গৌতমকুমার দাস
সুন্দরবন থেকে বহু রকমের লোকে দৈনিক কলকাতায় আসে যাদের হিসেব নিকেষ খুঁজে পাওয়া ভার৷ এরা ভোর বেলায় কলকাতায় আসে, বিকেল সন্ধে কিংবা রাতে ঘরে ফেরে৷ কলকাতায় থাকে না ঠিকই, তবে এরা ছাড়া কলকাতা প্রায় অচল৷ সরল সাদাসিধে, চালাক চতুর, বোম্বেটে বাটপেড়েসহ প্রায় সব রকমফেরের চরিত্রেই এই বহিরাগতদের মিলেজুলে উপস্থিতি কলকাতার জৌলুস বাড়িয়ে তোলে৷ সকাল সকাল কলকাতা চঞ্চল হয়ে ওঠে ওরা এলে৷ ওদের কেউ কেউ সকালে বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বা দুধ দেয়, কেউ চায়ের দোকানে কয়লার উনুন জ্বালায়, কেউ বাজারে চট পেতে বা কলাপাতা বিছিয়ে মাছ সব্জির পসরা সাজায়, কেউবা মুরগী পাঁঠাকে শেষ বারের মতো খাইয়ে দাইয়ে চাকু শান দেয়৷ বাকিরা ধাপে ধাপে কলকাতায় ঢুকে পড়ে৷ তারা জোগানদার, রঙ প্লাস্টারের মিস্ত্রি, ভাতের হোটেলের রাঁধুনী, ঘর গেরস্থালীর ঠিকে কাজের লোক, ঝালমুড়ি ঘুঘনির দোকান সহ আরো বহু ধরণের মানুষ৷ কলকাতাকে ভালোবাসে কিনা মুখ ফুটে বলে না, তবে কলকাতা এদের রুজি রুটির জোগান দেয়৷ প্রায় তিনশ বছর আগেও যখন কুশারি-রা ঠাকুর পরিবার নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে নি, তখনও ছিল এদের আনাগোনা৷ ওর বহিরাগত বটে, তবে একালে নির্বাচনের সময় কলকাতায় ঢুকে পড়া বহিরাগতদের সঙ্গে এদের গুলিয়ে ফেলে বহিরাগত তকমা দিয়ে এদের সম্মানহানির কোন কারণ দেখি না৷ এরা কলকাতার বড় আপন, এক প্রকার অনাহৃত আত্মীয়৷
এই যেমন দীনু৷ ধীর, শান্ত, মিতবাক৷ নিতি হলি ওপর থেকেই নাও, কপি গুলান ঘেঁটে দিওনি-খুব বিরক্ত হলে দীনু বলে৷ দীনুর দোকানে ট্যারা বেঁকা পোকা লাগা দুমড়ে যাওয়া সব্জির বালাই নেই৷ যদি ভাঙ্গাচোরা ঝিঙে পটল দু’চার পিস থাকে তো দীনু আগেভাগেই আলাদা করে পিছনের দিকে আড়ালে রেখে দেয়৷ ওসব বেলায় বিক্রি হয়৷ কোনো সব্জি তার পড়ে থাকে না৷ বর ছেলে মেয়েকে খাইয়ে দাইয়ে অফিস স্কুল কলেজে পাঠিয়ে মাঝবয়সী বৌদিরা কম পয়সায় বাজার সারতে আসে বেলা এগারোটার পর৷ ওরা অবশ্য দীনুকে পায় না৷ দীনু ততক্ষণে ক্যানিং লোকাল ধরার জন্য স্টেশনে পৌঁছে যায়৷ ঘুটিয়ারি শরীফ স্টেশনে নেমে মেশিন ভ্যানে দশ মিনিট পথ পেরিয়ে হোমরাপলতায় তার বাড়ি৷ দীনুর পয়স কত বোঝা যায় না৷ অথচ ও দাদু হয়ে গেছে গত আষাঢ়ে৷ ওকে দীনুবাবু বলে ডাকি৷ ওই ডাক শুনে ক্রেতা পক্ষের কেউ কেউ তাচ্ছিল্য করে বলে, এই বাবু শুনে দীনু ইচ্ছে মতো সব্জির দাম চড়ায়৷ তবু গড়ফা বাজারে এত সব্জির দোকান থাকতে সেই সুবেশী ভদ্রলোকেরা কেন যে দীনুর দোকান থেকে সব্জি কিনে ব্যাগ বোঝাই করে, তা তারাই জানেন৷
অন্য এক বহিরাগত মানিক৷ লাজুক, মুখচোরা গোছের এমনই মানিক একবার বেশ ঝামেলা পাকিয়েছিল৷ এক সন্ধেয় ক্লাবে ঢুকে জয়ন্তদার চিৎকার চেঁচামেচিতে আড্ডারত ক্লাবের সদস্যরা একেবারেই চুপ৷ হাওড়া ট্রেজারির এককালের খাজাঞ্চি জয়ন্ত মুখার্জির দেড় কুইন্ট্যাল বপুর সঙ্গে তার বাজখাই গলা চড়ালে বয়সে তার সিনিয়র অরুণ দাশগুপ্ত, নির্মল চৌধুরী-রাও থম মেরে যায়৷ জয়ন্তদার রোষানলে জল ঢেলে শান্ত করার কাজটা করার পর জিজ্ঞাসা করি, কি হয়েছে জয়ন্তদা? জয়ন্তদা রিক্সাওয়ালা মানিককে দেখিয়ে বলে, ওইটার জন্য আমার সংসারে আগুন লেগে গেছে রে-তোকে আর কি বলি৷ বেতবেড়িয়া ঘোলার রফিক, আর যাদবপুর স্টেশনে নেমে একই লোকের রিক্সার হ্যান্ডেল ধরা মানিকের চরিত্তির কি আর ভালো হয়— তুই বল৷ তখন বলি, আসল ঘটনাটা কি বলবেন তো? তাহলে শোন-ঠিক সন্ধে সাতটা বেজে দশে মানিক বাড়ির তলা থেকে আমাকে নিয়ে তার রিক্সা চালানো শুরু করে৷ তারপর ঘুর পথে যাই খাল পাড়ে৷ যাতে নির্মল অরুণ বুলগানিন গোদো ব্যাঙ্গা চরণ পটলারা দেখে না ফেলে৷ তারপর তুই বিশ্বাস কর, এই তোর গা ছুঁয়ে বলছি, একটা করে বেগুনি, ফুলুড়ি, আলুর চপ আর পেঁয়াজি কিনি৷ এই সিডিউলের বেশি আমি কোনোদিন খাই না৷ আমি চারটে খাই৷ আরো দুটো চপ ফুলুড়ি কিনে মানিককে দিই৷ বাড়ির কেউ যাতে চপ ফুলুড়ি খাওয়ার কথা জানতে না পারে তার জন্য মানিকটাকে পইপই করে বুঝিয়েছি৷ তবু তোর বৌদির সামনে হতভাগাটা সব বলেই দিল৷ মানিক ততক্ষণে মুখ কাঁচুমাচু করে রিক্সা বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ক্লাবের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে৷ ওকে দেখেই জয়ন্তদার ফের ধমক-তুই আমার খাবি, আর বাড়িতে তোর বৌদিকে বলে দিবি? মানিক কোন রকমে বলে, কি করব বৌদি যে ভাবে চোখ কটমট করে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তাতে—৷ জয়ন্তদার আবার ধমক, তোর বৌদির চোখ দেখে আমার ঘাবড়ানোর কথা, তুই খামোকা ঘাবড়াতে গেলি কেন? তুই তো ঘোলা বেতবেড়িয়ার গাছে চড়িস, মাঝে ট্রেনে চড়িস, আর যাদবপুরে নেমে নাম বদলে রিক্সায় চড়িস৷ তুই সকাল থেকে সন্ধে জীবন জুড়ে লড়িস৷ সামান্য এই লড়াইটুকু লড়তে পারলি না—এই বলে জয়ন্ত দা তখনো মুঠোয় ধরে থাকা ঠোঙার দুটি মোচার চপ আর ফুলুড়ি মানিককেই দিয়ে দিলেন৷ জয়ন্তদাকে এই প্রথম নিজেকে বাদ দিয়ে লড়িয়ের শংসাপত্র যাকে দিতে দেখলাম— সে মানিক৷
বাজারে দশ টাকার কলা নিয়ে একশো টাকার ভাঙানি দেওয়ার সময় অসাবধানে পালান ছাটাইয়ের বুক পকেট থেকে সব টাকা কলার ছড়ার উপর ছড়িয়ে যায়৷ টাকা পড়ে যেতে বলে উঠি, যা, আপনার সময় নষ্ট করে দিলাম৷ শুনে পালানবাবুর উত্তর, টাকা গোনাও একটা কাজ৷ থতমত খেয়ে যাই এমন দার্শনিক উত্তরে৷ পালানবাবুকে কখনো তার কলা বিক্রির জন্য হাঁকডাক করতে দেখি নি৷ লুঙ্গির উপর জামা একটা পরে থাকেন বটে, তবে তার বোতাম একটাও নেই৷ ভোলে ভালা স্বভাবের দৈনিক কলকাতায় এসে কলাবেচা পালানবাবুর টাকার উপর লোভ কখনো চোখে পড়েনি৷ আর তার টাকা আছে তা দেখানোর জন্য পালানবাবুর টাকা গোছানো বা গোনার কোন মানে দেখি না৷ অতি সাধারণ পালান ছাটুইয়ের বিপণনের বস্তু কলা বা কমলা কেনার সময় খালি হয়ে গেলেও শহুরে হিসেবি লোকেদের ছাপিয়ে পালানবাবুরাই কেবল বলতে পারে— টাকা কামানো নয়, গোছানোও একটা কাজ৷
বচন রঙের মিস্ত্রি, কুরপার কাছে সকাল ন’টায় এসে নাম লেখায়৷ কুরপা কাজ ধরে৷ আর বচনের মতো আট দশজন তালদি থেকে এসে কুরপার ধরা কাজ তুলে দেয়৷ বাড়িতে একবার রঙ করাতে হচ্ছে৷ কুরপা কাজ ধরেছে৷ বচন সহ আরো তিনজন কাজে লেগেছ৷ বচন মিশুকে, রঙের কাজ চলতে চলতে মাঝে সাঝে গাজনের গান ধরে৷ দশটা থেকে চারটে পর্যন্ত ওরা টানা কাজ করে৷ মাঝে পার্টি অফিস লাগোয়া গোপালের হোটেলে খেয়ে আসে৷ ওরা ভাত খাওয়ার কথা বলে না৷ বলেটিফিন করতে যাচ্ছে৷ গেটের চাবি নিয়ে গেট খুলে যায়৷ গেটের একটা চাবি ওদের কাছেই থাকে৷ বাড়িতে তিনজনের জন্য তিনটে গেটের চাবি৷ অতএব একটা চাবি দিলে অসুবিধার কোন কারণ নেই৷ চার পাঁচ দিনে কাজ শেষ হবার পর বচনরা চলে যায়৷ কিন্তু বচনদের দেওয়া চাবির হদিশ নেই৷ বাড়ির সব জায়গায় খুঁজে চাবি আর পাওয়া যায় না৷ বাড়ির অন্যরা গাজন-গাইয়ে বচনকে সন্দেহ করে৷ কুরপা কে বলা হয়৷ কুরপা বলে, বচন-রা এমন কাজ করবে বিশ্বাস হয় না৷ আমারও তেমনই মনে হয়৷ কুরপার কথায় বচন একদিন এসে কাঁচুমাচু মুখে বলে, চাবি কিন্তু বাড়ির ভেতরই আছে৷ সত্যিই দুদিন পর দোতলার বারান্দায় যাওয়ার দরজার মাথায় আংটা থেকে ঝোলা চাবি চোখে পড়ে৷ বচনের সততা কলকাতা বাসীর সন্দেহের উপর লজ্জার শিহরণের দাগ রেখে যায়৷
বাজারে কাঁদনদার চায়ের দোকান৷ বাড়ি কইখালি৷ বামুনের ছেলে৷ সাদা ধুতি, খালি গা, কাঁধে একটা লাল গামছা৷ শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় কাঁদনদার একই পোষাক৷ কেবল লক্ষ্মী সরস্বতী বিশ্বকর্মা পুজোয় কাঁদনদাকে একটা নামাবলী গায়ে চাপিয়ে পুজোর পুরুতগিরি করতে দেখা যায়৷ এই কাঁদনদার চায়ের দোকানে নিয়ম শৃঙ্খলার কড়া আইন চলত৷ ছোটখাটো বাম-ডান মার্কা পাড়ার নেতাদের রাজনীতির কচকচানি শুরু হলে কাঁদনদা প্রথমে ভদ্রভাবে বারণ করে থামাতে চাইত৷ তাতে কাজ না হলে ছাপার অযোগ্য শব্দবাণ প্রয়োগে সব কটি ঠান্ডা মেরে যেত৷ কাঁদনদার বয়স কত জিজ্ঞাসা করা হয় নি৷ তার মাথার চুল দাড়ি সবই ধবধবে সাদা৷ সংসার করেনি৷ তার পাড়াতুতো বোন গীতাদিও তাই৷ গীতাদি হেল্পার৷ কাঁদনদাকে এক শীতের সকালে খালি গায়ে চা বানাতে দেখে জিজ্ঞাসা করি, শীত করছে না কাঁদনদা? মুচকি হেসে কাঁদনদার উত্তর— শিবের প্রসাদি জল খালি পেটে পড়লে শীত বাবার চরণে আশ্রয় নেয়৷ শিবের প্রসাদি জলের নিত্য সেবায় কাঁদনদা একদিন কাউকে আগাম না জানিয়েই শিবধামে যাত্রা করলেন৷ অবশ্য শেষদিকটায় কাঁদনদা কালিকাপুরের মন্ডলপাড়ায় ভাড়া বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে কলকাতায় বহিরাগত তকমা মুছে কলকাতাবাসী হয়ে গেছিলেন৷ ছবি হওয়ার পর দোকানে টাঙানো ছবির তলার লেখা কাঁদনদার পোশাকি নাম পড়ে দেখি— মৃত্যুঞ্জয় গাঙ্গুলী৷
কলকাতায় আসা যাওয়া ও করেকম্মে খাওয়ার মাঝে বহিরাগতদের মধ্যে কেউ কেউ কলকাতায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে দেয়৷ কলকাতা তখন এদের চেনা জানা৷ রুজি রোজগারের জটিল আবর্ত তখন হাতের মুঠোয়৷ এরা খালপাড়ে বা রেললাইনের ধারে ঝুপড়ি বাঁধে৷ একজন ঝুপড়ি বাঁধলে সেখানে ক্রমে সার সার ঝুপড়ি গজিয়ে ওঠে৷ বসতি হয় বস্তি৷ বাড়ির বউ বাবুদের বাড়ির বাসন মাজা, ঘর মোছা অথবা রান্নার কাজ ধরে নেয়৷ মরদের সব্জি, মাছ কিংবা চায়ের দোকান৷ তেলে ভাজা বা সন্ধ্যেয় খালপাড়ে অস্থায়ী চোলাই-এর ঠেক গড়ে তুলতে পারলে তো সোনায় সোহাগা৷ বেশ কামাই৷ কোঁচড়ে কাঁচা টাকা৷ ঝুপড়ির ভিতর আসে কালারটিভি৷ গভীর রাতে সেইটিভিতে চলে অশ্লীল ছবি৷ কখনোবা ঝুপড়ির মধ্যে যৌনতাও পথ খুঁজে নেয়৷ তারপর কলকাতাবাসী কোন এক ফ্ল্যাট-বাবুর পরামর্শে জাতে ওঠার চেষ্টা চলে৷ আলিপুরের জজকোর্টে এফিডেবিট (ওরা বলে এপিঠ ওপিঠ) করে মন্ডল হয়ে যায় মিত্র, মুন্ডা হয় মন্ডল, শিট হয় শেঠ অথবা মাহাতো হয় মহাপাত্র বা মিত্র৷ ক্রমে পার্টির দাদার সৌজন্যে রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, অটোর লাইসেন্স৷ বহিরাগত তকমা ঘুঁচিয়ে ওরা তখন কলকাতা দাপিয়ে বেড়ায়৷ হয় কলকাতাবাসী৷ শোনা যায়, কলকাতার জল যার একবার পেটে পড়ে, সে আর কিছু না হোক পরমানন্দ কলকাত্তাইয়া হয়ে যায়৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন