গৌতমকুমার দাস
বাংলার ঘরে ঘরে প্রতিটি পরিবারে মধু-র ব্যবহার সর্বজনবিদিত৷ বাংলাদেশে বিভিন্ন কাজে মধু অপেক্ষাকৃত অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয়৷ সেই মধু সুন্দরবন থেকে মউলেরা আহরণ করে থাকে৷ সুন্দরবনের মধু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তার স্বাদ ও গন্ধের জন্য সমাদৃত৷ বিজলি আলো ঘরে ঢোকার আগে মৌচাক থেকে সংগৃহীত মোমের থেকে তৈরী মোমবাতির চাহিদা ছিল প্রচুর৷ মার্চ-এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের কাজ শুরু হয়৷ মধু ও মোম সংগ্রহকারীরা স্থানীয়দের কাছে মৌয়াল বা মউলে নামে পরিচিত৷ খলসী ফুলের মধু অতি সুস্বাদু ও স্বচ্ছ হয়ে থাকে বলে মৌয়ালরা খলসী গাছ ভরা জঙ্গলে মধু আহরণ করার জন্য যায়৷ মৌয়ালরা দল বেঁধে মধু সংগ্রহ করার কাজে নামে৷ প্রতিটি দলের সদস্য সংখ্যা ১০-১২ জনের হয়ে থাকে৷ এদের মধ্যে একজন নৌকা পাহারা ও মৌচাক ভাঙতে যাওয়া মৌয়ালদের রান্নাবান্না করার কাজে নিযুক্ত থাকে৷ নৌকায় থাকা সেই লোকটিকেই জঙ্গলের মৌচাক থেকে সংগৃহীত মধু চাক থেকে নিংড়ে মাটির কলসীতে ভরে রাখার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়৷ সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢুকে মৌয়ালরা অর্ধ সংখ্যক দুটি দলে বিভক্ত হয়ে মৌচাকের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়৷ গহন বনে ঘুরে বেড়ানোর সময় মধু সংগ্রহকারী মৌমাছির উড়ানের অভিমুখ লক্ষ্য করতে থাকে এবং মৌমাছিদের উড়ে যাওয়া পথেই মৌচাকের হদিস পেয়ে যায়৷ বসন্তে মধু ভর্তি মৌচাক পাওয়ার কারণ এই সময় সুন্দরবনের খলসী, বাইন, কেওড়া, গর্জন এসব গাছগাছালিতে ফুল ফোটে৷ মধু সংগ্রহের জন্য মৌয়ালদের সরকারী অনুমোদন নিতে হয় যা মৌয়ালদের কাছে ‘পারমিট’ নামে পরিচিত৷ বনে ঢোকার সময় মৌয়ালদের কাছে থাকে ধারালো দা যা দিয়ে মধুভর্তি মৌচাকের সামনের অংশটি কেটে নিয়ে বেতের তৈরী ধামায় সংগ্রহ করে রাখে৷
মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের পদ্ধতি অতি প্রাচীন৷ ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়া মৌমাছিদের পথ ধরে এসে মৌয়ালরা মৌচাকের তলায় উপস্থিত হয়৷ এরপরের ধাপ হল মৌমাছি তাড়ানোর পালা৷ প্রাচীন পদ্ধতি অনুসারে ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়ানোর কাজ করে থাকে মৌয়ালরা৷ সেজন্য হেঁতাল গাছের শুকনো ও কাঁচা ডাল কেটে একসঙ্গে বেঁধে তড়পা তৈরী করে৷ ঐ তড়পাতে আগুন দিলে শুকনো ও কাঁচা পাতা জ্বলে তীব্র ধোঁয়ার সৃষ্টি করে এবং মৌমাছিরা ধোঁয়ার জ্বালায় মৌচাক ছেড়ে পালায়৷ চাকের সামনের অংশটুকু তখন কেটে নেওয়া হয়৷ চাকের পিছনের অংশটুকু রেখে দেওয়ার কারণ ওখানে মৌমাছির বাচ্চাগুলি থাকে৷ উড়ে যাওয়া মোমাছিরা পরে ফিরে আসে আর বাচ্চা মৌমাছিগুলি দু চারদিনে বড় হয়ে উঠে চাক ভাঙার পনের দিনের মাথায় আবার পূর্ণ মৌচাক তৈরী করেও মধু ভর্তি করে ফেলে যার থেকে পুনরায় মধু সংগ্রহ করা যায়৷ সুন্দরবনে এক একটি মৌচাক থেকে সর্ব্বোচ্চ প্রায় ১ মন পর্যন্ত মধু পাওয়া যেতে পারে৷
মৌচাকে মৌমাছির মধু সংগ্রহ করার পর সঞ্চয়জাত করার প্রক্রিয়া বেশ অভিনব৷ খলসী, কাঁকড়া, গেঁওয়া, বাইন, তরা, গরান, পশুর প্রভৃতি ফুলের থেকে মধু সংগ্রহ করে শুধুমাত্র শ্রমিক মৌমাছিরা৷ তারপর উড়ে এসে মৌচাকের কোষে উদ্গীরণ করে৷ এরপর মধু থেকে জলীয় অংশ বাষ্পাকারে সরানোর জন্য ডানার সাহায্যে হাওয়া দেয়৷ জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমতে কমতে প্রায় কুড়ি শতাংশে যখন নেমে আসে তখন কোষের মুখ বন্ধ করে ফেলে মৌমাছি৷ এইভাবে অসংখ্য বহুভূজাকার কোষের সমাহারে মৌচাক তৈরী হয়৷ মৌচাকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের জন্য ভবিষ্যতে খাওয়ার সঞ্চয় করে রাখে৷ সুন্দরবনের মৌমাছির প্রজাতিভিত্তিক স্থানীয় নাম— সূর্যমুখী৷ আর ঐ মৌমাছির বিজ্ঞান সম্মত নাম—এপিস ডরসাটা ৷
জঙ্গলের নোনা আবহাওয়ায় সংগৃহীত মধুতে নদীর নোনা জল মেশালে মধু ভালো থাকে এমনটা স্থানীয়দের অভিমত৷ সাধারণত সুন্দরবনের মৌয়ালরা একমন মধুতে সাড়ে চার লিটার নোনা জল মিশিয়ে থাকে৷ যদিও এই ধারণা একটি অন্ধ বিশ্বাস মাত্র কারণ সংগৃহীত মধুতে নোনাজল মেশানোয় মধু ভালো রাখার কোন বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি ও ব্যাখ্যা আজো খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ তবে মধু ব্যবসায়ীরা চিনির গাদ তৈরী করে মধুতে মিশিয়ে জালিয়াতি করে থাকে এমনই যে তা সাধারণ বা পর্যটক ক্রেতারা ধরতে পারে না৷ সুন্দরবনের আসল মধু স্বাদে গন্ধে অত্যন্ত উপাদেয়৷ গ্রীষ্মের দাবদাহে আম দুধের সঙ্গে মধু সুন্দরবনের অতি প্রিয় খাদ্য৷ পৌষ পার্বনে পিঠে পুলি তৈরীতে মধু ব্যবহার করে থাকে দুই বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ৷ মধু-র সরবত সহযোগে জামাই আপ্যায়ন সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবনযাপনকারী মানুষের বহুদিনের রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত৷
মৌচাক থেকে মধু আহরণের সময় মৌয়ালরা মৌমাছির কামড় খায়৷ সাধারণত সারা গায়ে নদীর পলি মেখে মৌয়ালরা মৌচাক ভাঙতে যায়৷ মৌমাছির ঝাঁক যখন আক্রমণ করে তখন কুমীর হাঙরে ভর্তি সুন্দরবনের নদীর ভরা জলে ঝাঁপ দিতেও কসুর করে না মৌয়ালরা৷ লক্ষ্য করা গেছে যে মৌমাছির কামড় খাওয়া মৌয়ালদের বহুকাল জ্বরজাড়ি জাতীয় অসুখে ভুগতে দেখা যায় না৷
মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ অভিযানে বিপদ থাকে সামনে পেছনে এমনকি প্রতিটি নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে৷ সাধারণত গরীব মানুষ মউলেরা মহাজনের দেওয়া অর্থে নৌকা করে এই কাজে আসে৷ ফলে হাতে গরান গর্জন অথবা হেঁতাল লাঠি ছাড়া কার্যত কোন অস্ত্রশস্ত্র তাদের কাছে থাকে না৷ অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতিও নেই৷ বাঘের উপদ্রব তো আছেই, তাছাড়া বিষাক্ত সাপের ছোবল তাদের জীবন কেড়ে নেয় অচিরেই৷ তাই মৌয়ালরা মন্ত্রতন্ত্র, ফুঁ দেওয়া রুমাল এ সবে বিশ্বাস রেখে বনে আসে, মন্তর মনে সাহস জোগায়৷ সাধারণত নিরক্ষর অজ্ঞ মৌয়ালরা যে মন্ত্র পড়লে বাঘের হাঁ অর্থাৎ মুখ বন্ধ হয়ে যায় বলে তাদের ধারণা, সেই মন্ত্র পড়ে বনে প্রবেশ করে৷ এই মন্ত্রকে মৌয়ালরা বলে খিলান মন্ত্র৷
‘‘আকাশে তারা বন্ধন
পাতালে বারি বন্ধন
সাতষট্টি কোটি দেবতা বন্ধন
নদীতে কুমীর বন্ধন
ডাঙায় বাঘ বন্ধন
আর এই বন্ধন যদি নড়ে
বনবিবির মস্তক ছিঁড়ে জমিনেতে পড়ে৷’’
আবার অধিক পরিমাণে মধু পাওয়ার জন্যও মৌয়ালরা মন্ত্রে বিশ্বাসী, যেমন—
‘‘দক্ষিণরায় বলে বাবা
বনবাঙালী মধু পাবা
গাজী বাবা হও রাজি
ধরলাম আজি বাজি
আলী আলী
হাবন্ত যেন না হয় খালি৷’’
বাঘ যাতে মৌয়ালদের না দেখতে পায় তার জন্য মন্ত্র পাঠ—
‘‘ ঘর বন্ধ দোর বন্ধ
আকাশের তারা বন্ধ
শত্রু-দুষমন তাদের চোখও বন্ধ
আমার এই মালের মধ্যে যে করিবেন ঘা
আল্লাহর ওয়াস্তে তার জ্বলে যাবে গা
দোহাই শাহ আলী
দোহাই শাহ আলী৷’’
নৌকা নিয়ে মৌয়ালরা নদীপাড়ে ঘন জঙ্গলের কাছে এলে মন্ত্র বা কিছু প্রাচীন রীতি অনুযায়ী কে বা কারা বনে জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে যাবে আর কাকে নৌকায় থেকে মাছ ধরা, রান্নাবান্না, চাকভাঙা মধু কলসীতে ভরতে হবে তার বিভাজন করা হয়৷ মৌয়ালদের ১০-১২ জনের একটি দলের সঙ্গে কাঁসার ঘটিতে করে ফকির সাহেবের মন্ত্রপূত জল থাকে৷ নৌকায় তারা গোল হয়ে দাঁড়ায়৷ একজন ঘটি থেকে সেই মন্ত্রপূত জল প্রত্যেকের হাতের তালুতে ঢালে৷ সেই জল যে যে এক ঢোকে গিলতে পারে, কেবলমাত্র তারা বনে যেতে পারে, আর যাদের বা যার গলায় জল আটকে যায় তাকে নৌকায় থেকে আনুষঙ্গিক কাজকর্ম দেখা শোনা করতে হয়৷ এত মন্ত্রতন্ত্র, মন্ত্রসাধিত জল, নিয়মকানুন, তবু মৌয়ালদের বাঘের পেটে যেতে হয়, সাপের কামড়ে প্রাণ যায়, কখনোবা কুমীরে টেনে নিয়ে যায়৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন