প্রান্তিক মানুষ

গৌতমকুমার দাস

বনজ সম্পদ আহরণের অভীপ্সা ষোল আনা থাকলেও সুন্দরবনে ইংরেজদের কোম্পানী শাসনের সেকালে বাউলে মউলে জেলেদের বনবাসী হবার কোন ইচ্ছেই ছিল না৷ ১৭৫৭ খ্রিঃ রবার্ট ক্লাইভের সুন্দরবন সহ ২৪ পরগণা জেলা নবাব মিরজাফরের থেকে উপঢৌকন হিসোবে প্রাপ্ত অথবা ১৭৬৫ তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের সময়েও সুন্দরবনের কাছে পিঠে কোন মানুষের বসবাস চোখে পড়ত না৷ অসংখ্য নদীনালা খাঁড়ির জালিকাকার বিস্তৃতির বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলিতে পরিবহন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা যেমনটি ছিল, তেমনি শ্বাপদ সঙ্কুল দুর্গম বনে বাঘ কুমীরের জলে স্থলে ভয়াবহতা বসতি স্থাপনের পথে অন্তরায় ছিল৷ ঝড় ঝঞ্ঝা সাইক্লোনে যখন তখন বিপর্যস্ত হওয়া অথবা পানীয় জলের সামান্যতম উৎস না থাকাও সেদিনের সুন্দরবনে বসবাস গড়ে তোলার পক্ষে অনুকূল ছিল না৷ খাদ্যাভাব তো ছিলই কিন্তু তা পূরণ করার মতো বিঘে দুই আবাদি জমিও সুন্দরবনে ছিল না৷ ক্লড রাসেল বাটিলম্যান হেঙ্কেলের চেষ্টায় সুন্দরবনে জঙ্গল হাসিল করে আবাদি কৃষিজমি সংস্কারের সময় ছোটনাগপুর থেকে কোল ভিল মুন্ডা মাহাত সাঁওতালদের নিয়ে আসা হয় বিনা মূলধনে জমি পাইয়ে দেবার লোভ দেখিয়ে৷ তারো পরে জমিদারি ব্যবস্থায় পরিকাঠামোয় জমিদার ও তার স্তাবক মহাজনদের অত্যাচারে নিজ নিজ জেলা থেকে বহু নিম্ন শ্রেণীর নানা সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ কার্যত পালিয়ে সুন্দরবনে এসে প্রাণে বাঁচে৷ কালক্রমে মেদিনীপুর থেকে মানুষ সুন্দরবনে এসে অল্প পুঁজিতে আবাদি জমি কিনে রায়তদার-এ রূপান্তরিত হয়৷ ব্রিটিশ আমলে সুন্দরবনের পুনরাভ্যুদয়ে সুন্দরবনের মতো গহীন জঙ্গলেও মানুষের বসতি স্থাপনের সূচনা ঘটে৷ বর্তমানে সুন্দরবন জুড়ে কত গঞ্জ, হাট, বাজার, থানা, পর্যটনকেন্দ্র যেখানে বহু ধরণের জীবিকার ভিন্ন ভিন্ন মানুষের অবস্থান৷ কিন্তু সুন্দরবনের মানুষ বলতে জলে জঙ্গলে সুন্দরবনে জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত বাউলে মউলে জেলে চনারুদেরকেই বোঝায়৷ জীবিকার দিক থেকে সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষদের দুটি শ্রেণী জঙ্গলের বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল, আর অন্য এক শ্রেণী জঙ্গল বিমুখ সম্পূর্ণভাবে কৃষিজীবী৷ মধ্যস্বত্ব ভোগী আর এক ধরণের লোভী ভোগী মানুষের দঙ্গল আছে যারা সুযোগসন্ধানীর গোত্রভুক্ত৷ এরা কখনো সাধারণ দরিদ্র চাষার জমি নামমাত্র মূল্যে অথবা পেশীবলে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে নোনা মাছের ভেড়ি বানিয়ে ফেলে, আবার কখনোবা জঙ্গলের নদীনালা সুতি খালে দিনরাত পড়ে থাকা জেলেদের থেকে থোক কিছু টাকা দিয়ে সারাদিনের ধরা মাছ ভটভটিতে নিয়ে এসে দশগুণ দামে গঞ্জে বা শহরের আড়তে বেচে দেয়৷ চরিত্রে কাজে প্রকৃতিতে কত ধরনের মানুষই না দেখা যায় এই সুন্দরবনের বাসভূমিতে৷ ১৭৭০ খ্রীঃ ক্লড রাসেলের প্রায় জনশূণ্য সুন্দরবনকে আধুনিক বর্তমান সুন্দরবনের নতুন যুগের ভিত্তিবর্ষ ধরলে কম বেশি প্রায় আড়াইশো বছরের ব্যবধানে ব্যস্ত জনপদে রূপান্তরিত এই সুন্দরবনের আধুনিক সর্বোত্তম পরিবর্তন বলা যেতে পারে বাদাবনের মানুষের ব্যবহারিক, জীবিকা ও শ্রেণীগত বিবর্তন৷

আধুনিক সুন্দরবনের আদিতে জঙ্গল হাসিল করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ জমিদারদের আনানো আদিবাসী ও নিম্নশ্রেণীর মানুষ প্রথম বসতি স্থাপন করে৷ বঙ্গদেশের অপেক্ষাকৃত উন্নত জেলা বা মহলে উচ্চ বর্ণের মানুষের হাতে লাঞ্ছিত নিম্ন সম্প্রদায়ের হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়ে গিয়ে সুন্দরবনে চলে আসে ও বসবাস শুরু করে৷ সপ্তদশ শতকে সুন্দরবনের নবযুগে আদিবাসি, হিন্দু, মুসলমান সব সম্প্রদায় অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্রতর শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ দুর্গম জঙ্গলের শ্বাপদসঙ্কুল বেষ্টিত এমনতর বাসস্থানের কারণে বিপদে আপদে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাহায্যের মনোভাবের স্বাভাবিক ও সঙ্গত কারণে ধর্ম জাতপাতের কোন ভেদাভেদ ছিল না৷ আড়াইশ বছরের পরেও আজো সুন্দরবনের মানুষের জীবিকাই প্রধান, ধর্ম বা জাতপাত নয়৷ কালের কষ্টিপাথরে ধর্মগুরুদের প্রচার ও প্রভাবে, ভয়ে শোষণ ও লাঞ্ছনার কারণে প্রান্তিক মানুষের কোথাও কোথাও ধর্ম বদলে গেলেও জীবিকা বদলায়নি৷ নিজস্ব আচার অনুষ্ঠান ভাবধারা ফেলে আসা সুন্দরবন মানুষের নতুন এক সংস্কৃতি ক্রমে গড়ে ওঠে৷ পরিবর্তিত শব্দভান্ডারে গড়ে ওঠে সুন্দরবনের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিবর্তিত উচ্চারণের এক নবীন ভাষা যদিও তা উৎসগতভাবে আদি ও অকৃত্রিম বাংলা ভাষা৷ বহিরাগত দুর্বল, সামান্যতম আয় আর জঙ্গল-জীবিকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই লড়াই করা মানুষগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় সকল সম্প্রদায়ের এক ও অভিন্ন সহাবস্থান৷

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় প্রাচীনযুগে সুন্দরবনে (তখন সুন্দরবন নাম ছিল না) ছিল উচ্চবর্ণের মানুষের বসবাস৷ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মুদ্রা, ভূমিদানপট্ট, তাম্রলিপি বা পুরাতাত্ত্বিক নির্দেশনামায় কুষাণ, গুপ্ত, পাল, সেন, চন্দ্র, রায় প্রভৃতি যুগে এখানে বসবাসকারী অধিকাংশই ছিল উচ্চবর্ণের মানুষ৷ প্রবল বন্যায় পঞ্চদশ শতকে উচ্চবর্ণের মানুষের বসতির এই সুন্দরবন অঞ্চল ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বলে ধরে নেওয়া হয়৷ যদিও সুপার সাইক্লোন, প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে নোনাজলের প্লাবন ৯৭৫ খ্রিঃ চন্দ্রবংশের মহারাজা জয়ন্তচন্দ্রের মনির তটে স্থাপিত জটার দেউল ধ্বংস করতে পারে নি৷

প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধনীয় এলাকায় পৌন্ড্র, বর্তমানে পোদ নামে পরিচিত ও সুন্দরবনের সংখ্যা গরিষ্ঠ সহ অন্ত্যজ শ্রেণীর কেওড়া, বাগদি, কৈবর্ত, উগ্রক্ষত্রিয়, ব্যাঘ্রক্ষত্রিয়, তিলি, যুগী, শুঁড়ি, রাজবংশী, মাহিষ্য প্রভৃতির জাতপাত বা হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা সুন্দরবনের মানুষের পরিচয় নয়, এদের পরিচিতি জীবিকায় যেমন বাউলে, মউলে, জেলে, চনারু ইত্যাদি৷ নইলে আট-দশদিনের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবার প্রাক্কালে কেনইবা মাঝি দাঁড়ির দল একযোগে মা গঙ্গা, ও বদর পীরের পূজো করে তাদের উভয়ের মূর্তি বরফভর্তি ট্রলারে তুলে নিয়ে পাড়ি দেবে অজানা ভবিষ্যতের পথে অথবা পুজো শেষে নৌকায় মাঝিমাল্লা বা নদীপাড়ে তাদের একান্ত আপনজনকেইবা একসুরে পাঁচালী গাইতে থাকবে—

গাজীর মিঞার হাজোত

সিন্নি সম্পূর্ণ হল

হিন্দুগণে বল হরি

মোমিনে আল্লা বল

কম কথার শান্ত নিরীহ কালো বর্ণের কৌম আদিবাসি সম্প্রদায়, উচ্চবর্ণের তাড়া খাওয়া পালিয়ে বাঁচা অন্ত্যজ সম্প্রদায় ও মধ্যস্বত্বভোগী লোভী-ভোগী সম্প্রদায়ের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে সুন্দরবনের মানুষের জীবন ও জীবিকা৷ অজস্র শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের ভেদাভেদের মধ্যে সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষ মাত্রেই বোঝায়— বাউলে মউলে জেলে৷

প্রান্তিক মানুষ

সুন্দরবনের অধিকাংশ মানুষ গরীব ও শোষিত৷ তাছাড়া গড়পড়তা ৭০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর৷ তাই শ্রমদান ও সুদখোর মহাজনদের শোষণ-যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয় এখানকার সাধারণ মানুষদের৷ দারিদ্র এবং কর্মসংস্থান এর অভাব সুন্দরবনের মানুষের মধ্যে এতটাই যে তার ফলে শুধুমাত্র পরিবারে অন্নাভাব নয়, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার জন্য স্কুলে পর্যন্ত যেতে পারে না৷ প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিরক্ষর হয়ে থেকে যায় এই অঞ্চলের মানব সম্পদ৷ পাকা রাস্তা নেই বললেই চলে৷ ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা মূলত পায়ে হেঁটে, নদী পেরিয়ে, তবে সম্ভব হয়৷ যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ায় স্বাস্থ্য পরিষেবার বালাই নেই৷ তাছাড়া এমনিতেই এই অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবা সহ ডাক্তার, হাসপাতাল, প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র অপ্রতুল৷ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এর আধুনিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত সুন্দরবনের দরিদ্র মানুষ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করার সময় চাই নৌকা, জাল, বরফ, পানীয় জল, আহার সামগ্রী সহ বিভিন্ন রশদ যা ক্রয় করার কোন ক্ষমতা কার্যত নেই সুন্দরবন অঞ্চলের গরীব মানুষের৷ তাই এদেরকে নির্ভর করতে হয় মধ্য-স্বত্ত্ব ভোগী মহাজনদের থেকে অধিক সুদে ধার করা অর্থের উপর৷ বিনা পরিশ্রমে মহাজন সম্প্রদায় সুদ আদায় করে৷ শ্রম দান করতে হয় না তাই মহাজনদের বিপদও নেই৷ আর শ্রমজীবী মানুষকে সুন্দরবনের জলে জঙ্গলে কুমীর কামট বাঘ সাপের ছোবলে জীবিকার প্রয়োজনে দিতে হয় প্রাণ৷ বিপদসঙ্কুল সুন্দরবনে বনজ সম্পদ আহরণ করেই দিন কাটায় সাধারণ মানুষ৷ সুন্দরবনে বাউলে মউলে জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ জলা জঙ্গলে বিচরণে বিশেষ ভাবে দক্ষ৷ বনের সম্পদ আহরণ করার জন্য এরা বনজীবী৷ সুন্দরবনের নদী, খাল, খাঁড়ি থেকে মাছ, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক সংগ্রহ করেও জীবন নির্বাহ করে থাকে এখানকার প্রান্তিক মানুষ৷ বিভিন্ন ধরণের সম্পদ আহরণের উপর নির্ভর করে সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবন নির্বাহকারী মানুষদের নিম্নলিখিত শ্রেণীগুলিতে বিভক্ত করা যায়—

ক) মৌয়াল বা মউলে (মধু সংগ্রহকারী)

খ) বাওয়ালী বা বাউলে (কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহকারী)

গ) জেলে (খাঁড়ি বা নদীনালায় ধীবর শ্রেণী)

ঘ) বাগদা পোনা সংগ্রহকারী

ঙ) কাঁকড়া সংগ্রহকারী

চ) চনারু (ঝিনুক শামুক সংগ্রহকারী)

জলে জঙ্গলে লড়াই করে চলা মউলে বাউলে জেলে চনারুদের ঠিক বিপরীত মেরুতে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা সুন্দরবনের সম্পদ ধ্বংস করে কাঠুরে জেলেদের জীবনে বিভীষিকা রচনা করে৷ এরা বাঘ হরিণ কুমীর শিকার করে৷ কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ পাচার করে সহজে অর্থ উপার্জন করে৷ এরা জল দস্যু, বন দস্যু, পাচারকারী নামধারী এক ঘৃণিত সম্প্রদায়৷ বাংলাদেশ সুন্দরবনে এই জলদস্যু বাঘ কুমীর হরিণের চামড়া পাচারকারীরা অতি সক্রিয়৷ ভারতীয় সুন্দরবন আঁটোসাঁটো প্রশাসনের কারণে এমন অসামাজিক ক্রিয়াকলাপের দস্যুবৃত্তি পাচার ইত্যাদি ধরণের দুর্নীতি থেকে আপাতত মুক্ত৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%