সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়

গৌতমকুমার দাস

সুন্দরবনের ঝড়খালিতে নদীর মাঝে নোনা জলে ছুটে চলা ভটভটির সাথে প্রজাপতি ওড়ে৷ বুনো শুয়োর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে খাল খাঁড়ির পাড়ে কর্কর খাবারের খোঁজে মুখ গুঁজে ঘোঁত ঘোঁত করে৷ বানরের দল গায়ে মুখে কাদা মেখে গেঁওয়া বাইনের ডালে হয়ে থাকা মৌচাক ভেঙে খলসী ফুলের মধু খায়৷ চিত্রা হরিণ কেওড়া গাছের তলায় দাঁড়িয়ে উপর পানে তাকিয়ে থাকে৷ বানর ডালে বসে কেওড়া ফল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে৷ হরিণ কেওড়া ফল খাওয়া শেষে আবার ওপরে তাকালে মগডালে বসে বসে বানর তাকে ভ্যাংচায়৷ মা-কুমীর এখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, ডিমে তা দেয়৷ ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে ছানাদের নিয়ে মাসাধিক কাল খাঁড়ির পাড় বরাবর বাচ্চাদের সাঁতরে খাবার ধরার কায়দা কানুন শেখায়৷ বাঘিনী বাঘের হাত থেকে বাচ্চা বাঁচাতে চলে আসে নিরিবিলি নিরুপদ্রব এই ঝড়খালি-হেড়োভাঙার জঙ্গলে৷ ঝড়খালির উল্টোপিঠে হেড়োভাঙা খাঁড়ির ওপারে হেড়োভাঙা জঙ্গল এমনিতেই শান্ত নিরিবিলি নির্বাক৷ এর মাঝ বরাবর ফুঁড়ে আঁকাবাঁকা পথ চলা সূর্যমণি খাঁড়ির জল যেন শিল্পীর তুলির আঁচড়ে আঁকা একটি ক্যানভাস৷ এই খাঁড়ির দুপারে বাঘ, কুমীর, হরিণ, শুয়োর, গোসাপ, পানকৌড়ি, মদকটাক, কোঁচবক, শঙ্খচিল, কুবো পাখি, হাঁড়িচাচা, মাছরাঙা আর আয়নার মতো স্থির জলে ভেসে থাকা ডিঙিতে জেলে ও তার লাল ডুরে শাড়ির জেলেবৌ চুপি চুপি মাছ ধরে চলে৷ ভটভটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লে বাঘিনী বাদ দিয়ে অন্য আর সবাই এই সূর্যমণি খাঁড়িতে চোখে পড়বেই৷ এর একটিই কারণ হল সূর্যমণি খাঁড়িতে সারাক্ষণই বেজে চলে অনিন্দ্যসুন্দর শ্যামলিমার নীরব সুরের মূর্চ্ছনা৷ এ খাঁড়ির জলে স্রোত বোঝা দায়৷ এখানে বাতাস যখন খুশী, যেমন খুশী বয় না৷ শীত ঢোকে না, গরম পড়ে না, গাছের পাতা নড়ে না, তবে বৃষ্টি পড়ে৷ সময় ও আবহাওয়া যেন এখানে থমকে থাকে৷ পরিবর্তনশীল গতিময় বাস্তুতন্ত্রের অফুরন্ত পুষ্টি প্রাচুর্যের সূর্যমণি খাঁড়ি তাই শুধুমাত্র জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ নয়, নিঃশব্দ ও নীরব স্থানের বাঘ ও কুমীর সম্প্রদায়ের মা জননীদের অপত্য স্নেহদানের পরিচ্ছন্ন নির্জন ক্ষেত্রবিশেষ৷

এই ঝড়খালিতে মাসখানিক আগে প্রায় বার-চোদ্দটা বাচ্চা সহ এক কুমীররাণী ভেসে বেড়াত সূর্যমণি খালে৷ সরকারি বনদপ্তরের ভগবতপুর কুমীর প্রকল্পের কর্মীরা এসে বাচ্চাগুলোকে ধরে নিয়ে যেতে মা-কুমীর গেল চলে৷ তাকে আর ভেসে বেড়াতে দেখে না মোটর লঞ্চের মালিক ও মাঝি শ্যামল মন্ডল বা অর্জুন মন্ডল-রা৷ এখনো গন্ডাখানিক শাবকসহ প্রায়ই বাঘিনী চলে আসে খোদ ঝড়খালির ম্যানগ্রোভস্ অরণ্যের মধ্যে৷ বাঘ বাবাজিরা বাঘের বাচ্চা দেখলেই খেয়ে ফেলে৷ প্রাকৃতিক নির্বাচনের অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রামে শুধু খাবারের খোঁজে নয় বড় হয়ে প্রেমের পথে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে ভাবীকালের এই প্রজন্ম৷ তাই বাঘ-শিশু নিধনে মত্ত হয়ে ওঠে পরিণত বয়সী বাঘ৷ বাঘিনী তাই নিরাপদ নিরিবিলি এমনতরো জায়গা শাবকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বেছে নেয়৷ জন্মদাত্রী কুমীররাণী বা বাঘিনীদের তেমনই একটি নিরাপদ নির্জন বনাঞ্চলের নাম হল এই ঝড়খালি৷

প্রকৃতির এত সৌন্দর্য এত প্রয়োজন সবই অসুন্দর ঠেকে যখন সভ্যতার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ এই বনে জঙ্গলে তার পরিকল্পিত মন নিয়ে ঢুকে পড়ে আর স্বার্থসিদ্ধি করে চলে৷ বুনো পশুদের নির্জন নিরাপদ স্থান তেমনই এই ঝড়খালি জঙ্গল কেটে নাকি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা হয়েছে৷ এমনকি অত্যাধুনিক সেই পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে ধনীমহলের যাতায়াতের জন্য থাকবে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা৷ ম্যানগ্রোভস্ কাটা পড়বে হেলিপ্যাড তৈরীর জন্য৷ হেলিকপ্টার, মোটর লঞ্চ, ভটভটি, মানুষের ভয়ঙ্কর শব্দ, চিৎকার চেঁচামেচির চোটে কুমীর-মা বা বাঘিনীরা ঝড়খালিকে কি আর নিরাপদ মনে করবে, না হরেকরকমের মাছরাঙা বক শঙ্খচিল পানকৌড়িরা এখানে উড়ে বেড়ানোর সাহস পাবে৷ নদীনালা খাঁড়ির কাঁথি (Natural Levee)-তে বন-শুয়োর বনের ভেতর থেকে চলে আসার আর ভরসা রাখতে পারবে বলে বোধ হয় না৷ যে হোটেল মোটেল শপিং মল তৈরীর পরিকল্পনা হয়েছে তাদের নর্দমা নিষ্ক্রান্ত বর্জ্যের দূষণে নদী নালা খাঁড়ির জল কুমীর ছানাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযুক্ত থাকবে কিনা তাও কেবল ভবিষ্যৎ বলবে৷ অজস্র মানুষ স্থলযান-জলযানের শব্দে প্রজাপতিদের উড়ান থেমে যাবে৷ এখনই যা শব্দ রোববার আর ছুটির দিনে৷ এই ডিসেম্বর মাসের এক রোববারে এক পিকনিক পার্টির সাউন্ডবক্সে বেজে চলা ‘‘ঝিঙ্কু নাকুর নাক্কু নাকুর নাক্কু নাকুর না না’’ গানের তীব্র আওয়াজে আমার ভাড়া গাড়ির চালক সাগর বলে ওঠে, এদের কানের পর্দার চামড়া মনে হয় অর্ডার দিয়ে তৈরী৷ বাঘ কুমীরের কানের পর্দার চামড়া তো আর এমন একটানা ভয়ঙ্কর শব্দ বিস্ফোরণ শুনতে অভ্যস্ত নয়, অতএব তাদের পছন্দের তালিকা থেকে নির্জন নিরাপদ জায়গা হিসাবে ঝড়খালি বিদায় নেবে৷ এমনিতেই ওদের নিজের মতো করে বেঁচে থাকার জায়গা কমেই চলেছে যদিও এই নোনা বনে জঙ্গলে ওদের জন্ম বেড়ে ওঠা আর বিবর্তন৷ অতএব ঝড়খালিতে পর্যটনশিল্প নৈব নৈব চ৷ বরং ঝড়খালি হেড়োভাঙার জঙ্গল হয়ে থাক বাঘিনী-কুমীররাণীর অপত্য স্নেহের এক প্রাকৃতিক আবাসস্থল৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%