গলদা মীন

গৌতমকুমার দাস

সুন্দরবনের নদনদী ছাড়িয়ে রূপনারায়ণের জলে গলদা মীন সংগ্রহের কাহিনীতেও বেশ বিস্ময়৷ গলদা-বাগদা চিংড়ি অভিজাত আহার্য্যে, সমাজে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে৷ স্বাদে, গন্ধে, অতুলনীয় না হলে কি তার বর্ণনা দেবভাষায় হতো, না কল্যাণী দত্তের ‘অষ্টরম্ভা’ (পৃঃ-৬৪)-য় তার দেখা মিলত—

‘গলদাং বাগদাং রস্যাং নারিকেল সমন্বিতাম্

অলাবু লোভনাং কৃত্বা ভক্ষিতব্যং শুভে যোগে৷’

বাগদার মতো ঘেরে গলদা চিংড়ির চাষ হয়৷ মিষ্টি বা ঈষৎ লবণাক্ত রূপনারায়ণের জলে গলদা চিংড়ির মীন ধরায় কোন সমস্যাই নেই৷ সকাল বিকেল এমনকি তখনো যখন গেঁওখালির সাঁঝবেলার আকাশ ক্রমশ রাঙা হয়ে ওঠে আরো দক্ষিণের হলদিয়া শহরের নিয়নবাতির আলোয়৷ গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় গাদিয়াড়ায় দাঁড়িয়ে রূপনারায়ণের বুকে ভেসে আসা দখিনা বাতাস শরীরে মেখে এক আলাদা স্বর্গীয় অনুভূতি পেতে গিয়ে মাটির কাছে রূপনারায়ণের জলে শ্রম ও সত্যের সংমিশ্রণে দেখা যায় অভিনব এক নতুন দৃশ্যপট৷ রূপনারায়ণের পাড় ঘেঁষে দেখা যাবে এক বুক জলে নাইলন এর তৈরি ছোট ছোট জাল টেনে চলেছে একদল কিশোরী, যুবতী৷ জাল টানলে গলদা চিংড়ির মীন পড়ে৷ টানা ৬ থেকে ৮ ঘন্টা জলে জাল টেনে চলে ওরা যে সময় রূপনারায়ণের জল ভাটির টানে হুগলী নদীতে এসে মেশে৷ এ ধরণের শ্রম করে চলে স্কুল-ছুট কানন, রীতা, গঙ্গা, মালা, মালতীরা৷ একবেলা শাক-ভাত পাওয়ার পাশাপাশি চুলে লাল ফিতে কিংবা নখ রঙীন করার স্বপ্ন ওরা দেখে৷ বাতাসীর ইচ্ছে তো একটিবার শ্যামপুরে গিয়ে সিনেমা দেখে আসে৷ শ্যামপুর, বেলপুকুর সিনেমা হলের নাম শুনেছে অনেক, কোনোদিন সিনেমা দেখা হয়নি বাতাসীর৷

বেঁচে থাকার সত্য ও তার জন্য বিস্তর শ্রমদান চলে গাদিয়াড়ায়৷ শুরু হয় বোশেখ মাসের মাঝামাঝি রূপনারায়ণের জল একটু নোনা হলে তবে না গলদা চিংড়ির (Macrobrachium rosenbergii) মীনের স্রোতে ভেসে আসা শুরু হয়৷ গাদিয়াড়া হাওড়া জেলায় যেখানে রূপনারায়ণ হুগলী নদীতে এসে মিশেছে৷ অজস্র জলরাশির ধারে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত সবুজে মোড়া গাদিয়াড়ার দক্ষিণে পূর্ব মেদিনীপুরের গেঁওখালি এবং পূর্বে দক্ষিণ ২৪ পরগণার নূরপুর৷ হুগলী নদীতে রূপনারায়ণের মোহানা এতটাই প্রশস্ত যে গাদিয়াড়া থেকে গেঁওখালি কিংবা নূরপুর অস্পষ্ট লাগে৷ রাতে নিয়নবাতি জ্বলে উঠলে অন্ধকারের বুকে অনেক দূরে স্থলভাগের ধারণা জন্মায়৷ গাদিয়াড়া থেকে হুগলী জলপথ পরিবহন সমিতির লঞ্চ রয়েছে নূরপুর, গেঁওখালি পারাপারের জন্য৷ এক ঘন্টা অন্তর লঞ্চ ছাড়ে, নিয়ম মেনে চলে৷

রূপনারায়ণ নদীর জল ঈষৎ লবণাক্ত হলে গলদা চিংড়ির পোনা বা গলদা মীন স্রোতে ভেসে আসে৷ গাদিয়াড়ায় রূপনারায়ণের লবণাক্ততার পরিমাণ প্রচন্ড গ্রীষ্মে ২ পি.টি.টির বেশি হয় না, উল্টোদিকে নূরপুরেও লবণাক্ততার পরিমাণ কমে হয় ১ পি.টি.টি৷ হুগলী নদীর জলে লবণতা কম হয়ে থাকে৷

একই মোহানায় বিভিন্ন দিকে লবণাক্ততার পরিমাণ আলাদা হওয়ার কারণ হলো জোয়ার জলের স্রোত৷ লবণাক্ত জল জোয়ারের সময় হুগলী নদী বরাবর গতিপথের ওপরের দিকে উঠে আসে বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে৷ হুগলী ও রূপনারায়ণের উচ্চগতিপথ থেকে বয়ে নিয়ে আসা মিষ্টি জল লবণাক্ততা কমায়, হুগলী নদীর থেকে জোয়ারের জল গাদিয়াড়ার দিক দিয়ে রূপনারায়ণে ঢোকে বলে গাদিয়াড়া আর হুগলীর তীরে অবস্থিত নূরপুরের কাছে জলের লবণাক্ততার পরিমাণ এক হয়৷ আর জল নেমে যাওয়ার সময় ভাটির টান গেঁওখালির অভিমুখে হয়৷ রূপনারায়ণের মিষ্টি জল হুগলীর জলস্রোতে মেশার দরুন গেঁওখালির দিকে লবণাক্ততার পরিমাণ কম হয়৷ গেঁওখালি থেকে গাদিয়াড়া— প্রতি ১০০ মিটার অন্তর জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে লবণাক্ততা গাদিয়াড়ার দিকে ক্রমশ বাড়ে৷

এই ঈষৎ লবণাক্ত জল গাদিয়াড়ায় গলদা মীন এর প্রাচুর্যের কারণ৷ লবণাক্ততা এক থাকা সত্ত্বেও নূরপুরে হুগলী নদীতীরে ঢাল বেশি হওয়ার জাল টেনে গলদা মীন ধরা একটু কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়৷ সংগ্রহকারীরা প্রতি মীন এক টাকা করে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে৷ সংগৃহীত মীন আড়তদার মারফৎ ম্যাটাডোর করে চলে যায় সুন্দরবনের হাসনাবাদ, বসিরহাট, বনগাঁ সীমান্তে৷

মীন সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত টানা জাল নাইলনের তৈরী মশারীর নেট দিয়ে তৈরি হয়৷ বাঁশ চেরাই করে জালের ধরার জন্য তিনদিকের কাঠামো বানানো হয়৷ মীন সংগ্রহ করে সেগুলিকে রাখা হয় নদীর জল ভর্তি মাটির ভাঁড়ে৷ কোনওভাবে অ্যালুমিনিয়াম, স্টীল বা কাঁসার পাত্র ব্যবহৃত হয় না৷ সংগ্রহকারীদের মত— মাটির ভাঁড় জল ঠাণ্ডা রাখে৷

গাদিয়াড়ার পাশের তিনটি গ্রামের প্রায় শ’পাঁচেক কিশোরী, যুবতী, ভাঁটির টান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই রূপনারায়ণের এক বুক জলে নেমে জাল টানা শুরু করে৷ রূপনারায়ণ নদীতীরের চাতালে মৃদু ঢাল থাকায় জলে হেঁটে জাল টানতে অসুবিধা হয় না৷ নদীপাড়ে বাসস্ট্যান্ডে টাকা আর ম্যাটাডোর নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে আড়তদাররা৷ গাদিয়াড়ায় এরা সংখ্যায় জনাদশেক৷ ভরা কোটালে সংগ্রহকারীর মাথাপিছু দৈনিক ৫০-৭০টি মীন জাল টেনে পায়৷ মরা কোটালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১০-১২টিতে৷ জাল টানার পরে জালে ধরা পড়া সবকিছুই নদীপাড়ে নিয়ে আসে সংগ্রহকারীরা৷ শুরু হয় গলদামীন সনাক্ত করার বাছাই পর্ব৷ অনেক প্রজাতির মাছের পোনা সহ কাঁকড়া, সন্ধিপদ, কম্বোজ পর্বের লার্ভা সংগৃহীত অংশে থাকে৷ গলদা চিংড়ির মীন বেছে নিয়ে অন্যান্য মাছের পোনা সহ আবর্জনা বাঁধের ওপর ফেলে দেওয়া হয়৷ অসংখ্য প্রজাতির মাছ সহ অন্যান্য প্রাণীর পোনা অকালে নষ্ট হয়ে যায়৷ রূপনারায়ণ নদীর এই বাস্তুতন্ত্রে খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজাল নির্দিষ্ট৷ বেশ কয়েকটি প্রজাতির পোনা এভাবে নষ্ট হলে অদূর ভবিষ্যতে ঐ প্রজাতিগুলির অবলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে তেমনি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যও নষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়৷ বাছাই পর্বের পর অন্যান্য মাছের পোনা সহ আবর্জনা আবার নদীর জলে ফিরিয়ে দিতে হয়৷ পঞ্চায়েত ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলির এ বিষয়ে প্রচার অভিযান আশু প্রয়োজন৷ বাস্তুতন্ত্র বাঁচিয়ে বিজ্ঞানকে সঙ্গী করে প্রকৃতির সম্পদ কিছু মানুষের বেঁচে থাকায় হয়ে উঠুক শ্রম-নির্ভর সত্যের রসদ৷

সকল অধ্যায়
১.
পরিবেশ শিক্ষার অঙ্গন—সুন্দরবন
২.
সুন্দরবন— একটি ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা
৩.
সুন্দরবন জীবমন্ডল
৪.
ম্যানগ্রোভস্ বায়োম—প্রেক্ষিত-সুন্দরবন
৫.
সুন্দরবনে লবণপ্রাণ
৬.
সুন্দরবনের পাহারাদার— রয়েল বেঙ্গল টাইগার
৭.
সাপ কান্ড সুন্দরবন
৮.
কুমীর বন্দনা
৯.
সুন্দরবনের ঝড়খালিতে পর্যটনকেন্দ্র কোনমতেই নয়
১০.
সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া চিংড়ি
১১.
ইলিশ
১২.
বাগদামীন
১৩.
মীন সংগ্রহকারীদের রোগভোগ
১৪.
গলদা মীন
১৫.
নোনা মাছ— জাতে ওঠেনি আজো
১৬.
প্রান্তিক মানুষ
১৭.
মৌয়াল/মউলে
১৮.
গুণিন
১৯.
বাওয়ালী/বাউলে
২০.
জেলে
২১.
চোরাশিকারী
২২.
বনদস্যু/জলদস্যু
২৩.
সুন্দরবনের গ্রামীণ ডাকাত
২৪.
মোলঙ্গী— নুন চাষীর আর এক নাম
২৫.
শহরে সোঁদরবনের পাঁচ কাহন
২৬.
জলাভূমি—সাম্প্রতিকী ও সংরক্ষণ
২৭.
হেতানিয়া দোয়ানিয়ায় বার্জ-জেটি
২৮.
জনগোষ্ঠী ও ভাষা
২৯.
লৌকিক দেবদেবী
৩০.
গ্রামনাম বৈচিত্র্যে সুন্দরবন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%