কুমীর বন্দনা

গৌতমকুমার দাস

বন্ধুরা সব বলে, রবিঠাকুর কোনো কিছু লিখতে বাদ রাখেননি৷ রবীন্দ্র রচনাবলী উল্টেপাল্টে দেখে আমার কেমন যেন মনে হয়, তাঁর লেখায় কুমীর উপেক্ষিত৷ তাহলে কুমীর নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করলে কী এমন ক্ষতি! ভয় পাওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই৷ এতো আর কুমীর শিকার নয়, বরং একে সোঁদরবনের কাহিনীর শুরুতে পরিচয় করিয়ে দিই, কুমীর এক সরীসৃপ৷ জলে-ডাঙায় মিলে-জুলে এর বাস৷ ভালো নাম ক্রোকোডাইলাস পোরোসাস৷ এরা বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, তা-দিয়ে বাচ্চা ফোটায় ডাঙাতেই৷ ডাঙার থেকে গরু ছাগল পাকড়াও করলে তখন জলে নামতেই হয়৷ নইলে যার ছাগল সে তাড়া করে৷ গায়ের রক্ত যতই ঠান্ডা হোক না কেন মার খেতে কারইবা ভালো লাগে৷ তবে জলে মরা গরু ভেসে যেতে দেখলে ছাড়ার কোনো প্রশ্নই নেই৷ বাসি খাবারের স্বাদটাই যে আলাদা৷ মরা গরুর উপর নিজের শরীরের ভরটা ছেড়ে দিয়ে আলতো করে ভেসে থাকে৷ আর ঢাকাই পরোটার মতো ঐ গরুর পচা মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাও৷ আহা! সে এক অনাবিল আনন্দ৷ একেই বলে ভ্রমণমূলক খাদ্যগ্রহণ৷

কুমীরের আলাদা এক গৌরব আছে৷ সুন্দরবনের লৌকিক দেবতা কালু রায় কুমীরের দেবতা রূপে পূজিত হয়, চড়ক সংক্রান্তিতে মাটির উপর দশ-বারো ফুট লম্বা কাদার কুমীর ঠাকুর বানিয়ে সারা গায়ে কাঁচা পাকা হলদে সবুজ খেজুরকুল বসিয়ে দেওয়া হয়৷ নৈবেদ্যে লাগে বুনো ঝাউয়ের ফুল৷ তবে এই কুমীর ঠাকুরের মন্দিরে বাস নেই৷ জ্যান্ত কুমীরও ডিমে তা দেওয়া ছাড়া বাসা বাঁধে না৷ তাও সে মা-কুমীর৷ আর তাছাড়া বাসায় থেকেও কি লাভ! শেয়াল পন্ডিতে কুমীর ছানার যা খেল দেখিয়েছিল, তা কুমীরের কোন পুরুষ আজো ভোলেনি৷ তেমনি মানুষও মনে রেখেছে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করে জলে বাস করতে নেই৷

জাতে সরীসৃপ লম্বাটে ইস্পাত শরীরের কুমীরের মেরুদন্ড যতটা না শক্ত, তার থেকে তার দুই চোয়াল বেশী শক্ত৷ নইলে আস্ত একটা গরুকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নদীতে নিয়ে পালাতে পারে৷ তবে সব কুমীর লোকের গরু বাছুর বৌ ধরে টানাটানি করে না৷ কিছু বৈষ্ণব কুমীরও নাকি নদীনালায় আছে৷ সতীশ চন্দ্র মিত্র তাদের সরজমিনে ভ্রমণকালে দেখেছিলেন৷ তিনি যশোর খুলনার ইতিহাসে (পৃঃ-৬৫) লিখছেন— ‘সুন্দরবনের নদীমাত্রেই কুম্ভীরে পূর্ণ৷ ‘ভাসাল’ নামক এক জাতীয় কুমীর মধুমতী প্রভৃতি নদীতে দেখা যায়; শুনিয়াছি উহারা মনুষ্য শিকার করে না৷ কিন্তু সুন্দরবনের নদীতে এরূপ বৈষ্ণব কুমীর নাই; সুন্দরবনের কুমীর অত্যন্ত হিংস্র৷’’

গ্যাসট্রেল সাহেব নদীর জলে বাংলার বধূদের উপর কুমীরী অত্যাচারের কাহিনী বহুবার শুনিয়েছেন৷ ব্রিটিশ সরকারের ইংরেজ সাহেব রাজস্ব-জরিপবিদ কলোনেল জে.ই.গ্যাসট্রেল ‘ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রিকায় (১৮৭৫) তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখছেন—‘‘After the beginning of March, it is not safe to bathe in or take water from the streams, except at places specially protected by palisades of bamboos or wooden stakes. Even this precaution sometimes fails. Instances have been frequently known of crocodiles entering within the palisades from the land side during the night. In the morning, the first notice of the hidden danger is the struggles and shrieks of some unfortunate women, seized and dragged under water by the reptile.’’ সুন্দরবনে কুমীরের পেটে যাওয়ার ঘটনা একালেও শোনা যায়৷ আনন্দের মাকেও কুমীরে ধরেছিল৷ নদীবাঁধে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আনন্দ দেখছিল মাছ ধরতে গিয়ে লাল হলদে ডুরে শাড়ির তার মা সপ্তমুখী নদীর জলে এই ডুবছে তো ঐ ভাসছে৷ বছর ফুরোতে না ফুরোতেই তার বাপ সংসারে খাল কেটে কুমীর আনলো৷ সৎমা তোতলা আনন্দকে দুচক্ষে দেখতে পারতো না৷ গরীব প্রভু দন্ডপাট কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করতে করতে শিশুপুত্র আনন্দকে আমাদের বাড়ি রেখে যায়৷ আনন্দ ও আমার মধ্যে কোনোদিন কোনো ভেদাভেদ রাখেনি আমার মা৷ আসলে আমার বাবা টাকার কুমীর ছিল না, তাই৷

জলে কুমীর ডাঙায় বাঘ তত্ত্বকে একেবারে নস্যাৎ করে ছেড়েছে সোঁদরবনের কুমীর৷ ভাবা যায়, কুমীর এখন সটান পাহাড়ের মাথায়৷ ভূটানের ফুন্টসিলিং-এ৷ তার-ঘেরা চৌবাচ্চায় দিবিব মানিয়ে নিয়েছে ওরা৷ কষ্ট করে লাফিয়ে ঝাঁপিয়েও ওদের খাবার ধরতে হয় না৷ আলসেমিতে জীবন কাটায় ওরা৷ আর তার ফল একেবারে হাতেনাতে৷ চেহারায় গোলগাল হয়ে ভূটানীদের মতো এখন দেখতে হয়েছে কুমীরদের৷

ব্রিটিশ আমল থেকে শৌখিন শিকারীদের দাপটে সুন্দরবনে একসময় কুমীর বিপন্নপ্রায় প্রজাতি হয়ে দাঁড়ায়৷ তাই পাথরপ্রতিমার ভগবতপুরে সপ্তমুখী নদী ঘেঁষে ১৯৭৬ সাল থেকে কুমীরের কৃত্রিম প্রজনন চলছে৷ সুন্দরবনে অন্য কোনো জীবজন্তুর জন্য এমনতর প্রজনন কেন্দ্র চালু নেই৷ এটা কুমীরের গৌরব গাথা৷ এই প্রজনন কেন্দ্রের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা আসে৷ বনে বাদাড়ে ঘুরে কুমীরের বাসা খুঁজে ডিম নিয়ে এসে কৃত্রিম উপায়ে এখানে বাচ্চা ফোটানো হয়৷ সেই বাচ্চা কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে এলে সুন্দরবনের নদীনালায় ছেড়ে দেওয়া হয়৷ সাত আট বছর খাঁচার মধ্যে কাটিয়ে যৌবনে ওরা প্রকৃতির মাঝে মুক্তির স্বাদ পায়৷ তবে বাচ্চা অবস্থায় কুমীরগুলোকে কেমন যেন কুমীর কুমীর মনে হয় না৷ গিরগিটির বাচ্চা বলে ভ্রম হতে পারে৷ কালো সাদা ছোপের কুমীর বাচ্চারা সিমেন্টের তৈরী চৌবাচ্চা ভর্তি জলে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গুলে মাছ ধরে ধরে খায়৷

প্রকৃতির মাঝে জঙ্গলের বাসায় মা-কুমীরের এক নাগাড়ে ৩০-৪০ দিন ডিমে তা দিয়ে ফোটানো বাচ্চা নদী নালার জলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়৷ স্রোতে হারিয়ে গিয়ে বা অন্য জীবজন্তুর খাবার হয়ে শেষমেষ এক আধটা বাচ্চা বাঁচে৷ ভাবা যায়, মানুষ খেকো কুমীর-ছানাদের কিনা কাগাবগায় খেয়ে ফেলে! তাই বনদপ্তরের কর্মিরা জল থেকে ঐ সব বাচ্চাদের দেখতে পেলে উদ্ধার করে নিয়ে এসে প্রজননকেন্দ্রে ছেড়ে দেয়৷ বড় হলে তবে না ফের নদীর জলে ফেরা৷

নৌকা থেকে কুমীরের মানুষ শিকারের গপ্পো বহু শুনেছি৷ সতীশ চন্দ্র মিত্র এমন ঘটনার কথা যশোর খুলনার ইতিহাস-এ স্বীকার করেছেন— ‘সুন্দরবনের কুমীর কখনওবা লেজের আঘাতে মানুষকে ছোট নৌকা হইতে জলে ফেলিয়া দিয়া শিকার করে৷’ সপ্তমুখী নদীর জলে পরপর কয়েকদিন পাঁচ-ছয় ঘন্টা করে একাকী জল থেকে মাত্র ফুটখানিক উঁচু একটা রবারের তৈরী বোটে কাটিয়েছি৷ নদীজলের কয়েকটি নিরীক্ষার প্রয়োজন ছিল, তাই৷ পাশেই ভগবতপুর কুমীর প্রজননকেন্দ্র৷ তা সত্ত্বেও আমার কপালে সেবার কুমীরের লেজের ঝাপটা জোটেনি৷ এই সপ্তমুখীতে লঞ্চ থেকে একবার ঝাঁপ দিয়েছিলাম৷ ডুব সাঁতার দিয়ে খানিক দূরে ভেসে উঠতেই কানে আসে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক অমলেশ চৌধুরীর আপ্রাণ ডাক— ‘উঠে এসো, কালই ভগবতপুর কুমীর প্রকল্প থেকে ৩৬টি কুমীর এই নদীর জলে ছাড়া হয়েছে৷’ সেবারেও কুমীরের ভোগ্য হইনি৷

নব্বই-এর দশকের প্রথম দিকে গবেষণার কাজে সুন্দরবনের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপে চার পাঁচ বছর থাকার সুবাদে এক কুমীর রাণীর সঙ্গে প্রায়ই দেখা সাক্ষাৎ হতো৷ তার পেছনের একটা পা ছিল না৷ দ্বীপের লোকরা তাকে ‘খোঁড়া’ কুমীর বলে ডাকত৷ তবে তার চরিত্র নিয়ে তেমন খারাপ কিছু শুনিনি৷ নদীচরে ধানীঘাসের মধ্যে চরে বেড়ানো গরু ছাগল কাউকে সে টেনে নিয়ে যায়নি৷ নদীর ঢালে তার সঙ্গে প্রায় প্রতি বিকেলেই দেখা হতো৷ একই জায়গায় সে প্রতিদিনই ঐ সময়টায় থাকতো৷ অপেক্ষা করতো৷ হয়তো জানত আমি আসব৷ কেমন যেন মনে হয়, আমাকে তার মনে ধরেছিল৷ তখন বুঝিনি৷ সেই কুমীররাণীকে এখন বেশ মনে পড়ে৷ সে এখন কোথায়, কে জানে!

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%