গৌতমকুমার দাস
বনদস্যু, জলদস্যু, পাচারকারীর থেকে চোরাশিকারীর কর্মপদ্ধতি কার্যত আলাদা প্রকৃতির৷ এদের কখনোই দেখতে পাওয়া যায় না৷ শুরু থেকে শেষ অবধি অদৃশ্য থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে কার্যসিদ্ধি করে বলেই এরা চোরাশিকারী হিসাবে সুন্দরবনের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত৷ তবে অন্যান্য দুষ্কৃতির থেকে এদের অর্থোপার্জন বহুগুণ বেশী৷ একটা বাঘ শিকার করে চামড়া, দাঁত, হাড় (আর এখন বাঘের মাংসও) পাচার করে দিতে পারলে ৩০ লক্ষেরও অধিক বাংলাদেশী টাকা হাতে আসে৷ প্রধানত বাঘ আর হরিণের চামড়া, দাঁত, শিঙ ইত্যাদি চোরা শিকারীরা পাচার করে থাকে৷ হরিণের মাংসের জন্য হরিণকে এই চোরা শিকারীদের হাতে মরতে হয়৷ তবে এই সব চোরা শিকারীদের অধিষ্ঠান বর্তমানে বাংলাদেশ সুন্দরবন৷
হরিণ শিকারী
সুন্দরবনের সৌন্দর্য মায়াবী চিতল হরিণ চোরা শিকারীদের নিয়মিত শিকারে সংখ্যায় ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে৷ হরিণ শিকারে বন্দুকের ব্যবহার তো ছিলই, এখন নতুন নতুন পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সুন্দরবনে হরিণ শিকার ত্বরান্বিত হয়ে চলেছে৷ বন্দুক ছাড়াও ফাঁদ পেতে, বিষ খাইয়ে, কলার টোপে ঘুমপাড়ানি ওষুধ পুরে হরিণ শিকার করে চলেছে চোর শিকারীরা৷ সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে হরিণের পায়ের ক্ষুরের দাগ দেখে শিকারীরা বুঝে যায় হরিণ চলাচলের পথ৷ তারপর ঐ পথে দড়িতে সারি সারি কলা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়৷ কলার মধ্যে পুরে দেওয়া হয় ঘুম পাড়ানী ওষুধ যেমন অপসোনিল, ডরমিকর, টিনিল, আমিলিন, কজিয়াম, সিডাক্সিন, লারগাটিল ইত্যাদি৷ হরিণের দল এসে কলা খেতে উৎসাহী হয়, কলা খায় ও পরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে৷ উঁচু গাছের ডালে চোরাশিকারীরা বসে থাকে ও লক্ষ্য রাখে৷ হরিণগুলি প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেলে তাদের টানতে টানতে নিয়ে আসে কাছেপিঠে বেঁধে রাখা নৌকায়৷ পরে হরিণ শিকারীর দল হরিণগুলিকে নিয়ে এসে জবাই করে উচ্চ মূল্যে মাংস বিক্রয় করে এবং হরিণের চামড়া পাচার করে৷ হরিণ চলাচলের পথে ফাঁদ পেতে রাখলেও অতি সহজেই হরিণ ধরা পড়ে৷ হরিণ ভীরু ও চঞ্চল প্রাণী হওয়ায় আরো বেশী করে ফাঁদে জড়িয়ে যায়৷ ওৎ পেতে থাকা শিকারীরা তাদের টেনে নিয়ে গিয়ে নৌকায় তোলে৷ সম্প্রতিকালে হরিণ শিকারীরা শিকারের নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ করছে বাংলাদেশ সুন্দরবনে৷ বড় বড় আকারের সাগর কলায় মাছ ধরা ছিপের কাঁটা ঢুকিয়ে গাছ থেকে ঝুলিয়ে রাখায় ঐ কলা লোভে পড়ে হরিণ খেলে হরিণের গলায় কাঁটা আটকে যায়৷ তখন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হরিণ শিকারীরা এসে, লাঠি দিয়ে হরিণগুলিকে পিটিয়ে কাহিল করে ট্রলারে তুলে গোপন জায়গায় নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে ও মাংস পাচার করে৷ সুন্দরবনে চিত্রল হরিণের প্রিয় খাদ্য কেওড়া ফল৷ হরিণ শিকারীরা হরিণ ধরতে কেওড়া গাছের তলায় কেওড়া ফলের মধ্যে মাদক দ্রব্য বা চেতনানাশক রাসায়নিক পদার্থ ঢুকিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে৷ হরিণ কেওড়া ফল দেখে লোভী হয়ে ওঠে এবং গোগ্রাসে অনেকগুলি খেয়ে ফেলে আর কিছু সময়ের মধ্যে অবচেতন হয়ে পড়লে হরিণগুলিকে হরিণশিকারীর দল নৌকায় টেনে নিয়ে তোলে৷ বনবিভাগ যাতে এই হরিণ শিকারীদের ধরতে না পারে তার জন্য এরা সোর্স পোষে৷ তাই খবর পেয়ে যখন বনকর্তারা উপস্থিত হয়, তার অনেক আগেই হরিণ শিকারীরা চম্পট দেয়৷ এই সব মানুষের কীর্তিকলাপ অহরহ চলে বাংলাদেশের সুন্দরবনে৷ বাংলাদেশের সুন্দরবনের শরণখোলা, চাঁদপাই, শ্যামনগর, কয়রা, মংলা প্রভৃতি লোকালয় সন্নিবিষ্ট লবণান্বু উদ্ভিদের জীব পরিমন্ডলে এই অত্যধিক হরিণ শিকার অবাধে চলছে৷ ফাঁদ পেতে ওষুধ খাইয়ে, বন্দুক তাক করে গুলি ছুঁড়ে বাংলাদেশ সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বনাঞ্চলের প্রায় সব কম্পার্টমেন্টেই হরিণ হারিয়ে যাচ্ছে এভাবেই৷
সাধারণত হরিণ শিকারীরা বাংলাদেশ বনদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢোকে৷ এদের সঙ্গে বনকর্মীদের আঁতাত থাকে৷ হরিণ ও ফাঁদ সহ ধরা পড়লেও কোন অজ্ঞাত কারণে এদের কোনো শাস্তি হয় না, এমনকি অর্থ জরিমানাও হয় না৷ হরিণ শিকারের অনেকগুলি দল আছেটিয়ার চর, শেলার চর, কটকা, আড়ুয়া, কবিখালি, কলমতেজী, বয়রা, কুকিলমুনি, সোনাতলা, পাথরঘাটা, রাজাপুর, খুড়িয়াখালি, মঠবাড়িয়া, চরদুয়ানি, সাপলেজা প্রভৃতি এলাকায়৷ এদের অনুমোদন থাকে মাছ ধরার, তাই জাল নিয়ে নৌকায় খাঁড়ি পেরিয়ে আসে জঙ্গলে৷ কিন্তু ঐ জাল আর নদী খাঁড়ির জলে মাছ ধরার জন্য না পেতে বনে জাল পেতে দেয় আর ঐ জালে আটকালেই হরিণশিকারীর বন্দুকের গুলিতে প্রাণ হারায় অসহায় স্বভাবের ভীরু চিত্রা হরিণ-হরিণী৷ ছাড় পায় না হরিণ শিশুও৷ জঙ্গলে পাখীর মিষ্টি মধুর কাকলি বুঝতে না বুঝতেই হিংস্র হরিণ-শিকারীদের হাতে নির্মমভাবে হরিণ শিশুদের প্রাণ বলি দিতে হয়৷
শিকারীরা গুলি করে, ফাঁদ পেতে, খাবারে বিষ মিশিয়ে, বড়শিতে সাগর কলার টোপ দিয়ে, বনের এক থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকা জাল পেতে অথবা তীর ছুঁড়ে নিধন করে থাকে সুন্দরবনের সম্পদ মায়াবী চিত্রা হরিণ৷
বাঘ শিকার
সুন্দরবনের সম্পদ জগদ্বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার বনভূমির এলাকা হ্রাস এবং খাদ্য সংকটে বিপন্নপ্রায় প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে৷ আরো একটি কারণে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা কমছে তা হল প্রজননের জন্য নিভৃত নিরুপদ্রব নিরাপদ স্থানের অভাব৷ তার উপর চলছে লোভী শিকারীর নির্মম বাঘ শিকার৷ সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ এই অবৈধ শিকার৷ ভারতীয় সুন্দরবনে কড়া প্রশাসনের জন্য বাঘ শিকারের ঘটনা না ঘটলেও, বাঘ বাংলাদেশ সুন্দরবনে নদী সাঁতরে বাঘ পেরিয়ে এলে ওৎ পেতে বসে থাকা শিকারীর হাতে বেঘোরে প্রাণ যায়৷ বাঘ মেরে ফেলার জন্য যেমন খাবারে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয় তেমনই বন্দুক রাইফেলের গুলিতেও বাঘ শিকার করা হয়, বাঘের চামড়া মধ্য-পূর্ব এশিয়ার আরব শেখ ও আমীররা তাদের বসার ঘরে টাঙ্গিয়ে নিজেদের বনেদিয়ানা ও আভিজাত্য জানান দেয়৷ বিশ্বের চল্লিশটি দেশের কালো বাজারে বাঘের চামড়ার ক্রয়-বিক্রয় চলে৷
গত দশকেই শতাধিক বাঘের মৃত্যু হয়েছে বাঘ শিকারীদের হাতে৷ শুধু বাঘের চামড়াই নয়, বাঘের দাঁত, চোয়াল, হাড় এসবও সংগ্রহ করে থাকে চোরা শিকারীরা এবং তা অতি উচ্চমূল্যে বিক্রয় হয়৷ এমন কি বাঘের মাংস চড়া মূল্যে বিক্রি হয় ইউনানি মেডিসিন তৈরীর কাজে যা খেলে নাকি আরব শেখরা যৌবন ফিরে পায়৷ বাঘ শিকার ছাড়াও বাঘের মৃত্যু হয় গণ পিটুনিতে যখন বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ে৷ ভয় পেয়ে বাঘ তাল গাছে উঠলেও মানুষের হিংস্রতার আদিম প্রবৃত্তির জেরে মার খেয়ে প্রাণ হারাতে হয় বেচারী বাঘকে৷ অনেক সময় ঘুম পাড়ানি গুলিতে অতিরিক্ত ওষুধের প্রভাবে বাঘের আর জ্ঞান ফিরে আসে না৷
কাঠ পাচার
বাংলাদেশ সুন্দরবনে সুকৌশলে রাতদিন কাঠ পাচারের কাজ চলে৷ এখন ভারতীয় সুন্দরবনে সুন্দরী, হেঁতাল কাটা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে৷ তবে বাংলাদেশ সুন্দরবন জুড়ে নিয়ম নীতি ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে নিষিদ্ধ কাঠ কাটা ও পাচার চলছে৷ যথারীতি বনকর্মকর্তাদের যোগ সাজশ এই কাঠ পাচার চক্রের সঙ্গে রয়েছে৷ ভারতীয় সুন্দরবনে কাঠ পাচার চক্রের হদিশ না মিললেও বাংলাদেশের সুন্দরবনে অসংখ্য কাঠ পাচার চক্র রয়েছে এবং তারা অত্যন্ত সক্রিয়৷ বছরভর বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে কাঠ পাচারের কুকর্ম তারা চালিয়ে যাচ্ছে৷ শুধুমাত্র বনদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ যুক্ত৷ দেখা যায় ট্রলার করে গভীর জঙ্গল থেকে অবৈধ কাঠ কেটে এনে স্থলভাগে যখন লরি ম্যাটাডর করে পাচার হয় তখন খুলনা সাতক্ষীরায় প্রশাসনের নজরে এলেও সেগুলিকে আটক করে না৷ আবার বনবিভাগ মাঝেসাঝে দেনা পাওনায় গরমিল হলে কিছু কিছু ট্রলার আটক করে এবং সেই ট্রলারগুলিকে বাংলাদেশের সুন্দরবনের বনদপ্তর টহল দেওয়ার কাজে ব্যবহার করে থাকে৷ এভাবে লক্ষ লক্ষ মন সুন্দরী, গরান, পশুর, ধুঁধুল কাঠের অবৈধ পাচার চলে, যার রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে না৷
বাংলাদেশের সুন্দরবনে কাঠ পাচারের এক অভিনব কৌশল ‘ভুর’৷ সুন্দরীর গুড়িগুলিকে ভেলার মতো করে সাজিয়ে গোলপাতার গোড়া এই কাঠের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ভাসিয়ে দেওয়া হয়৷ সুন্দরীকাঠ থাকে নীচে আর গোলপাতার গোড়া ওপরে ভেসে চলে ঠিক ছিপের ফাতনার মতো৷ জোয়ারের সময়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় এই ‘ভুর’৷ বনরক্ষীরা এই কাঠ পাচারের কৌশল ধরতে পারে না৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন