গৌতমকুমার দাস
সুন্দরবনে গুণিন বা ওঝারা পূর্বে বাউলে নামে পরিচিত ছিল৷ ‘বাউলে’ শব্দটির থেকে পরবর্তীকালে ‘বাওয়ালী’ কথাটি সম্ভবত এসেছে৷ বাউলে কথার অর্থ হল ওঝা বা গুণিন৷ পূর্বে কাঠ কাটতে গেলে কাঠুরের দলের সঙ্গে অবশ্যই এক জন বাউলে যেত৷ বাউলে জঙ্গলে মন্ত্র পড়ে এক একটি এলাকা জল ছড়িয়ে বন্ধ করে দিত অর্থাৎ ঐ মন্ত্রপুত এলাকায় বাঘ কুমীর সাপের কোন বিপদ আপদ কাঠুরেদের অন্তত হবে না৷ বর্তমানকালে কাঠুরেদের দলে আর বাউলে বা গুণিন নেওয়া হয় না৷ কাঠুরেরা ব্যয় কমানোর জন্য আর বাউলে সঙ্গে নেয় না৷ তাছাড়া চোখের সামনে অজস্র গুণিন বা বাউলেদের বাঘের শিকার হতে দেখেছে কাঠ কাটতে যাওয়া কাঠুরের দল৷ তবু মন্ত্র তন্ত্রের হাল হকিকত এখনো ছাড়েনি কাঠুরেদের দল৷ তারা ফকিরদের ফুঁ দেওয়া বা পীর সাহেবের মন্ত্রপুত জল নিয়ে কাঠ কাটতে আসে৷ যাই হোক, গুণিনদের জন্য ‘বাউলে’ শব্দটির ব্যবহার ও প্রয়োগ এখন বিলুপ্ত প্রায়৷ প্রায় তিন দশক পূর্বে বাউলেদের সঙ্গী করে নিয়ে যাওয়া কাঠুরের দল নিজেরাই এখন বাউলে বা বাওয়ালী নামে পরিচিত৷ সুন্দরবনের গহন জঙ্গলে নৌকা করে দলবদ্ধ ভাবে কাঠ কাটতে যাওয়া কাঠুরেদের কে এখন বলা হয় বাউলে বা বাওয়ালী৷ কাঠ কাটতে যাওয়ার পূর্ব এদের মহাজনরা বন বিভাগের অনুমতি বা পারমিট নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করে রাখে৷ তারপর মাসাধিককাল কাঠ কাটার জন্য বেরিয়ে পড়ে বাওয়ালীদের দল৷ সুন্দরবনে এরা গোলপাতা ও কাঠ সংগ্রহ করে থাকে৷ এদের মজুরী দৈনিক কাজ করার উপর নির্ভর করে৷ কখনো সখনো এরা চুক্তিভিত্তিক মজুরিতে কাঠ কাটতে যায়৷ শ্বাপদ সঙ্কুল সুন্দরবনের অরণ্যে প্রাণ বিপন্ন করে স্বল্প পারিশ্রমিকে কাজ করতে যায় বাওয়ালীরা৷ হিংস্র বাঘের মুখে পড়তে হয় কখনো সখনো৷ বাঘে শিকার ধরে চোখের পলকে কাঁধে চাপিয়ে হেঁতাল ঝোপের মধ্যে এত দ্রুত মিলিয়ে যায় যে বাওয়ালীদের অর্ধভুক্ত দেহটারও খোঁজ পাওয়া ভার হয়ে দাঁড়ায়৷ ঝুঁকির নিরিখে প্রায় বিনামজুরীতে কাজ করে চলে এই বাউলে বা বাওয়ালীরা৷
সুন্দরবনের বাওয়ালীরা কাঠ কাটতে গিয়ে বিভিন্ন ঘটনায় ওদের অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে ওঠে৷ বাওয়ালীদের দর্শনে থাকে জঙ্গলের ভেতরের বারভূঞ্যার আমলের ভাঙা প্রাসাদ, ভগ্ন শিব মন্দির, বাঘ হরিণের পছন্দের জায়গা ও তাদের খাবারদাবার অথবা বানর-হরিণের বন্ধুত্বের খুনসুটি৷ এককথায় সুন্দরবনের জঙ্গলমহলের হাল হদিশ সহ বহু রকমের তথ্য বাওয়ালীদের নখদর্পণে থাকে৷ এরা যখন কাঠ কাটতে যায়, তখন এদের মধ্যেকার সম্পর্ক খুব গাঢ় থাকে৷ প্রয়োজনে একে অপরের জন্য জীবন দিতে পারে এমনও দেখা যায়৷ বিশেষ করে যখন কোনো বাওয়ালীকে বাঘে ধরে, তখন অন্য বাওয়ালীরা পালায় না, বরং গাছের ডাল, কাঠ কাটার কুড়ুল নিয়ে বাঘের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতি-আক্রমণে যায়৷ বাঘ ভয় পেয়ে কখনো সখনো শিকার ছেড়ে পালায়৷
বাউলেরা মাসাধিককালের রসদ ইত্যাদি নৌকায় চাপিয়ে রওনা দেয়৷ চাল, ডাল, তেল, মুড়ি, আলু, কচু, কুমড়ো, পানীয় জল, ডিজেল, মোবিল নিয়ে বেরোয়৷ খাপলা জাল ও বড়শি দিয়ে নদীর থেকে মাছ ধরে৷ জঙ্গলে থাকাকালীন বাউলেরা তেঁতুলের টক খায় খুব৷ নোনা জলের আবহাওয়ায় তেঁতুল দিয়ে মাছের টক জিভে স্বাদ আনে৷ হরিণ অতি কাছে থাকলেও এরা হরিণ শিকার করে না বা হরিণের মাংস খায় না৷
সারাদিনের অক্লান্ত খাটুনীর পর সন্ধ্যায় এরা আমোদ প্রমোদে মেতে ওঠে৷ সব চেয়ে বেশী জমে, আষাঢ়ে গপ্পো৷ তারপর ক্রমে ভাটিয়ালি, বাউল, ধুয়া জারী, মুর্শিদী বিভিন্ন গান গেয়ে ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করে৷ এখন প্রায় প্রত্যেক বাওয়ালী দলের সঙ্গে রেডিও থাকে৷ ক্লান্ত বাওয়ালীরা রাতের খাবার খেয়ে নৌকার খোলে অথবা টোঙ্গে ঘুমে ঢুলে পড়ে৷ পাখীর ডাকে পরের দিন সকালে ওদের ঘুম ভাঙে৷ কাঁধে কুড়োল চাপিয়ে পান্তাভাত চারটি খেয়ে ফের কাজে যায়, যেতে হয়৷
পরপর তিনদিন বাউলে মউলে জেলেদের থেকে এমনই বহু তথ্য জোগাড় করে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পাখিরালয় থেকে ফিরছি৷ গদখালিতে গাড়ি পাঠানোর কথা অরূপকে আগে থেকে বলা ছিল৷ গাড়ি বাসন্তী ঢোকার পূর্বে রাস্তার পাশে দেখি বেশ একটা জটলা গোছের, আর দু-চার জন ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে নেমে পড়ে জটলার কাছে গিয়ে দেখি, মোরগ লড়াই চলছে৷ আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে তপশিলী, উচ্চবর্ণের মানুষও জুটেছে শীতের শেষ বিকেলে মোরগ লড়াইয়ের আখড়ায় যদিও উচ্চবর্ণের মানুষজন খেলায় অংশ নিচ্ছে না, তারা নিছক কৌতুহলী দর্শক মাত্র৷ আমার কাছে তথ্য ছিল— আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ শুধু জঙ্গলে ঢোকার সময় বাউলে মউলেদের সঙ্গে যখন যায় তখন একা একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে৷ নইলে এরা শুয়োর চাষ করুক বা মোরগ লড়াইয়ের সময় মোরগের পায়ে ছুরি বাঁধার কাঁতিদারি করুক তখন এরা যূথচারী৷ এদের একা একা থাকায় পোষায় না, সে বনে জঙ্গলে শিকারে বা আদিবাসি সমাজের আচার অনুষ্ঠানে বা এই মোরগ লড়াইয়ের আখড়ায়৷ তবে দলবদ্ধতার প্রকাশ যেন একটু বেশীই হয় ফি-হাটবারে মোরগ লড়াইয়ের আসরে৷ বাউলে মউলে জেলে যে পেশাতেই এরা থাকুক না কেন, বিনোদন এদের চাই-ই৷
মোরগ লড়াই দেখছিলাম আর পাশাপাশি দু একজনের সঙ্গে কথা চালাচালিও চলছিল৷ শুনলাম, সুন্দরবনে আদিবাসিদের মোরগ লড়াইয়ের আসর যাকে ওরা আখড়াই বলে থাকে, শুরু হয় কোজাগরী (লক্ষ্মী পুজো) পূর্ণিমার দিন থেকে চৈত্র সংক্রান্তি অর্থাৎ বাংলা বছরের শেষ দিন পর্যন্ত৷ লড়াইয়ে জাত মোরগদের সামিল করতে হয়৷ ঝিঁঝরি, মালা, জংলী বা বাগা, কাওরা, উচ্ছরা প্রভৃতি জাতের মোরগ আখড়ায় লড়াই জমিয়ে দেয়৷ খেলা শুরুর আগে কোন মোরগ কার সঙ্গে লড়বে সেটা দেখে নেওয়া রীতি নইলে আখড়াই-তে মোরগদ্বয় মুখোমুখি হবেই না, লড়াই তো পরের কথা৷ মোরগদের পায়ে ধারাল ছুরি বাঁধার জন্য ছুরি, চামড়ার টুকরো, সূচ, সুতো, ন্যাকড়া নিয়ে বসে থাকে কাঁতিদার৷ লড়াই করতে যাওয়া মুরগীকে একা এক কাঁতিদারের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না, তাই ‘বুড়ি’ নামের সহায়ক কাঁতিদারকে মোরগের পায়ে ছুরি বাঁধার সাহায্য করে থাকে৷ মোরগের পায়ে ‘কাঁত’ নামের ছুরির আগার ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নাম যেমন মোজা ফলি, বেঁকা ফলি, বেঁকি, সোজা ডাঁট ইত্যাদি৷ এসব ছুরি বাঁধা ও তৎসহ শত্রু মোরগের গায়ে জ্বালা ধরানোর জন্য ছুরির আগায় তুঁতে মাখানো বাবদ এক একজন কাঁতিদার দু-চার টাকা করে পায়৷ মোরগ লড়াই চলাকালীন টুঁ শব্দটিও করার নিয়ম নেই৷ তাই আমি যাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম তারাও খুব নীচু স্বরে কথা বলছিল৷ তবে লড়াইয়ের পর মাঝে মধ্যে বিজয়ী মোরগ, ‘জিৎকার’ ও পরাজিত মোরগ ‘পাউড়’ নিয়ে কথা কাটাকাটি, হাতাহাতি, এমনকি মারামারি পর্যন্ত ঘটনা গড়ায়৷ অথচ কতনা নিয়মকানুন সংস্কার মেনে মোরগটাকে বাড়ি থেকে লড়াইয়ের ‘আখড়াই’ পর্যন্ত নিয়ে আসতে হয়৷ লড়াইয়ের মোরগ কাছে থাকলে রাস্তায় কারো সঙ্গে কথা বলা যায় না, পিছন ফিরে তাকানো যায় না, মোরগ যতই কঁকর কঁক করুক না কেন গামছা বা চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়, এমনকি লড়াইয়ের মোরগ সহ পথে চলাকালীন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়াও নিষিদ্ধ৷
শনি রবিবার ছুটি থাকায় দেশের বাড়িতে আসা সরকারী উচ্চপদে কর্মরত বৈদ্যনাথ হেমব্রম এর থেকে ‘আখড়াই’-এর পাশে দাঁড়িয়ে মোরগ লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে পুরাণবৃত্তান্ত শুনছিলাম৷ বৈদ্যনাথবাবু বলছিলেন—এই মোরগ লড়াইয়ের সঙ্গে কৃষ্ণের কংস নিধনের কাহিনীও জড়িয়ে আছে৷ কৃষ্ণ যতবার সময়ে অসময়ে কংস নিধনে যান না কেন কংস নিযুক্ত মোরগ অনুচরেরা ডাক দিয়ে কংসকে সতর্ক করে দিত৷ বুদ্ধিমান কৃষ্ণ তখন মোরগদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ এমনই তৈরী করে দেয় যে সেদিন থেকে কোন একটি মোরগ নাকি অন্য মোরগকে দেখলেই লড়াইয়ে সামিল হয়৷ মোরগদের মতো একা একা নয়, আদিবাসি সম্প্রদায় একসময় একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জমিদার, জোতদারদের জুলুমের প্রতিবাদে, তেভাগা আন্দোলনে৷ সে ছিল অন্য এক প্রতিরোধের মোরগ লড়াই৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন