী

পৌরাণিক দেবী বা শাস্ত্রীয় দেবী না হলেও সুন্দরবনের জঙ্গলে জননী বিশালাক্ষী প্রাচীন বৌদ্ধ দেবী৷ এই দেবীর সঙ্গে সুন্দরবনের অন্য কোনো লৌকিক দেবদেবীর কোনো ধরণের বিরোধ নেই৷ তাই জঙ্গল হাসিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশালাক্ষী মায়ের পূজার প্রসার সুন্দরবনের জঙ্গলমহলে বিস্তৃত হয়েছে৷ মউলে বাউলে জেলে সহ গ্রামীণ জনপদের সমস্ত শ্রেণীর মানুষের উপাস্য এই মা জননী বিশালাক্ষী৷ মা বিশালাক্ষীর পুজোর জন্য নির্দিষ্ট মন্দির আছে৷ দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলের দেবনগর গ্রামে বিশালাক্ষী মায়ের বড় মন্দির আছে৷ বৈশাখী পূর্ণিমায় বিশালাক্ষী দেবীর পূজা হয়৷ এই দেবী বাঘের উপর অধিষ্ঠাত্রী, চতুর্ভূজা৷ মা দুর্গার সঙ্গে পূজার উপাচার এর যেমন মিল তেমনই চন্ডী মঙ্গলের কীর্তন এই বিশালাক্ষী পূজার কয়দিন ধরে চলে৷ দেবনগরে এইসময় বড় মেলা বসে যায়৷ উৎসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে৷ উৎসব উপলক্ষে দশ বারো হাজার মানুষের সমাগম হয়৷ ব্যাঘ্রবাহিনী বিশালাক্ষী দেবী জঙ্গলের আশেপাশে গ্রাম গঞ্জের মানুষকে বাঘের হাত থেকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস৷ সুন্দরবনের এই লৌকিক দেবীকে অনেকেই তান্ত্রিক দেবী বলে মনে করে থাকেন৷ স্থানভেদে জঙ্গল জননী বিশালাক্ষীকে বাসুলী, বসুলী দেবী নামেও আরাধনা ও উপাসনা করা হয়৷

নাগদেবী মনসা ও অরন্ধন উৎসব

সর্পদেবী মনসার পুজো যেমন মন্দির বা থানে হয়, তেমনই ফনিমনসার ডাল এনে কাঁচা মাটির গোলায় স্থাপন করে দুধ কলা ঢেলে পারিবারিক মনসার পূজা সুন্দরবন অঞ্চলে বহুল প্রচলিত৷ সাপে ভর্তি সুন্দরবনের গ্রাম গঞ্জে মনসা দেবীর সার্বজনীন পূজা ও উৎসব উপলক্ষে মেলা প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়৷ তবে মন্দির থান বা সার্বজনীন পূজা হলেও ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে সুন্দরবনের ঘরে ঘরে মনসা পূজা হয় এবং পূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় অরন্ধন উৎসব যাকে গ্রামীণ জনপদে বলা হয় রান্না পূজা৷ তোলা উনুনে মাটি লেপে শুচিতার সঙ্গে মাটির হাঁড়িতে প্রথমে মনসার বাহন অষ্টনাগের জন্য আতপ চালের ভোগ রান্না করার পর ভাজাভুজি চিংড়ি ইলিশ পিঠে পুলি পায়েস সহ বহু পদের রান্না গ্রাম্য মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী করে থাকে৷ ওই দিন অবশ্য ওই সব খাবার দাবার নিষিদ্ধ৷ পরদিন সকালে উনুন পরিষ্কার করার পর উনুন পুজো করে, শাপলার মালা তৈরী করে ভোগের মাটির হাঁড়ির গলায় পরিয়ে, শাপলা পাতায় অষ্টনাগের উদ্দেশ্যে ওই ভোগ নৈবেদ্য নিবেদন করে তবে গতরাতের রান্না করা সব খাবার কলাপাতায় পান্তা ভাতের সঙ্গে সবাই বসে একসঙ্গে খায়৷ এদিন সারাদিন নিয়মমতো কোন রান্না বাড়ার কাজ চলবে না৷ তাই রান্না পূজার পরদিন অরন্ধন উৎসব৷ এই অরন্ধনের দিনে আত্মীয় স্বজন গরীব দুখীর একসঙ্গে আসা যাওয়াকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনে প্রতি পরিবারে রান্না পুজো যেন উৎসবের চেহারা নেয়৷ রান্না পূজা ও অরন্ধন উৎসব সুন্দরবনের গ্রামীণ নারীর কর্তৃত্ত্বে পালিত হয়৷

বড় খাঁ গাজী

সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষদের কাছে বনবিবি দক্ষিণ রায় ছাড়াও অন্যান্য লৌকিক দেবদেবীর স্থান বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য৷ তেমনই একজন বড় খাঁ গাজী৷ সুন্দরবনের সাধারণ মুসলমানদের মতো এই গাজীর মূর্তি বহু বছর ধরে প্রচলিত৷ গাজীর মূর্তিতে কোথাও পাজামা-পাঞ্জাবী, কোথাও লুঙ্গি-ঘাড়ে গামছা পোষাক হিসাবে লক্ষ্য করা যায়৷ তবে সব মূর্তিতে মুখ ভর্তি সাদা দাড়ি লক্ষ্যণীয়৷ আর এর পুজোয় লাগে বাতাসা পাটালী আতপ চালের সিন্নি যা সাধারণ মানুষদের কাছে অতটা দুর্লভ নয়৷ শুধু জঙ্গলের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া নয়, গ্রামীণ জনপদে পশুপাখিদের মঙ্গল কামনায়ও সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষ বড় খাঁ গাজীর কাছে মানত করে থাকে৷ বহু ব্যবহারে বর্ণ বিপর্যয় ঘটে ‘‘বড় খাঁ গাজী’’ এখন সাধারণ মানুষের মুখে ‘‘বড় কাছারি’’ হয়ে গেছে৷ পুজো বা মানত করতে গেলে মানুষে বলে ‘‘বড় কাছারি’’র থানে যাচ্ছে৷ বড় খাঁ গাজীর স্মরণে নিম্ন গাঙ্গেয় অঞ্চলের এই সুন্দরবন অঞ্চলে ‘গাজীর গান’ অর্থাৎ ‘গাজন’ হয়৷ শীত গ্রীষ্ম বসন্তে গ্রাম্য এলাকায় যে কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষে গ্রাম্য নিরক্ষর মানুষের চিত্ত বিনোদনে গাজীর গীতের আসর বসে যায়৷ সমসাময়িক কোন ঘটনা, নৌকাডুবি, পরকীয়া, বাঘে খাওয়া, জঙ্গলের বর্ণনা এসব গাজনের বিষয় হয়ে ওঠে৷ এখন সুদূর সুন্দরবনে দুরদর্শন চালু হয়ে যাওয়ায় এই গাজনের গুরুত্ব ক্রমশ কমছে৷ এই গাজন গান ও গাজন ভাটা এক নয়৷

বড় খাঁ গাজীর লৌকিক দেবতা হয়ে ওঠার পূর্বে তিনি ছিলেন একজন ইসলাম ধর্মের একনিষ্ঠ প্রচারক৷ ধর্মযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ায় তাঁর ‘‘গাজী’’ উপাধি প্রাপ্তি৷ কথিত সোনারপুর ও ব্রাহ্মণনগরের রাজার কন্যা চম্পাবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে রাজা মুকুট রায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় বড় খাঁ গাজী ওরফে বরখান গাজী৷ যুদ্ধে মুকুট রায়ের পরাজয় ঘটে৷ তখন ওই রাজা রানী ও তার কন্যা চম্পাবতীকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে ও রূপবতী রাজকন্যে চম্পাবতীকে বিয়ে করে ফেলে বড় খাঁ গাজী৷ এই সশস্ত্র যুদ্ধে প্রচুর সংখ্যক সৈন্য সামন্ত সহ মানুষের মৃত্যু হয়৷ ফলে ইসলাম ধর্মের প্রচারকরা সব সময় ভালোবেসে বা তার চরিত্রের মাধুর্যে ‘‘গাজী’’ উপাধি লাভ করেননি৷ বরং বেশীর ভাগ সময়ে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জোর করে নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভিন্ন ধর্মীয়দের ভীত সন্ত্রস্ত করে একজন ইসলাম প্রচারক ধর্মান্তরিত করার কাজটি করতেন৷ এসব কথিত কাহিনীর মধ্য দিয়ে একটি সত্য উঠে আসে যে এই বড় খাঁ গাজী লৌকিক দেবতা হিসাবে সাধারণ মানুষের কাছে পূজিত হলেও তিনি ছিলেন প্রাথমিক ভাবেই এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব৷ গৌড়ের সুলতান মতান্তরে বৈরাট নগরের সুলতান সেকেন্দার শাহ ও অজুফা সুন্দরীর দ্বিতীয় সন্তান এই বরখান গাজী মতান্তরে বড় খাঁ গাজী৷ এই গাজীর সর্বক্ষণের সহচর কালু ছিল অজুফা সুন্দরীর পালিত পুত্র৷ এই কালু ও কুমীর দেবতা কালু রায় এক ব্যক্তি নয়৷

ভাঙ্গড় পীর

মধ্য যুগীয় ইসলাম ধর্মের প্রচারক ভাঙ্গড় পীর সুন্দরবনের পীর গাজীদের তালিকায় এক পরিচিত নাম৷ বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগনার যে স্থানে এই পীর ঘাঁটি গেড়েছিলেন, সেই স্থান তাঁর নামানুসারে বর্তমানে ভাঙ্গড় নামে পরিচিত৷ বর্তমানে ভাঙ্গড় শুধুমাত্র একটা ব্লক বা থানা নয়, পশ্চিমবঙ্গের একটি বিধানসভা কেন্দ্রও বটে৷ ভাঙ্গড় এলাকায় ভাঙ্গড় পীরের পবিত্র মাজারে প্রতি বছর ষোলই চৈত্র মানুষের ঢল নামে৷ রাতে মেলা বসে৷ ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় সারারাত ধরেই চলে৷ কাওয়ালী, পিরালি, ফকিরি গান হয় পীরের মাজারে৷ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঐ রাতে ভাঙ্গড় পীরের মাজারে শিখন্ডিরাও প্রবেশাধিকার পায়৷ বর্তমানে ‘‘ভাঙ্গড়’’ অপভ্রংশ ও বর্ণ বিপর্যয় হয়ে ‘‘ভাঙড়’’ নামে পরিচিত হয়েছে৷

পশুদেবতা মানিক পীর

সুন্দরবন অঞ্চলে মানিক পীর নামের কোন ইসলাম ধর্মের প্রচারক কবিরাজি ও গাছ গাছড়ার ওষুধ প্রয়োগে পশুপাখির হেকিমি চিকিৎসায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন৷ পরবর্তীকালে তাঁর ধন্বন্তরী চিকিৎসা তাকে লৌকিক দেবতায় উন্নীত করে মানিক পীর নামে পরিচিতি দিয়েছে৷ বাংলা নববর্ষের দিনে তাই মানিক পীরের নাম স্মরণ করে গরু বাছুরদের শিঙে হলুদ ও তেল মাখিয়ে পুকুরে গা ধোয়ানো হয়৷ এই উপলক্ষে গোয়াল ঘরে গোবর চোনা পরিষ্কার করে ঈশান কোণে ক্ষীর নৈবেদ্য নিবেদন করে মানিক পীরের পূজা করা হয়৷

জনপদ জননী বিবিমা

জাতি ধর্ম সম্প্রদায়ের গন্ডি ছাড়িয়ে ভক্তি ও ভালোবাসার জন্য খ্যাত গ্রাম জননী বিবিমা৷ এই লৌকিক দেবী একজন নয়, কোথাও সাতজন, আবার কোথাও নয় জন বিবিমা৷ এদের মধ্যে বড় জনা ওলা বিবি৷ ওলাউঠা’র অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসাবে সুপরিচিতা এই ওলা বিবি৷ আর অন্য বিবিমারা হলেন ঝোলা বিবি, আজগৈ বিবি, চাঁদ বিবি, বাহড় বিবি, ঝেটুনে বিবি এবং আসান বিবি৷ ঝোলা বিবি হাম বসন্ত এসব রোগের দেবী৷ এই সাতজন বিবিমার সঙ্গে আরো একজন আছেন যার নাম মড়ি বিবি, যিনি জ্বর বিকার প্রভৃতির নাশের এক লৌকিক দেবী৷ মাটি বা সিমেন্ট-বালির স্তুপ বানিয়ে এই বিবিমাদের পুজো প্রতি মঙ্গল শনিবারে হয়ে থাকে৷ বিবিমাদের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য পালা গান আছে৷ বেশ কিছু গায়েন ও বায়েন বিবিমার পালাগানের ঐতিহ্য এই দুরদর্শনের সস্তা বিনোদনের যুগেও ধরে রেখেছেন৷ সুন্দরবনের গ্রাম গঞ্জের মানুষ মাটির উপরে বিছানো তেরপলে বসে হ্যাজাকের আলোয় সারারাত ধরে ভক্তি ভরে শোনে বিবিমার মাহাত্মের কথা কাহিনী ও পালা গান৷ বিবিমা সুন্দরবনের জনপদে ক্রমে বিবিমাতায় রূপান্তরিত হয়েছেন৷

ধামুয়া ষ্টেশন থেকে নেমে আলিদা গ্রামে বিবিমাতার মন্দিরের মধ্যে বিবিমাতার মূর্তির সাথে একই উচ্চতায় ছোটোখাটো পাথরের তৈরী একটা মসজিদের অবস্থান বিস্ময় সৃষ্টি করে৷ সুন্দরবনের লৌকিক দেবদেবীর উপর বিভিন্ন যুগে শাসককুলের প্রভাব বিষয়ে ধারণা স্পষ্টতর হয়ে ওঠে৷ ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে জঙ্গলের দেবী বনচন্ডী ক্রমে মুসলিম শাসনের সময় বনবিবি রূপে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে পূজিত হতো৷ সুন্দরবনে বনবিবির এখনো সর্বত্র পূজা হয়ে থাকে৷ সুন্দরবন অঞ্চলের জঙ্গল উধাও হয়ে যাওয়া এলাকায় বনবিবির ‘বন’ লুপ্ত ও ভক্তিরূপে ‘মাতা’ যুক্ত হওয়ায় ‘বনবিবি’ ক্রমে কালে কালে ‘বিবিমাতা’ নামে ভাটির দেশের লৌকিক দেবী রূপে পরিচিত পেয়েছে৷

শস্যদেবী টুসু

সুন্দরবনে উর্বরা শক্তির লৌকিক দেবীরূপে পূজিতা হন টুসু৷ আদিবাসী ও ভূমিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে টুসু দেবীর পূজা উল্লেখযোগ্য৷ তাই টুসু শুধু সুন্দরবন অঞ্চলে নয়, পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী প্রধান অঞ্চলেরও লৌকিক দেবী৷ টুসু আদিবাসী সমাজে লক্ষ্মী রূপে সমাদৃতা৷ মূর্তি পূজার চল রয়েছে টুসুর ৷ গায়ের রঙ ফর্সা, মাথায় মুকুট, হাতে পদ্ম, মনিবন্ধে গলায় কানে সোনালী অলংকারে ভূষিতা টুসু গ্রামে গঞ্জে শস্যের পরিপূর্ণতার প্রতীক বলে আদিবাসিদের বিশ্বাস৷ টুসু সুন্দরবন অঞ্চলে কেবলমাত্র দেবী হিসাবে পূজিতা নন, আদিবাসিদের ঘরের মেয়ে রূপেও সমাদৃত৷ টুসুর মাহাত্ম কীর্তনে তার প্রতিফলন ঘটে৷

‘‘আলু রুইলাম সারি সারি

বেগুন রুইলাম দুই বাড়ি

বেছে বেছে তুলবো বেগুন

কাল যাবো বাপের বাড়ি৷৷

বাপের বাড়ি যাবে টুসু

আনতে যাবে নীলমণি,

আসার বেলায় আসবে টুসু

কেঁদনা মা জননী৷৷’’

টুসু প্রাচীন দেবতা৷ সুন্দরবনে জঙ্গল কাটাই-এর সময় কোল ভীল মুন্ডা ওঁরাও শ্রেণীর আদিবাসীদের আগমনে সুন্দরবনে টুসু পূজার চল হয়েছিল৷ পৌষমাসের ধান ঘরে উঠলে টুসু পূজার ধূম পড়ে যায়৷ তাই টুসু পূজা আর নবান্ন উৎসব সমার্থক৷ আদিবাসী সমাজে টুসু পূজায় হাঁস বলির প্রচলন রয়েছে৷

বেনাকী

এই শস্যদেবীর কোন মূর্তি, থান, মন্দির কোন কিছুই নেই৷ ধানের শিস পাকলে অঘ্রাণ মাসে মাঠের ঈশান কোণে দু ফুট বাই দু ফুট আল পরিষ্কার করে বেনাকী ঠাকুরের পূজা হয়৷ কাদা দিয়ে ওপরে দু’হাত নীচে দু’পা করে মাটিতে শোয়ানো গোসাপের মতো মূর্তি তৈরি করা হয়৷ তবে গোসাপের মতো লেজ থাকে না৷ বেনাকীর পূজা দিয়ে ধানকাটার কাজ শুরু করে সুন্দরবনের কৃষক৷ অঘ্রাণের শেষের দিকে অবশ্যই বৃহস্পতিবারে বছরে একবারই ধানের ক্ষেতে বেনাকী পূজা হয়ে থাকে৷ বেনাকী টুসুর মতো শস্য দেবী৷

জ্বরাসুর

সুন্দরবন অঞ্চলে কোথাও কোথাও জ্বরনাশক লৌকিক দেবতা জ্বরাসুরের পূজার প্রচলন আছে৷ যদিও জ্বরাসুর জাতে অসুর৷ অদ্ভুত দর্শন জ্বরাসুরের গায়ের রঙ ঘন নীল, এর তিন মাথা, তিন পা, ছয় হাত, নয় চোখ৷ কখনো মা শীতলার থানে, কখনোবা বনবিবি, দক্ষিণ রায়, কালু রায়ের সঙ্গে জ্বরাসুর পূজিত হয়৷ তবে জ্বরাসুরের মূর্তি পূজার প্রচলন খুব কমই চোখে পড়ে৷

প্রাচীনকাল থেকে একথা প্রচলিত ও অনুমোদিত—মানুষই দেবতা গড়ে৷ সুন্দরবনের ভাটির দেশ তার ব্যতিক্রম নয়৷ মানুষ বা মানুষী, হিন্দু বা মুসলমানী যে যখন সহায় সম্বলহীন মানুষের উপকারে এসেছে, সেই দেবতা বনে গেছে এবং সেই লৌকিক দেবদেবীদের প্রচার চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম৷ মানুষ থেকে পরিবর্তিত এই দেবদেবীরা প্রকৃতিতে অতি সাধারণ৷ তাদের কাজ বা মানুষের প্রতি উপকার জঙ্গল বা জঙ্গল ঘেঁষা সমাজের বাইরের কোনো প্রয়োজনের কথা ভেবে নয়৷ সুন্দরবনের লৌকিক দেবদেবীর কোন স্বর্গীয় মাদকতা নেই৷ এরা দেবতা অথচ অলৌকিক নয়৷

ইতিহাসের ছোট একটা অধ্যায় প্রামাণ্য সহকারে পেশ করি৷ নবম শতাব্দীতে মগ ঠগ বর্গীদের ঠেঙ্গিয়ে ভাটির দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে তার রাজধানীতে ফিরে যান মহারাজ জয়ন্তচন্দ্র৷ ফিরে যাওয়ার পূর্বে মণি নদীর তটে তাঁর আগমন ও বিজয়বার্তা, অথবা রাজ্যজয়ের সীমানা একটি বিরাট স্তম্ভাকারে ৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপন করে যান৷ একথা একটি তাম্রশাসনে তিনি লিপিবদ্ধ করে দিয়েছিলেন যা পরে পাওয়া যায়৷ মহারাজ জয়ন্তচন্দ্র যদি ফিরে না যেতেন এবং ভাটির দেশের মানুষদের আরো সুশাসন দিতেন, তাহলে হয়তো জয়ন্তচন্দ্র নামে কোন লৌকিক দেবতার আবির্ভাব ঘটতেই পারতো৷ যদিও এমন ধারণা আমার ব্যক্তিগত অনুমান মাত্র৷ তবে সুন্দরবনের অন্ত্যজ নিম্নবর্ণের মানুষদের সুশাসক, উপকারী, মহৎ, বীর যোদ্ধা মানুষদেরই পূজা করে দেবতা বানাতে বাধ্য হতে হতো৷ কারণ নিম্নবর্ণের মানুষদের বৈদিক শাস্ত্রীয় দেবদেবীদের পূজা করার কোনো অধিকার ছিল না৷

সুন্দরবনের বিভিন্ন লৌকিক দেব-দেবীর পূজা, থান, আখ্যান, মহিমা কীর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পুরুষ দেবতার মধ্যে শিবঠাকুর মূলত মুখ্য দেবতা৷ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর-এই ত্রয়ীর মধ্যে কলকে পায় কেবল শিবঠাকুর৷ এই শিবঠাকুর বেশ কিছু লৌকিক দেবতাকে গিলে ফেলেছে কথাটি বোধ হয় তাই অত্যুক্তি নয়৷ শিবরূপে বাবা পঞ্চানন্দ পূজিত, গাজন ভাটায় শিবঠাকুরের গান দিয়ে আসর বন্দনা হয়ে থাকে৷ শিবঠাকুর তাই লৌকিক দেবতাদের ক্রম-বিলুপ্তির পথে অনবদ্য এক চরিত্র৷ সুন্দরবনের মানুষের কাছে এই শিবঠাকুর সুন্দরবন সহ দক্ষিণবঙ্গের জগৎপিতা, জগৎপালক ও সকল দেবদেবতার প্রকাশ৷ বহু লৌকিক দেবতার তাই কালের কষ্টি পাথরে এই শিবঠাকুরের কাছে তাদের অস্তিত্বের বিনাশ ঘটেছে৷

সুন্দরবনের লোকসমাজ ও গ্রামীণ জনপদে লৌকিক দেবদেবীর প্রধানত ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে উত্তরণ ঘটেছে৷ কেবলমাত্র বনবিবির হয়েছে সামাজিক উত্তরণ৷ নিম্মবর্ণীয় হিন্দুদের আরাধ্যা প্রাচীন বনদুর্গা মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাবে বনবিবিতে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমানে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের পূজা পায়৷ তাছাড়া দক্ষিণ রায়, আটেশ্বর, বড় খাঁ গাজী, কালু রায়, ভাঙ্গড় পীর এরা সবাই ঐতিহাসিক চরিত্র যাদের অমিত বিক্রম অথবা অত্যাচার ও পরে সেবা সহায়তা ও সংস্কারে বিশেষ ভূমিকার জন্য সুন্দরবনের নিরক্ষর বা স্বল্প শিক্ষিত মানুষের কাছে ভয়ে বা শ্রদ্ধায় লৌকিক দেবদেবীর আসন পেয়েছে৷ এই লৌকিক দেবদেবীদের পূজো অর্চ্চনা করে জঙ্গল লাগোয়া মানুষ যেমন হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের থেকে নিরাপত্তা পাওয়ায় বিশ্বাস করে, তেমনই এদের পুজো করে পাওয়া অধিক রুপোলী ফসল, মাছ, কাঁকড়া বিক্রি করে তার ঘরের কোঁকড়া চুলের ছোট্ট ছেলেটি পেট পুরে পান্তাভাত পাবে এ বিশ্বাসটুকুও অতি অল্পে আশ মেটা এই বনজীবী ও জলজীবী মানুষদের আছে৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%