গৌতমকুমার দাস
‘যারে সইতে নারি তার চলন বাঁকা’৷ প্রচলিত কথা৷ সাপেরও চলন বাঁকা৷ সর্পিল গতি দেখলেই গা হাত পা শিরশির করে ওঠে৷ তাই সাপকে কেউ পোষ মানানোর চেষ্টা করে না৷ পোষ মানানো দূরের কথা, কেউ কেউ সাপের নাম পর্যন্ত নেয় না৷ হান্টার সাহেবও তাই নেয়নি৷ অত বড় আই সি এস পাশ ইংরেজ সাহেব ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার৷ ইংরেজ আমলে ব্রিটিশ ভারতে পরিসংখ্যানের সর্বময় কর্তা৷ নামের মধ্যেই যার শিকারী শিকারী (হান্টার) গন্ধ৷ তিনি কিনা সর্বপ্রথম সুন্দরবন নিয়ে লেখা তাঁর বইতে (এ স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গল— সুন্দরবনস) ‘স্নেকস’ কথাটি লিখলেনই না৷ বদলে ‘সারপেন্টস’ কথাটি লিখলেন৷ সারপেন্ট কথাটির অর্থ সাপ যেমন হয়, তেমনি ঈশ্বর বৈরী শয়তানও হয়৷ সারপেন্ট কথাটি লিখে হান্টার সাহেব বাঙালীদের কি বার্তা দিতে চেয়েছিলেন তা জানা নেই৷ তবে এটুকু অন্তত বোঝা গেছিল যে সাহেবরা সাপে সংস্কারমনা৷
‘সেই সাপ জ্যান্ত, গোটা দুই আনতো’৷ লাইনটা কার লেখা আমার ঠাকুমাও জানে৷ আর যাদের জ্যান্ত ধরে আনা যায়, তারা তো আপাত নিরীহ জীব৷ কিন্তু গোটা দুই জ্যান্ত কেন, মৃত সাপকেও পাশ কাটিয়ে গেছেন এক সারস্বত সাহেব৷ তিনি এল.এস.এস.ও’ ম্যালি সাহেব৷ এদেশে আধুনিক গেজেটিয়ারের স্রষ্টা বলা হয় তাকে৷ ২৪ পরগনা জেলার উপর সুললিত ভাষায় লেখা সুন্দরবনের আস্ত একটা পরিচ্ছেদে বর্তমানে অবলুপ্ত গন্ডার, বুনো মোষ, হাতি সহ সবাই স্থান পেয়েছে৷ এমনকি বাঘ কুমীর কামট পাখির কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ কিন্তু সাপ ব্যাঙের কথা কোথাও লেখা নেই৷ বনে জঙ্গলে জ্যান্ত সাপ দেখে সাহেব ঘাবড়ে গেছিলেন কিনা কে জানে! তখনকার সাপ তো! লম্বায় দেড়া, খসখসে নয়তো বা তেলতেলে কালো, তিলক কাটা ফণার কত শত বাহারি সাপ৷ সেকালে মানুষের খাদ্যাভাব থাকলেও মা মনসার বাহনদের দুধ কলায় অন্তত ভেজাল থাকার কথা নয়৷ সাহেবদের সাপে এমন অনীহা থাকায় সাপ মারায় সরকার থেকে কোনো পুরস্কার বরাদ্দ ছিল না৷ বাঘ মারলে কিন্তু হাতে হাতে দশ টাকা পুরস্কার৷ পুরস্কার পরে বেড়ে জঙ্গলে মারলে বাঘের মাথা পিছু পঞ্চাশ টাকা আর জনপদে পঁচিশ৷ ঠিক একশ বছর আগের রেট পঞ্চাশ টাকা খুব খারাপ না৷ অবশ্য বাজারে তখন বাঘের চামড়ার এতটা চড়া দাম ছিল না৷ নইলে সাহেবরাই সব বাঘ খতম করে চামড়ার দাম সহ পুরস্কারটাও পকেটে পুরতো৷ সিপাইদের বিদ্রোহ ঠান্ডা করে দেওয়া ইংরেজদের কাছে বাঘ মারা সে আর এমন কি দুঃসাধ্য কাজ!

বাইন গাছে অজগর
সাপ কান্ডে সাহেবরা কিন্তু পিছু হঠা এক জাত৷ অন্তত এই একটা জায়গায় বেশ কয়েকজন বাঙালীর কাছে সাহেবরা পিছিয়ে আছেন৷ তেমনই এক বাঘের ব্যাটা বাঙালীর নাম সতীশ চন্দ্র মিত্র৷ যশোর খুলনার ইতিহাস প্রণেতা সতীশবাবু শুধু সুন্দরবনের জঙ্গলের সাপ নয়, জঙ্গল ঘেঁষা জনপদের বহু সাপের বিচিত্র বর্ণনায় পাঠককে মুগ্ধ করেছেন৷ দিশি বাঙালী সতীশবাবু কতরকমের যে বিষাক্ত স্বদেশী সাপের উল্লেখ করেছেন, তা বলতে গেলে স্বতন্ত্র একটি রচনার প্রয়োজন৷ শুধু কেউটের রকমসকমই আট প্রকার— ‘কাল কেউটা (আকারে ছোট, চোখ লাল বর্ণ, রঙ কালো), আ’ল কেউটা (নীল বর্ণ), তেতুলিয়া কেউটা (লাল বর্ণ, জল বোড়া সাপের মতো), ঘিতে ভাঙা বা শামুক ভাঙা, পদ্ম কেউটা বা তারা ফুটকী (মাথায় পদ্ম সুস্পষ্ট দেখা যায়), বাঁশ বুনো কেউটা (শাদা শাদা ডোরা), দু’ধে খরিষ (শাদার উপর শাদা পদ্ম) এবং খ’য়ে কেউটা’৷ সতীশবাবু শঙ্খচূড় সাপ সুন্দরবনে দেখেছিলেন এবং এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন— ‘হরিদ্রাভ, সর্বাপেক্ষা সাংঘাতিক’৷ নাগশ্রেষ্ঠের কথা হলে যশোরের মধু কবি এসে পড়েন— ‘যথা পথে সহসা হেরিলে উর্ধ্বফণা ফণীস্বরে, ত্রাসে হীনগতি পথিক—’৷ খুলনার সতীশবাবু যশোরের মধু কবির প্রতিবেশী মানুষও বটে৷ সতীশবাবুর চোখে ময়াল সাপও ধরা পড়েছিল৷ তিনি লিখেছেন— ‘বরাহচিতে বা ময়াল প্রভৃতি কালাই মাঝে মাঝে বড় বড় জন্তুকে উদরসাৎ করিয়া থাকে৷’ ‘কালাই’ এর পরিচয় দিয়েছেন তিনি— ‘বিষহীন সর্পের মধ্যে কতকগুলিকে কালাই সাপ বলে, এবং দাঁড়াস প্রভৃতি অন্যগুলির কোনো বিশেষ নাম দেওয়া যায় না৷’ সঙ্কর সাপের উৎপত্তি ও নামগত বৈচিত্র্য তাঁর বর্ণনায় অদ্ভুত লাগে— ‘আবার নানা জাতীয় সর্পের পরস্পর সঙ্গমে সঙ্কর বা দোরোখা সাপের উৎপত্তি হয়৷ সুন্দরবনের জঙ্গলে কেউটা বা গোখুরার সহিত আইরাজের সম্মিলনে উৎপন্ন অনেক সঙ্কর সর্প দেখিতে পাওয়া যায়৷’
‘সাপের লেখা বাঘের দেখা’৷ সুন্দরবনে গাঁয়ে ঘরে প্রচলিত প্রবাদ বাক্য৷ সাপে কাটা কপালে লেখা থাকলে কি হয়, মধু কবি বেশ সুন্দর করে বলেছেন— ‘মাটি কাটি দংশে সর্প আয়ুহীন জনে!’ তাহলে ‘নিয়তি কে ন বাধ্যতে’-এর প্রতীক সাপ৷ সাপ অশুভ৷ কিন্তু রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের লোগোতে সাপ তো পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে দেখানো হয়েছে৷ শুভ অশুভ পবিত্র অপবিত্র যাই হোক না কেন, এখনকার বাঙালীরাও সুন্দরবনে সাপচর্চায় কেমন যেন উদাসীন কে জানে! এই যেমন সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের অধিকর্তা পি. ব্যাস ২০১০-এ তাঁর একটি প্রবন্ধে সরাসরি ‘সুন্দরবনে শঙ্খচূড় ও ময়ালের অস্তিত্ব নথিভুক্ত নেই’ বলে মত প্রকাশ করেছেন৷ এদিক থেকে অতিরিক্ত মুখ্য বনপাল প্রণবেশ সান্যাল তাঁর প্রবন্ধে (২০১০) তিন তিনটি শঙ্খচূড় সাপকে সজনেখালির জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন৷ ময়াল সাপও সুন্দরবনে দেখা যায় তা এই প্রবন্ধে প্রণবেশবাবু স্বীকার করেছেন৷ অন্য আর একটি প্রবন্ধে (২০১২) প্রণবেশবাবু একটি বাঘের মৃত্যুর পর তার পাকস্থলিতে পাওয়া খাবারের মধ্যে শঙ্খচূড় সাপের দেহাবশেষ দেখার কথা জানিয়েছেন৷ বাঘের পেটে শঙ্খচূড়টি তখনো নাকি পুরোপুরি হজম হয়ে যায়নি৷
‘সর্পঃ ক্রুর খলঃ ক্রুর সর্পাৎ ক্রুরতর খলঃ... মন্ত্রৌষধি বশো সর্পঃ খলঃ কে ন নিবার্যতে’৷ বালকবেলায় পড়া এই সংস্কৃত শ্লোকের সারমর্ম-সাপ ধূর্ত কিন্তু মানুষ তারও অধিক শয়তান৷ খানিকটা সাবধান থাকলে গাঁয়ে ঘরে সার ঐ ‘নিয়তি’-র কারণ হয়ে দাঁড়ায় না৷ সাপ আঘাত পেলে নাকি শোধ নিতে ফিরে আসে৷ আসলে ডান্ডার বাড়ি খেয়েও সাপের কোনো কোনো সময় মৃত্যু হয় না৷ সাপের ফুসফুস লম্বাটে হওয়ায় ডান্ডার আঘাতেও নষ্ট হয়ে যায় না৷ বাতাস ভরা থাকে ফুসফুসে৷ মৃতবৎ পড়ে থেকে কিছু পরে ভাঙা শিড়দাঁড়া নিয়ে নড়াচড়া শুরু করলে মানুষ ভয় পেয়ে যায়৷ ভাবে, সাপের এবার প্রতিশোধ নেবার পালা৷ সুন্দরবনে সাপ মারার পর পুড়িয়ে দেওয়া তাই রীতি৷
সাপ শয়তান নয়, বরং লাজুক ও সুন্দর৷ সুন্দরবনে নেতি ধোপানী যাওয়ার পথে এমনই নাগিন সুন্দরীর দেখা পেয়েছিলাম৷ বনবিবি ভারাণি’র খাঁড়ির পাশের জঙ্গলে ভটভটির শব্দে বিরক্ত এক শঙ্খচূড়কে খাড়া প্রায় দু’ফুট দাঁড়িয়ে যেতে দেখেছিলাম৷ আমরা ভটভটি থামিয়ে তাকে দেখছি৷ সে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল৷ নাগিনের জেদের কাছে আমরা হার মানলাম৷ তার রাগ না বাড়িয়ে আমরা এগোলাম৷ এমন সুন্দরীকে বিরক্ত করা আমাদের মানায় না৷ সাপ কিন্তু শুনতে পায় না৷ আমাদের ভটভটির তোলপাড় করা জলের কম্পন তরঙ্গাকারে দ্বীপভূমির মাটিতে শঙ্খচূড়টির বুকের পাঁজরে কম্পন ধরায়৷ ঐ কম্পন সাপের অন্তকর্ণে শ্রবণ অনুভূতির সৃষ্টি করে৷ সাপের পক্ষে তাই মনসা ভাসানোর গাওয়া ওঝার মন্ত্র শোনা অসম্ভব৷ মনসার বাহন দুধ কলাও খেতে পারে না৷ দ্বিখন্ডিত জিভে দুধ খাওয়া সম্ভব নয়৷ সাপ গিলে খায়, চিবোতে পারে না৷ দুধ কলা হজমের উৎসেচক সাপের পেটে নেই৷ আর মুখে যে টুকু লালা থাকে, চিবোতে পারে না বলে কাজে লাগে না৷ সাপের ঐ পরিবর্তিত লালা (স্যালাইভা) হল সাপের বিষ (ভেনোম)৷
ময়াল সুন্দরবনে আছে৷ এপারে চোখে পড়েনি৷ ওপার বাংলার সুন্দরবনে ময়াল দেখেছি৷ পশুর নদীর তীরে করমজলে কাঠের তক্তা বিছানো প্রায় দু’শো মিটার পথ পেরিয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে বাংলাদেশ সুন্দরবনের গাছগাছালির প্রজাতিগুলো তালিকাভুক্ত করছিলাম৷ জঙ্গলের ভেতরে কিছুটা এগোতে বাইন গাছের শক্ত ডাল জড়িয়ে বিশাল বপুর হলদে ময়ালকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখি৷ প্রাণ জুড়োয়৷ এমন চোখে আজো আমার দিকে কেউ তাকায়নি৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন