গৌতমকুমার দাস
পারশে তপসে ভাঙন ট্যাংরা গুড়জাউলি জাতীয় চার পাঁচ প্রজাতি সুন্দরবনের নোনা মাছ বাঙালি মধ্যবিত্তের পাতে রোজ না হলেও নিয়ম করে ভিড় জমায়৷ বাজারি দামে অথবা রসনার রসায়নে, স্বাদ পরিবর্ত্তনে আমোদি ফ্যাসা পায়রাচাঁদা রূপাপাতি গাঙমৌটি চ্যালা কান-মাগুরদের তেমন কোন ভূমিকা নেই৷ এই দুই শ্রেণীর মধ্যবর্ত্তী মধ্যবর্গীয় গুলে ভোলা চাপিলা খয়রা নিম্ন মধ্যবিত্তদের সেবায় নিয়োজিত যদিও প্রকৃত কারণ কার্যত এবং আবশ্যিক অর্থে আর্থিক৷ সেদিক থেকে ভোলা-ভেটকি ফিসফ্রাই হয়ে অনুষ্ঠান বাড়ির নিমন্ত্রিত খাদকের ছাপা মেনুর তালিকায় প্রথম পদ হিসাবে ভেটকির কুলীন নামে বেশ কাটে৷ মেনুতে ছবি ও নামে ভেটকি অথচ গিলছি ভোলা-ভেটকি—এ যেন ফেসবুকের ফেক আই-ডি৷ বরং লইট্যা কইলকাত্যার কলোনিগুলোর স্বঘোষিত বিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যাহ্নভোজের প্লেটে জায়গা পেয়ে গেছে কিছুটা নস্টালজিকতার দরুন৷ দ্যাশ ভাগের পর কপর্দকহীন দাদুর যৌবনবেলায় মাছ কেনার প্রায় সামর্থ্য না থাকা অবস্থায় মাছে-ভাতে বাঙালীর স্মৃতি সরণিতে শাসন করা সেদিনের লইট্যা আজ নাতির কাছে দাদুর সেই সময়ের দারিদ্র—যুগ পেরিয়ে আসা এক ঐতিহ্যের মতো৷ কলোনির বর্তমান ফ্ল্যাটে ডাইনিং টেবিলে বসে ফোকলা দাঁতে লইট্যা খেয়ে তৃতীয় প্রজন্মের নাতির কাছে দাদুর ঢেঁকুরে মন্তব্য— আহা! লইট্যার তুলনা নাই৷ লইট্যা চিবোতে হয় না, কাঁটা বাছতে হয় না বলে লইট্যা সর্বজনপ্রিয় হলেও তার থেকে অধিকতর স্বাদের ফ্যাসা আমোদিরা এ সন্মান থেকে বঞ্চিত স্রেফ খাওয়ার সময় কাঁটা বাছার কারণে৷ দেহভর অজস্র কাঁটা অথচ ‘V’ আকৃতির মায়োটম পেশী অর্থাৎ মাছের যে অংশটুকু আমরা মাছ হিসাবে খাই তা সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম থাকায় উচ্চ মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে এদের প্রবেশ এখনো নিয়ন্ত্রিত৷ অথচ ১২০ প্রজাতির মাছ, ১৮ প্রজাতির চিংড়ি, ৩৪ প্রজাতির কাঁকড়া এখনো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে চলে যদিও জিভে জল আনা রূপোলী ইলিশ পূর্বের মতো সুন্দরবনে ধরা পড়ে না, ইলিশ এর প্রাচুর্য এখন এখানে আর নেই৷ বেশ কয়েক বছর ধরে মিষ্টি জল নদীর উজান থেকে এসে সুন্দরবনের মোহানার খাঁড়ির জলে না মেশায় ইলিশ ডিম পাড়তে এখানে খুব কম আসে৷ অবশ্য হরিণ্যে ও চামনে চিংড়ির স্বাদ মাছের অভাব ভোলায় তবে ওদের বাজার দর যথেষ্ট৷ সুন্দরবনের শিলা কাঁকড়া কি আর কম যায়৷ পাঁচ তারা হোটেলে প্রমাণ সাইজের এক একটি শিলা’র (Scylla serrata) প্লেট কম করে হাজারে বিকোয়৷ অধিকাংশ মাছ বাঙালির পাতে জাতে না উঠলে কি হবে চিংড়ি কাঁকড়ার থেকে বাঙালি, অবাঙালি, আমিষাশী, বিদেশী সবার জিভ লালা নিঃসরণে লালায়িত হয়ে ওঠে৷

নোনা মাছ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন