মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ

গৌতমকুমার দাস

নোনাজলে মীন ধরতে গিয়ে দুরারোগ্য চর্মরোগ, কিডনির অসুখ, মেয়েদের জননাঙ্গে অদৃষ্টপূর্ব রোগ মীন সংগ্রহকারীদের কয়েক বছর আগেও ছিল না৷ এগুলির শুরু সম্ভবত ১৯৯৩ সাল থেকে৷ কোন জীবানু এসব রোগের সংক্রমণ ঘটায় তা সংশ্লিষ্ট গবেষকরাই বলবেন৷ তবে বেশিক্ষণ নোনাজলে গা ভেজালে ওই জীবানুরা সক্রিয় হয়ে ওঠে৷

সুন্দরবন এলাকায় গণহারে বাগদামীন ধরা শুরু হয়েছে ১৯৮৯-৯০ সাল থেকে৷ গবেষণার তাগিদে পাথরপ্রতিমা ব্লকের রামগঙ্গা, পশ্চিম শ্রীপতিনগর (কে-প্লট), কামদেবপুর, বিরাটবাজার, অচিন্ত্যনগর (আই-প্লট), জি-প্লটের গোবর্ধনপুর, ইন্দ্রপুরে তথ্য ও পরিসংখ্যান সংগ্রহের জন্যে যেতে হয়েছে৷ ১৯৯১-২০১৪ এই বছরগুলিতে সংগৃহীত প্রাক-মৌসুমী, মৌসুমী-উত্তর সময়ে বাগদামীন সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কেন, কীসের লোভে কিংবা অভাবে বেশী সময় ধরে সুন্দরবনের শ্রমজীবী একটি পরিবারের আবালবৃদ্ধবনিতাকে নোনাজলে পড়ে থাকতে হয়৷

প্রতি ব্যক্তির দৈনিক সংগৃহীত মোট বাগদামীনের সংখ্যা গত ২৫ বছরে প্রায় ২০০টি করে কমেছে, যদিও সংগ্রহকারীর সংগ্রহ করার ক্ষমতা ও প্রবণতা দুটোই বেড়েছে৷ প্রকৃতিতে বাগদামীন যত দুর্লভ হয়ে উঠছে, দাম ততই আকাশছোঁয়া হয়েছে৷ ভাবা যায়, ১৯৯৫ জানুয়ারীতে প্রতি হাজার মীন ৩২০০ টাকা করে ছিল৷ তবে পরিবহণের উন্নত ব্যবস্থা বাগদামীনের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কমিয়েছে৷

রামগঙ্গা এলাকায় ১৯৯০ সালে যে সংখ্যক বাগদামীন অন্যত্র রফতানি করা হত তা ২০১৪ সালে হাজারগুণ কমে গেছে৷ বেড়েছে আড়তদারদের দেওয়া দাদনের টাকা ও মীন ধরার জালও৷ ফলে দাদনের লালচক্ষু আর মীনের আকাশছোঁয়া দাম আজ দুটোরই শিকার সুন্দরবনের খেটে খাওয়া মানুষ৷ তাই তারা ৭/৮ ঘন্টাও নোনা জলে পড়ে থাকে৷ এদের মধ্যে অধিকাংশই মেয়ে; কিশোরী, বাড়ির বউ৷

দুরারোগ্য চর্মরোগ, কিডনির অসুখ এসবের সঙ্গে যেটা প্রবল আকারে দেখা দিয়েছে তা হল মেয়েদের জননাঙ্গের রোগ৷ এসব সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ, সুন্দরবন জীব পরিমণ্ডলের অনেক কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে বহুবার৷ তাদের প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায় নি৷

বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হচ্ছে৷ বাগদামীন বাদে অন্যান্য মাছ (Fin fish, shell fish) এর বাচ্চা, জলজকীটপতঙ্গের লার্ভা ফেলে দেওয়া হচ্ছে নদী চরে কিংবা নদী বাঁধে৷ যেখানে চলছে বাছাই পর্ব৷ বারবার জাল টানার ফলে নদীচর কিংবা ঢাল (slope) ক্ষয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত৷ যার ফল বাঁধের ভাঙন৷ নদী এগিয়ে আসছে৷ ক্ষতি হচ্ছে কৃষিজমির৷ স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের মৃদু নির্দেশ মীন সংগ্রহকারী ১০/১১ বছরের মেয়ে কাজল উড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘‘এক মুঠো ভাতের পরও এই কাঁচের চুড়ি, পুঁতির মালা কে দেবে বাবু?’’ সরকারি স্তরে এসব বিশ্লেষণ পর্যালোচনা তখনই হয় যখন অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যায়৷ সময়ই শিক্ষা দেবে৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%